আমাদের কিছু বিদেশী বন্ধুর কথা

বছর ঘুরে আবার চলে আসলো বিজয়ের মাস । এই বিজয়ের পিছনে যেমন রয়েছে ৩০ লাখ শহীদের এবং ২ লক্ষ্য মা বোনের সম্ভ্রম , তেমনি আছে কিছু বিদেশী বন্ধু । আজ এই পোস্টে আমি আপনাদের সাথে কিছু বিদেশী বন্ধুর সাথে পরিচয় করয়ে দিবো ।
উইলিয়াম এ এস ওডারল্যান্ড

ওডারল্যান্ড ছিলে ডাচ-অস্ট্রেলিয়ান নৌ কমান্ডো অফিসার । মুক্তিযুদ্ধের আগে তিনি ২য় বিশ্বযুদ্ধে যোগদান করেন । পরবর্তীতে বাটা কোম্পানীতে যোগদান করেন।
মুক্তিযুদ্ধের সময় উইলিয়াম এ এস ওডারল্যান্ড ছিলেন বাটা কোম্পানীর ম্যানেজিং ডিরেক্টর । যুদ্ধের সময় আর দশ জন সাধারণ বাঙ্গালীর মত তিনিও মুক্তিযুদ্ধে যোগদান করেন । প্রথমে ১ নং সেক্টরে যোগদান করলেও পরবর্তীতে সেক্টর ২ এ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ প্রদান ও যুদ্ধ পরিচালনায় উদ্বুদ্ধ করার পাশাপাশি তিনি নিজেও দখলদার পাকিস্তানী বাহিনীর বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধ করেন। রণাঙ্গনে সক্রিয় অংশ গ্রহণের সাথে তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের খাবার, ঔষধ, অর্থ দিয়ে ফান্ড গঠনের চেষ্টা করেন। এভাবেই তিনি কখনো গোয়েন্দা, কখনও গেরিলা, কখনও ট্রেনার এবং সর্বশেষ মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনে প্রত্যক্ষ ভুমিকা পালন করেন। পরবর্তীকালে ওডারল্যান্ড পাকিস্তানী বাহিনীর গণহত্যা ও নৃশংসতার ছবি ও ঘটনা আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে তুলে ধরতে চেষ্টা করেন। এখানে বলে রাখা ভালো উনি ছিলেন একমাত্র খেতাব প্রাপ্ত বিদেশী মুক্তিযোদ্ধা । ৭২ সালে সরকার তাকে বীর প্রতীক খেতাবে ভূষিত করে।

তাদের কথা আমরা কমবেশী সবাই জানি । সরাসরি যুদ্ধ না করেও যে যুদ্ধে সহায়তা করা যায় উনি ছিলেন তার জ্বলন্ত প্রমান । ১৯৭১ সালে বাংলার মানুষদের দুরবস্থা দেখে বিশ্বখ্যাত সেতার বাদক রবিশংকর হাত গুটিয়ে বসে থাকতে পারেননি। নিজের ছাত্র বিটলস-এর গিটারিস্ট জর্জ হ্যারিসনকে বলেছিলেন সাহায্যের হাত বাড়ানোর জন্য। তারপর জোয়ান বায়েজের লেখা “বাংলাদেশ” গানটি কম্পোজ করেন জর্জ হ্যারিসন এবং একটি আলবাম বের করেন “বাংলাদেশ” শিরনামে । পরবর্তীতে রবিশংকরের পরামর্শে বাংলাদেশের মানুষদের সহায়তা করার জন্য ১৯৭১ সালের ১লা আগস্ট নিউইয়র্কের ম্যাডিসন স্কয়ারে তাঁরা আয়োজন করেন ‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’। সেদিন এরিক ক্ল্যাপটন, রিংগোস্টার, লিওন রাসেল, বব ডিলান সহ বিশ্বের তাবৎ নামীদামী শিল্পীদের সংগীতের মাদকতায় ভেসেছিলো লাখ লাখ মানুষ। জোয়ান বায়েজ কনসার্টে আসতে না পারলেও লিখেছিলেন তাঁর অমর ‘বাংলাদেশ বাংলাদেশ’ গানটি।

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ মার্কিন কবি অ্যালেন গিন্সবার্গকে ভীষনভাবে আলোড়িত করেছিলো ।বাংলাদেশের মানুষের দুর্দশা স্বচক্ষে দেখতে তিনি ভারতে এসেছিলেন একাত্তরের সেপ্টেম্বরে। বাংলাদেশের শরণার্থী শিবিরের নিদারুণ অভিজ্ঞতা তিনি লিপিবদ্ধ করেছিলেন ‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’ নামের কবিতায়। পরবর্তীতে এই কবিতার উপর ভিত্তি করে মৌসুমী ভৌমিক গেয়েছিলেন বিখ্যাত ‘যশোর রোড’ গানটি।

লেয়ার লেভিন। আমাদের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন তিঁনি দেশের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে ঘুরে প্রায় ২০ ঘন্টার ভিডিও করেন। পরবর্তীতে সেইসব ফুটেজের অংশবিশেষ নিয়ে নির্মিত হয় “মুক্তির গান” এবং “মুক্তির কথা” নামক দুটি ডকুমেন্টারি সিনেমা।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের খবর সারা পৃথিবীর মানুষের কাছে পৌছে দিতে যে গুটিকয়েক সাংবাদিক সাহসী ভূমিকা রেখেছিলো , তাদের মধ্যে সায়মন ড্রিং অন্যতম । তিনি একুশে টিভির ম্যানেজিং ডিরেক্টর ছিলেন । তবে বিদেশী বন্ধুদের মধ্যে ওনাকেই মনে হয় সবথেকে উত্তম সন্মাননা দেয়া হয়েছে । তার সন্মাননার সরূপ হিসেবে ২০০২ সালে তৎকালীন সরকার তার ওয়ার্ক পারমিট বাতিল করে।

যুদ্ধকালীন সময়ে বাংলার মানুষদের কস্ট চরমভাবে আলোড়িত করে এই বেলজিয়ামের তরুন কে। বাংলাদেশের মানুষদের সহায়তা করার জন্য তিনি অবতীর্ন হন রবিনহুডের ভূমিকায় । ৭১ সালের ২৩শে সেপ্টেম্বর ব্রাসেলসের মিউজিয়াম অব ফাইন আর্টস থেকে তিনি চুরি করেন ১৭ দশকের শিল্পী ইয়োহান ভারমিয়ারের আঁকা ‘দ্য লাভ লেটার’ নামের মাস্টারপিসটি, যার মূল্য ছিলো ৫ মিলিয়ন ডলারের মত। পরবর্তীতে তিনি এই ছবির জন্য মুক্তিপন দাবী করেন । তবে মুক্তিপনের টাকা তিনি নিজের জন্য চাননি । তিনি দাবী করেন এটা ফেরত পেতে হলে কর্তৃপক্ষকে ২০০ মিলিয়ন ফ্রাংক (চার মিলিয়ন ডলার) মুক্তিপণ দিতে হবে। তবে শর্ত আছে। টাকাটা তাকে নয়, দিতে হবে ক্যাথলিক দাতব্য সংস্থা কারিতাসে। আর সেটা খরচ করতে হবে পূর্ব পাকিস্তানের শরণার্থীদের পেছনে! তার সম্পর্কে আরও বিস্তারিত জানতে এই লেখাটি পড়ুন।

১৯৭১ সালের ৩রা ডিসেম্বর প্যারিসের অর্লি বিমানবন্দরে পাকিস্তান ইন্টারন্যাশনাল এয়ারলাইনসের একটি বোয়িংয়ের নিয়ন্ত্রণ নেন জাঁ ক্যুয়ে নামে এক ফরাসি যুবক। না, টাকা-পয়সা কিছু দাবি করেননি। অবিলম্বে ২০ টন মেডিকেল সামগ্রী ও রিলিফ প্লেনটিতে তোলা না হলে এটি বোমা মেরে উড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দেন তিনি। আর সেগুলোর গন্তব্য হবে পূর্ব পাকিস্তান। স্বাধীনতার জন্য লড়তে থাকা বাংলাদেশে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *