ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান>Mass Movement of Sixty nine

বাংলাদেশের স্বাধীনতা-পূর্ব ইতিহাসে ঊনসত্তরের গণ-আন্দোলন ছিল একটি মাইলফলক। ছয়দফা আন্দোলনের ধারাবাহিক তীব্রতার কারণে পাকিস্তান সরকার আগরতলা ষড়যন্ত্রের নামে ‘রাষ্ট্র বনাম শেখ মুজিবুর রহমান’ মামলা করে। এতে শেখ মুজিবের প্রতি মানুষের সহানুভূতি ও সমর্থন বাড়তে থাকে। ১৯৬৭ সাল থেকেই ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়ন (মতিয়া) ও ছাত্র ইউনিয়ন (মেনন) শিক্ষা কমিশন রিপোর্ট, ছাত্রদের শিক্ষা জীবনের নানা সমস্যা ও বন্দিমুক্তি প্রভৃতি ইস্যুতে ঐক্যবদ্ধ কার্যক্রম গ্রহণ করতে থাকে। ১৯৬৮ সালের শেষ দিকে হরতাল ধর্মঘটের মাধ্যমে গণ-অসন্তোষের বহিঃপ্রকাশ ঘটে। ১৯৬৯ সালের ৫ জানুয়ারি এই ঐক্য প্রচেষ্টা ১১ দফা দাবিনামা প্রণয়নের ভেতর দিয়ে সুনির্দিষ্টরূপ লাভ করে।
১১ দফা দাবিতে আন্দোলন গড়ে তোলার লক্ষ্যে গঠিত হয় ‘কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ’। ১৯৬৯ সালের ১৭ জানুয়ারি ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের উদ্যোগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলায় আহূত ছাত্র সমাবেশের ভেতর দিয়ে সূচিত ছাত্র আন্দোলন অচিরেই গণ-অভ্যুত্থানে রূপ নেয় এবং ১৯৬৯ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার ও কারাগার থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মুক্তিলাভের মাধ্যমে এর সফল সমাপ্তি ঘটে।
ছাত্র আন্দোলনের পাশাপাশি ১৯৬৯ সালের ৮ জানুয়ারি তৎকালীন সারা পাকিস্তানের ৮টি রাজনৈতিক দল মিলে ‘গণতান্ত্রিক সংগ্রাম পরিষদ’ বা উবসড়পৎধঃরপ অপঃরড়হ ঈড়সসরঃঃবব Ñ ‘ডাক’ গঠন করে। ডাক-এর সদস্য ছিল পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ, পাকিস্তান ন্যাপ, মুসলিম লীগ, জামায়াতে ইসলামী, এনডিপি ও পিডিএম প্রভৃতি দল। ডাক ৮ দফা দাবি প্রণয়ন করে, যার মূল কথা প্রাপ্তবয়স্ক ভোটাধিকারের ভিত্তিতে প্রত্যক্ষ নির্বাচন, জরুরি আইন প্রত্যাহার, কালাকানুন বাতিল এবং শেখ মুজিবুর রহমানসহ সকল রাজবন্দির মুক্তি প্রভৃতি। ‘ডাক’ ৮ দফায় পূর্ববাংলার স্বায়ত্তশাসনের দাবি এড়িয়ে যাওয়ায় পূর্ববাংলার মানুষের মধ্যে সাড়া জাগাতে পারেনি। তবে ‘ডাক’ গঠিত হওয়ায় এবং ডাক-এর আহ্বানে ১৪ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান জুড়ে হরতাল পালিত হওয়ায় গণ-আন্দোলন পশ্চিম পাকিস্তানেও ছড়িয়ে পড়ে।
পূর্ববাংলায় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতৃত্বে আহূত আন্দোলন দমনে ১৪৪ ধারা জারি এবং পরে কারফিউ জারি করা হয়। কিন্তু ছাত্রসমাজ ১৪৪ ধারা ও কারফিউ ভঙ্গ করেই আন্দোলনকে এগিয়ে নেয়। ২০ জানুয়ারি ছাত্র মিছিলে গুলিতে ছাত্রনেতা আসাদুজ্জামান নিহত হন। ২৪ জানুয়ারি এর প্রতিবাদে আহূত হরতাল-ধর্মঘটেও গুলিবর্ষণ করা হয়। নিহত হয় স্কুলছাত্র মতিউর। ঐদিন রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে গণ-অভ্যুত্থান সৃষ্টি হয়। ফেব্রুয়ারি মাসে আইয়ুব খান বিরোধী দলের সঙ্গে আলোচনার এবং শেষের দিকে শেখ মুজিবকে প্যারোলে মুক্তি দিয়ে গোলটেবিল বৈঠকে যোগদানের আহ্বান জানান। মুজিব প্যারোলে মুক্তির প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন।
১৫ ফেব্রুয়ারি ক্যান্টনমেন্টে বন্দী আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার আসামি সার্জেন্ট জহিরুল হককে পাকিস্তানি সেনারা গুলি করে হত্যা করে। সারাদেশ এর প্রতিবাদে বিস্ফোরণোন্মুখ হয়ে ওঠে। সরকার সেনাবাহিনী নিয়োগ করে। ১৮ ফেব্রুয়ারি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক প্রক্টর ড. শামসুজ্জোহাকে সেনাবাহিনী হত্যা করায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। জনগণ সান্ধ্য আইন ভঙ্গ করে রাজপথে নেমে আসে। ইতিমধ্যে আইয়ুব খাঁ পিছু হটতে শুরু করেন। শেখ মুজিব ছাড়া সকল রাজবন্দিকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। ২১ ফেব্রুয়ারি গণ-অভ্যুত্থানের চাপে আইয়ুব আর রাষ্ট্রপতি হবেন না ঘোষণা দেয়। ২২ ফেব্রুয়ারি আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার করা হয়। শেখ মুজিবুর রহমান কারাগার থেকে মুক্তিলাভ করেন। ২৩ ফেব্রুয়ারি ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ রেসকোর্স ময়দানে সদ্য কারামুক্ত শেখ মুজিবুর রহমানকে গণসংবর্ধনা জানায় এবং ওই জনসভা থেকেই দেশবাসীর পক্ষ থেকে ডাকসুর সহ-সভাপতি তোফায়েল আহমেদ শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত জাতীয় নেতা হিসেবে বরিত হন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *