আমাদের মুক্তির নিরীহ, অসামরিক অসীম সাহসী যোদ্ধারাঃ কি করেছিলেন আর কি পেয়েছেন? ঝুলন্ত প্রশ্নটি থেকে আমি অশ্রু পতনের শব্দ শুনতে পাই ।

সে রাত ছিল চাঁদনী পসর । পৃথিবীর বিভিন্ন জায়াগায় যে স্থান গুলোতে রাত্রি জেগে ছিল সে সব জায়গায়, অনেক উজাগর নিশিপাওয়া কবি হয়তো লিখছিলেন মহৎ কোন কাব্য, প্রেমিকা – প্রেমিকের হৃদয়ভেজা কাধে মাথা রেখে হয়তো শুনছিল কোন অনাগত ভবিষ্যতের সুখপূর্ণ মিথুন জীবনের গল্প, কোন মা তার নিরাপদ বুকে সন্তানটিকে নিয়ে হয়তো শোনাচ্ছিল লাল পরী আর নীল পরীর কোন রূপকথা ……

সেই রাতেই পূর্ণিমার চেতনা বিনাশী সৌন্দর্য্যকে অগ্রাহ্য করে শীর্ণ দেহের ছেলেটি অনেক গুলো গুলি করলো ভারি মর্টার থেকে পাকিস্তানি শত্রু শিবিরে । প্রতিবার গুলি করার আগে ভাবছিল এইবার ঐ শুয়ার পাকিস্তানি হানাদারের পালের একটা নিশ্চয় ছিন্নবিচ্ছিন্ন হবে । না, প্রতিবার ই লক্ষ্য ভ্রষ্ট হচ্ছিল তার অপার্থিব মায়াময় ক্রোধ গায়ে মাখা নির্বোধ মর্টারের গুলি গুলো । লক্ষ্য পৌছার অনেক আগেই গুলিগুলো দুর্বল হয়ে পরে যাচ্ছিল অথর্ব মাটিতে । অদৃষ্টের তামশায় বড়ই বিরক্ত ছেলেটি । উপায় একটা আছে । যদি গাছপালার আড়াল থেকে বের হয়ে ৩০০-৪০০ গজের মত এগিয়ে গিয়ে গুলি করা যায়, তবে কিছু কাজ হতে পারে । লক্ষে আঘাত হানবে গর্ধব গুলি গুলো । কিন্তু সমস্যা হলো ৩০০-৪০০ গজে দূরে শুধুই ধান ক্ষেত ! শত্রু শিবিরের আরো কাছে ! পূর্ণিমার আলোতে নর পিশাচের চোখ, মুক্তির মহান আলো জ্বলা চোখ দেখতে পাবে ঠিকই । নির্জনতায় ঠিকই শুনতে পাবে হৃদপিন্ডের ধুকপুক – “স্বাধীনতা ! স্বাধীনতা !!” মারা পরতে হবে বেঘোরে । ছেলেটি ছুটল তার কমান্ডারের কাছে । ৪০০ গজ সামনে এগিয়ে যাবার অনুমতি চায় । মৃত্যুর অনুমতি চায় ! শহীদ হবার অনুমতি চায় !! কমান্ডার যেতে দিতে চাইলেন না । নাছোড়বান্দার অনুরোধের পর কমান্ডার অনেক আশাংকা নিয়ে অনুমতি দিলেন , মনে মনে দোয়া করতে লাগলেন , যেন ছেলেটা বেঁচে ফিরতে পারে । অসীম সাহসের সাথে ছেলেটি এগিয়ে গেল । মৃত্যু যেন ভর বিকালের দস্যি মেয়ের কুতকুত খেলতে যেয়ে হোচট পাওয়ার মতই সাধারন, অগুরত্বপূর্ণ !! এগিয়ে গেল সে !!!

সে কিন্তু মরেনি সে রাতে । দেশ স্বাধীন হবার সাথে ছেলেটির কোন ব্যক্তিগত স্বার্থ জড়িত ছিল না । অশিক্ষিত ছেলেটির মধ্যে কোন উচ্চমার্গের নীতিবোধ থাকারও কথা নয় । কি জন্যে এগিয়ে গিয়েছিল ছেলেটি বোকার মত নিজের জীবনকে বিপন্ন করতে ?

দেশপ্রেম ছিল ছেলেটির আত্মার শরীরে মিশে যাওয়া চামড়া । দেশপ্রেম তাকে অকুতভয় করে তুলেছিল । অনেক অসীম সাহসী মুক্তিযোদ্ধা, অনেক যুদ্ধের ক্ষেত্রে নিজেদের নাজুক অবস্থায় পশ্চাদপসারনের আদেশ সত্ত্বেও, পিছু না হটে চালিয়ে গিয়েছিল যুদ্ধ – মৃত্যুকে হেলাফেলায় বরন করেছিল দুর্দমনীয় সাহসে ।

দেশ স্বাধীন হলো, ভারতীয় সেনা বাহিনীর কাছে পশুদের নেতা নিয়াজী আত্মসমর্পন করল দলবল সহ । বিশ্বব্যাপী প্রচারিত হল – ভারতীয় সৈনিকদের বীরত্বে বাংলাদেশ স্বাধীন । আমাদের ক্ষেত খামারে কাজ করা অসামরিক নিরক্ষররা, আমাদের মহামানবরা,আমাদের নক্ষত্ররা, আমাদের আসল বীরেরা, জানতেও পারলেন না , তারা মুক্তিযুদ্ধের অনুবন্ধী হিসাবেও পরিচিত নন, বিশ্বের ইতিহাসে । ভারতীয় জেনারেল দের লেখনীতে তাদের কোন উল্লেখ পাওয়া গেল না ।

আমরা স্বাধীনভাবে নিঃশ্বাস নিতে শুরু করলাম । বড় হতে লাগলাম । আমাদের চাষা যোদ্ধারা, আমাদের শ্রমিক যোদ্ধারা, আমাদের অশিক্ষিত-অর্ধশিক্ষিত যোদ্ধারা অবহেলিত হয়ে রইলেন ।

তাজুল, আখাউড়ার তাজুল – যে যুদ্ধের আগে চোরাকারবার করতেন । মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে তার নতুন জন্মের পর তার ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও তিনি পুনর্বাসিত হতে পারন নি । সরকার , বেসরকার – সবাই নিস্পৃহ ।

ট্রেনে যে মানুষটা পিক-পকেট করতেন, সেই ফজলু – যুদ্ধের পর গৌরীপুর রেল ষ্ট্বেশনে মুক্তিযোদ্ধা ফজলু ছোট্ট চা বিস্কিটের দোকান করে আধপেটা হয়ে বেঁচে আছেন । এর চেয়ে উন্নত তর জীবন কি তার প্রাপ্য ছিল না ?

তাহের – ফেনীর বীর আহত যোদ্ধা তাহের যুদ্ধের পর বাড়ি ফিরে দেখেন ঘর উজার, পরিবারের সবাইকে মেরে ফেলেছে রাজাকারেরা , তার বাড়িঘর ও দখল করেছে ঐ কুলাঙ্গারেরাই ! নিস্বতার হতাশায় পিজি হাঁসপাতালের উপর থেকে লাফিয়ে পরে আত্মহত্যা করেন ।

এ রকম আরো হাজারটা লজ্জা খুজতে গেলে বেরিয়ে পড়বে ।

যুদ্ধাপরাধের বিচার হয়নি । এটাও লজ্জার । এটার চেয়ে বড় লজ্জা আমাদের আসল বীরদের প্রতি আমাদের অবজ্ঞামিশ্রিত কর্তব্যহীনতা ।

এইসব দরিদ্র মুক্তিযোদ্ধাদের অনেকেই বেঁচে নেই । অনেকেই হয়তো অল্প কিছুদিন পরে হয়তো আর থাকবেন না ।

আমাদের মুক্তির নিরীহ, অসামরিক অসীম সাহসী যোদ্ধারাঃ কি করেছিলেন আর কি পেয়েছেন?

ঝুলন্ত প্রশ্নটি থেকে আমি অশ্রু পতনের শব্দ শুনতে পাই ।

এখনো সময় আছে , এই বীরদের জন্য, বঞ্চিতদের জন্য কিছু করার । ঋণ কিছু তো সোধ করি ! প্রশ্নটি থেকে অশ্রু পতনের শব্দ বড় অসহ্য ঠেকছে !

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *