ইতোমধ্যেই জাতীয় ঐক্য সৃষ্টি হয়েছে

যার যার অবস্থান থেকে রুখে দাঁড়ান : প্রধানমন্ত্রী
উত্তরণ প্রতিবেদন: প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে ইতোমধ্যে জাতীয় ঐক্য সৃষ্টি হয়েছে। বাংলাদেশ সবসময় সন্ত্রাসবিরোধী, জঙ্গিবাদবিরোধী। এ দেশের মানুষকে সবসময় এর বিরুদ্ধে সচেতন থাকতে হবে জানিয়ে সবাইকে যার যার অবস্থানে থেকে সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান তিনি। প্রধানমন্ত্রী গত ১৭ জুলাই বিকেলে প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন গণভবনে এক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন। ১৫-১৬ জুলাই মঙ্গোলিয়ায় অনুষ্ঠিত ১১তম আসেম সম্মেলনের সার্বিক বিষয়ে জানাতে এর আয়োজন করা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর কাছে সাংবাদিকদের বেশির ভাগ প্রশ্নই ছিল দেশে জঙ্গি ও সন্ত্রাসী তৎপরতার বিষয়ে। তিনি সাম্প্রতিক জঙ্গি হামলার পর বিশ্বনেতাদের কাছে বিব্রত হওয়া, জঙ্গিদের বিরুদ্ধে সরকারের পদক্ষেপ, আদালতে বিচার আটকে থাকাসহ নানা বিষয়ে কথা বলেন।
জঙ্গিবাদ দমনে বিএনপির জাতীয় ঐক্যের আহ্বান প্রসঙ্গে এক প্রশ্নের উত্তরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমি তো মনে করি ইতোমধ্যে সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে জাতীয় ঐক্য সৃষ্টি হয়ে গেছে। আর যারা সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ, পুড়িয়ে মানুষ মারা অথবা যুদ্ধাপরাধে জড়িত তাদের কথা আলাদা। যাদের ঐক্য হলে সত্যিকারভাবে সন্ত্রাস দূর করা যাবে, তাদের ঐক্য কিন্তু ঠিকই গড়ে উঠেছে। এই ঐক্য থাকবে, এটাই হলো বাস্তব।
অন্য এক প্রশ্নের উত্তরে শেখ হাসিনা গুলশানে হামলার পর আসেম বৈঠকে নিজের জোর গলায় কথা বলতে না পারার বিষয়টি তুলে ধরে বলেন, একটার পর একটা ঘটনা ঘটিয়ে তারা দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট করার চেষ্টা করেছে। এই প্রতিকূল অবস্থার মধ্যে বহু সমালোচনা শুনেও আমরা কিন্তু উন্নয়নের পথে এগিয়ে যাচ্ছি এবং বাংলাদেশকে একটি সম্মানজনক অবস্থায় নিয়ে গেছি। ইতালির মিলানে এর আগের আসেম সম্মেলনে গলা উঁচু করে কথা বলতে পেরেছিলাম। কিন্তু আজকে দেখা যাচ্ছে আমার বাংলাদেশেও একই ঘটনা ঘটছে। পৃথিবীর অন্য জায়গায়ও একই ঘটনা। যে সম্মানজনক অবস্থানে বাংলাদেশকে আমরা নিয়ে গিয়েছিলাম সন্ত্রাস জঙ্গিবাদ মোকাবিলা করে, সেই অবস্থানে একটা ছেদ তৈরি হলো গুলশান হত্যাকা-ের মাধ্যমে।
আসেম বৈঠকে বিত্তবান পরিবারের সন্তানরা জঙ্গি কর্মকা-ে জড়িয়ে পড়ায় বিশ্বনেতারাও বিস্ময় প্রকাশ করেছেন জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এটি একটি মৌলিক বিষয় যে অস্ত্র কোথা থেকে আসছে, পরামর্শ কারা দিচ্ছে, অর্থ জোগানদাতা কে এবং কেন তারা এসবে জড়িয়ে পড়ছে?
শুধু বাংলাদেশ নয়, অন্য সব দেশেই এটি ঘটছে। তাদের জীবনে তো চাওয়া-পাওয়ায় কোনো কমতি নেই।
আন্তর্জাতিকভাবে সবাইকে মিলে জঙ্গিবাদ মোকাবিলা করতে হবে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা সবারই সহযোগিতা চাই। তবে কে আমাদের সাহায্য করল, আর না করল তা নিয়ে বসে থাকলে চলবে না। সবাইকেই সহযোগিতা করতে হবে। কীভাবে হচ্ছে, কারা করছে, কখন করছেÑ এসব নিয়ে আমরা তথ্যবিনিময় করব। এগুলো মোকাবিলার জন্য আমরা যা যা করার করব। আমেরিকার নিশা দেশাই এসেছিলেন। আমি তাকে বলেছি, আমাদের দরকার ইন্টেলিজেন্স ইনফরমেশন। আমি এই রিপোর্ট আগে চাই। এসব তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করুন। অন্যান্য বিষয় যেমন টেকনিক্যাল টেস্ট, যেসব আমাদের দেশে নেই সেসব আমরা বিভিন্ন দেশে পাঠাচ্ছি।
এ দেশে উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তানদের জঙ্গিবাদে জড়িয়ে পড়ার বিষয়ে শেখ হাসিনা বলেন, সব সময় সবাই মনে করত মাদ্রাসার ছাত্ররা এসব করে। এখন দেখা যাচ্ছে উচ্চবিত্ত, যাদের সব চাহিদা পূরণ হচ্ছে, এখন আর কিছু না পেয়ে মানুষ হত্যায় নেমে গেছে। তারা এখন হুর-পরি পেতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। তারা এখানে কেন এলো? এর কোনো যৌক্তিকতা খুঁজে পাচ্ছি না। মানুষ খুন করলে বেহেশতের দরজা খুলবে না। যারা তাদের এ শিক্ষা দেবে সেটা ভুল। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্র রাজনীতি চালু করা হবে কিনা এমন প্রশ্নের উত্তরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ছাত্র রাজনীতি কিন্তু বাংলাদেশে নিষিদ্ধ নয়। আমাদের সবার শুরু ছাত্র রাজনীতি থেকে। আমরা স্কুল পালিয়ে চলে আসতাম। যার যার প্রতিষ্ঠান তাদের নিয়ম-নীতিমালা অনুযায়ী চলছে। কিন্তু সন্ত্রাসী কর্মকা-কে মদত দেওয়া খুব দুঃখজনক।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ছাত্ররা না হয় বুঝলাম কম বয়সী; কিন্তু শিক্ষকরা জঙ্গিবাদে জড়ায় কীভাবে? এটা খুবই দুঃখজনক।
এক প্রশ্নের উত্তরে জঙ্গিবাদ নিয়ে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণœ হওয়া এবং এগুলো দমনে সরকারের পদক্ষেপ তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, আমার কষ্ট লেগেছে, এত কষ্ট করে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি তুলে ধরলাম; তবে তার সব যে শেষ হয়ে গেছে এমন নয়। অবশ্যই এসব প্রতিরোধে পরিবারগুলোকে সচেতন করা হবে। গ্রামপর্যায় পর্যন্ত কমিটি করে দিয়েছি। ধর্মীয় নেতাদের আমরা সচেতন করছি।
জঙ্গি হামলাগুলোর তদন্ত প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা বলেন, এখানে অনেকগুলো ধাপ আছে, কাজ আছে। ভবিষ্যতে এমন এমন জিনিস বেরোবে যে আপনারা নিজেরাই তাজ্জব হয়ে যাবেন। সেখান থেকে যতটুকু প্রকাশ করা যায় ততটুকু প্রকাশ করা হচ্ছে। সাংবাদিকদের বলব, আপনারা বেশি খোঁচাখুঁচি করে একটা শব্দও যদি বের করেন, তা হলে একটা সূত্র নষ্ট হয়ে যেতে পারে।
জঙ্গিদের মামলা আদালতে আটকে থাকা প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, অত্যন্ত দুঃখজনক যে ২১ জন জেএমবি সদস্যের মামলা হাইকোর্টে ঝুলে আছে। বারবার তাগাদা দেওয়ার পরও বিচার হচ্ছে না। সব জায়গায় তো সব ধরনের লোক আছে। আছে বলেই অনেক সময় আমাদের সমস্যায় পড়তে হয়। আবার আমরা যদি বেছে বেছে তাদের বিষয়টা তুলতে যাই, আপনারাই তখন লিখবেন, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা শুরু হয়েছে। আমরা চাই যারা একেবারে চিহ্নিত তাদের সাজাটা দ্রুত কার্যকর করতে। এতে অন্তত একটা বার্তা পৌঁছায় যে এসব করলে শাস্তি পেতে হয়।
পশ্চিমবঙ্গে আস্তানা গেড়ে এ দেশে সন্ত্রাসী কর্মকা- চালানো হচ্ছে এমন এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, পশ্চিমবঙ্গ থেকে জঙ্গিরা এখানে আসছে, এ ধরনের কোনো তথ্য আমার কাছে নেই। যেহেতু বর্ডার এলাকা, সেহেতু যারা ঘটনা ঘটায়, তারা ওই দিকে চলে যাওয়ার চেষ্টা করছে। আবার ওখানে যারা ঘটনা ঘটাচ্ছে, তারা এদিকে চলে আসার চেষ্টা করে। আমরা অনেককে ফিরিয়ে এনেছি। ভারত সরকার এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিচ্ছে। আমরাও আমাদের মাটিতে কোনো কিছু করার সুযোগ দিচ্ছি না।
এর আগে লিখিত বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আসেম সম্মেলন শুরু হওয়ার কয়েক ঘণ্টা আগে ফ্রান্সের নিস শহরে সন্ত্রাসী হামলায় ৮৪ জন নিহত হয়। আমি এই জঘন্য হত্যাকা-ের তীব্র নিন্দা জানিয়েছি। তিনি বলেন, ওই সম্মেলন চলাকালেই তুরস্কে সেনা অভ্যুত্থানের খবর আসে। আমরা সব সময়ই অসাংবিধানিকভাবে ক্ষমতা দখলের বিরুদ্ধে। তুরস্কের জনগণ অসাংবিধানিকভাবে ক্ষমতা দখলের চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে প্রমাণ করেছেÑ জনগণই মূল শক্তি।
প্রধানমন্ত্রী বিশ্বনেতাদের কাছে সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে তার সরকারের জিরো টলারেন্স নীতি তুলে ধরেন বলে জানান। তিনি বলেন, আমি সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের মূল চিন্তা-চেতনার উৎস খুঁজে বের করতে সবার প্রতি আহ্বান জানাই। একই সাথে জঙ্গি ও সন্ত্রাসীদের মদতদাতা, অর্থদাতা, প্রশিক্ষণদাতা, যারা পরামর্শ দিচ্ছে বা অস্ত্র সরবরাহ করছে, তাদের খুঁজে বের করে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানাই।
ভারত, জাপান ও ইতালির সাথে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশে সংঘটিত হামলা নিয়ে সরকারের চলমান তদন্ত কার্যক্রমের বিষয়ে জাপানের প্রধানমন্ত্রী, ইতালির পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও ভারতের উপ-রাষ্ট্রপতিকে আমি অবহিত করি। আমি তাদের আশ্বস্ত করি যে ঘটনার তদন্তের স্বার্থে ভারত, জাপান, ইতালিসহ অন্য যে কোনো বন্ধুপ্রতিম দেশের কাছ থেকে প্রয়োজন মোতাবেক সহযোগিতা গ্রহণ করা হবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাপানের প্রধানমন্ত্রী আমাকে এই মর্মে আশ্বস্ত করেন যে গুলশানের ঘটনা জাইকাসহ জাপানের উন্নয়ন সহযোগিতা এবং বাংলাদেশে তার দেশের বিনিয়োগ কিংবা প্রতিশ্রুত ৬ বিলিয়ন ডলার ছাড়করণের ক্ষেত্রে কোনো বিরূপ প্রভাব ফেলবে না।
প্রধানমন্ত্রী জানান, তিনি রাশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর সাথে বৈঠকে তাকে ও প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিনকে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। এ ছাড়া জার্মানির সাথে বৈঠকে জার্মান চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মার্কেল, মিয়ানমারের সাথে বৈঠকে মিয়ানমারের রাষ্ট্রপতি ও এনএলডির সভাপতি অং সান সু চি’কে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *