আমি রাজাকারের সন্তান বলছি।

দরজার পাশে দাড়িয়ে ছোট বুবুন দেখতে পায়, পাক বাহীনির এক দল জোয়ান ওদের বাড়ীর পাশের ধান ক্ষেত দিয়ে লাইন বেধে

ওদের বাড়ীতে এসে ঢুকছে,

আর তার পরই জীপ গাড়ী তে ধুলো উড়িয়ে ওদের কমান্ডার এসে ঢুকেছে। ওর অনেক দিনের ইচ্ছা ছিলো ও পাক বাহীনি দেখবে।

ওর বাবা এই অন্ঞলের রাজাকার বাহীনির প্রধান, তাকে সে গতকাল জিগ্যেস করেছিলো বাবা পাক বাহীনি কেন আসছে ? উনি বলেছিলেন কিছু দেশদ্রোহী দুই পাকিস্তানের মধ্যে চীড় ধরাতে চায়। এরা দুইপাকিস্তানের মধ্যে ভ্রাত্তৃত্ব নষ্ট করতে উঠে পরে লেগেছে। উনারা আসতেছেন ঐ সব কাফের দের দমন করতে। উনারা আসতেছে ইসলামের পথে জিহাদ করতে। আলহামদুলিল্লা আমি ও এই কাজে অংশ গ্রহন করতে পেরে নিজেকে গর্বিত মনে করি। আল্লাহ তালা নিশ্চই আমাদের জন্য জান্নাত লিখে রেখেছেন। বুবুন তুমিও বলো আলহামদুলিল্লা। কিন্তু আজ সকালে যখন মিলিটারিরা এসে ওদের বাড়ী তে ঢুকল তখন থেকেই বুবুনের কেমন যেন খুত খুত লাগছে, এতো এতো বন্দুক রাইফেল নিয়ে ওরা এসেছে, ওর কিছু টা ভয় ভয় লাগে। বুবুনের ও একটা পিস্তল আছে তবে সেটা খেলনা। ওর চাচাত ভাই রওনক ওকে ওটা ঢাকা থেকে কিনে এনে দিয়েছে, বাবার মুখে শুনেছে সে নাকি কাফের দের দলে যোগ দিয়েছে। বাবা বলেছে মুক্তি যোদ্ধারা কাফের দের বাহীনি। বুবুনের বাবারও একটা বন্দুক আছে বাবা বলেছে ওটা দিয়ে নাকি মানুষ মারা যায়, রওনক ভাই গ্রামে এলে ওটা দিয়ে মাঝে মাঝে পাখি মারতো।

সকালে বুবুন একবার ওর বাবার সাথে বাড়ীর সামনের বড় কাচারী ঘরটায় গিয়ে ছিলো যেটা এখন হানাদার দের ক্যাম্প। ক্যম্পের কমান্ডার বুবুন কে কাছে ডেকে বলেছিলো “তুমহার নাম ক্যেয়া হ্যা?” বুবুনের বাবা উর্দূ জানে। বুবুনকে বুঝিয়ে দিতে বুবুন উত্তর দিল “বুবুন”, কমান্ডার তখন বললেন “ইএ ক্যাইসা নাম হ্যা? ইসকে আন্দার ইসলামকা কৈ নাম নিসানা নেহি হ্যা” ‘ইস নাম তুমকে কিসনে দিয়া?” বুবুনের বাবা লাজুক হাসি হেসে বলে “উনকা ব্যহেন নে” বুবুনের খটকা লাগে তখনই বুবুন ও কিছু কিছু উর্দূ বোঝে, বুবুনের বোনের কথা সোনার পর কমান্ডারের চোখ দুটো চক চক করে ওঠে। সাথে বলে তুমহারা এক লারকি বি হ্যা, বুবুনের বাবা বলে “হ্যা জনাব” মিলিটারি জানতে চায় “কিতনে সাল কা?” জ্বি ১৮ সাল কা।

বুবুন এখন ওর বাবর শোয়ার ঘরে বসে আছে, এখান থেকে ক্যাম্প টা দেখা যায় জালনাদিয়ে। এমন সময় বাহিরে একটা চিৎকার শোনে, সে জালনার ফাক দিয়ে বাইরে তাকিয়ে দেখে একজন মিলিটারি ওর বুবুকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে, আর ওর মাকে ধরে রেখেছে অন্য একজন মিলিটারি। আর দুরে সেই কমান্ডার বেল্ট খুলতে খুলতে বেরিয়ে আসছে ক্যাম্প থেকে, এর মধ্যে হঠৎ বুবুনের বাবা ঘরে ঢোকে তারা হুরা করে আলমারী থেকে বন্দুক বের করে দরজা দিয়ে বেরিয়ে যেতে যেতে বুবুন কে দেখে বলে বুবুন তুই পালা পাক বাহীনি ভালো না এরা আমাদের ভুল বুঝিয়েছে, পালা বুবুন তুই পালিয়ে যা, পারলে আমাকে ক্ষমা করিস বাপধন। বলে বেড়িয়ে যায় বুবুনের বাবা।

বুবুন পিছনের দরজা দিয়ে বের হয়ে বাড়ীর পিছনের ধান ক্ষেতের মধ্য দিয়ে দৌড়তে থাকে খুব জোড়ে। এমন সময় সে একটা গুলির আওয়াজ শোনে এটা ওর বাবার বন্দুকের গুলির আওয়াজ ও এআওয়াজ চেনে, কারন রওনক ভাই য়ের হাতে এই আওয়াজের পরই বহু পাখি জীবন দিয়েছে। এর পর সে অসংখ্য বুলেটের শব্দ শুনতে পায় আর তার পরই সে তার বাবার মুখে কলেমা পড়তে শোনে “লা ইলাহা ইল্লাললাহু মুহাম্মাদুর রসুলউল্লাহ।” এর পর বুবুন একটা হোচট খায়, তার পর কি ঘটে ছিলো সেটা সে জানেনা, যখন সে চোখ মেলে তাকালো দেখতে পেলো সে একটা ঝুপরি ঘরে শুয়ে আছ.

আর তার থেকে কিছু দুরে কয়েক জন মুক্তি খাবার খাচ্ছে, বুবুন অস্ফুট সরে কেদে ওঠে আর বলে-“ওরা বেইমান ওরা কাফের।” ঠিক তখন বুবুন তার মাথার কাছ থেকে রওনকের গলার সর শুনতে পায়, সে বলে। “বুবুন তুমি মুক্তি বাহীনির ক্যম্পে আছো।” বুবুন মুখ ঘুরিয়ে রওনক কে দেখে কেদে ফেলে। সে বলে, “দাদা ওরা কি সবইকে মেরে ফেলেছে?” “হ্যা বুবুন আমরা ঐ অন্ঞলেই অন্য একটা অপারেশনে যাবার সময় গোলা গুলির শব্দ শুনে ঐ দিকে অগ্রসর হই এবং তখনই বুঝতে পারি ঘটনা টা ঘটেছে আমাদের বাড়ীতে। আমারা তখন ওদের এম্বুস করি। এক সহযোদ্ধা তোকে বাড়ীর পাশের ধান ক্ষেতে পেয়েছে। সব গুলো মিলিটারী মারা গেছে , চাচা জান আগেই ওদের কমান্ডারকে গুলি করে মেরে ফেলেছিলো, চাচিকে ওরা মেরে ফেলেছিলো গুলি করে, চাচা জান শহীদ হয়েছেন। বুবুন অনেকটা ভয় নিয়ে জানতে চায় “বুবু, বুবুর কি হয়েছে?

“নুপুর কে ওরা খুটির সাথে বেধে………. আমি আর বলতে পারবোনা বুবুন, কেবল এতটুকু বলতে পারি ওদের ক্ষমা নেই।” বুবুন এত খনে স্পষ্ট ভাবে বলে “দাদা বাবা বলেছিলো ওরা মুসলমানদের বাচাতে এসেছে আমরা তো মুসলমান ওরা আমাদের মারছে ক্যানো?
আমি কলেমা জানি বাবা কলেমা পড়তে পড়তে মরেগেলো, বাবা বার বার বলতেন তোমরা কাফের কিন্তু আসল কাফেরতো ওরা, আমি মুক্তি হবো, দাদা। ওদেরকে আমি ছাড়বোনা।” রওনক বলে “বুবুন ওরা কোন নির্দিষ্ট ধর্মের মানুষকে মারতে আসেনি ওরা এসেছে বাংলাদেশী দের নিধন করতে। ইসলামকে ওরা স্রেফ ব্যাবহার করেছে আর কিছুনা।

এর পর বুবুন মুক্তি বাহীনীর সাথে সাথে থাকতো ও মুক্তি বাহীনীর রসদ গুলি সরবরাহ করত।

রওনক ওকে থ্রি নট থ্রি রাইফেল চালানো শিখিয়ে ছিলো। এর পর ১৯৭১ এর ১৪ ই ডিসেম্বর পাকবাহীনি ও রাজাকার বিশেষ করে বিহারীরা হত্যা করলো বাংলার

সুর্য সন্তান দের,
বুবুনরা ১৫ তারিখে ঢাকায় আসে

সেদিন থেকেই পাকরাও করা হয় রাজাকার ও পাকিস্তানী হানদার দের। ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে ধরে আনাহয় রাজাকার দের এবং ওদের কে হত্যাকরা হয় বুবুন ও একটা রাজাকার মেরেছিলো থ্রিনট থ্রির গুলিতে এর পর ওদের মুখে থুতু ছিটিয়ে দিয়েছিলো।

সেই ছোট বুবুন আজ বড় হয়েছে, আমি সেই বুবুনের সন্তান আজো বাবাকে মাঝে মেঝে প্রশ্ন করি ১৯৭১ বাঙালী নিধনে কি ইসলামের কোন ভুমিকা ছিলো?

বাবা বলে স্বাধীনতার এখন ৪০ বছর হয়েগেছে, তোরা এখন অনেক কিছু বুঝিস দেখ কম্পিউটার কে তোরা ভালো কাজে ব্যবহার করতে পারবি তেমনি খারপ কাজেও ব্যাবহার করতে পারবি এখন কেউ যদি কম্পউটারকে খারপ কাজে ব্যাবহার করে তাহলে সেই খারাপ কাজের দায় ভার কে নিবে কম্পিউটার, নাকি যে কম্পিউটার কে খারাপ কাজে ব্যাবহার করলো সে।
ইসলাম কে ১৯৭১ সালে ব্যাবহার করা হয়েছিলো। ওরা চেয়েছিলো হিন্দু মুসলিম রায়ট বাধিয়ে দিতে। আর বাঙালীরা ধর্ম প্রান জাতী তাই ধর্মকে ব্যবহার করে কোন কথা বললে যে কেউ খুব সহজে তা বিশ্বাস করে নেবে। যে ভুল তোর দাদা জান করেছিলেন। একটু ভালো করে লক্ষ কর মুক্তি যুদ্ধ টা ছিলো হিন্দু মুসলিম সবার যুদ্ধ এটা আমাদের স্বাধিকার আদায়ের যুদ্ধ, কিন্তু একটা কথা দেখ এই প্রজন্মের একটা বিষয় আমার খুব অপছন্দ, আর সেটা হলো দারি টুপি পরে এমন লোক গুলোকে ঢালাও ভাবে রাজাকার বলে, আর তাছারা কেউ ইসলামের কথা বললে তাকে জামাত পন্থী মনে করে এদের কে ডাকা হয় ছাগু, এসব কারনে প্রশ্ন থেকে যায় আমরা বাঙালিরা কি সত্যি কারের স্বাধীনতা পেয়েছি? কেনো একজন মুসলিম বাঙালি তার কেবল দাড়ী আর টুপি পরার কারনে ঢালাও ভাবে রাজাকার হিসাবে চিন্হিত হবে? কেন এক জন মুসলিম বলতে দিধা করবে আমি মুসলিম আমি বাঙালি।

দেখ আমাদের মুক্তি যুদ্ধে হিন্দু দের যেমন অবদান আছে তেমনি মুসলমানদের ও কিন্তু সমান অবদান আছে, আমি তো বলবো একটু বেশিই আছে, মুসলমান রা যদি আলাদা বাংলাদেশ না চাইতো তাহলে কেবল মাত্র হিন্দুরা এই দেশ স্বাধীন করতে পারতোনা কোন দিন। আর যদি ব্যাপার টা হিন্দু মুসলিম দাঙায়ায় রুপ নিত তাহলে যে পরিমান হিন্দু এই দেশ ছিলো তারা হয় মারা যেত আথবা ভারত পালিয়ে যেত, তাই মুসলমানরা ই দেশের স্বাধীনতায় ভুমিকা রেখেছে বেশি যেমন ধর আমাদের

৭ জন বিরশ্রেষ্ঠ তার সবাই মুসলমান।

শেখমুজিব মুসলমান।

জিয়াউর রহমান মুসলমান।

আতাউল গনী উসমানি মুসলমান।

চার নেতা মুসলমান।

কাদের সিদ্দিকি মুসলমান।

আমি এটা বলছিনা যে হিন্দু বা অন্যান্য ধর্মের লোকেরা কেউ ভুমিকা রাখেনি। আমি কেবল এতটুকু বলতে চেয়েছি স্বধীনতা যুদ্ধে মুসলমানরা অংশ গ্রহন না করলে আমাদের স্বাধীনতা পেতে অনেক দেরী হতো।

তাহলে তুমি বলো, দাড়ী টুপি ওয়ালা দের দেখলেই যে বর্তমান প্রজন্ম রাজাকার বলে এর জন্য কে দায়ি?

প্রথমত মুসলমানরাই কারন এদের মধ্যে কিছু কুসন্তানেরা পাকিস্তানের তাবেদারি না করলে যুদ্ধের ভয়াবহতা এত বাড়তো না, এবং মুসলমানরাও রাজাকার খেতাব পেতনা। তবে কি জানিস বর্তমান মিডিয়া অবশ্য এই ব্যাপারে একটু কট্টর ভাবে ভুমিকা রেখেছে তারা রাজাকার ভুমিকায় কাউকে দেখালেই তাকে দাড়ী টুপি পরা অবস্হায় দেখায় অথচ বহু রাজাকার ছিলো যাদের দাড়ী ছিলোনা বরং তার ইয়াং স্টাইলে চিপ রাখত। আমি আজ পর্জন্ত কোন নাটকে বা সিনামায় ঐ ধরনের রাজাকার দেখিনি। অথচ সরোয়ার্দি উদ্দানে বা তার আসে পাশে যে সব রাজাকার দের হত্যা করা হয়েছে(হত্যা করাই উচিৎ ছিলো)

তাদের কারো মুখই দাড়ী দেখতে পাবিনা। তার পরে দেখ যে কজন কে রাজাকার বলে গ্রেপতার করা হয়েছে তারা রাজাকার দের হেড অফ কমান্ড।তার মধ্যে ও একজনার দাড়ী নাই, অথচ দেখ তোদের জেনারেশন বা তার পরের জেনারেশনের মনে রাজাকার মানে কি একজন মসজিদের ইমামের মুখ ভেসে ওঠে।

আর একটা কথা বলি আলেম সমাজ ই যে রাজাকার হয়েছে এটা ঠিক নয় বহু দফাদার রাজাকার ছিলো, প্রান ভয়ে বহু সাধারন মানুষ ও রাজাকার হয়েছিলো। ঠিক তেমনি বহু মসজিদের ইমাম মুক্তি যোদ্ধা হয়েছিলো। এখন কেউ যদি ১৯৭১ এর রজাকার ইস্যুতে ইসলামকে হেয় প্রতিপন্ন করে তা তো মেনে নেয়া যায় না। আর যদি মেনেও নিস যে দাড়ী টুপি পরলে সে রাজাকার হয়ে যাবে। তাহলে কাল থেকে পরিচয় দিস তুই রাজা কারের সন্তান কারন আমার ও তো দাড়ী টুপি আছে।

আমার কথাঃ আমি আর বাবা মিলে এক সাথে ২১সে বই মেলায় রাজাকারদের বিচার চাইয়ের স্বাক্ষর গ্রহনের খাতায় স্বাক্ষর করেছিলাম। ১৬ ই ডিসেম্বরে রাজাকারদের বিচার চেয়ে মানব বন্ধন করেছিলাম ডাচের সামনে। বাবা দাড়িয়ে ছিলো দাড়ী আর টুপি নিয়ে তখন একটা ছোট শিশু ওর আব্বুকে, বাবাকে দেখিয়ে বলেছিলো, আব্বু দেখো একটা রাজাকার। তার পর থেকে- ই বাবার এই ক্ষোভ।

তিনি এখোন চান রাজাকার বা যারা যুদ্ধ অপরাধী এদের বিচার হোক, কিন্তু বাবার এক কথা ধর্ম আর ১৯৭১ গুলিয়ে ফেললে চলবেনা। আর বাবা রাজাকার শব্দটাকে খুব ঘ্রীনা করেন, কারন মীরজাফরের নামটার মতন রাজাকার শব্দটাও এখন একটা গালি।

মুখ বন্ধঃ নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক যোদ্ধার মনের কথা এগুলো, লেখার সাথে যে ছবি গুলো ব্যাবহার করা হয়েছে সেগুলো এই ঘটনার সাথে মিলরেখে ভিজুয়ালাইজেসনের সুবিধার জন্য ব্যাবহার করা হয়েছে। রাজাকার দের বিচার হওয়া উচিৎ তবে কোন নিরাপরাধ ব্যাক্তিযেন কোন রাজনৈতিক শত্রুতার কারনে বিপদে না পরে।

৩০ লক্ষ প্রানের বিনিময়ে অর্জিত এই দেশকে আসুন আমরা সবাইমিলে একটি দূর্নিতী মুক্ত দেশ হিসাবে গড়েতুলে শহীদ দের রক্তের ঋণ কিছুটা হলেও শোধ করি।
পোষ্টটির নামকরন কি অর্থে করা হয়েছে সেটা মনে হয় আর বর্ননা করার প্রয়জন নাই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *