‘আত্মকথা ১৯৭১’ ::: নির্মলেন্দু গুণের জবানবন্দী

অন্ধকারে হালকা আলো পড়া একটি মুখ, দুটো চোখের সামনে চশমার স্বচ্ছ কাচের আবরণী, কিন্তু দৃষ্টি প্রসারিত চশমার ফাঁক দিয়ে উন্মুক্ত বাংলাদেশে। সেই চোখ দুটোতে প্রিয়জন হারানোর বেদনা, অতীত খুঁড়ে বীভৎসতা বলার কষ্ট, জন্মচেতনা থেকে ক্রমাগত বিচ্যুত হতে থাকা মানুষকে ফিরিয়ে আনার সংকল্প- সব মিলিয়ে প্রচ্ছদপটে যে নির্মলেন্দু গুণ উঠে এসেছেন, সেটি প্রকৃতপক্ষে আমার ছবি, আপনার ছবি, মুক্তিযুদ্ধকে ধারণ করা আমাদের সম্মিলিত ছবি। সেই ছবি যুদ্ধাপরাধী-রাজাকার-ইতিহাসবিকৃতিকারী ও তাদের আশ্রয়দাতাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ও প্রতিবাদের ছবি।

বলছিলাম নির্মলেন্দু গুণের লেখা বই ‘আত্মকথা ১৯৭১’-এর কথা।

মার্কসের মতে, পৃথিবীর ইতিহাস যদিও শ্রেণী সংগ্রামের ইতিহাস হওয়ার কথা, কিন্তু আমাদের অ্যাকাডেমিক জীবনে ইতিহাস মানে যুদ্ধ, ইতিহাস মানে রক্তপাত এবং বিজয়ীর কথা। কিন্তু ইতিহাস আসলে নিজেই পক্ষপাতদুষ্ট এক অভিধা। যে কারণে যুগে যুগে রচিত হওয়া যে ইতিহাস আমরা শুনে আসছি, সেই ইতিহাস আসলে যুদ্ধের সেনাদের চাইতে, যুদ্ধে প্রভাবিত হওয়া জনমানুষের চাইতে নেতৃত্ব দেওয়া জয়ী বীরদের কথা। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসও এই ডিসকোর্স থেকে বেরুতে পারে নি। ফলে বিভিন্ন বই-গবেষণা-আখ্যানে আমরা যে মুক্তিযুদ্ধের সন্ধান পাই, সেখানে সাধারণ মানুষের কষ্ট, আত্মত্যাগ ও তাদের জীবনযাত্রায় যুদ্ধের প্রভাবের কথা যতোটুকু উঠে এসেছে, তার চাইতে সহস্রগুণ বেশি উঠে এসেছে সম্মুখ সমরের যোদ্ধাদের কথা। সম্মুখ সমরের যোদ্ধাদের কথা যতোটুকু এসেছে, তারও সহস্রগুণ এসেছে তাদের নেতৃত্ব দেওয়া বীরদের কথা। অথচ সরাসরি যুদ্ধ যতোটুকু ইতিহাসের পাঠ, জনমানসে তার প্রভাবের ইতিহাস তার চাইতে কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। কম গুরুত্বপূর্ণ নয় ছোট ছোট লড়াইয়ের ঘটনাগুলোও। একটি আরেকটির চাইতে বড় কিংবা ছোট নয়, ইতিহাসের এই দুটো ধারা আসলে একে অপরের পরিপূরক। একটিকে ভালো করে বুঝতে চাইলে আরেকটিকে কোনোমতেই বাদ দিয়ে ইতিহাস তৈরি করা যাবে না।

দুঃখজনক হলেও সত্য, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস আমাদের অপ্রতুল। যতোটুকু আছে তারও অনেকখানি বিকৃত করা হয়েছে। যার যতোটুকু প্রাপ্য, রাজনৈতিক ও বৈষয়িক মোহে তাকে তার চাইতে বেশি দেয়া হয়েছে। ফলে একপেশে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস দিন দিন নতুন প্রজন্মকে বিমুখ করেছে, আমরা বেড়ে উঠছি আমাদের জন্মইতিহাসকে না জেনে, তাকে উপেক্ষা করে।

নির্মলেন্দু গুণের ‘আত্মকথা ১৯৭১’ ঠিক সে কারণেই আলাদা হয়ে ধরা দিয়েছে এ প্রজন্মের পাঠকের কাছে। প্রকাশে তিনি গদ্যকার, স্বভাবে কবি, মননে দুটোর মিশেল। ফলে অনুপম ভাষা দিয়ে তিনি যেভাবে আত্মকথায় আমাদের মুক্তিযুদ্ধকে তুলে এনেছেন, তা আমাদের দুটো চাহিদাকেই পূরণ করে। অ্যাকাডেমিক ইতিহাস লেখার ধারা অনুসরণ না করেও তিনি একাধারে যেমন তুলে এনেছেন সে সময়কার ঐতিহাসিক মুহূর্তগুলো, তেমনি বইয়ের অধিকাংশ পৃষ্ঠায় মিশে আছে সাধারণ মানুষের যাতনা ও আনন্দের ঘটনাগুলো। তিনি বইটিতে যেমন দেখিয়েছেন কীভাবে মেজর জিয়াউর রহমান বঙ্গবন্ধুর পক্ষে ধারাবাহিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে অনেকের মতো গুরুত্বপূর্ণ একজন হয়ে স্বাধীনতার ঘোষণা প্রচার করেছিলেন, তেমনি তুলে এনেছেন বুড়িগঙ্গার ওপারে কেরানীগঞ্জের গণহত্যার অজানা কথা। তিনি যেমন মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের নথি থেকে তুলে দিয়েছেন সে সময়কার কিছু ঘটনাপ্রবাহের কথা, তেমনি যুদ্ধকালীন অবস্থায় রাস্তায় রাস্তায় মানুষের অবর্ণনীয় দুর্ভোগের কথাও। ফলে ইতিহাসের দুটি ধারাই তার মধ্যে সচেতনভাবে প্রবাহিত হয়ে প্রকাশিত হয়েছে আমাদের মতো বিভ্রান্তের ঘূর্ণিপাকে অবস্থানকারীদের সামনে।

আমরা যদি কেউ জানতে চাই যুদ্ধের সম্মুখ সমরের মতো মঞ্চের পেছনে সাধারণ মানুষের ভূমিকার কথা, তাহলে এই বইটি আমাদের পড়তে হবে। আমরা যদি চাই সে সময়কার মানুষের চিন্তন প্রক্রিয়ার কথা, তাহলে আমাদেরকে বইটি পড়তে হবে। আমরা যদি চাই নিজেদের জন্মচেতনাকে জেনে তাকে অনুভবে প্রতিষ্ঠিত করতে তাহলে এই বইটি আমাদের অবশ্যপাঠ্য।

এই বইটি অবশ্যপাঠ্য তাদেরও- স্বাধীনতার ঘোষক নিয়ে বিভ্রান্তি রয়ে গেছে যাদের।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *