একদিন, বঙ্গবন্ধু …

গাঢ় কুয়াশায় ভিতরে দীর্ঘ পদক্ষেপ ফেলে হাঁটছিল দীর্ঘদেহী তরুণ মুজিবুর । ১৯৪০ সাল। মাঘ মাসের মাঝামাঝি। এ বছর দক্ষিণাঞ্চলে প্রচন্ড শীত পরেছে। দিনের বেলায় ঘন কুয়াশায় ডুবে থাকে গ্রামাঞ্চল । হিমে ঢাকা গ্রামগুলি কেমন নির্জন হয়ে আছে। বিশ্বজগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন নিথর বোধহীন মনে হয়। সূর্যের সোনালি কিরণের অভাবে অভিমানী শিশিরবিন্দুগুলি অভিমানে পড়ে আছে কচুপাতা, মুথা ঘাস ও সবুজাভ পত্রালীর উপর । …হাঁটার গতি বাড়িয়ে দেয় মুজিবুর ।
একটা সাইকেল হলে ভালো হত। শেখ জহির মুজিবুরের দূর সম্পর্কের এক আত্মীয়। সে আজ ভোরে মুজিবুরের সাইকেলটা নিয়ে কোটালিপাড়া গেছে।
কুয়াশায় ভিতর হাঁটতে হাঁটতে মুজিবুর কে কেমন চিন্তিত দেখায়। তার কারণ আছে। বালক বয়েসে রশীদ মাষ্টারের কাছে অক্ষরজ্ঞান পেয়েছিল মুজিবুর । বড় সাদাসিদে মাটির মানুষ রশীদ মাষ্টার। মুজিবুর কে ভারি ভালোবাসতেন। রশীদ মাষ্টার মুজিবুরকে প্রায়ই বলতেন, ‘দেখিস, মুজিবুর, তুই একদিন অনেক অনেক বড় হবি। তুই আমাদের টুঙ্গিপাড়ার মুখ উজ্জ্বল করবি।’ সেই রশীদ মাষ্টার গুরুতর অসুস্থ । আজ সকালে সংবাদ পেয়েছে। মুজিবুর হাঁটতে -হাঁটতে দীর্ঘশ্বাস ফেলে। রশিদ মাষ্টারের বাড়ি মোল্লার হাটে । যত শিগগির সম্ভব মোল্লার হাটে পৌঁছতে হবে।
বেলা যতই বাড়ছে শীত ততই জেঁকে বসেছে। মুজিবুরের পরনে সাদা পায়জামা-পাঞ্জাবির উপর নীল রঙের ঘন উলের সোয়েটার। তার ওপর খয়েরি রঙের একটি তসরের চাদর। গলায় কালো রঙের মাফলার জড়ানো । ক’দিন ধরে কাশি হয়েছে মুজিবুরের। মাঝে-মাঝে কাশছে সে। গায়ে অল্প জ্বরও আছে। মা আজ বাইরে বেরুতে নিষেধ করল। ঘরে শুয়ে থাকতে বলল। রশীদ স্যার গুরুতর অসুস্থ, এ অবস্থায় মুজিবুর ঘরে শুয়ে থাকে কি করে!
একটি কাক উড়ে যায় কুয়াশায় ঘন কুয়াশায় । হাঁটতে – হাঁটতে সে দৃশ্যটি এক পলক দেখে নেয় মুজিবুর । শীতের উদাসী রূপ বড় ভালোবাসে সে । অবশ্যি ঘোর বর্ষার কৃষ্ণাভ মেঘদলও তার প্রিয়। কিংবা শরতের নীল আকাশের শুভ্র মেঘের সারি । মায়াময় সোনার বাংলায় জন্মেছে সে … এ যে শত সহস্র জনমের সাধনার ফল । তার জীবনের ব্রত সোনার বাংলার যোগ্য সন্তান হওয়া। সে জন্য প্রাণ গেলে যাবে …
এবার কলিকাতা থেকে রবি ঠাকুরের অনেক ক’টা কাব্যগ্রন্থ কিনে এনেছে মুজিবুর । গতকাল রাত্রে প্রদীপের আলোয় রবি ঠাকুরের কবিতা পড়ছিল সে । রবি ঠাকুরের একটা কবিতা মনে পড়ে গেল তার:

বহুদিন ধ’রে বহু ক্রোশ দূরে
বহু ব্যয় করি বহু দেশ ঘুরে
দেখিতে গিয়েছি পর্বতমালা,
দেখিতে গিয়েছি সিন্ধু
দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া
ঘর হতে শুধু দুই পা ফেলিয়া
একটি ধানের শিষের উপরে
একটি শিশিরবিন্দু।

কবিতার প্রতিটি চরণে কী যে সত্য লুকিয়ে রয়েছে। বস্তুত বাংলার মাঠে-ঘাটে অপরূপ সব দৃশ্যাবলী ছড়িয়ে আছে। ঘন কুয়াশায় কাক উড়ে যাওয়ার দৃশ্যটিও কি কম কুহকী? তা ছাড়া রোদ উঠলে পর মাঠের সোনা রোদের একটি কি দুটি শালিক দানা খুঁটে খাবে। গ্রামবাংলার মনোরম দৃশ্যাবলী কী ভাবে দেখতে হয় তা রবি ঠাকুর ‘দেখায়া দিয়েছেন’। … শেখ বাড়ির পিছনে জাম গাছে মৌমাছিরা মধুর চাক বেঁধেছিল। দিনভর মৌমাছির সেই গুঞ্জন প্রকৃতির শ্রেষ্ঠ সংগীত বলে বোধ হয় …

মুজিবুরের অবশ্য জানার কথা না … ঠিক এই মুহূর্তে বাংলার রূপে অভিভূত হয়ে জীবনানন্দ দাস নামে একজন কবি বরিশাল শহরে (কিংবা কলিকাতায়) বসে লিখছেন-

একদিন কুয়াশার এই মাঠে আমারে পাবে না কেউ খুঁজে আর, জানি;
হৃদয়ের পথ চলা শেষ হল সেই দিন -গিয়েছে যে শান্ত হিম ঘরে,
অথবা সান্ত¦না পেতে দেরি হবে কিছু কাল -পৃথিবীর এই মাঠখানি
ভুলিতে বিলম্ব হবে কিছু দিন; এ মাঠের কয়েকটি শালিকের তরে

আশ্চর্য আর বিস্ময়ে আমি চেয়ে রবো কিছু কাল অন্ধকার বিছানার কোলে,
আর সে সোনালি চিল ডানা মেলে দূর থেকে আজো কি মাঠের কুয়াশায়
ভেসে আসে? সেই ন্যাড়া অম্বনে’র পানে আজো চলে যায়
সন্ধ্যা সোনার মতো হলে?
ধানের নরম শিষে মেঠো ইঁদুরের চোখ নক্ষত্রের দিকে আজো চায়

সন্ধ্যা হলে? মউমাছি চাক আজো বাঁধে না কি জামের নিবিড় ঘন ডালে,
মউ খাওয়া হয়ে গেলে আজো তারা উড়ে যায় কুয়াশায় সন্ধ্যার বাতাসে –
কতো দূরে যায়, আহা … অথবা হয়তো কেউ চালতার ঝরাপাতা জ্বালে
মধুর চাকের নিচে – মাছিগুলো উড়ে যায় … ঝ’রে পড়ে … ম’রে থাকে ঘাসে –

মুজিবুর দীর্ঘশ্বাস ফেলে।
সেই সঙ্গে বিষন্ন বোধ করে সে। রশীদ মাষ্টারের মুখ পড়ে যায় তার । এক অস্বস্তিকর উদ্বেগ ঘিরে ধরে তাকে । শেখ বাড়িতে প্রায়ই আসতেন রশীদ মাষ্টার । বারান্দায় বসে রসুলে করিম কিংবা পারস্যের আউলিয়া-আম্বিয়াদের জীবনকথা শোনাতেন, কখনও ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের মাতৃভক্তির গল্প শোনাতেন । বালক মুজিবুর বসে তন্ময় হয়ে শুনত। এসবই দশ/বারো বছর আগের কথা … সে কথা স্মরণ হলে এই মুহূর্তে মুজিবুরের চোখ আর্দ্র হয়ে উঠতে থাকে। মুজিবুর নিঃশব্দ প্রার্থনায় মগ্ন হয়। ‘হে আল্লাহ, আমি যেন আমার মহান শিক্ষককের শেষ মুহূর্তে পাশে থাকতে পারি। আমি যেন তার খেদমত করতে পারি।’
মাটির মানুষ ছিলেন রশীদ মাষ্টার …সোনার বাংলায় মাটির মানুষের জন্ম হয় … বাংলার মানুষ আর বাংলার প্রকৃতি … বড় আশ্চর্য এই মিশ্রণ … জগতে কোথায় আছে এমন? কোথাও কি আছে? কিন্তু, এই দেশ পরাধীন কেন? এই দেশ স্বাধীন না কেন?
এমন উত্তেজনাকর ভাবনাও কুড়ি বছরের তরুণের মনের মধ্যে উঁকি দেয়।
টুঙ্গিপাড়া অতিক্রম করে হাতের ডাইনে পাটগাতি রেখে মধুমতি নদীর পাড়ে এসে দাঁড়ল মুজিবুর ।
যদিও এখন মধ্যাহ্ন … তথাপি ধূসর আকাশে সূর্যের দেখা নেই।
কী রকম এক আবছা ধূসর আলো ছেয়ে আছে চর্তুদিক।
কুয়াশার ঘেরাটোপ ঢেকে রয়েছে চরাচর।
নদীর ঘাটে খেয়া পারাপারের একটি নৌকা।
এ পাড়ে আর কোনও যাত্রী নেই।
ঘাটে নেমে এসে মুজিবুর নৌকায় উঠে বসলে মাঝি নৌকা ছাড়ল।
বৈঠা হাতে বসে থাকা মাঝিটি বৃদ্ধ। পরনে ছেঁড়া লুঙ্গি আর গেঞ্জি। মাথায় গামছা প্যাঁচানো। ভাঙা মুখে খোঁচা খোঁচ শুভ্র দাড়ি। একটি চাদর দিয়ে যে শীর্ণ শরীরটি ঢাকবে সে সামর্থ্যও নেই বৃদ্ধ মাঝির । এই ভাবনায় মুজিবুরের হৃদয় হুহু করে ওঠে। নদীর শীতল বাতাসের ঝাপটায় হিহি করে কাঁপছে মাঝি ।

… এবং সেই ঠান্ডা শীত মুজিবুর-এর স্পর্শকাতর শরীরের মাংস ভেদ করে হাড়ের ভিতরে মজ্জার ভিতরে ঢুকে যায় এবং রক্ত কণিকায় বারবার ঘা দিতে থাকে … অতঃপর শীতে আর্ত তরুণটি একটি পরাধীন দেশের দুঃস্থ মানুষের দূরবস্থার কথা ভেবে অতিশয় চঞ্চল হয়ে উঠতে থাকে এবং তাঁর মনের গভীরে বারবার ধ্বনিত প্রতিধ্বনিত হতে থাকে কতগুলি প্রশ্ন … এই দেশ পরাধীন কেন? এই দেশ স্বাধীন না কেন? … মুজিবুর বাংলার মানুষকে গভীর ভাবে ভালোবাসে। যে করেই হোক বাংলাকে স্বাধীন দেখতে চায় সে …

মধুমতি নদীটি ছোট । তার উপরে শীতে শীর্ণ হয়ে রয়েছে । অল্পক্ষণের মধ্যেই কুয়াশার চাদর ভেদ করে মাঝি অপর পাড়ে নৌকাটি ভেড়াল ।
নৌকা থেকে নামার আগে গায়ের তসরের চাদরটি খুলে মাঝির শরীরে জড়িয়ে দিল মুজিবুর।
আশ্চর্য়! চাদর এত উষ্ণ কেন? যেন পিতার উষ্ণ বুক। অথচ …অথচ টুঙ্গিপাড়ার শেখ বাড়ির ছেলে মুজিবুর রহমান-এর বয়স মাত্র কুড়ি । কই, শীত তো আর লাগছে না।
মুজিবুর গভীর আবেগে বলল, বাবা, আপনি এইটা পরেন।
বাকরুদ্ধ মাঝিটির ভাঙাচোরা মুখেচোখে খুশির আভা ছড়িয়ে পড়ল । তরুণের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতায় চোখের কোণে পানি চলে আসে তার ।
কিন্তু, চাদর এত উষ্ণ কেন? পিতার হৃদয়ের মতো উষ্ণ । মাঝির বিস্ময় যেন কাটতেই চায় না। মাঝি হাত তুলে মহান আল্লাহর দরবারে মোনাজাত করে।
চাদর খুলে ফেলতেই নদী পাড়ের শীতার্ত বাতাস নির্দয়ভাবে ছোবল মারতে থাকে মুজিবুর কে । শীতের ক্ষুরধার নখরের আঘাতে আঘাতে
দেশপ্রেমিক দয়ালু তরুণটি শরীর থেকে অদৃশ্য রক্ত ঝরে ঝরে পড়ে … ঝরে ঝরে পড়ে … তথাপি তরুণটি আপনমনেই যেন হাসল। যেন সে জানে … এ শীত কিছু না, আরও ভয়াবহ শীত আরও বুলেট-বৃষ্টি অপেক্ষা করে আছে তার জন্যে … বাংলার মানুষের প্রতি মুজিবুরের ভালোবাসায় বিন্দুমাত্র খাদ নেই …বাংলার কবিরা বলেন, নিখাদ ভালোবাসায় মরণ অবধারিত …
নদীর পাড়ে উঠে মোল্লার হাটের উদ্দেশে দ্রুত হাঁটতে থাকে মুজিবুর । রশীদ মাষ্টারের মুখটা বারবার মনে ভাসছে। রশীদ মাষ্টার মুজিবুরকে প্রায়ই বলতেন, ‘দেখিস, মুজিবুর, তুই একদিন অনেক অনেক বড় হবি। তুই আমাদের টুঙ্গিপাড়ার মুখ উজ্জ্বল করবি।’
হাঁটতে- হাঁটতে মুজিবুরের শরীর একবার কেঁপে উঠল। সময়টা ১৯৪০ সাল … মাঘ মাসের মাঝামাঝি … সে বছর প্রচন্ড শীত পরেছিল …

* ছেলেবেলায় বঙ্গবন্ধুর মাঝিকে চাদর দেওয়ার ঘটনাটি আব্বার মুখে শুনেছিলাম। সেই স্মৃতি থেকে লিখলাম …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *