ইজ্জত হারিয়ে এখনো পাগল বীরাঙ্গনা আফিয়া খাতুন চৌধুরী

১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালে পাক হানাদারবাহিনী জগন্নাথ দীঘি সংলগ্ন এলাকায় ক্যাম্প স্থাপন করে। তখন সোনাপুর গ্রামে পাকবাহিনীর অত্যাচার নির্যাতন বেড়ে যায়। পাক হানাদারদের ভয়ে গ্রামের নারীরা ছিল সন্ত্রস্ত।

আজ এ ঘর তো কাল ওই ঘরে গিয়ে বিবাহযোগ্য কিংবা বিবাহিত যুবতী মেয়ে কিংবা মহিলাদের তুলে নিয়ে যেত। এরই মধ্যে রাজাকারদের সহায়তায় ক্যাম্পের দায়িত্বরত পাক হাবিলদারের কাছে খবর পৌঁছে যায় সুন্দরী বিধবা খঞ্জনীর কথা। তাকে হাবিলদারের হাতে তুলে দিলে গ্রামে অন্য নারীদের ওপর নির্যাতন করা হবে না। এ কথামত স্থানীয় রাজাকার নুরুল ইসলাম নুরু ওরফে নুরু মিয়া, আফজ উদ্দিন ফজল হক ও তার মা জোর করে খঞ্জনীকে হানাদারদের জগন্নাথ দীঘি ক্যাম্পে নিয়ে যান ১৯৭১ সালের জুন মাসের কোনো এক রাতে। ওই রাতেই হাবিলদার এই রাজাকারদের উপস্থিতিতে জোর করে খঞ্জনীকে বিয়ে করেন। এর পরদিন থেকেই সোনাপুর গ্রামে পাকবাহিনীর অত্যাচার নির্যাতন কমে যায় এবং ১৬ ডিসেম্বরের আগ পর্যন্ত এ গ্রামের কোনো নারী আর সম্ভ্রম হারাননি।

ফেনী জেলার বরইয়া চৌধুরী বাড়ির আফিয়া খাতুন চৌধুরী ওরফে খঞ্জনীর একাত্তরের দিনগুলোতে পাকিস্তানি হানাদারদের অপমানের কথা জানান স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধারা। তখন যে গ্রামে ডাকঘর ছিল তার নাম জোয়ার কাছাড়।

সোনাপুর গ্রামের স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধারা জানান, জুলাই মাসের শেষ দিকে জগন্নাথ দীঘি সংলগ্ন চিওড়া রাস্তার মাথায় মুক্তিযোদ্ধাদের একটি এম্বুসে পড়ে খঞ্জনীর কথিত স্বামী পাকিস্তানি হাবিলদার মারা যান। এরপরও খঞ্জনীকে হানাদার বাহিনী ছাড়েনি। ১৯৭১ সালের ১৫ ডিসেম্বর রাত পর্যন্ত তাকে হানাদারদের ক্যাম্পে থাকতে হয়েছে। এই সময়ে সোনাপুর গ্রামসহ আশপাশের অসংখ্য গ্রামের অসহায় লোকজনকে পাকবাহিনীর চোখকে ফাঁকি দিয়ে সামর্থ্য অনুয়ায়ী সাহায্য করেছিলেন।

স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালে নিজের ইজ্জত বিলিয়ে দিয়ে আশপাশের শত শত নারীর ইজ্জত সম্ভ্রম রক্ষা করা আফিয়া খাতুন চৌধুরী সমাজ সংসারে নষ্ট, ভ্রষ্ট ও অস্পৃশ্য হয়ে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে সীমাহীন মানবেতর জীবনযাপন করছেন। শুধু নিজের ইজ্জত দিয়েই গ্রামের মেয়েদের ইজ্জত রক্ষা করেননি তিনি। আশপাশের অনাহারী অভাবী মানুষজনদের জন্য কৌশলে পাক হানাদারদের ক্যাম্প থেকে খাবার দিয়ে তাদের জীবন রক্ষা করেছেন। অথচ খাবার দিয়ে যে সব পরিবারকে তিনি বাঁচিয়ে রেখেছিলেন, নিজের নারীত্ব বিসর্জন দিয়ে যেসব মা-বোন-স্ত্রীদের পাকবাহিনীর লোলুপ দৃষ্টি থেকে রক্ষা করেছেন, সে সব মানুষই দেশ স্বাধীন হওয়ার পর খঞ্জনী যখন গ্রামে ফিরে এলেন তখন তাকে গলা ধাক্কা দিয়ে নষ্টা, ভ্রষ্টা বলে তাড়িয়ে দিয়েছিলেন।

স্বামী, সংসার হারিয়ে পথে পথে ভিক্ষাবৃত্তি করে, অনাহারে, অর্ধাহারে জীবন কাটাতে কাটাতে এক সময় মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন। বর্তমানে কুমিল্লা নগরীর পূর্ব বাগিচাগাঁও এলাকার একটি বস্তিতে দরিদ্র মেয়ের কাছে মানবেতর জীবনযাপন করছেন তিনি।

আফিয়া খাতুন চৌধুরী ওরফে খঞ্জনী ১৯৩৯ সালে ফেনী জেলার বরইয়া চৌধুরী বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম হাসমত আলী চৌধুরী ও মা মছুদা খাতুন। গায়ের রং ফর্সার পাশাপাশি দেখতেও ছিল বেশ সুন্দরী আফিয়া। ১৯৬৩ সালে কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম উপজেলার জগন্নাথ দীঘি ইউনিয়নের সোনাপুর গ্রামের রুহুল আমিন মানিক ওরফে হেকমত আলীর সঙ্গে তার বিয়ে হয়। ১৯৬৪ সালে রোকসানা ও ১৯৬৫ সালে আবদুল মতিন নামে এই দুই ছেলেমেয়ে জন্মগ্রহণ করে। খঞ্জনীর স্বামী, ছেলেমেয়ে ও শাশুড়ি বোচন বিবিকে নিয়ে বেশ ভালোভাবেই সুখের সংসার চালিয়ে যাচ্ছিলেন। কিন্তু সুখ খঞ্জনীর জীবনে বেশি দিন স্থায়ী হলো না। ১৯৬৬ সালে চট্টগ্রামের রেলওয়ের বৈদ্যুতিক শাখায় কর্মরত থাকা অবস্থায় নগরীর পাহাড়তলীর ভেলুয়াদীঘির পাড়ের ভাড়া বাসায় রহস্যজনকভাবে মারা যান তার স্বামী হেকমত আলী। স্বামী মারা যাওয়ার পর বাবার বাড়ি থেকে প্রস্তাব আসার পরেও স্বামীর ভিটে-মাটি ছেড়ে যাননি খঞ্জনী। এতিম দুই ছেলেমেয়ে ও শাশুড়িকে নিয়ে চরম অভাব অনটনে কোনো মতে দিন কাটাচ্ছিলেন তিনি। দুই সন্তানের জননী হলেও অপূর্ব সুন্দরী খঞ্জনীর গায়ের রূপ লাবণ্য কমেনি এতটুকু যা সহজেই দৃষ্টি কাটত সবার। ওই রূপই কাল হয়ে দাঁড়ায় তার।

১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর দেশ স্বাধীন হয়েছে আওয়াজ শুনে ক্যাম্প থেকে বের হয়ে আসেন খঞ্জনী বেগম। স্বর্বস্ব হারিয়ে ছুটে যান তার মেয়ে রোকসানা ও ছেলে মতিনের কাছে। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস, খঞ্জনী বেগম যাদের জন্য ইজ্জত বিলিয়ে দিয়েছেন, পাক হানাদার বাহিনীকে ফাঁকি দিয়ে যাদের খাবার দিয়ে ক্ষুধা মুক্ত করেছেন তারা তাকে দেখেই অগ্নিশর্মা হয়ে উঠলেন। বলতে লাগলেন, এই নষ্টা, ভ্রষ্টা, অসতী খঞ্জনী বেগমকে সোনাপুরে জায়গা দেয়া যাবে না। তাকে ছোঁয়া যাবে না। শাশুড়ি বোচন বিবিও সন্তানদের তার কাছে রেখে এক কাপড়ে বিদায় করে দিলেন খঞ্জনী বেগমকে। সোনাপুর থেকে বাবার বাড়ি ফেনীতে গিয়েও আশ্রয় মেলেনি খঞ্জনী বেগমের। কারণ, পাকবাহিনীর ক্যাম্পে ছিলেন তিনি। পরবর্তীতে ক্ষুধার জ্বালায় ভিক্ষা করতে শুরু করে। রাত কাটে কোনো বাজারে অথবা রেলস্টেশনে। শাশুড়ির কাছে থাকতে গিয়ে অভাব অনটনে অনাহারে মারা যায় ছয় বছরের ছেলে আবদুল মতিন।

জানা যায়, নষ্টা নারী বলে সোনাপুরের তৎকালীন সমাজপতিরা মৃত ছেলেকেও দেখতে দেয়নি খঞ্জনী বেগমকে। এভাবে এক সময় তিনি মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন। নিজে নিজে বকবক করেন, রাস্তাঘাটে কিংবা স্টেশনে গান করেন, কবিতা বলেন, পুঁতি পরেন। বলা যায়, পুরোদস্তুর পাগল হয়ে যায় খঞ্জনী বেগম। এভাবে কেটে যায় স্বাধীনতার পর তার জীবন থেকে ২৮টি বছর।

১৯৯৯ সালের শেষ দিকে এসে খঞ্জনী বেগম আশ্রয় পান ফেনীতে তার ভাই সেনাবাহিনী কর্মকর্তা আবদুর রহমান চৌধুরীর বাড়িতে। কিন্তু সেই আশ্রয়টিতেও অস্পৃশ্য থেকে গেছে তার জীবন। ভাই, ভাবী ও তার ছেলেরা কেউ তাকে নিজের ঘরে রাখেনি। ভাই আবদুর রহমান চৌধুরী দয়া করে তার জন্য বরাদ্দ দিয়েছিলেন ৫ ফুট দৈর্ঘ্য ও আড়াই ফুট প্রস্থের একটি মাটির ঘর। সেখানে ধানের খড় বিছিয়ে খাওয়া-দাওয়া, ঘুমানো সব কাজ করতে হতো। জানা গেছে, ভাই আবদুর রহমান চৌধুরী আনোয়ারা বেগম নামে এক চাচিকে মাসের খোরাকি বাবদ কিছু চাল দিতেন। চাচি রান্না করে খঞ্জনী বেগমকে দিতেন। খঞ্জনী বেগম তা কখনো খেতেন আবার কখনো খেতেন না। তবে সারাক্ষণ বিরবির করে আনমনাভাবে কথা বলতেন। তিনি খেলেন কি খেলেন না তার খবর নিতেন না কেউ। তিনি যত দিন আবদুর রহমান চৌধুরীর বাড়িতে ছিলেন ততদিন তার স্ত্রী বড় দুশ্চিন্তায় ছিলেন। তার ধারণা, খঞ্জনী বেগম এখানে থাকলে ভবিষ্যতে সন্তানদের বিয়ে-শাদীতে সমস্যা হতে পারে।

বীরঙ্গনা খঞ্জনী বেগমের দুই ছেলে মেয়ের মধ্যে ছেলেটি ছয় বছর বয়সেই মারা যায়। আর মেয়ে রোকসানা বেগমকে ফুল মিয়া নামক এক শ্রমজীবীর সঙ্গে বিয়ে দেয়া হয়। এক সময় ফুল মিয়া ও রোকসানা দুই জনেই কুমিল্লা বিসিকের পাবন ফ্যাক্টরিতে চাকরি করতেন। এখন মানসিক ভারসাম্যহীন মা খঞ্জনী বেগম তার সঙ্গে থাকেন বলে নিজের চাকরিটুকু ছেড়েছেন।

জানা যায়, খঞ্জনীর শাশুড়ি বোচন বিবি মারা যাওয়ার পর খঞ্জনীর স্বামীর ১৮ শতক জায়গার মধ্যে স্থানীয় জনৈক আবদুছ সাত্তার তাদের ৯ শতক জায়গা জোর করে দখল করে নেন। যদিও খঞ্জনী বেগমকে নিয়ে মেয়ে রোকসানা চরম মানবেতর জীবনযাপন করছেন। বর্তমানে থাকেন মেয়ে রোকসানা ও মেয়ের জামাতা ফুল মিয়ার সঙ্গে কুমিল্লা নগরীর পূর্ব বাগিচাগাঁওয়ের বড় মসজিদ সংলগ্ন বড় মসজিদের ওয়াকফ এস্টেটের বস্তির দু’কক্ষের একটি খুপড়ি ঘরে। রোকসানা ও ফুল মিয়া দম্পত্তির রয়েছে সুরাইয়া, মুন্না ও তারিন নামে তিনটি সন্তান।

মেয়ে ও মেয়ের জামাতা জানালেন, চলতি বছর কুমিল্লা জেলা প্রশাসক এবার খঞ্জনীর নামে চৌদ্দগ্রামের কালকোট মৌজার ৩১ দাগের হালে ৬৪০ এর ৫ শতক খাস জায়গা দিয়েছেন। কিন্তু এই জায়গায় আমরা দখলে যেতে পারছি না। প্রভাবশালীরা আমাদের যেতে দিচ্ছে না। প্রশাসনও আমাদের জায়গা বুঝিয়ে দিচ্ছেন না।

মেয়ে রোকসানা আরো বলেন, আমার মার কোনো অপরাধ ছিল না। এলাকার রাজাকাররা আমার মাকে পাঞ্জাবিদের হাতে তুলে দিয়েছে তাদের মা-বোনদের ইজ্জত রক্ষা হবে বলে। আবার ক্যাম্প থেকে মা তাদের জন্যই বিভিন্ন খাবার পাঠাত যাতে তারা খেয়ে থাকে। অথচ যে দিন মা ছাড়া পেল সেদিন মা, মাগো মা বলে কান্নাকাটি করলেও গ্রামের লোকজন মায়ের কাছে আমাদের যেতে দেয়নি। বলেছে, তোর মা খারাপ। যে দেশের জন্য আমার মা ইজ্জত দিল সে দেশ আজো আমার মাকে বীরাঙ্গনা উপাধি দিল না। সরকারিভাবে যে খাস জমি দিয়েছে তা আজো আমরা দখল নিতে পারছি না বড় লোকদের ভয়ে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *