আজ ২৫ মার্চ, চেতনাকে ঝালাই করে নিতে আবার পড়ুন

# সেই কালোরাতে ইথারে খুনীরা যা বলেছিলো
২৫ মার্চ, ১৯৭১। অপারেশনে নেমেছে পাকিস্তান সেনাবাহিনী। আনুষ্ঠানিক নাম- অপারেশন সার্চলাইট। বাস্তবে নির্বিচার হত্যা, জ্বালাও-পোড়াও। স্বাধীনতাকামী বাঙালীর কণ্ঠ বুলেট দিয়ে চিরতরে স্তব্ধ করার সামরিক নকশা। সেরাতে দেড়টা থেকে পরদিন সকাল ৯ টা পর্যন্ত পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ওয়ারলেস ট্রান্সমিশন রেকর্ড করেছিলেন আনবিক শক্তি কমিশনের ড. এম এম হোসেইন। ঢাকার খিলগাও চৌধুরীপাড়ার বি-১৭৪ নং বাড়িতে বসে প্রাণের উপর ঝুঁকি নিয়ে কাজটি করেছিলেন এই পদার্থবিদ। ইংরেজি-উর্দূ মেশানো অসম্পূর্ণ এই ট্রান্সক্রিপ্টের অনুবাদ একটু কঠিন ঠেকেছে। মিলিটারি জারগন জানার চেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে প্রতিটি অপারেশনে বিশেষ কোড থাকে, যা সংশ্লিষ্টরাই শুধু জানে। সেগুলো ডিসাইফার করতে সমস্যা হয়েছে খুব। কিছু বিশেষ সম্বোধনের অর্থ ধরতে পারিনি। আবার কিছু আন্দাজ করে নিয়েছি। যেমন ইমাম (ধারণা করছি এর অর্থ কমান্ডার। সেটা টিক্কা খান, আবার জাহানজেব আরবাব থেকে শুরু করে ইউনিট কমান্ডারও হতে পারে)। আবার মেইন বার্ড বলতে বোঝানো হয়েছে শেখ মুজিবর রহমানকে। টিক্কা খানের (স্ক্রিপ্টে যাকে কন্ট্রোল হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে) তত্বাবধানে পরিচালিত এই অপারেশনের রেকর্ডকৃত ট্রান্সক্রিপ্টে বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা, রাজারবাগ পুলিশ লাইন, পিলখানায় অপারেশনের দায়িত্বে থাকা ইউনিটগুলোর কথাবার্তা উল্লেখযোগ্য, যদিও প্রতিটি বার্তা ধারাবাহিক এমন নয়, অনেকে কথা বলছে, অনেক সময় বেশ সময় নিয়ে বলছে। কল্পনায় দিব্যি দেখতে পাচ্ছি রিসিভার হাতে এসব বার্তা বিনিময়ের সময় জ্বলছে ঢাকা, মরছে বাঙালী। একইসঙ্গে শুরু হয়ে গেছে মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতার প্রথম প্রহর।

# সেই কালোরাতে ইথারে খুনীরা যা বলেছিলো…২
প্রাসঙ্গিক কিছু কথা : অপারেশন সার্চ লাইট চূড়ান্তকরণ হয়েছিলো সাধারণ একটি নীল রংয়ের প্যাডে (নীলনক্সা হিসেবে ঠিক আছে) সাধারণ একটি কাঠ পেন্সিলে! পূর্ব পাকিস্তানে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর জনসংযোগ কর্মকর্তা (পিআরও) হিসেবে দায়িত্ব পালন করা সিদ্দিক সালিক তার লেখা উইটনেস টু সারেন্ডারে বর্ণনা দিয়েছেন এর। জেনারেল রাও ফরমান আলী খসড়া করেছিলেন মূল পরিকল্পনাগুলোর। আর এর দ্বিতীয়ভাগ লিখেছেন জেনারেল খাদিম হোসেন রাজা। সেনা বন্টন এবং কোন ব্রিগেড ও ইউনিট কোন অপারেশনের দায়িত্বে থাকবে তারই নির্দেশনামা।
পাঁচ পৃষ্ঠাজুড়ে ১৬টি অনুচ্ছেদে পরিকল্পিত এই অপারেশনের মূল লক্ষ্য ছিলো ইপিআর (ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস, বর্তমানে বিডিআর) ও পুলিশসহ বাঙালী সেনা সদস্যদের নিরস্ত্র করা, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানসহ আওয়ামী লিগ নেতা এবং গুরুত্বপূর্ণ ১৬ জন ব্যক্তির বাসায় হানা দিয়ে তাদের গ্রেপ্তার। ২০ মার্চ ফ্ল্যাগস্টাফ হাউজে জেনারেল হামিদ ও লে. জেনারেল টিক্কা খানকে পড়ে শোনানো হয় এই হাতে লেখা পরিকল্পনা। দুজনই তা অনুমোদন করেন। সে অনুযায়ী রাও ফরমান আলীর তত্বাবধানে ব্রিগেডিয়ার জাহানজেব আরবাবের নেতৃত্বাধীন ৫৭ ব্রিগেড ঢাকা ও আশপাশে অপারেশন চালায়, মেজর জেনারেল খাদিম রাজা দেশের বাকি অংশে।

২৫ মার্চ রাত ঠিক সাড়ে ১১টায় রেডিও ট্রান্সমিটারগুলো জীবন্ত হয়ে ওঠে। মূল অপারেশনের সময়সীমা ছিলো রাত একটা (ক্যালেন্ডারের পাতায় ২৬ মার্চ শুরু), তার আগেই টার্গেটের আশেপাশে ইউনিটগুলোর অবস্থান নেওয়ার কথা। তার মধ্যেই প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার পশ্চিম পাকিস্তানে পৌঁছে যাবেন। কিন্তু স্বাধীনতাকামী বাঙালী ছাত্র-জনতা তার আগে থেকেই রাস্তায় প্রতিরোধ গড়ে তুলছিলো, গুরুত্বপূর্ণ সড়ক থেকে শুরু করে বিভিন্ন জায়গায় গাছের গুড়ি ও নানা কিছু দিয়ে রোডব্লক তৈরি করেছিলো তারা। গোয়েন্দাসূত্রের এই খবরেই সাড়ে ১১টায় সবগুলো ইউনিটই ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট থেকে যাত্রা শুরু করে।

ঢাকার এই অপারেশনে বিভিন্ন দায়িত্বে ছিলো :
১৩ ফ্রন্টিয়ার ফোর্স : ঢাকা সেনানিবাস আক্রান্ত হলে সেটা সামাল দিতে রিজার্ভ হিসেবে রাখা হয়েছিলো তাদের।
৪৩ লাইট অ্যান্টি এয়ারক্রাফট রেজিমেন্ট : তেজগাঁ বিমানবন্দরের দায়িত্বে
২২ বেলুচ : পিলখানায় ইপিআরদের নিরস্ত্রিকরণ ও তাদের ওয়ারলেস এক্সচেঞ্জ দখলের দায়িত্বে।
৩২ পাঞ্জাব : রাজারবাগ পুলিশ লাইনের দায়িত্বে
১৮ পাঞ্জাব : নবাবপুরসহ পুরান ঢাকার হিন্দু অধ্যুষিত এলাকাগুলোর দায়িত্বে
১৮ পাঞ্জাব, ২২ বেলুচ ও ৩২ পাঞ্জাবের একটি করে কোম্পানির সমন্বয়ে যৌথ ইউনিট ইকবাল হল ও জগন্নাথ হলসহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্ব পেয়েছিল
স্পেশাল সার্ভিস গ্র“পের একদল কমান্ডোর দায়িত্ব ছিলো শেখ মুজিবকে (কলসাইন : মেইন বার্ড) জীবিত গ্রেপ্তার করা। এক স্কোয়াড্রন এম-২৪ ট্যাঙ্ক ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে যোগ দেওয়ার অপেক্ষায় ছিলো। এছাড়া সেকেন্ড ক্যাপিটাল (শেরেবাংলা নগর/সংসদভবন এলাকা) এবং মীরপুর ও মোহাম্মদপুরের বিহারী অধ্যুষিত এলাকায় দায়িত্বরত ছিলো ফিল্ড রেজিমেন্ট।

কিছু শব্দার্থ জেনে রাখলে সুবিধা হবে পাঠকদের : ৮৮, ৪১, ২৬, ৫৫ এসব হচ্ছে দায়িত্বরত ইউনিটগুলোর পরিচিতি সংকেত। কথা বলার আগে কোন ইউনিট কথা বলছে তারই পরিচয় দিতে সংখ্যাটা বলেছে তারা। একইভাবে কোনো নির্দিষ্ট ইউনিট যখন অন্য কোনো ইউনিটের সঙ্গে কথা বলতে চাইছে তখন সে সেটা উল্লেখ করছে, যেমন ৮৮কে ৯৯। রজার মানে বোঝা গেছে, লাউড অ্যান্ড ক্লিয়ার মানে পরিষ্কার বোঝা গেছে, উইলকো মানে উইল কমপ্লাই বা আদেশ পালিত হবে, ওভার মানে বাক্য শেষ, আউট টু ইউ মানে তোমার সঙ্গে কথা শেষ, ইমাম হচ্ছে কমান্ডিং অফিসার, মারখোর এডজুটেন্ট/কমান্ডিং অফিসারের স্টাফ অফিসার। কন্ট্রোল হচ্ছে রেজিমেন্ট কন্ট্রোল রুম। আবারও বলছি, বার্তা বিনিময়ের মধ্যে বিরতি ছিলো, তাই প্রতিটি লাইনকে ধারাবাহিক ধরে নেওয়া উচিত হবে না।

আগের অংশের পর :

: কমিশনার অফিসে আমাদের এখান থেকে পুরানো পল্টন এলাকায় প্রচুর আগুন জ্বলতে দেখা যাচ্ছে। এটা কি হেড অফিস নাকি অন্য কোনো জায়গা? ওভার।
: ৯৯কে ২৬। ২০০০ (এরিয়া টু থাউজেন্ড/রাজারবাগ পুলিশ লাইন) আগুন জ্বলছে। আবার বলছি ২০০০ জ্বলছে। ওভার।
: ৮৮কে ৯৯। পিপলস ডেইলির (হোটেল ইন্টারকনের/এখন শেরাটন উল্টোদিকে অবস্থিত পত্রিকা অফিস) কি অবস্থা?
: ৯৯কে ২৬। উড়িয়ে দেওয়া হয়েছে (ব্লাসটেড)। আবার বলছি, উড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। গুরুতর আহত অবস্থায় আমাদের দুজনকে সিএমএইচ (সম্মিলিত সামরিক হাসপাতাল) পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে, আরও দুজন অল্প আঘাত পেয়েছে। ওভার।
: ২৬কে ৯৯, প্রতিপক্ষের ক্ষয়ক্ষতির কোনো আন্দাজ? ওভার।
: ২৬, না। এই মুহূর্তে অনুমান করা কঠিন। লক্ষ্যবস্তুগুলোতে আগুন জ্বলছে অথবা পুরোপুরি ধ্বংস করা হয়েছে। এই মুহূর্তে কিছু বলা সম্ভব হচ্ছে না। ওভার।
: ২৬কে ৯৯, পুলিশ লাইনেরও ব্যবস্থা নেওয়া হয়ে গেছে? ওভার।
: ৯৯কে ২৬। হ্যাঁ বলেছি, দুই হাজার, পুলিশ লাইন জ্বলছে। ওভার।
: ২৬কে ৯৯। দারুণ দেখিয়েছো। আউট।
: ৫৫। লাউড অ্যান্ড ক্লিয়ার। ওভার।
: ৫৫, মারখোর শুনছে। পাঠাও। ওভার।
: ৫৫, বার্তা পাঠাও। ওভার।
: ৫৫ আপনি কল করেছিলেন। মেসেজ পাঠান। মারখোর শুনছেন (উর্দু)। ৫৫, আপনার মেসেজ পাঠান। ওভার।
: ৫৫….
: ৫৫, আবার বলেন। ওভার।
: ৫৫….
: ৮৮কে ২৬। অগ্রগতি জানাও। ওভার।
: ৫৫। রজার। এদের সঙ্গে ঠিক কোথায় যোগাযোগ হয়েছিলো? ওভার।
: ৮৮কে ২৬। আপনার কথা ভেঙে ভেঙে আসছে আর জগন্নাথের ব্যাপারে অগ্রগতি জানান, জগন্নাথের ব্যাপারে (উর্দু)। ওভার
: …. আপনার কাছে রিপোর্ট করবে।
:৮৮কে ২৬। রজার। আউট।
: ৫৫। আমি আবার বলছি, আমাদের…. সামনে একটা রোড ব্লক ছিলো আর আমরা সেটা সরাচ্ছি, আর… … … আদার এলিমেন্টস। ওভার।
: ৫৫। জলি গুড শো (দারুণ দেখিয়েছো)। তোমার এলিমেন্টগুলো (সম্ভবত সাপোর্টিং আর্টিলারির কথা বলা হয়েছে) ২৬ এ পাঠানোর কথা। তবে তারা বেশি কাজে আসবে ৮৮র, যারা এই মুহূর্তে বেশ ঝামেলায় পড়েছে। আসতে থাকো। আউট।
: ৫৫। রি-নেট (ট্রান্সমিটার সেট করার নির্দেশ)। আপনার সেটের নেটিং চেক করুন। বোঝা যাচ্ছে না আপনি কি বলছেন (উর্দু)। ৫৫, ৫৫, ৫৫, ৫৫… নেটিং কল। নেট নাও। নেটিং কল এন্ডস।
: ৫৫। আমার কথা শোনা যায়? ওভার।
: ৫৫, ৫৬ … … ওভার।
: ৫৫, এখনো শিসের মতো শব্দ হচ্ছে। ট্রান্সমিটার আবার নেট করো (উর্দু)। ৫৫, ৫৫, ৫৫, ৫৫। হিয়ার নেটিং কল। নেট নাও। নেটিং কল এন্ডস।
: ৫৫। আমার কথা শোনা যায়? ওভার।
: ৫৫… …।
: ৫৫। রজার। মাইক একটু দূরে রেখে কথা বলুন (উর্দু)। ৫৫, আর কিছু না। আউট।
: মেসেজ। ওভার।
: ৮৮কে ২৬, ৮৮কে ২৬, মেসেজ। ওভার।
: ২৬কে ৮৮। আমরা যাচ্ছি…
: ৮৮কে ২৬। জগন্নাথের অগ্রগতি জানাও, আবার বলছি, জগন্নাথ। ওভার।
: ২৬কে ৮৮। আমার ইমাম যাচ্ছেন।
: ৮৮কে ২৬। রজার আউট।
: মারখোরকে মারখোর। ওভার।
: ১৬। অপেক্ষা করো। আউট।
: ওদিকের ক্ষয়ক্ষতি কেমন? ওভার।
: ১৬… … চারজন নিহত।
: রজার। আহতদের যথার্থ চিকিৎসা সেবা দেওয়া হয়েছে?
: … … … ইপিআর হাসপাতাল। ওভার।
: ১৬। খুব ভালো। আউট টু ইউ। হ্যালো ২৬, হ্যালো ২৬, হ্যালো ২৬, মেসেজ। ওভার।
: ৫৫। অবস্থান জানাও। ওভার।
: ৫৫। অবস্থান জানাও। ওভার।
: ৫৫, আমি ফার্মগেটের কাছাকাছি আর এখন বিস্ফোরক ও অন্যান্য জিনিস দিয়ে রোড ব্লক সরাচ্ছি। আমরা এখনও আগের জায়গাতেই আছি। ওভার।
: ৫৫। রজার। আশা করি কেউ তোমাদের বিরুদ্ধে লাগার সাহস করেনি। ওভার।
: ৫৫। আমরা চারদিকে চিতা (কমান্ডো দল) ছড়িয়ে দিয়েছি। এখন পর্যন্ত নেতিবাচক। ওভার।
: ৫৫। রজার। (বুল)ডোজার এবং অন্যান্য উদ্ধার সরঞ্জাম আছে তোমার সঙ্গে? ওভার।
: ৫৫। হ্যা, ডোজার এখন সামনে জায়গামতো যাচ্ছে সরাতে… … … শক্তি দিয়ে। আর এরাও আমাদের বেশ সাহায্য করছে। ওভার।
কন্ট্রোল: ৫৫। বেশ দারুণ। আসতে থাকো। আমরা এখন এই মূলভবনের এলাকায়। তুমি চেষ্টা করে দেখো রাস্তাগুলোর অপ্রয়োজনীয় ক্ষতি এড়িয়ে যেতে। আউট।
: …. ওভার।
: ৭৭কে…, ৭৭কে ১৬, মেসেজ। ওভার।
: ১৬, মারখোরকে দিন। ওভার।
: ১৬, মারখোরকে দিন। ওভার।
: ১৬ …
: ১৬, আগে যেভাবে বলা হয়েছিলো, তোমার আসল দলের (অরিজিনাল ফোর্স) ইমাম প্রয়োজনীয় দায়িত্ব পালন করবে এবং আনুষঙ্গিক কি কি করতে হবে সেগুলো বের করে সে অনুযায়ী সাজাবে। ভোর না হওয়া পর্যন্ত কিংবা তোমাদের ওখানের ইমাম না আসা পর্যন্ত যেমন ছিলে সেভাবেই থাকতে বলা হচ্ছে।
: ১৬, উইলকো। আউট।
: … ইমামের জন্য। ওভার।
: … অপেক্ষা করো। ওভার।
: ইমাম শুনছেন। মেসেজ পাঠাও। ওভার।
: ৪১, তোমার এলাকায় ফিজিকাল ট্রেনিং ইনস্টিটিউট (মোহাম্মদপুর, এখানেই পরে আল-বদর হেডকোয়ার্টার স্থাপিত হয়) এবং পুলিশ স্টেশনগুলোর অবস্থা জানাও। ওভার।
: ৪১। ফিজিকাল ট্রেনিং ইনস্টিটিউট ভালোভাবে তল্লাশী করা হয়নি, তবে আমরা সেখানে সশস্ত্র সেনা মোতায়েন করেছি। এই এলাকায় কোনো পুলিশ স্টেশন নেই। ওভার।
: ৪১। ধন্যবাদ। আউট।
: ৪১। আমাদের এখানে অনেকগুলো লোক আছে যারা বেশ কিছু রোড ব্লক দিয়েছিলো, এদের ধরা হয়েছে এবং সেগুলো পরিষ্কার করতে কাজে লাগানো হয়েছে। ওদের কি আপনার কাছে নিয়ে যেতে হবে, নাকি খতম করে দেবো (বন্দী হিসেবে পাঠিয়ে দেবো না মেরে ফেলবো)? ওভার।
: ৪১, শ্রমের দারুণ ব্যবহার করেছো দেখছি। আপাতত এদের ব্যবহার করতে থাকো আর যতক্ষণ পর্যন্ত ইমামের কাছ থেকে নির্দেশ না পাচ্ছি ততক্ষণ আটকে রাখো। তারপর পরিস্থিতি বুঝে হয় তোমরা তাদের খালাস করবে নয়তো আমাদেরকে পাঠাবে। ওভার।
: ৪১। রজার। আউট।
: ৮৮। মেসেজ। ওভার।
: ৮৮, মেসেজ পাঠাও। ওভার।
: ৮৮, রোমিও সিয়েরা ইউনিফর্মের (রিভেরাইন ইউনিট/নদীর কুল পাহারা দেয়া পদাতিক ইউনিট) সঙ্গে আপনার এক এলিমেন্ট (সেনা কর্মকর্তা) আছে তার মাধ্যমে জিজ্ঞেস করুন তো রোমিও সিয়েরা ইউনিফোর্ম পানিতে টহল দিচ্ছে কি না (উর্দু)। ওভার।
: ৮৮। রজার। ওভার।
: ৮৮, আউট।
: … স্রেফ মনে করিয়ে দিতে চেয়েছি যে রোমিও সিয়েরা ইউনিফর্মের সঙ্গে থাকা আপনার এলিমেন্টের উচিত হবে তাদেরকে নৌকায় করে টহল দিতে বলা (ক্যারি আউট প্যাট্রলিং ইন দ্য রিভার বোটস)। ইমামের সঙ্গে আলোচনা অনুযায়ী নদীতে টহল শুরু করুন। ওভার।
: ৮৮, আমরা এরমধ্যেই তা শুরু করে দিয়েছি, আবার বলছি, আমরা ইতিমধ্যে তা শুরু করে দিয়েছি। ওভার।
: ৮৮… আমি তার কাছে পুরাটা দিচ্ছি
: ৮৮, খুব ভালো। চালিয়ে যাও। আউট।
: হ্যালো ২৬। ওভার।
: ২৬। পাঠাও। ওভার।
: তোমরা কি ডেইলি পিপল থেকে গুরুত্বপূর্ণ কাউকে আটকাতে পেরেছো? ওভার।
: ২৬ না, নেগেটিভ। তবে আমাদের সৈন্যরা অন্য কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ লোকের খোঁজে গেছে আর আমরা তাদের অগ্রগতি জানতে অপেক্ষা করছি। ওভার।
কন্ট্রোল: ২৬। রজার। আলফা লিমার (আওয়ামী লিগ) কার্যালয় কি দখল হয়েছে? ওভার।
: ২৬। না। ভোর বেলা ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ওভার।
: ২৬। রজার। তাহলে হয়তো সেখানকার বাসিন্দারা সব রেকর্ড বা কাগজপত্র এর মধ্যেই পুড়িয়ে বা নষ্ট করে ফেলেছে। তারপরও তোমরা তোমাদের পরিকল্পনামতোই এগোতে থাকো আর তোমাদের অগ্রগতি খুবই চমতকার হচ্ছে। ছোটখাটো যাই ঘটুক না কেনো আমাদের জানিও। ওভার।
: হ্যালো ৯৯, ৯৯। মারখোর। ছোটাকে দিন। ওভার।
: ৯৯, অপেক্ষা করো। আউট।
: মেসেজ পাঠান, ওভার।
: আউট টু ইউ, হ্যালো ২৬, ২৬, ৭৭ থেকে মেসেজ, মারখোরকে জানান যে ইমাম বলেছেন, ভোরের আলো ফোটার আগেই যত লাশ আছে সব যেন সরিয়ে ফেলা হয়; বাকি সবাইকে এটা বলে দাও (উর্দু)। ওভার।
(চলবে)

#ডক্টর মোহাম্মদ মোজাম্মেল হোসেইন : যার কাছে বাঙালীর অসীম কৃতজ্ঞতা

প্রাক কথন : ১৯৭১ সালের ২ জুন টাইমস পত্রিকায় একটি প্রতিবেদন বেরোয়। লেখেন পিটার হেজেলহার্স্ট। বেঙল রেবেলস সেন্ড ইউএন এভিডেন্স অব টেরর এটাকস অন ঢাকা (ঢাকায় নারকীয় আক্রমণের প্রমাণ জাতিসংঘে পেশ করতে যাচ্ছে বাঙালী বিদ্রোহীরা) শিরোনামে হেজেলহার্স্ট জানান যে প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের হাতে প্রমাণ এসেছে যে ২৬ মার্চ রাতে পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর নৃশংস আক্রমণটি ছিলো নিতান্তই দমনমূলক। শুধুমাত্র সশস্ত্র বিদ্রোহীদের প্রতিহত করার তাদের দাবি প্রত্যাখান করা এই প্রমাণপত্রটি হচ্ছে একটি রেডিও মেসেজের অনুলিপি। আক্রমণের সে রাতে পাকিস্তানী সেনা ইউনিটগুলোর মধ্যেকার ওয়ারল্যাস কথোপকথন লিখিত রয়েছে তাতে। খানিকটা উদাহরণ দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয় এটি জাতিসংঘের মহাসচিব উ থান্ট এবং বিভিন্ন রাষ্ট্রপ্রধানের কাছে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ।

অনুলিপির উল্লেখ করা হলেও বাংলাদেশ সরকারের হাতে আসলে জ্বলজ্যান্ত একটি অডিও টেপ বর্তমান। কিন্তু তখন পর্যন্ত তারা নিশ্চিত জানেন না এই কীর্তি কার। যিনি করেছিলেন তিনি উচ্চপদস্থ একজন সরকারী কর্মচারী। নির্দিষ্ট করে বললে বিজ্ঞানী। দেশ স্বাধীন হওয়া পর্যন্ত চাকুরি করে গেছেন জান হাতে নিয়ে। স্বাধীনতার পরপর যখন পাকিস্তানীদের যুদ্ধাপরাধ বিচারে ভারতের সহায়তায় ‘ঢাকা ট্রায়াল’ গঠনের উদ্যোগ নেয়া হলো, তাতে মূল প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করার কথা ছিলো এই অডিও টেপটি। সে এক অন্য গল্প। তার চেয়ে বরং সেই কীর্তিমানের ব্যাপারেই জানাজানি হোক।

কিভাবে তার খোঁজ পেলাম, এনিয়েই আলাদা একটা ব্লগ লেখা যায়। হিসাব করলে বছরখানেক তো হবেই। ২০০৭ সালের মার্চের দিকে পোস্ট করেছিলাম ‘সে কালোরাতে ইথারে যা বলেছিলো খুনীর দল’। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তান সেনাবাহিনী বর্বর নির্মমতায় ঝাপিয়ে পড়েছিলো বাঙালীকে বশ মানাতে। মাথায় হাত বুলিয়ে নয়, বুলেট ঢুকিয়ে। অপারেশন সার্চলাইট নামের এই কুখ্যাত সামরিক হত্যাযজ্ঞ শুরুর সময়টায় পাকিস্তানীদের রেডিও ট্রান্সমিশনের অনুলিপি ছিলো সেগুলো। এই দুঃসাহসিক কাজটি যিনি করেছিলেন তার নাম জেনেছিলাম এম এম হোসেইন। পেশা অ্যাটমিক এনার্জি কমিশনের প্রকৌশলী। মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘরের তরফে এটুকুই হদিস মিলেছিলো তার। একটা ইনিশিয়াল ধাচের নাম, যা অনেক প্রকারই হতে পারে। ক্লু জোগালেন আমিনুর রহমান নামের একজন ব্লগার। ৯৫-৯৬ সালের দিকে স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষ্যে একটা ডকুমেন্টারি বানিয়েছিলেন। সেখানে এই ট্রান্সক্রিপট ব্যবহার করেছিলেন আমিন। আর সহায়তা করেছিলেন বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে তারই সহকর্মী মুনিরা হোসেইন। ইনি এমএম হোসেইনের ছোট বোন। এমএম হোসেইন দিয়ে কি হয় সেটা বলতে পারেননি আমিন, তবে এটুকু জানেন যে তিনি দেশে নেই। অনেক বছর ধরেই বিদেশে। উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে খোঁজ নিলে মুনিরা হোসেইনকে পেতে পারি, তার কাছেই মিলবে বাকি ঠিকুজি।

এই খোঁজ নেয়াটা হলো ক’দিন আগে। মুক্তিযুদ্ধের ওপর একটা বই লিখছি। বইমেলা ধরতে না পারলে ই-বুকই করবো। সেটা উৎসর্গ করবো আমাদের স্বাধীনতাযুদ্ধে মাল্টিমিডিয়া ব্যবহার করে পাকিস্তানীদের গণহত্যার অকাট্য প্রমাণ যোগান দেয়া দুই প্রকৌশলীকে (তখন পর্যন্ত যে তা-ই জানি!)। অধ্যাপক নুরুলউল্লাহ, যিনি ভিডিওতে ধারণ করেছিলেন জগন্নাথ হলের হত্যাকান্ড। আর এম এম হোসেইন। অডিওতে যিনি রেকর্ড করেছিলেন রাতভর চলা পাক সেনাদের কুকীর্তি।

বান্ধবী শিমুর স্বামীকে দিয়ে মুনিরা হোসেইনের ফোন-মেইল এড্রেস বের করলাম। কয়েকদফা চেষ্টার পর পেলাম তাকে। পরিচয় এবং উদ্দেশ্য জানিয়ে শুরুতেই জানলাম এম এম হোসেইন নামের পুরোটা। ডক্টর মোহাম্মদ মোজাম্মেল হোসেইন। ঘটনার সময় ঢাকার এটমিক এনার্জি কমিশনে প্রিন্সিপাল সায়েন্টিফিক অফিসার ছিলেন। এবং তিনি প্রকৌশলী নন। একজন পদার্থবিদ। শেষ তথ্যটা জানিয়েছেন মোজাম্মেল হোসেইন নিজেই। জাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করছেন। ২৫ বছরের ওপর দেশের বাইরে। দু-বছরে একবার দেশে আসেন। আমার সৌভাগ্যের ঘোষণাটা দিলেন মুনিরা হোসেইন। সুবাদেই আসল মানুষটার মুখোমুখি। সুদর্শন, মেধাদীপ্ত এক উজ্জ্বল পুরুষ। তার পা ছুঁতে আমার একটুও ভাবতে হলো না। এক্সক্লুসিভ সাক্ষাতকারটা বেশ ঘরোয়া পরিবেশেই হলো। তবে দূর্ভাগ্য যে আসলেই পিছু ছাড়েনি সেটা টের পেলাম ঘরে ফিরে। অডিও ক্লিপগুলো সেভ করা হয়নি! আবারও ফোন করে জ্বালানো। পরে মুসাবিদার একটা কপি তাকে মেইল করে চেক করানোর চুক্তি। কিন্তু নানা ঝামেলায় লেখাটাই হচ্ছিলো না। অবশেষে ব্লগ ফর্মেই ছাড়লাম। ফর্মাল ইন্টারভিউ থাকবে মুল বইয়ে। আপাতত আগে-পরের কথাগুলো ধারাবাহিক সাজিয়েই এই উপস্থাপন :

একটু পেছন থেকেই শুরু করি। মার্চের সেই দিনগুলোর কথা বলুন, আঁচ পাচ্ছিলেন বড় কিছুর?

শুরুতেই বলে নিই। আমার কোনো দলের সঙ্গেই রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা নেই। তবে ৭০ সালের নির্বাচনে ভোট দিয়েছিলাম একটা তাগিদ থেকেই। তখন মোটামুটি পরিষ্কার হয়ে গেছে স্বাধীনতা ছাড়া বাঙালীর অন্য কোনো বিকল্প নেই। রাজনীতি না করলেও রাজনীতির খোঁজ ঠিকই রাখতাম। রাখতে হতো। আসল পরিবেশটাই তখন হয়ে গিয়েছিলো সেরকম। আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও মুক্তিযোদ্ধা নুরুদ্দিন মাহমুদের (এয়ার ভাইস মার্শাল সুলতান মাহমুদের ছোটো ভাই) সঙ্গে এ ব্যাপারগুলো নিয়ে বেশ আলোচনা হতো। বলতে পারেন গোপন একটা তৎপরতায় জড়িত ছিলাম আমরা। আমাদেরই এক বন্ধু ফ্লাইট লেফট্যানেন্ট শামসুল আলমের কাছ থেকে আমরা বিমানবন্দরে পাকিস্তানীদের সামরিক আনাগোনার খোঁজ পেতাম। গোপনে সে তথ্য পৌঁছে দেয়া হতো বঙ্গবন্ধুকে। উনার হয়তো এসব জানার অন্য মাধ্যম ছিলো। কিন্তু তারপরও আমরা এক ধরণের সন্তুষ্টি পেতাম কিছু করতে পারার আনন্দে।

বাঙালী হিসেবে বঞ্চনার অভিজ্ঞতা আপনার কেমন?

ভালোই। বাবার চাকুরির সুবাদেই আমার পড়াশোনা হয়েছে করাচিতে। বাঙালীর ছেলে হিসেবে ভালো কলেজে পড়া, কিংবা করাচি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়াটা ছিলো বিশাল ব্যাপার। পাকিস্তানীরা প্রায়ই ‌‌’বাঙালী, বাঙালী’ বলে টিজ করতো। তবে আমার যা মার্কস ছিলো তাতে এসব কোনো বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। আরেকটা সুবিধা ছিলো শুদ্ধ উচ্চারণে উর্দু বলতে পারার ক্ষমতা। এটাও বেশ কাজে এসেছে।

ফিরে যাই সেই দিনটিতে। কিভাবে ঘটলো ব্যাপারটা?

এজন্য আরেকটু পেছনে ফেরা যাক। সাতই মার্চই আসলে একটা বড় কিছু ঘটে যাওয়ার আশঙ্কা ছিলো। রেসকোর্সে বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষণা দিতে যাচ্ছেন এমন একটা গুজব ছড়িয়ে পড়েছিলো গোটা দেশে। সেদিন পাকিস্তান আর্মিরও প্রস্তুতি ছিলো ভয়ঙ্কর কিছু ঘটানোর। এটা ঘটনাক্রমে জানতে পারি আমি রেডিও টিউন করতে গিয়ে। যদিও সেদিন রেসকোর্সে উপস্থিত ছিলাম আমি। ডায়াসের পেছনদিকেই। এই ভাষণটি রেডিওতে সম্প্রচার করার কথা ছিলো, কিন্তু পাকিস্তান সরকার সেটা স্থগিত রেখেছিলো। তখনই টিউন করতে গিয়ে আমার কানে আসে বিভিন্ন আর্মি ইউনিটের নানা কথাবার্তা।

কোন ওয়েভ লেংথে?

মিডিয়াম ওয়েভে।

তার মানে ২৫ মার্চ রাতে সেই অভিজ্ঞতাটাই প্ররোচিত করেছিলো আপনাকে অসাধারণ সেই কাজটি সারতে?

তা বলতে পারেন। তবে রেডিও শোনার অভ্যাস আমার অনেক আগে থেকেই। একটা সনি টিআর-থাউজেন্ড রেডিও ছিলো আমার। এছাড়া গান শোনার জন্য ব্যবহার করতাম জার্মান গ্রুনডিগ ব্র্যান্ডের একটা রেকর্ডার। স্পুল সিস্টেম। ২৫ মার্চ মাঝরাতে ভয়ঙ্কর গোলাগুলির শব্দে আমি জেগে উঠি। তখন খিলগাঁও থাকতাম আমরা। ছাদে উঠে দেখি ট্রেসারের আলোয় উজ্জ্বল চারপাশ। সেইসঙ্গে গুলির আওয়াজ। নীচে নেমে আমি রেডিও খুলি। টিউন করতে করতে শর্ট ওয়েভে পেলাম উর্দু ও ইংরেজি মেশানো কথাবার্তা। বুঝতে পারলাম পাকিস্তানী আর্মি ইউনিটগুলোর মধ্যেকার কথাবার্তা এগুলো। এরপর একটা ক্যাবল দিয়ে রেডিওর সঙ্গে সংযুক্ত করে শুরু করলাম রেকর্ডিং। ভাগ্যক্রমে আমার একদম নতুন একটা স্পুল ছিলো। তবে একটানা রেকর্ড হচ্ছিলো না। কারণ এসব কথাবার্তার মধ্যে বেশ বিরতি ছিলো। আমাকে থেমে থেমে রেকর্ড করত হচ্ছিলো। এভাবে সকাল পর্যন্ত চললো।

এরপর?

তখন পর্যন্ত পুরো ব্যাপারটা আমার পরিবারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। ২৭ মার্চ কারফিউ ওঠার পর বের হলাম শহর দেখতে। নারকীয় ধংসযজ্ঞের চিহ্ন চারপাশে। আমি, নুরুদ্দিন একটি বাইকে চড়ে ঘুরছিলাম। গুলিস্তানের কাছে এসে দেখা হলো শামসুল আলমের সঙ্গে। সে জানালো বঙ্গবন্ধুকে গ্রেপ্তার করেছে আর্মি। বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় দেখলাম একই অবস্থা। ইকবাল হল পুরো বিধ্বস্ত। এরও কদিন পর, এপ্রিলের শুরুর দিক রমনা কালীবাড়ি গেলাম। পাশেই আমার অফিস। ঢোকার আগে দেখি এক লোক বমি করতে করতে বেরোচ্ছে। কাছেই একটা আর্মি জিপ ছিলো। কিছু বললো না যদিও। তবে লোকটিকে দেখেই বুঝলাম কি বিভৎস দৃশ্য চাক্ষুস করেছে সে। আমার অভিজ্ঞতাও হলো তার মতোই।

অডিও টেপ নিয়ে কেমন সমস্যায় পড়েছিলেন? তখন কি বুঝেছিলেন কি অমূল্য উপাত্ত আপনার হাতে?

আমি এর মধ্যেই স্পুলটি অডিও ক্যাসেটে কনভার্ট করে নিয়েছিলাম। এপ্রিলের শেষ দিকে ঠিক করলাম এটি ভারতে পাঠাবো। এ ব্যাপারে সাহায্য করতে এগিয়ে এলো কাজী নামে এক বন্ধু। পাকিস্তান টোবাকোতে কাজ করতো সে। ঠিক হলো মইদুল ইসলাম (সাংবাদিক/ন্যাপ কর্মী) ও জামিল চৌধুরী এটি ভারতে নিয়ে যাবে। কাজী থাকতো ইস্কাটনে। ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতাটা হলো যেদিন আমি ওর বাসায় যাচ্ছি ক্যাসেট ডেলিভারী দিতে, অল্পের জন্য বেঁচে গেছি বলতে হবে। রিক্সায় আমার কোলে একটা রেকর্ডার, তার মধ্যে সেই ক্যাসেট। পুরো রাস্তাটা ফাঁকা। মৌচাক মোড়ে এমন সময় একটা আর্মি জিপ টার্ন নিলো, আসতে লাগলো বরাবর আমার দিকে। আত্মা খাচারাম অবস্থা তখন। যদি থামিয়ে বলে বাজাতে, আর তারপর শোনে কি আছে তাহলে আর জান নিয়ে ফিরতে হবে না। কিন্তু মুখের ভাবে সেটা বুঝতে দিলাম না। রিক্সা একপাশে সাইড করে দাড়াতে বললাম। জিপটা পাশ দিয়েই গেলো। আমি হাসি মুখে তাকালাম তাদের দিকে। কিছু ঘটলো না। ঠিকমতোই পৌছে দিলাম। আগস্টের দিকে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারিত হয় টেপটি। তবে আমার নাম বলেনি। অবশ্য জানার কথা নয় তাদের।

স্পুলটির কি হলো?

এটি নিয়ে আরেক সমস্যা। কখনো এটা রাখতাম আমার অফিসে, কখনো বাসায়। মে মাসের দিকে একদিন অফিসে গিয়ে দেখি লন্ডভন্ড হয়ে আছে চারদিক। পাকিস্তান আর্মি রাতে রেড দিয়ে তল্লাশী চালিয়েছে। ভাগ্যক্রমে স্পুলটা সেরাতে আমার বাসায় ছিলো।

চাকুরী করতে সমস্যা হয়নি?

না, হয়নি।

ডিসেম্বরে বুদ্ধিজীবিদের যখন তালিকা করা হচ্ছিলো, তাতে পরিচিত কেউ ছিলো না?

আমাদের আনবিক শক্তি কমিশনের কেউ ছিলেন না। তবে সে সময় অন্য একটা ঘটনা ঘটেছিলো। ডিসেম্বরের শুরুতে ডেমরার মুক্তিযোদ্ধারা আমাদের বাসার পাশের জলাঞ্চলটা ব্যবহার করতেন চলাচলের জন্য। এক রাতে পাকিস্তান আর্মি সেদিক লক্ষ্য করে সারারাত গুলি চালালো। পুরোটা সময় বেশ আতঙ্কে কেটেছে।

বিজয়ের সময়কালটা বলবেন? তখনকার অনুভূতি

আমি সারেন্ডারের সময়কার কথাবার্তাও রেকর্ড করেছিলাম।

সেগুলো কই!

আছে কোথাও। খুজলে পাওয়া যাবে।

এসব তো আমাদের মুক্তিযুদ্ধের অসামান্য সব দলিল। আপনিতো চাইলে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে দিতে পারেন এসব।

দিয়েছিতো। অপারেশন সার্চলাইটের ট্রান্সক্রিপ্ট আমি তাদের দিয়েছি অডিও টেপসহ। যদিও তারা আমার পেশা প্রকৌশলী লিখেছে, আপনি দয়া করে এটা অবশ্যই সংশোধন করে দেবেন।

এই যে অসাধারণ একটি কাজ করেছেন এজন্য সরকারী তরফে কোনো স্বীকৃতি পেয়েছেন? ব্যাপারটা জানালেন কবে, মানে কাজটা যে আপনার। তাছাড়া এটা তো যুদ্ধাপরাধের প্রমাণ হিসেবে দাখিল করার কথা ছিলো

আমি ঠিক স্বীকৃতির জন্য কিছু করিনি। সত্যি বলতে স্বীকৃতির কাঙ্গালও নই। ‘৭২ সালের ফেব্রুয়ারির দিকে বাংলাদেশ অবজারভারে আমি একটা লেখা লিখি এটা নিয়ে। কিছুদিন পর পুলিশের ডিআইজি শাকুর সাহেব আমার সঙ্গে দেখা করেন ট্রান্সক্রিপ্ট নিয়ে আলোচনা করতে, এতে যুদ্ধাপরাধের প্রমাণ হিসেবে উল্লেখযোগ্য কি কি পাওয়া যায় দেখতে। আমি অডিওর একটা কপি দিয়েছিলেন তখনকার সেনাপ্রধান শফিউল্লাহ এবং নুরুদ্দিনের বড় ভাই সুলতান মাহমুদকে। কিন্তু এরপর আর কোনো খবর পাইনি। বরং জিয়া সরকারের আমলে একবার সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে দেখি ট্রান্সক্রিপ্টটা ছাপা হয়েছে তাদের কীর্তি বলে। আমি অবজারভারে প্রতিবাদলিপি পাঠালাম। বুঝতেই পারছেন। কোনো উত্তর আসেনি, প্রতিবাদও ছাপা হয়নি। অবশ্য আমি সবকিছু এমপিথ্রি ফরম্যাট করে রেখেছি।

আশির শুরু থেকে আমি দেশের বাইরে। কালেভদ্রে আসা হয়। এর মধ্যে একবার এনটিভিতে একটা অনুষ্ঠানে ডাকা হয়েছিলো আমাকে। নুরুদ্দিনও ছিলো। সেখানে প্রচার করা হয়েছিলো টেপটি। এইতো। নিজের প্রচার নিয়ে আমি ভাবি না। তবে এবার দেশে ফিরে মুক্তিযোদ্ধার চেতনার যে নবজন্ম দেখলাম, তাতে আমি যেমন অবাক তেমনি খুশী। আমাদের গর্বের এই অর্জনটাকে ধরে রাখতেই হবে নতুন প্রজন্মের কাছে।

কৃতজ্ঞতা : মাহবুবুর রহমান জালাল, জন্মযুদ্ধ

# অধ্যাপক ড. নুরুল উল্লাহর সাক্ষাতকার
আপনি কি ২৫ মার্চের হত্যাকাণ্ডের ছবি নিজ হাতে তুলেছিলেন?

হ্যাঁ। আমি জগন্নাথ হলের মাঠে ২৬ মার্চের সকালবেলা যে মর্মস্পর্শী দৃশ্য ঘটেছিলো তার ছবি আমার বাসার জানালা থেকে টেলিস্কোপ লাগিয়ে মুভি ক্যামেরায় তুলেছিলাম।

এ ছবি তোলার জন্য আপনার কি কোনো পূর্ব পরিকল্পনা ছিলো, না এমনি হঠাৎ করে মনে হওয়ায় তুলে নিয়েছেন?

৭ই মার্চ বঙ্গবন্ধুর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ভাষণের পর থেকেই আমার একটা ধারণা হয়েছিলো যে এবার একটা বিরাট কিছু পরিবর্তন আসতে যাচ্ছে। তাই তখন থেকেই বিভিন্ন সভা, শোভাযাত্রা, বিক্ষোভ মিছিল, মশাল মিছিল, ব্যারিকেড ইত্যাদির ছবি আমি তুলতে আরম্ভ করি।
ক্যামেরাটি কি আপনার নিজস্ব?

না, ওটা আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের টেলিভিশন ভিডিও টেপ ক্যামেরা। ছাত্রদের হাতেকলমে শিক্ষা দেবার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে এমনি ধরণের আরো বহু ক্যামেরা ও জটিল যন্ত্রপাতি রয়েছে।

ক্যামেরাটি আপনার কাছে রেখেছিলেন কেনো?

এর জবাব দিতে গেলে আমাকে আরো একটু পেছনের ইতিহাস বলতে হয়। ইতিহাস কথাটা বলছি এজন্য যে. এগুলো ইতিহাসের পাতায় লিখে রাখা উচিত। ৭ই মার্চের পরে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগের কিছু ছেলে এসে আমাকে ধরল, ‘স্যার আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের ইলেকট্রিকাল ইনজিনিয়ারিং বিভাগের যন্ত্রপাতি দিয়ে একটি ওয়ারলেস স্টেশন তৈরি করতে হবে।’

আমি ওদের কথাটা একেবারে উড়িয়ে দিতে পারলাম না। এরপর ওরা একদিন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের সঙ্গে কথা ঠিক করে আমাকে তার ধানমন্ডীর বাড়িতে নিয়ে গেলেন। আমাকে বঙ্গবন্ধুর বাড়ীর একেবারে ভিতরের এক প্রকোষ্ঠে নিয়ে যাওয়া হলো। আমি প্রথমে ব্যাপারটার গুরুত্ব অতোটা উপলব্ধি করতে পারিনি। অনেক ভিতরের একটা কক্ষে নিয়ে যাওয়ার পর আমি দেখলাম সেখানে সোফার উপর তিনজন বসে রয়েছেন। মাঝখানে বঙ্গবন্ধু। তার ডান পাশে সৈয়দ নজরুল ইসলাম ও বাঁপাশে তাজউদ্দিন সাহেব।

আমি ঢুকে বঙ্গবন্ধুকে সালাম করলাম। ছাত্ররা আমাকে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলো। যদিও আগেও অনেকবার তার সঙ্গে আমার সাক্ষাত হয়েছিলো। তিনি সোফা থেকে উঠে এসে আমাকে ঘরের এককোণে নিয়ে গেলেন। আমার কাঁধে হাত রেখে অত্যন্ত সন্তর্পনে বললেন, ‘নুরুল উল্লাহ, আমাকে একটা ট্রান্সমিটার তৈরি করে দিতে হবে। আমি যাবার বেলায় শুধু একবার আমার দেশবাসীর কাছে কিছু বলে যেতে চাই। তুমি আমাকে কথা দাও, যেভাবেই হোক একটা ট্রান্সমিটার আমার জন্য তৈরি রাখবে। আমি শেষবারের ভাষণ দিয়ে যাব।’
বঙ্গবন্ধুর কণ্ঠ তখন আমার কাছে বাচ্চা শিশুর আব্দারের আবেগময় কণ্ঠের মতো মনে হচ্ছিলো। এর পরেই বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে আমাদের তড়িৎ কৌশল বিভাগের অন্যান্য শিক্ষকদের কাছে সব কথা খুলে বললাম। শুরু হলো আমাদের কাজ। বিভাগীয় প্রধান ড. জহুরুল ইসলামসহ প্রায় সকল শিক্ষকই আমাকে সহযোগিতা করতে লাগলেন। ৯ দিন কাজ করার পর শেষ হলো আমাদের ট্রান্সমিটার। এর ক্ষমতা বা শক্তি ছিলো প্রায় সারা বাংলাদেশ ব্যাপী। শর্টওয়েভে এর শব্দ ধরা যেত। যাহোক পরবর্তী সময়ে এর ব্যবহার হয়নি। এই সাথেই আমার মাথায় ধারণা এলো যদি কোনো হত্যাকাণ্ড, অগ্নিসংযোগ বা গোলাগুলি হয়, তাহলে আমি তা ক্যামেরায় তুলে ফেলবো। এবং সেই থেকেই আমি ক্যামেরাটি সাথে রাখতাম।

আপনি কখন ছবি তোলা শুরু করেন?

রাত্রে ঘুমের মাঝে হঠাত বিকট শব্দ শুনে আমাদের সকলের ঘুম ভেঙে যায়। অবশ্য আমরা তখন অতটা গুরুত্ব দেইনি। আমি ভেবেছিলাম যে আগের মতোই হয়তো ছাত্রদেরকে ভয় দেখাবার জন্য ফাঁকা গুলি করা হচ্ছে। অথবা আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের ছেলেরা আমাদের নির্দেশ ও সহযোগিতায় যেসব হাতবোমা তৈরি করেছিলো, তারই দুয়েকটা হয়তো বিস্ফোরিত হয়েছে। সারা রাত একটা আতঙ্কের মধ্যে কাটালাম। জানালা দিয়ে মাঝে মাঝে জগন্নাথ হলের দিকে তাকাতাম। কিন্তু সমগ্র এলাকাটা আগে থেকেই বিদ্যুৎ লাইন কেটে দেয়াতে অন্ধকারাচ্ছন্ন ছিলো।

রাতে জগন্নাথ হল এলাকায় কি হচ্ছিলো কিছুই দেখতে পারলাম না। শুধু গোলাগুলির শব্দ পাচ্ছিলাম। কিন্তু স্পষ্ট বুঝতে পারলাম যে ওখানে দুপক্ষেই একটা ছোটখাট লড়াই হচ্ছে। সাথে সাথে আমার ক্যামেরাটার কথা মনে পড়ে গেলো। অপেক্ষা করতে লাগলাম কখন সকাল হবে আর দিবালোকে আমি ছবি তুলতে পারবো।
আপনি যে ক্যামেরা বসিয়েছিলেন তা কি বাইরে থেকে দেখা যাচ্ছিলো না?

এমনভাবে ক্যামেরা বসানো হয়েছিলো যে বাইরে থেকে বোঝার কোনো উপায় নেই। কারণ পর্দার আড়ালে এমনভাবে বসানো হয়েছিলো যে শুধু ক্যামেরার মুখ বের করা ছিলো। পুরো ক্যামেরাটা কালো কাপড়ে মোড়ানো ছিলো। আমাদের জানালাগুলো এমনভাবে তৈরি যে বন্ধ করার পরও ধাক্কা দিলে কিছুটা ফাঁক রয়ে যায়। ওই ফাঁক দিয়ে ক্যামেরার মুখটা বাইরে বের করে রাখলাম।

ক্যামেরা চালু করলেন কখন?

সকাল ৭টা থেকে ৮টার মধ্যবর্তী সময়ে। জানালা দিয়ে লক্ষ্য করলাম যে জগন্নাথ হলের সামনের মাঠে কিছু ছেলেকে ধরে বাইরে আনা হচ্ছে এবং তাদেরকে লাইনে দাঁড় করানো হয়েছে, তখনই আমার সন্দেহ জেগে যায়। এবং আমি ক্যামেরা অন করি। আমাদের ক্যামেরাটির একটি বিশেষ গুণ এই যে, এতে মাইক্রোফোন দিয়ে একই সাথে শব্দ তুলে রাখা যায়। তাই আমি টেপের সাথে মাইক্রোফোন যোগ করে ক্যামেরা চালু করলাম। কিছুক্ষণের মধ্যেই দেখলাম যে ছেলেগুলোকে এক ধার থেকে গুলি করা হচ্ছে ও একজন একজন করে পড়ে যাচ্ছে।

পাকসেনারা আবার হলের ভিতরে চলে গেলো। আমি ভাবলাম আবার বেরিয়ে আসতে হয়তো কিছু সময় লাগবে। তাই এই ফাকে টেপটা ঘুরিয়ে আমার টেলিভিশন সেটের সাথে লাগিয়ে ছবি দেখতে লাগলাম যে ঠিকভাবে উঠেছে কিনা। এটা শেষ করতেই আবার জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখলাম যে আবার কিছু সংখ্যক লোককে ধরে এনেছে। আবার লাইন করে দাঁড় করানো হয়েছে। আমি তখন আগের তোলা টেপটা মুছে ফেলে তার উপরে আবার ছবি তোলা শুরু করলাম।

আপনি আগের তোলা টেপটা কেনো মুছে ফেললেন?

আমার মনে হচ্ছিলো আগের ছবিতে সবকিছু ভালোভাবে আসেনি। আর নতুন ছবি তুলতে গিয়ে আমি হয়তো আরো হৃদয়স্পর্শী দৃশ্য ধরে রাখতে পারবো। আর হাতের কাছে আমার টেপ ছিলো না। মোট কথা আমি ঐ সমস্ত দৃশ্য দেখে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে পাগলের মতো হয়ে গেলাম। আজও আমি দুঃখ করি যদি নতুন টেপে ছবি তুলতে পারতাম তাহলে কতো ভালো হতো। দুটো দৃশ্য মিলে আমার টেপের দৈর্ঘ্য বেড়ে যেত। কিন্তু তখন এত কিছু চিন্তা করার সময় ছিলো না। যাহোক দ্বিতীয়বারের লাইনে দেখলাম একজন বুড়ো দাড়িওয়ালা লোক রয়েছে। সে বসে পড়ে হাতজোর করে ক্ষমা চাইছে। আমার মনে হচ্ছিলো সে তার দাড়ি দেখিয়ে বোঝাতে চেয়েছিলো যে সে মুসলমান। কিন্তু বর্বর পাকবাহিনী তার কোনো কথাই শুনতে চায়নি। তাকে গুলি করে মারা হলো।

মাঠের অপরদিকে অর্থাৎ পূর্বপাশে পাকবাহিনী একটা তাবু টানিয়ে ছাউনি করেছিলো। সেখানে দেখছিলাম, ওরা চেয়ারে বসে বেশ কয়েকজন চা খাচ্ছে আর হাসি তামাশা ও আনন্দ উল্লাসে ফেটে পড়ছে।

লোকগুলোকে হলের ভিতর থেকে কিভাবে আনা হচ্ছিলো?

যাদেরকে আমার চোখের সামনে মারা হয়েছে ও যাদের মারার ছবি আমার ক্যামেরায় রয়েছে তাদের দিয়ে প্রথমে হলের ভেতর থেকে মৃতদেহ বের করে আনা হচ্ছিল। এবং মৃতদেহগুলি এনে সব একজায়গায় জমা করা হচ্ছিলো। এবং ওদেরকে দিয়ে লেবারের কাজ করাবার পরে আবার ওদেরকেই লাইনে দাঁড় করিয়ে এক সারিতে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। মনে হচ্ছিল একটা একটা করে পড়ে যাচ্ছে।

জমা করা মৃতদেহের সংখ্যা দেখে আপনার ধারণায় কতগুলো হবে বলে মনে হয়েছিলো?

আমার মনে হয় প্রায় ৭০-৮০ জনের মৃতদেহ এক জায়গায় জড়ো করা হয়েছিলো।

আপনার কি মনে হয় যে ওগুলো সবই ছাত্রদের মৃতদেহ?

আমার মনে হয় ছাত্র ছাড়াও হলের মালি, দারোয়ান, বাবুর্চি-এদেরকেও একই সাথে গুলি করে মারা হয়েছে। তবে অনেক ভালো কাপড়চোপড় পড়া বয়সী লোকদেরও ওখানে লাইনে দাড় করিয়ে মারা হচ্ছিলো। এদেরকে দেখে আমার মনে হয়েছে এরা ছাত্রদের গেস্ট হিসেবে হলে থাকছিলো।
আপনি কি দেখেছেন যে কাউকে গুলি না করে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে?

না, তবে লাইনে দাঁড় করাবার পর যে খান সেনাটিকে গুলি করার নির্দেশ দেয়া হয়েছিলো সে যখন পেছনে তার অফিসারের দিকে মুহূর্তের জন্য তাকিয়েছিলো তখন দুজন লোক ঝপ করে মৃতদেহগুলোর মধ্যে শুয়ে পড়লো। আর বাকিদের গুলি করে মারা হলো। গুলি করে খানসেনারা সবাই যখন কয়েক ঘণ্টার জন্য এই এলাকা ছেড়ে চলে গেলো সেই ফাঁকে ওই দুজন উঠে প্রাণভয়ে পালাতে লাগলো। পরবর্তীতে এদের একজন এসে আমার বাসায় এসে আশ্রয় নিয়েছিলো। সে একজন ছাত্রের অতিথি হিসেবে হলে থাকছিলো। ঢাকায় এসেছিলো চাকুরীর ইন্টারভিউ দিতে।

আপনি কি আপনার ইচ্ছেমতো সব ছবি তুলতে পেরেছিলেন?

না, আমি আগেই বলেছি যে আমি থেমে থেমে তুলছিলাম পাছে টেপ ফুরিয়ে যায়। তাই আমি সব ছবি তুলতে পারিনি বলে আমারও ভীষণ দুঃখ হচ্ছে। কারণ পরে বুলডোজার দিয়ে সব লাশগুলো ঠেলে গর্তে ফেলা হচ্ছিলো সে ছবি আমি তুলতে পারিনি। কারণ ওরা কিছুক্ষণের জন্য চলে যাবার পরপরই আমার পরিবারের সদস্যদের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে আমাকে বাসা ছেড়ে চলে যেতে হয়েছিলো।

আপনি কি টেপ সাথে করে নিয়ে গিয়েছিলেন?

না, আমি সাথে নেয়াটা আরো বিপদের ঝুঁকি মনে করে বাসাতেই যত্ন করে রেখে যাই। আর এ ঘটনা একমাত্র আমার স্ত্রী ছাড়া কেউ জানতো না। বাইরে নিয়ে গেলে হয়তো অনেকেই জেনে ফেলতো এবং আজকে এই মূল্যবান দলিল আমি দেশবাসীর সামনে পেশ করতে পারতাম না।

আপনি কখন এই টেপ সবার সামনে প্রকাশ করলেন?

যুদ্ধকালীন নয় মাস প্রতিদিন প্রতিমুহূর্ত আমার আতঙ্কের মধ্যে কেটেছে। কখন কে জেনে ফেলে। কখন আমি ধরা পড়ে যাই, বা কখন এসে এটা নিয়ে যায়। এমনি মানসিক যন্ত্রনায় আমি ভুগছিলাম। যাহোক দেশ স্বাধীন হওয়ার পরে ১৭ই ডিসেম্বরের দিকে আমি আস্তে আস্তে প্রকাশ করলাম আমার এই গোপন দলিলের কথা। এবং ২-৩দিন পরেই এটা আমি সবাইকে জানালাম ও কয়েকদিন পরে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক ও অন্যান্যদের এটা দেখালাম। এ খবর শুনে অনেক বিদেশী সাংবাদিক আমার কাছে এলেন। এর ছবি দেখে আমার কাছে বহু টাকার বিনিময়ে এই দলিলের অরিজিনাল কপি অর্থাৎ আসল টেপ কিনতে চাইলেন।

আপনি কি রাজী হলেন?

আমার রাজী হবার প্রশ্নই ওঠে না। অরিজিনাল কপি আমি হারালে সেটা আমার দেশের জন্য বিরাট ক্ষতি হবে। টাকার বিনিময়ে আমি এই সর্বনাশ করতে পারলাম না। আমার সাধ ছিলো বঙ্গবন্ধু ফিরে এলে তাকে আমি এই চলমান জীবন্ত ছবি দেখাবো।

বঙ্গবন্ধু ফিরে আসার পর দেখাতে পেরেছেন কি?

না, সে কথা বলে আর লাভ নেই। বঙ্গবন্ধু দেশে ফেরার পর তাকে ঘিরে ফেললেন যারা তাদের কাছে কয়েকবার অনুরোধ জানিয়েও আমি বঙ্গবন্ধুর সাক্ষাতপ্রার্থী হতে পারলাম না। কোনো এক সচিব মন্তব্য করেছিলেন যে এসমস্ত বাজে ছবি দেখার মতো সময় নাকি বঙ্গবন্ধুর নেই।

কিন্তু এতবড় প্রামাণ্য দলিল নিয়ে আপনার চুপ করে বসে থাকাটা মোটেও উচিত নয়। কারণ আমার মনে হয় পাকবাহিনীর বিচারের সময় এই প্রামাণ্য ছবি বাংলাদেশের ৩০ লক্ষ শহীদের পক্ষে স্বাক্ষী দেবে। আপনার কি মনে হয়?

এটা নিয়ে আমি অনেক কিছু চিন্তা করেছি। কারণ যে টেপে এই ছবি নেওয়া হয়েছে তা যে কোনো সময় নষ্ট হয়ে যেতে পারে। তাই এই টেপ থেকে ফিল্ম তৈরি করে রাখতে হবে। কারণ ফিল্ম অনেক পুরানো হলেও নষ্ট হয় না। কিন্তু টেপ কিছুদিন পরেই নষ্ট হয়ে যাবে। আর ফিল্ম করা হলে পরে এ থেকে অনেক কপি করে বিশ্বের মানুষের কাছে আমরা প্রমাণ দেখাতে পারবো যে বর্বর পাকবাহিনী বাংলাদেশে কিরকম গণহত্যা চালিয়েছে।

ফিল্ম তৈরি করার জন্য কোনো চেষ্টা আপনি করেছেন কি?

আমার চেষ্টায় এ ফিল্ম তৈরি সম্ভব নয়। কারণ যে ক্যামেরা দিয়ে এই ফিল্ম তৈরি করা যাবে তা বাংলাদেশে নেই। এজন্যে হয় এই টেপ জাপানে পাঠিয়ে করিয়ে আনতে হবে নতুবা ক্যামেরা এখানে নিয়ে আসতে হবে। তবে আমার মতে কারো হাতে এভাবে আসল কপিটা তুলে দেয়া ঠিক হবে না। আর এ ব্যাপারে সরকারী প্রচেষ্টাও পদক্ষেপ নেয়া না হলে এ দলিল নষ্ট হয়ে যাবে। অবশ্য এ যাবত বিভিন্ন বিদেশী টেলিভিশন ও দেশী টেলিভিশন এ থেকে ছবি তুলে বিশ্বের মানুষকে দেখিয়েছে। কিন্তু সে ছবি স্পষ্ট আসেনি। কারণ দুটোর স্পিড ভিন্ন হওয়ায় চলমান দাগ পড়ে যায়। সুতরাং স্পষ্ট ছবি তুলে রাখতে হলে এই টেপ জাপানে বা অন্য কোনো দেশে নিয়ে যেতে হবে। আর বর্তমানে আমাদের রেকর্ডারটিও নষ্ট হয়ে যাওয়াতে এর ছবি দেখা যাচ্ছে না। যদি মেরামত করা হয় তাহলে বঙ্গবন্ধুকে এ ছবি দেখাবার ইচ্ছা আমার রয়েছে। অবশ্য বাংলার বাণী পত্রিকা বিশেষ সংখ্যা বের করছে শুনে আমার ইচ্ছে হলো দেশের মানুষকে এ ব্যাপারে কিছূ জানিয়ে রাখতে। তাই সকলের সুবিধার্থে আমি কতকগুলি আলোকচিত্র ছাপিয়ে দিচ্ছি। এই আলোকচিত্রগুলি আবার এই টেলিভিশন থেকে আমার নিজস্ব ক্যামেরায় তোলা হয়েছিলো।

# ‘অপারেশন বিগ বার্ড’- যেভাবে গ্রেপ্তার করা হয়েছিলো বঙ্গবন্ধুকে
শেখ মুজিবর রহমানকে ঘিরে অনেক ইডিওটিক প্রপোগান্ডাই আছে। এর একটি হচ্ছে ২৫ মার্চ রাতে মুজিব কাপুরুষের মতো আত্মসমর্পণ করেছেন। আরেকটু গাধামী করে যোগ করা হয় তিনি স্বাধীনতা চাননি, তাই এমন করেছেন। কাছাকাছি অন্য ভার্সনটা হচ্ছে চাইলেই মুজিব আত্মগোপন করতে পারতেন। এমন একটা বিপ্লবে সরাসরি নেতৃত্ব না দিয়ে কিভাবে ধরা দিতে পারলেন! সাম্প্রতিক অন্য একটি পোস্টে এনিয়ে মুজিবের মুখ থেকেই দিয়েছিলাম উত্তরটা, ‘আমাকে না পেলে ওরা গোটা ঢাকা শহরের প্রতিটি বাড়িতে খুঁজবে। জ্বালিয়ে দেবে, নিরীহদের হত্যা করবে।’ সমর্থন মেলে সেরাতে গোটা পূর্ব পাকিস্তানে সামরিক অপারেশনের দায়িত্বে থাকা জেনারেল টিক্কা খানের কাছ থেকে। ১৯৭৬ সালে মুসা সাদিককে দেয়া এক সাক্ষাতকারে টিক্কা বলেছিলেন : “I knew very well that a leader of his stature would never go away leaving behind his countrymen. I would have made a thorough search in every house and road in Dhaka to find out Sheikh Mujib. I had no intention to arrest leaders like Tajuddin and others. That is why they could leave Dhaka so easily.” Then Tikka Khan said more in a very firm voice, “in case we failed to arrest Sheik Mujib on that very night, my force would have inflicted a mortal blow at each home in Dhaka and elsewhere in Bangladesh. We probably would have killed crores of Bangalees in revenge on that night alone.”

তার মানে তাকে কেন্দ্র করে নির্বিচার গণহত্যা ঠেকাতেই নিজের জীবনের উপর ঝুঁকি নিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু। আসলে পলায়ন বলতে যে অভিধানে একটা শব্দ আছে এটাই জানতেন না তিনি। তার গোটা রাজনৈতিক জীবনে পলায়নের কোনো ঘটনা নেই। তবে আমাদের আলোচ্য সেরাতে তার গ্রেপ্তারের ধরন। কে করেছিলো, কিভাবে করেছিলো। পাকিস্তানী তরফ এ ঘটনার নায়ক ব্রিগেডিয়ার (অব.) জহির আলম খান। সে সময় মেজর পদবীধারী এই স্পেশাল সার্ভিস গ্রুপ (অফিসার) পাকিস্তানী সামরিক অফিসারদের ঐতিহ্য ধরে রেখে একটা বই লিখেছেন ‘দ্য ওয়ে ইট ওয়াজ’ নামে। চলুন শুনি তার সেই বীরত্বের কাহিনী। শিরোনামে বিগ বার্ড শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে কারণ অপারেশন সার্চলাইটে মুজিবের কোডনেম ছিলো এটি।

একাত্তরে কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্ট থার্ড কমান্ডো ব্যাটেলিয়নের দায়িত্বে ছিলেন জহির। ২৩ মার্চ তিনি ঢাকায় আসেন চীফ অব স্টাফ অফিসে দেখা করে কমান্ড সংক্রান্ত একটা ঝামেলার সুরাহা করতে। বিমানবন্দরে তার অপেক্ষায় ছিলেন মেজর বিল্লাল। জহিরকে জানানো হয় প্রধান সামরিক প্রশাসকের কার্যালয়ে নিয়ে যেতে এসেছেন তিনি। সেখানে কর্ণেল এসডি আহমেদের সঙ্গে দেখা করতে হবে। দুপুর গড়িয়ে বিকাল হয়ে যাওয়ায় কর্ণেলের বাসভবনে যান দুজন। সেখানে জহির জানতে পারেন ২৪ কিংবা ২৫ মার্চ শেখ মুজিবর রহমানকে গ্রেপ্তার করতে হবে তাকে। প্লেন থেকে নেমে ঢাকার উত্তপ্ত অবস্থাটার আঁচ পেয়েছিলেন জহির। তার ভাষায়, ‘গোটা শহরজুড়ে বাংলাদেশের পতাকা। একমাত্র পাকিস্তানী পতাকাটা উড়ছিলো মোহাম্মদপুরের বিহারী কলোনীতে।’ সেরাতে মেজর বিল্লাল, ক্যাপ্টেন সাঈদ ও ক্যাপ্টেন হুমায়ুনকে নিয়ে ধানমন্ডীতে মুজিবের বাড়ি রেকি করতে যান তিনি। পরদিন সকালে আশেপাশের রাস্তাঘাটগুলো চেনার জন্য আবারও গাড়ি হাঁকান দলবল নিয়ে।

পরদিন মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলীর সঙ্গে দেখা করার নির্দেশ পান জহির। সকাল ১১টায় এই সাক্ষাতকারে চীফ অব জেনারেল স্টাফ তাকে নিশ্চিত করেন ২৫ মার্চ রাতেই মুজিবকে গ্রেপ্তার করতে হবে। নির্দেশনা নিয়ে বেরিয়ে আসার আগে ফরমান তাকে থামান। জিজ্ঞেস করেন, ‘কিভাবে করবে জানতে চাইলে না?’ বলেন যে বেসামরিক গাড়িতে একজন অফিসারকে সঙ্গে নিয়ে মুজিবকে গ্রেপ্তার করতে হবে। আগের দিনই মুজিবের বাড়ীর আশপাশে বিশাল জনতার সমাবেশ চোখে পড়েছিলো জহিরের। তাই এই নির্দেশ মানতে অস্বীকৃতি জানিয়ে কমপক্ষে এক প্লাটুন সৈন্য দাবি করেন তিনি।

ব্যাপারটা যে বাড়াবাড়ি হয়ে গেছে বুঝেছিলেন। ফরমানের রোষ থেকে বাঁচতে তাই সাময়িক আত্মগোপন করলেন। সন্ধ্যায় গেলেন বিমানবন্দরে। পিআইএর একটি ফ্লাইটে ঢাকা নামলেন মেজর জেনারেল মিঠা। কমান্ডিং অফিসারকে সব কিছু খুলে বললেন জহির।

রাতে পূর্ব পাকিস্তান সেনা সদরে তাকে দেখা করতে বলেন মিঠা। এরপর জেনারেল হামিদের মধ্যস্ততায় নিষ্পত্তি হয় এই ঝামেলার। হামিদ তাকে বলেন মুজিবকে জীবিত গ্রেপ্তার করতে হবে এবং কোনো কারণে মুজিব মারা গেলে এজন্য ব্যক্তিগতভাবে জহিরকেই দায়ী করা হবে। সেখান থেকে আবার ফরমানের কাছে গেলেন জহির। জানালেন তার কি কি লাগবে, ‘আমি সেনাবহনের জন্য তিনটা ট্রাক আর বাড়ির নকশা চাইলাম। উনি আমাকে বাড়ীর প্ল্যানটা দিয়ে জানালেন গাড়ী সময়মতো পাওয়া যাবে। জানতে চাইলাম শেখ মুজিবর রহমানের পেছনের বাসাটাই জাপানী রাষ্ট্রদূতের। যদি উনি সেখান আশ্রয় নেন তাহল আমার কী করণীয়। জেনারেল বললেন আমার বিচারবুদ্ধি প্রয়োগ করে সিদ্ধান্ত নিতে।’

মহড়ার জন্য মুজিবের বাসা ও সেখানে যাওয়ার পথটুকুর মডেল বানানো হয়। প্রয়োজনীয় গোলাবারুদের বরাদ্দও মেলে। সন্ধ্যার পর কোম্পানীকে অভিযানের নির্দেশনা বুঝিয়ে দেন জহির। কোম্পানিকে তিনভাগে ভাগ করা হয়। নেতৃত্ব সঁপা হয় যথাক্রম ক্যাপ্টেন সাঈদ, ক্যাপ্টেন হুমায়ুন ও মেজর বিলালের ওপর। ক্যাপ্টেন হুমায়ুনকে দুজন সঙ্গীসহ পাঠানো হয় মুজিবের বাসার চারপাশে সাধারণ গাড়িতে চক্কর দিতে এবং নজরদারি করতে।

তিনটি দলের মিলিত হওয়ার স্থান হিসেবে নির্ধারন করা হয় এমপি হোস্টেলের দিকে মুখ করে থাকা তেজগা বিমানবন্দরের গেট। ঠিক হয় বিমানবন্দর থেকে সংসদ ভবন ও মোহাম্মদপুর হয়ে ধানমন্ডী যাবেন তারা। রাত ন’টার দিকে জহির এয়ারফিল্ডে পৌছলেন। ঘণ্টাখানেক পর মুজিবের বাসার রেকি শেষে যোগ দিলেন ক্যাপ্টেন হুমায়ুন এবং জানালেন মোহাম্মদপুর-ধানমন্ডীর রাস্তায় প্রতিবন্ধকতা বসানো হচ্ছে। রোডব্লক সরাতে সম্ভাব্য সময় নষ্ট হওয়ার কথা বিবেচনা করে অপারেশনের সময় মাঝরাত থেকে একঘন্টা এগিয়ে আনলেন জহির। সময় অনুযায়ী রওয়ানা দিলেন সদলে।

এখান থেকে শোনা যাক জহিরের নিজের মুখে : ২৫ মার্চ রাত ১১টায় আমরা এয়ারফিল্ড থেকে গাড়ি নিয়ে বের হলাম। সাংসদদের হোস্টেল থেকে মোহাম্মদপুরের রাস্তায় কোনো বাতি নেই। বাড়িঘরগুলো ঘুটঘুটে আধারে। হেডলাইট জ্বালিয়ে জিপ নিয়ে এগোতে থাকলাম আমি। পেছনে বাতি নেভানো তিনটি ট্রাক। ওগুলো সিগনাল কর্পের। ঘণ্টায় ২০ মাইল গতিতে এগিয়ে বামে মোহাম্মদপুর-ধানমন্ডী সংযোগ সড়কে পড়লো আমাদের কলাম। ধানমন্ডীর সিকিমাইল আগে থাকতে ট্রাক ও নানা ধরণের যানবাহন উল্টিয়ে রাস্তা আটকানো হয়েছে। দুশো গজের মতো এগোতেই সামনে পড়লো দুফিট ব্যাসের অনেকগুলো পাইপ ফেলে রাখা হয়েছে, আরো দুশো গজ পর প্রায় তিনফুট উচু ও চার ফিট পুরু করে ইট দিয়ে রোডব্লক বানানো। ট্রাকের ধাক্কা দিয়ে পথ বের করার চেষ্টা করে আমরা ব্যর্থ হলাম। এরপর ক্যাপ্টেন সাঈদের দলকে গাড়ি যাওয়ার মতো জায়গা বের করতে নির্দেশ দিলাম। বাকিদের বললাম নেমে পায়ে হেটে চলতে।

শেখ মুজিবের বাড়ি পর্যন্ত হেটেই গেলাম আমরা। ডানে মোড় নিয়ে অবস্থান নিলাম বাড়ি এবং লেকের মাঝামাঝি পথটুকুতে। ক্যাপ্টেন হুমায়ুনের দল পাশের একটি বাসায় ঢুকে দেয়াল টপকে নামলো মুজিবের আঙ্গিনায়। এসময় গোলাগুলিতে একজন নিহত হয়। বাড়ির বাইরে পুর্ব পাকিস্তান পুলিশের সদস্যরা তাদের ১৮০ পাউন্ড ওজনের তাবুতে ঢোকে, সেগুলো খুটিসহ তুলে নিয়ে ঝাপ দেয় লেকে। সংলগ্ন এলাকার নিরাপদ দখল শেষ। ঘন কালো আধার চারদিকে। মুজিব ও তার প্রতিবেশী কারো বাসাতেই বাতি নেই।

তল্লাশী চালানোর জন্য এরপর একটি দল ঢুকলো। প্রহরীদের একজনকে বলা হলো রাস্তা দেখাতে। কিছুদূর যাওয়ার পর তার পাশে থাকা সৈন্যকে দা দিয়ে আক্রমণ করতে গিয়েছিলো সে, কিন্তু জানতো না তার উপর নজর রাখা হচ্ছে। তাকে গুলি করে আহত করা হয়। এরপর সিড়ি বেয়ে ওপরে উঠলো সার্চপার্টি। একের পর এক দরজা খুলে কাউকে পাওয়া গেলো না। একটা রুম ভেতর থেকে আটকানো ছিলো। ওপরে ওঠার পর কে যেন আমাকে বললো বদ্ধ ঘর থেকে কেমন অদ্ভুত শব্দ আসছে (সম্ভবত ওয়ারল্যাস ট্রান্সমিশন করছিলেন মুজিব)। মেজর বিল্লালকে বললাম দরজা ভাঙতে। আর আমি নীচে নামলাম ক্যাপ্টেন সাঈদের দল এলো কিনা দেখতে।

সাঈদের সঙ্গে কথা বলার সময় একটা গুলির শব্দ হলো। এরপর গ্রেনেড বিস্ফোরন ও তার সাথে সাব-মেশিনগানের ব্রাশ। ভাবলাম কেউ হয়তো শেখ মুজিবকে মেরে ফেলেছে। দৌড়ে গিয়ে দেখি সেই বদ্ধ রুমের দরজায় দাড়িয়ে মুজিব। রীতিমতো সন্ত্রস্ত।

পরে জানতে পারলাম মেজর বিল্লালের লোকেরা যখন দরজা ভাঙার চেষ্টা করছিলো তখন কেউ একজন সেদিকে পিস্তলের গুলি ছোড়ে। ভাগ্যক্রমে কারো গায়ে তা লাগেনি। বাধা দেয়ার আগেই বারান্দার যেদিক থেকে গুলি এসেছিলো সেদিকে গ্রেনেড ছোড়ে একজন সৈনিক। এরপর সাবমেশিনগান চালায়। গ্রেনেডের প্রচণ্ড বিস্ফোরণ ও স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রের গুলির আওয়াজে বদ্ধ সে রুমের ভেতর থেকে চিৎকার করে সাড়া দেন শেখ মুজিব এবং বলেন তাকে না মারার প্রতিশ্রুতি দিলে তিনি বেরিয়ে আসবেন। নিশ্চয়তা পেয়ে বেরিয়ে আসেন তিনি। বেরুনোর পর হাবিলদার মেজর খান ওয়াজির (পরে সুবেদার) তার গালে চড় মারেন।

শেখ মুজিবকে বললাম আমার সঙ্গে আসতে। উনি জানতে চাইলেন পরিবারের কাছ থেকে বিদায় নিতে পারবেন কিনা। আমি তাকে তা জলদি সারতে বললাম। এরপর গাড়ির দিকে হাটা ধরলাম। এরমধ্যে সদরে রেডিও বার্তা পাঠিয়ে দিয়েছি যে আমরা শেখ মুজিবকে গ্রেপ্তার করেছি। (বিগবার্ড ইন কেইজ)।

মুজিব এবার বললেন ভুলে পাইপ ফেলে এসেছেন তিনি। আমাকে নিয়ে পাইপ আনতে গেলেন আবার। এরমধ্যে মুজিব আত্মবিশ্বাস ফিরে পেয়েছেন। টের পেয়ে গেছেন তার কোনো ক্ষতি করা হবে না। বললেন, তাকে ফোন করে বললে তিনি নিজেই চলে আসতেন।

মাঝের ট্রাকে মুজিবকে বসিয়ে ক্যান্টনমেন্টের পথ ধরলো জহিরের দল। এসময় তার মনে হলো মুজিবকে গ্রেপ্তার করার পর কোথায় রাখতে হবে, কার কাছে হস্তান্তর করতে হবে তা তাকে বলা হয়নি। তাই সংসদ ভবনে মুজিবকে আটকে রেখে পরবর্তী নির্দেশনা জানতে ক্যান্টনমেন্ট রওয়ানা দিলেন। সংসদের সিড়িতে বসিয়ে রাখা হয় মুজিবকে।

লে. জেনারেল টিক্কা খানের সদর দপ্তরে গেলেন মেজর জহির। সেখানে চীফ অব স্টাফ ব্রিগেডিয়ার জিলানীর সঙ্গে দেখা করে তাকে জানালেন মুজিবকে গ্রেপ্তারের কথা। জিলানী তাকে টিক্কার অফিসে নিয়ে গেলেন এবং বললেন রিপোর্ট করতে। টিক্কা সম্ভবত আগেই খবর জেনেছেন, তাই তাকে বেশ খোশমেজাজে পাওয়া গেলো। আনুষ্ঠানিকভাবে শোনার অপেক্ষা করছেন শুধু। সিদ্ধান্ত হলো আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় যে কক্ষটিতে ছিলেন, সেখানেই রাখা হবে মুজিবকে। এরপর ১৪ ডিভিশন অফিসার্স মেসে স্থানান্তরিত হলেন তিনি। একটি সিঙ্গল বেডরুমে তাকে রেখে বাইরে প্রহরার ব্যবস্থা করা হলো।

পরদিন মেজর জেনারেল মিঠা শেখ মুজিবকে কোথায় আটকে রাখা হয়েছে জানতে চাইলেন। শোনার পর উদ্বিগ্ন হয়ে বললেন পরিস্থিতি সম্পর্কে একদমই ধারণা নেই সংশ্লিষ্টদের। অফিসার্স মেস থেকে তাকে উদ্ধারের চেষ্টা খুব সহজেই নিতে পারবে কেউ। এরপর একটি স্কুল ভবনের (আদমজী ক্যান্টনমেন্ট) চারতলায় মুজিবকে সরিয়ে নেওয়া হলো। সেখান থেকে ক’দিন পর করাচি।

ঘৃণা করুন পাকিস্তানী খুনে, লুটেরা ও তাদের এদেশী দোসর জামাত-শিবিরসহ সকল স্বাধীনতাবিরোধীকে। আওয়াজ তুলুন এই পাপের ক্ষমা নাই, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চাই

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *