‘অপারেশন সার্চলাইট’, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গণহত্যা এবং বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণা

১৯৭১ সালে স্বাধীনতা সংগ্রামে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এক গুরুত্বপূর্ণ দলিল। একাত্তরে পাকিস্তানি সশস্ত্রবাহিনীর বাঙালি সৈনিক, বৈমানিক ও ছাত্র-ছাত্রীদেরকে একই পর্যায়ভুক্ত করে আক্রমণ চালিয়েছিলো। এই অপারেশনের নাম ছিলো ‘অপারেশন সার্চলাইট’। এইচ আওয়ার নির্ধারিত হয়েছিলো ২৬ মার্চ রাত ১ টা। ক্যান্টনমেন্ট থেকে সেনাবাহিনী প্রথম প্রতিরোধের সম্মুখীন হয় ফার্মগেটে। রাস্তায় পড়ে থাকা একটি বিশাল গাছ সেনাবাহিনীর গতিরোধ করে, রাস্তার পাশের এলাকা পুরানো গাড়ি আর স্টিম রোলার দিয়ে বন্ধ ছিলো। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মুসলিম হলের ছাত্ররা হলের সামনে একটি বড় গাছের গুড়ি ফেলে রেখে সেনাবাহিনীকে বাধা দেয়। ভোর ৪টার মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভবনগুলো দখল করে নেয় তারা। ১৮নং পাঞ্জাব, ২২নং বেলুচ এবং ৩২নং পাঞ্জাব রেজিমেন্টের বিভিন্ন ব্যাটেলিয়ন নিয়ে গঠিত বিশেষ ভ্রাম্যমাণ বাহিনী লেফটেন্যান্ট কর্নেল তাজের নেতৃত্বে স্বয়ংক্রিয় রাইফেল, ট্যাংক বিধ্বংসী বিকয়েললেস রাইফেল, রকেট লঞ্চার, মর্টার, ভারি ও হাল্কা মেশিনগানে সজ্জিত হয়ে ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ থেকে ২৭ মার্চ সকাল পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস ঘেরাও করে আক্রমণ, গণহত্যা, লুণ্ঠন, অগ্নিসংযোগ এবং ধ্বংসযজ্ঞ চালায়।

সেই রাতে দৈবক্রমে পাকিস্তানি হানাদারদের আক্রমণ থেকে বেঁচে যাওয়া অধ্যাপক ড. মফিজুল্লাহ্ কবির তাঁর ১৯৭১-৭২ সালের বার্ষিক রিপোর্টে লেখেন, ঐ রাতে ছাত্রসহ প্রায় ৩০০ ব্যক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় নিহত হয়। সেই সাথে ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০ জন শিক্ষক ও ২৬ জন অন্যান্য কর্মচারী। নিহত শিক্ষকদের মধ্যে ছিলেন ড. ফজলুর রহমান (মৃত্তিকা বিজ্ঞান বিভাগ), অধ্যাপক এ আর খান খাদিম (গণিত বিভাগ), অধ্যাপক শরাফত আলী, ড. গোবিন্দচন্দ্রদেব (প্রাক্তন প্রোভস্ট জগন্নাথ হল), অধ্যাপক মনিরুজ্জামান, ড. জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা (প্রোভস্ট জগন্নাথ হল), অনুদ্বৈপায়ন ভট্টাচার্য, অধ্যাপক মুহম্মদ মুকতাদির (ভূতত্ত্ব) প্রমুখ। সবচেয়ে নারকীয় ঘটনা ঘটে জগন্নাথ হলে, সেই রাতে ৩৪ জন ছাত্র শুধু সেই হলেই নিহত হয়। ২৬ মার্চ রমনা কালীবাড়িও আক্রান্ত হয়, সেখানে নিহত হয় জগন্নাথ হলের ৬ জন ছাত্র। হানাদার বাহিনী হত্যা করে মধুর ক্যান্টিনের মধুসূদন দে’কেও (মধুদা)। মুক্তিযুদ্ধকালীন পাকিস্তানী সৈন্যরা মুধুর ক্যান্টিন ডিনামাইট দিয়ে উড়িয়ে দিতে শুরু করলে উর্দু বিভাগের শিক্ষক আফতাব আহমদ সিদ্দিকী খবর পেয়ে তাদের বাধা দেন এবং জানান যে এই ভবনেই ১৯০৬ সালে মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলো। ১০ নভেম্বর সশস্ত্র সৈন্যরা রোকেয়া হলে প্রবেশ করে এবং ত্রিশজন ছাত্রীর উপর বর্বর নির্যাতন করে, তারা প্রোভস্ট বাংলোও অবরোধ করে রাখে।

একাত্তরের মার্চ মাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশনের অধিবেশনে যোগদানের জন্য জেনেভা যান। সেখানে জেনেভার একটি পত্রিকায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দু’জন ছাত্রের মৃত্যু সংবাদ দেখে বিচলিত হয়ে ২৫ মার্চ পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক শিক্ষা সচিবকে পাকিস্তান দূতাবাসের মাধ্যমে প্রেরিত এক পত্রে লেখেন, ‘আমার নিরস্ত্র ছাত্রদের উপর গুলি চালানোর পর আমার ভাইস চ্যান্সেলর থাকার কোনো যুক্তিসংগত কারণ নেই। তাই আমি পদত্যাগ করলাম।’ ফলে মার্চের সেই কালরাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছিলো উপাচার্য বিহীন। পরে মুজিবনগর সরকার বিচারপতি সাঈদকে ‘প্রবাসী সরকারের বিশেষ প্রতিনিধি’ হিসেবে নিয়োগ দেয়। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য ড. সৈয়দ সাজ্জাদ হোসায়েনকে তাদের কনভয়ে করে ঢাকায় নিয়ে এসে ১৯ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের পদে বসান। তাকে সহায়তা করেন ড. হাসান জামান, ড. মেহের আলি। স্বাধীনতার পর তিনজনই গ্রেফতার হন এবং মুক্তির পর দেশত্যাগ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অসংখ্য ছাত্র-ছাত্রী মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি অংশগ্রহণ করেন। এদের অনেকেই পরবর্তীতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে কমিশন লাভ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষক মুক্তিযুদ্ধকালীন মুজিবনগর যান এবং প্রবাসী সরকারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ে ধ্বংসযজ্ঞ চালাবার পরে টিক্কা খান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল বিভাগীয় প্রধানদের ২১ এপ্রিল ও সকল শিক্ষকদের ১ জুন কাজে যোগ দিতে বলেন। টিক্কা খান ২ আগস্ট থেকে সকল ক্লাস চালু করারও আদেশ জারি করেন। মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগে কয়েকজন শিক্ষককে গ্রেফতার করে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে বন্দী করা হয় এবং ইন্টারোগেশনের মাধ্যমে নির্যাতন করা হয়। এদের মধ্যে ছিলেন ড. আবুল খায়ের, ড. রফিকুল ইসলাম, এ কে এম সাদউদ্দিন, আহসানুল হক এবং এম শহীদুল্লাহ। টিক্কা খান অধ্যাপক মুনীর চৌধুরী, ড. নীলিমা ইব্রাহিম, ড. এনামুল হককে লিখিতভাবে সতর্ক করে দেন; ড. আবু মোহাম্মদ হাবিবুল্লাহকে পদচ্যুত করা হয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছিলো বাংলাদেশের স্বাধীনতা চেতনার উন্মেষকেন্দ্র। বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য সশস্ত্র সংগ্রামেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবদান অবিস্মরণীয়। একাত্তরের মার্চ মাসে পাকিস্তানের সামরিক ও আমলাচক্রের মুখপাত্র জেনারেল ইয়াহিয়া খান ও জুলফিকার আলী ভুট্টো বাঙালিদের দমনের অভিযান অপারেশন সার্চ লাইট শুরু করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে।

পঁচিশে মার্চ কালরাত : অপারেশন সার্চলাইট:
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আক্রমণকারী পাকিস্তান বাহিনীতে ছিলো ১৮নং পাঞ্জাব, ২২নং বেলুচ, এবং ৩২নং পাঞ্জাব রেজিমেন্টের বিভিন্ন ব্যাটেলিয়ন। ২৫ মার্চের রাত থেকে ২৭ মার্চ সকাল পর্যন্ত এ বিশেষ মোবাইল বাহিনী স্বয়ংক্রিয় রাইফেল, ট্যাংক বিধ্বংসী রিকয়েলস রাইফেল, রকেট লাঞ্চার মার্টার ভারি ও হালকা মেশিনগানে সজ্জিত হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ঘিরে ফেলে। পশ্চিম দিক থেকে রেললাইনজুড়ে ৪১ ইউনিট, দক্ষিণ দিকজুড়ে ৮৮ ইউনিট এবং উত্তর দিক থেকে ২৬ ইউনিট কাজ শুরু করে।

শিক্ষক হত্যা:
২৫ মার্চের কালরাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৯ জন শিক্ষককে হত্যা করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৩নং নীলক্ষেতের বাড়িতে মৃত্তিকা বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. ফজলুর রহমানকে তাঁর দুই আত্মীয়সহ হত্যা করা হয়, ফজলুর রহমানের স্ত্রী দেশে না থাকায় প্রাণে বেঁচে যান তিনি। হানাদার বাহিনী বাংলা বিভাগের অধ্যাপক আনোয়ার পাশা ও ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক রাশিদুল হাসানের বাড়িতেও প্রবেশ করে। উভয় পরিবার খাটের নিচে লুকিয়ে সেই যাত্রায়প্রাণে বাঁচেন। ঘরে ঢুকে টর্চের আলো ফেলে তাঁদের কাউকে না দেখে হানাদাররা চলে যায়। উভয় শিক্ষক সে রাত্রে বেঁচে গেলেও, মুক্তিযুদ্ধের শেষে তাঁরা আলবদর বাহিনীর হাত থেকে বাঁচতে পারেননি, এমনকি বাড়ি পরিবর্তন করেও। ২৪নং বাড়িতে থাকতেন বাংলা বিভাগের অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম, সেই বাড়ির নিচে দুই পায়ে গুলিবিদ্ধ দুই মা তাদের শিশু সন্তান নিয়ে আশ্রয় নেওয়ায় সিঁড়িতে রক্ত ছিলো। পাক সৈন্যরা ভেবেছিলো, অন্য কোনো দল হয়তো অপারেশন শেষ করে গেছে তাই তারা আর ঐ বাড়িতে ঢোকেনি। অধ্যাপক ড. রফিকুল ইসলাম তখন প্রাণে বেঁচে যান। ঐ বাড়িরই নিচতলায় থাকতেন এক অবাঙালি অধ্যাপক। পঁচিশে মার্চের আগেই সেই ব্যক্তি কাউকে না জানিয়ে বাড়ি ছেড়ে চলে যান। বিশ্ববিদ্যালয় আবাসিক এলাকার সব অবাঙালি পরিবার তা-ই করেছিলেন।

ফুলার রোডের ১২ নম্বর বাড়িতে হানা দিয়ে হানাদাররা নামিয়ে নিয়ে যায় সমাজ বিজ্ঞানের অধ্যাপক সৈয়দ আলী নকিকে। তাঁকে গুলি করতে গিয়েও, পরে তাকে ছেড়ে দেয়া হয় এবং উপরের তলার ভূতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক মুহম্মদ মুকতাদিরকে গুলি করে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করা হয়। ২৭ মার্চ অধ্যাপক মুকতাদিরের লাশ পাওয়া যায় তৎকালীন ইকবাল হলে (বর্তমান জহুরুল হক হল), তাঁকে পরে পল্টনে এক আত্মীয়ের বাড়িতে দাফন করা হয়। সলিমুল্লাহ হল এবং তৎকালীন ঢাকা হলে (বর্তমান শহীদুল্লাহ্ হল) হানা দিয়ে ঢাকা হলের হাউস টিউটর ইংরেজির অধ্যাপক কে এম মুনিমকে পাতিস্তানি সেনারা প্রহার করে এবং ঢাকা হলে হত্যা করে গণিতের অধ্যাপক এ আর খান খাদিম আর অধ্যাপক শরাফত আলীকে। জগন্নাথ হলের মাঠের শেষ প্রান্তে অধ্যাপকদের বাংলোতে ঢুকে তারা অর্থনীতির অধ্যাপক মীর্জা হুদা এবং শহীদ মিনার এলাকায় ইতিহাসের অধ্যাপক মফিজুল্লাহ কবীরের বাড়িতে ঢুকে তাঁদের প্রহার করে।

জগন্নাথ হলে হামলা করার সময় আক্রান্ত হয় হলের প্রাক্তন প্রাধ্যক্ষ ড. গোবিন্দচন্দ্র দেবের বাস ভবন। পাকিস্তানি হানাদাররা হত্যা করে অধ্যাপক দেব এবং তাঁর পালিত কন্যা রোকেয়ার স্বামীকে। পরে জগন্নাথ হল সংলগ্ন বিশ্ববিদ্যালয় স্টাফ কোয়ার্টার, সেখানে হত্যা করা হয় পরিসংখ্যানের অধ্যাপক ড. মনিরুজ্জামান তাঁর পুত্র ও আত্মীয়সহ। আক্রমণে মারাত্বক আহত হন জগন্নাথ হলের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা পরে তিনি হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন। বৈদ্যুতিক মিস্ত্রী চিৎবালী ও জনৈকা রাজকুমারী দেবী তথ্য প্রদান করেন যে, ঢাকা মেডিকেল কলেজের চিকিৎসকরা চিনতে পেরে জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতাকে মর্গের কাছে গাছের নিচে খুব অল্প পরিসরে চিরদিনের জন্য শুইয়ে রেখেছেন। অধ্যাপক ড. মনিরুজ্জামান ও অধ্যাপক ড. জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতাকে পাশাপাশি দাড় করিয়ে হত্যা করা হয়। জগন্নাথ হলে আরো নিহত হন হলের সহকারি আবাসিক শিক্ষক অনুদ্বৈপায়ন ভট্টাচার্য। এ তথ্য পাওয়া যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলার অধ্যাপক শহীদ বুদ্ধিজীবী আনোয়ার পাশার মার্চ থেকে ডিসেম্বর নাগাদ লেখা আত্মজৈবনিক উপন্যাস ‘রাইফেল রোটি আওরাত’ গ্রন্থে।

শিক্ষার্থী হত্যা:
১৯৭১ সালের মার্চে অসহযোগ আন্দোলনের দিনগুলিতে ‘স্বাধীন বাংলাদেশ ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের’ কর্মকাণ্ড পরিচালিত হত ইকবাল হল (পর সার্জেন্ট জহুরূল হক হল থেকে)। পাকিস্তানি অপারেশন সার্চ লাইটের প্রথম লক্ষ্যবস্তু ছিলো জহুরুল হক হল। ২৫ মার্চের মধ্যরাতের পূর্বে প্রায় সব সাধারণ ছাত্ররা হল ছেড়ে যান। সেদিন রাত থেকে ২৬ মার্চ সারা দিন রাত ঐ হলের উপর নীলক্ষেত রোড থেকে মর্টার, রকেট লাঞ্চার, রিকয়েলস রাইফেল এবং ভারী মেশিন গান ও ট্যাংক থেকে প্রচণ্ড আক্রমণ পরিচালিত হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কে এ মুনিম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৯৭১-৭২ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনে লিখেছিলেন, শুধু জহুরুল হক হলেই ছাত্রলীগের প্রায় ২০০ ছাত্র নিহত হন।

রাত বারোটার পর ইউওটিসির দিকের দেয়াল ভেঙে পাকবাহিনী ট্যাংক নিয়ে জগন্নাথ হলের মধ্যে প্রবেশ করে এবং প্রথমেই মর্টার ছোড়ে উত্তর বাড়ির দিকে। সাথে সাথে অজস্র গুলিবর্ষণ শুরু হয়। তারা ঢুকে পড়ে জগন্নাথ হলে। উত্তর ও দক্ষিণ বাড়ির প্রতিটি কক্ষ অনুসন্ধান করে ছাত্রদের নির্বিচারে গুলি করে। সেই রাতে জগন্নাথ হলে ৩৪ জন ছাত্র শহিদ হয়। জগন্নাথ হলের কিছু ছাত্র তখন রমনার কালী বাড়িতে থাকতো। ফলে, ৬ জন ছাত্র সেই রাতে সেখানে নিহত হয়। এদের মধ্যে শুধু অর্থনীতি বিভাগের ছাত্র রমনীমোহন ভট্টাচার্য ব্যতীত অন্যদের নাম জানা যায় না। এছাড়া বহু সংখ্যক অতিথিও নিহত হয় এদের মধ্যে ভৈরব কলেজের হেলাল, বাজিতপুর কলেজের বাবুল পাল, জগন্নাথ কলেজের বদরুদ্দোজা, নেত্রকোনার জীবন সরকার, মোস্তাক, বাচ্চু ও অমরের নাম জানা যায়।

১৯৭১ সালের মার্চে ঢাকার মার্কিন কনসাল আর্চার কে ব্লাডের লেখা গ্রন্থ, ‘দি ক্রুয়েল বার্থ অব বাংলাদেশ’ থেকে জানা যায় সেই রাতে রোকেয়া হলে আগুন ধরানো হয়েছিলো এবং ছাত্রীরা হল থেকে দৌড়ে বের হবার সময় মেশিন গান দিয়ে গুলি করা হয়। ২৬ মার্চ সকালের দিকে সেনাবাহিনীর কন্ট্রোল রুম ও ৮৮ ইউনিটের মধ্যে যে কথোপকোথন হয় তা থেকে জানা যায় ক্যাম্পাসে চারশ’ ছাত্র নিহত হয়।

কর্মচারী হত্যা:
জহুরুল হক হল আক্রমণকারী বাহিনী ব্রিটিশ কাউন্সিল প্রহরারত ইপিআর সদস্যদের পৈশাচিকভাবে হত্যা করে। তারা শিক্ষকদের ক্লাব লাউঞ্জে আশ্রয়গ্রহণকারী ক্লাব কর্মচারী সিরাজুল হক, আলী হোসেন, সোহরাব আলি গাজী এবং আবদুল মজিদকে হত্যা করে। টিএসসিতে নিহত কর্মচারীরা ছিলেন আবদুস সামাদ, আবদুস শহীদ, লাড্ডু লাল। রোকেয়া হল চত্বরে নিহত হন আহমদ আলী, আবদুল খালেক, নমী, মো. সোলায়মান খান, মো. নুরুল ইসলাম, মো. হাফিজউদ্দিন, মো. চুন্নু মিয়া এবং তাদের পরিবার পরিজন।

পাকিস্তানি বাহিনী শহীদ মিনার ও বাংলা একাডেমি আক্রমণ করে তারাই ঢাকা হল (বর্তমানে শহীদুল্লাহ হল) সংলগ্ন শিক্ষকদের আবাসে ও মধুসূদন দে’র বাড়িতে হামলা চালায়। সৈন্যরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১১নং বাড়ির বাসিন্দা বিশ্ববিদ্যালয় ল্যাবরেটরি স্কুলের শিক্ষক মোহাম্মদ সাদেককে হত্যা করে। ২৩নং নীলক্ষেত আবাসের ছাদে আশ্রয় গ্রহণকারী নীলক্ষেত পুলিশ ফাঁড়ি থেকে পালিয়ে আসা বাঙালি পুলিশ কর্মচারী, প্রেসিডেন্ট হাউস (পুরাতন গণভবন) প্রহরারত বাঙালি ইপিআর সদস্য এবং নীলক্ষেত রেল সড়ক বস্তি থেকে আগত প্রায় ৫০ জনকে পাকিস্তানি সৈন্যরা হত্যা করে লাশ ফেলে যায়। ২৫ থেকে ২৭ মার্চের মধ্যে তিনটি ধর্মস্থান ধ্বংস ও ঐসব স্থানে হত্যা যজ্ঞ চালায় পাকিস্তানি বাহিনী। তিনটি স্থান ছিলো, কলাভবন সংলগ্ন শিখ গুরুদ্বার, রমনার মাঠে দুটি কালি মন্দির এবং শহীদ মিনারের বিপরীত দিকে অবস্থিত শিবমন্দির। সেই রাতে আরো নিহত হয় দর্শন বিভাগের কর্মচারী খগেন দে, তার পুত্র মতিলাল দে, বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মচারী সুশীল চন্দ্র দে, বোধিরাম, দাক্ষুরাম, ভীমরায়, মনিরাম, জহরলালা রাজভর, মনভরন রায়, মিস্ত্রি রাজভর, শংকর কুরী।

বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা:
‘এটাই হয়তো আমার শেষ বার্তা, আজ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন। বাংলাদেশের জনগুণ, তোমরা যে যেখানেই আছো এবং যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে দখলদার সৈন্য বাহিনীকে প্রতিরোধ করার জন্য আমি তোমাদের আহবান জানাচ্ছি। পাকিস্তান দখলদার বাহিনীর শেষ সৈনিকটিকে বাংলাদেশের মাটি থেকে বিতাড়িত করে বিজয় অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত তোমাদের যুদ্ধ চালিয়ে যেতে হবে।’-বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। (২৫ মার্চ ১৯৭১, গ্রেফতার হওয়ার পূর্বে পাঠানো বঙ্গবন্ধুর শেষ তারবার্তা।)

তথ্যপঞ্জি:
১. ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৮০ বছর – অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম; পৃষ্টা: ১৮৮
২. ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৮০ বছর – অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম; পৃষ্টা: ১৯৩
৩. ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৮০ বছর – অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম; পৃষ্টা: ১৯৪
৪. ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৮০ বছর – অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম; পৃষ্টা: ১৯৬
৫. ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৮০ বছর – অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম; পৃষ্টা: ২০৫
৬. ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৮০ বছর – অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম; পৃষ্টা: ১৯৭
৭. ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৮০ বছর – অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম; পৃষ্টা:১৯৮
৮. ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৮০ বছর – অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম; পৃষ্টা:১৯৪
৯. ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৮০ বছর – অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম; পৃষ্টা:১৯৩
১০. ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৮০ বছর – অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম; পৃষ্টা:১৯৭
১১. ডেইলি ডন, পাকিস্তান, নভেম্বর ১১, ১৯৭১
১২. ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৮০ বছর – অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম; পৃষ্টা:২০৮
১৩. ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৮০ বছর – অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম; পৃষ্টা:২০৬
১৪. ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৮০ বছর – অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম; পৃষ্টা:২০৭
১৫. বাংলাপিডিয়া: আবদুর রাজ্জাক (ফেব্রুয়ারি ২০০৬)
১৬. লন্ডন টাইমস্, জুলাই ৮, ১৯৭১
১৭. ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৮০ বছর – অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম; পৃষ্ঠা:২০৭

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *