একাত্তরের গেরিলা

বাঙালিদের প্রতি পাকিস্তানি শাসকদের শোষণ-নির্যাতন, বৈষম্যমূলক আচরণ, অবজ্ঞা আর উপেক্ষাই তিলে তিলে পাকিস্তান এবং পাকিস্তানি শাসকদের প্রতি এক তীব্র ঘৃণার জš§ দেয় কামালের মনে। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের কালরাতে পাকিস্তানি মিলিটারিদের ধ্বংসযজ্ঞ, গণহত্যা, ধ্বংসের বীভৎসতা দেখে সেই ঘৃণা চরম রূপ নেয় কামালের মনে। সেই সাথে জš§ নেয় মনে প্রতিশোধের আগুন। যে আগুনের দহন তাকে তাড়িত করে, চালিত করে মুক্তিযুদ্ধের দিকে। প্রশিক্ষণ শেষে গেরিলা কমান্ডের একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে দেশের মাটিতে পা রাখেন। দেশ স্বাধীন না হওয়া পর্যন্ত অবিচল থাকেন তার লক্ষ ও প্রতিজ্ঞায়।
’৭১ সালে কামালের বয়েস আর কত? বড়জোর পনের। তখন তার আবাস, ঢাকার নয়াপল্টনে। ২৫ মার্চ রাতে যখন ক্র্যাকডাউন হলো তখন কামাল পরীক্ষার পড়া তৈরি করছিলেন। হঠাৎ শুরু হয় নারকীয় হত্যাযজ্ঞ। গুলি আর ট্যাংকের শব্দ। মানুষের আর্তচিৎকার, আগুনের লেলিহান শিখার ভেতর এক চরম অনিশ্চয়তা আর আতঙ্কের মধ্যে রাতটি কাটে কামালদের। ২৬ মার্চ সকালে কিছু সময়ের জন্য কার্ফু তুলে নেওয়া হলে রাজারবাগ পুলিশ লাইনে যায় কামাল। এ প্রসঙ্গে পাক আর্মিদের বর্বরতার মুক্তিযোদ্ধা কামাল বলেন, রাতে রাজারবাগ পুলিশ লাইনের দিক থেকে প্রচ- গোলাগুলির শব্দ শুনেছি। তাই নিজ চোখে বাস্তব চিত্র দেখার জন্য সুযোগ পাওয়া মাত্র ছুটে যাই পুলিশ লাইনে।
গিয়ে কী দেখেন? শুধু রাজারবাগ পুলিশ লাইনে নয়, মালিবাগ ব্যারাকেও অসংখ্য পুলিশের পোড়া, গুলিবিদ্ধ, ছিন্নবিচ্ছিন্ন বীভৎস সব লাশ ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। ব্যারাকে ব্যারাকে আগুনের ব্যাপকতা, ভয়াবহতা এত বেশি ছিল যে আশপাশের কোনো গাছও রক্ষা পায় নি। এমনকি উঁচু উঁচু নারিকেল গাছগুলোও পুড়ে প্রায় কয়লা হয়ে গিয়েছিল।
এমনই বীভৎসতা কামালকে বিচলিত করেছিল মর্মে মর্মে, উপলব্ধি করেছিল সেদিন নিজ দেশেই বাঙালি কত অসহায়! ফলে পাকিস্তানিদের প্রতি দীর্ঘদিনের পুঞ্জিভূত ক্ষোভ, ঘৃণা তীব্র হয়েছিল সেদিন প্রচ-ভাবে।
কামাল জানান, ২৫ মার্চ সারাটা দিনই এক ধরনের উৎকণ্ঠায় কেটেছিল ঢাকাবাসীর। এক ধরনের শঙ্কা কাজ করছিল মানুষের মনে। নানারকম খবর। উড়ো খবরে সে শঙ্কা আরও বেড়ে যাচ্ছিল। কিন্তু যেহেতু ছাত্র রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলাম আগে থেকেই, তাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইকবাল হলে, যা আজকের সার্জেন্ট জহুরুল হক হল, সেই হলে ছোট ছোট দলে বেশ কবার গিয়েছিলাম এই ২৫ তারিখে। উদ্দেশ্য সত্যিকার অর্থে কী ঘটতে যাচ্ছে শেষ পর্যন্ত তাই জানা। তবে পাক আর্মিরা যে কোনো সময় বাঙালিদের ওপর যে বড় ধরনের আঘাত করতে পারে সে আশঙ্কা ছিল সবার মধ্যেই। তবে ওই রাতেই যে সেই আঘাত নেমে আসবে বাঙালির ওপর, তা ঘুণাক্ষরেও ভাবতে পারে নি কেউ।
কখন কী হয়, কখন কী হয় এমনই অনিশ্চয়তা। সন্ধ্যার পর থেকেই সেই উৎকণ্ঠা ক্রমেই যেন আতঙ্কে রূপ নেয়। তবু পড়াশোনায় মন দিতে হচ্ছে। কারণ সামনেই এসএসসি পরীক্ষা। আজকের ডিআইটি এক্সটেনশন রোডটি তখন নির্মাণ হচ্ছিল। মাটি ভরাটের কাজ চলছিল তখন জোরোসোরে। রাত আরও গভীর হতেই সম্ভবত রাত ১২টার দিকে গভর্নর হাউসের (আজকের বঙ্গভবন) দিক থেকে মুষলধারে গুলির শব্দ আসতে থাকে। গুলি এবং গোলার বিকট শব্দে চারদিকে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। তখন মানুষ মরিয়া হয়ে বেরিয়ে আসে রাজপথে। পল্টন, ফকিরেরপুল, টিএন্ডটি কলোনি এবং এজিবি কলোনি থেকে অসংখ্য মানুষ পথে নেমে আসে। তারা দৈনিক পাকিস্তানের (বাংলা) মোড়ে, নির্মাণাধীন ডিআইটি এক্সটেনশন রোডের জায়গায় জায়গায় ব্যারিকেড দিয়ে পাক আর্মিদের গতি প্রতিহত করার চেষ্টা করে। ইট, ড্রাম, টায়ার, গাছের গুঁড়ি যার হাতের কাছে যা ছিল তাই দিয়ে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করে জনগণ। কিন্তু মিলিটারিদের ভারী যানবাহনের গতি তাতে ব্যাহত হয়নি। সবকিছু গুঁড়িয়ে দিয়ে তারা এগিয়ে গেছে এবং গুলি, আগুন আর শেল নিক্ষেপ করে বীভৎস তা-বলীলা চালিয়েছে। তখন চারদিক ছিল ঘুটঘুটে অন্ধকার। মাঝে মধ্যেই কানে আসছিল আর্মিদের ওয়াকিটকির বুক কাঁপানো শব্দ। ওদের ভারী কণ্ঠ। সেই সাথে একটার পর একটা ট্যাংক আসছিল দৈনিক পাকিস্তানের (বাংলা) দিক থেকে, চলে যাচ্ছিল পুলিশ হাসপাতালের দিকে ঘড় ঘড় শব্দ তুলে।
কামাল জানান, রাজারবাগ পুলিশ লাইনে পুকুর ছিল দুটো। দুটো পুকুর পাড়েই পড়েছিল অসংখ্য লাশ। মূলত সেদিন পুলিশ ব্যারাকে আর্মিরা ঢুকতে চেয়েছিল পজিশন নিতে। তার আগে পুলিশদের আর্মসলেস করার চেষ্টা হয়েছে। কিন্তু পুলিশরা তাদের নির্দেশের প্রতি সাড়া না দিয়ে, তাদের প্রতি কোনোরকম আনুগত্য প্রদর্শন না করে রিভোল্ট করে এবং ব্যারাকে মিলিটারির প্রবেশ প্রতিহত করার চেষ্টা করে। এবং তাদের হাতে যা কিছু সামান্য অস্ত্র ছিল তাই দিয়ে পাক আর্মিদের ওপর আঘাত হানে। কিন্তু ভারী অস্ত্রশস্ত্র এবং সাজোয়া বহরে সজ্জিত আর্মিরা পুলিশ লাইনে ম্যাসিভ অ্যাটার্ক করে। ট্যাংকের আঘাতে ব্যারাকের ভবন ধসিয়ে দিতে থাকে একে একে। ফলে মাত্র আধাঘণ্টার মধ্যেই পুলিশের প্রতিরক্ষাব্যুহ ভেঙে পড়ে। পুলিশ লাইনে সেই রাতে একজন পুলিশও বাঁচতে পারে নি। পাক আর্মির দানবীয় আক্রমণে পুরো পুলিশ লাইনে এক ভয়াবহ ভুতুড়ে পরিবেশ নেমে এসেছিল সেদিন।
পুলিশ লাইনে ছিল ওয়ারলেস টাওয়ার। আন্তঃযোগাযোগের নানা সুবিধা। সেই কারণে সারাদেশের সাথে ছিল সুষ্ঠু নেটওয়ার্কিং ব্যবস্থা। এ ছাড়া ব্যারাক বলে ক্যাম্প তৈরির জন্যও ছিল সুবিধাজনক। অথচ সেখানে প্রবেশ করতে গিয়ে পুলিশের কাছ থেকে এভাবে তীব্র বাধা আসবে তা ছিল মিলিটারিদের কাছে অকল্পনীয়। তাই সমূলে সেদিন পুলিশ লাইনকে তছনছ করে দিতে পাক আর্মি সামান্যতম কার্পণ্য করে নি। ভুল করে নি কোনোরকম ঝুঁকি নিতে।
পুলিশ লাইনে নারকীয় হত্যাযজ্ঞ দেখে কামালসহ তারা বেশ কিছু বন্ধু সংঘবদ্ধ হয়। এই অন্যায় আর নির্যাতনের প্রতিশোধ নিতে তারা মরিয়া হয়ে ওঠে। কিন্তু শুধু হাতে কী করে সম্ভব সামরিক জান্তাদের প্রতিহত করা! প্রয়োজন সামরিক প্রশিক্ষণ, প্রয়োজন অস্ত্র। কিন্তু কোথায় পাবে তা? কার কাছে যাবে, কীভাবে যাবে এসব বিষয়ে ওরা ছিল তখন ঘোর অন্ধকারে। কিন্তু হার না মেনে ক্রমাগত অনুসন্ধান চালিয়ে জানতে পারে ভারতে ট্রেনিং হচ্ছে। কিন্তু কীভাবে যাবে, কোন পথ ধরে যাবে, কার কাছে যাবেÑ এসব প্রশ্নের কোনো উত্তর জানা ছিল না ওদের। এদিকে খবর এসেছে ওদের সহপাঠী আরেক কামাল এবং ওর বাবা পুলিশ দারোগা ভারতে যাওয়ার পথে দাউদকান্দিতে মিলিটারির হাতে ধরা পড়ে এবং তাদের হত্যা করা হয়েছে। অন্যদিকে পাড়ার বড় ভাই মাহাবুব, এরই মধ্যে প্রশিক্ষণ নিয়ে দেশে ফিরে এসেছে।
দাউদকান্দি ঝুঁকিপূর্ণ মনে হওয়ায় চাঁদপুর হয়ে ভারত যাওয়ার পরিকল্পনা করা হলো। এদিকে কামালদের প্রতিবেশী রতনদের বাড়ি ছিল চাঁদপুরে। রতনরা তখন চট্টগ্রাম ছেড়ে চাঁদপুরে গিয়ে উঠেছে। তাই প্রথমে রতনদের বাড়ি গেল কামাল। রতনের নানা পাটোয়ারী সাহেব আবার বেশ ডাকসাইটে লোক ছিলেন। প্রভাব-প্রতিপত্তির জোর ছিল তার বেশ। তার নেতৃত্বে ভারতে শরণার্থী পাঠানো হচ্ছিল। এদের সব দেখভাল পাটোয়ারী নানাই করছিলেন। কামাল মুক্তিযুদ্ধে যেতে চায় শুনে তাকে শরণার্থীদের সাথে ভারতে যাওয়ার বন্দোবস্ত করে দিলেন তিনি।
প্রথমে ভাঙাচোরা এক গাড়ি করে চাঁদপুর থেকে কুমিল্লায় আসে ওরা। সেখান থেকে সারারাত পায়ে হেঁটে, বৃষ্টিতে ভিজে, কাদা মাড়িয়ে, চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে সকালের দিকে ভারত সীমান্তের কাছে এসে পৌঁছে। তখন সারারাত বিকট শব্দে মাথার ওপর দিয়ে একটু পরপর শেল উড়ে যাচ্ছিল। সারাপথ কাদায় কাদাময়। পা দেবে যাচ্ছে। পা পিছলে যাচ্ছে একটু হাঁটতেই। এভাবে চৌদ্দগ্রামের এক জায়গা দিয়ে ভারতের এক গ্রামে প্রবেশ করল ওরা। সেই গ্রামের নাম বক্সনগর। এক পীরের আস্তানা ছিল সেই গ্রামে। আস্তানা খুলে দেওয়া হয়েছে শরণার্থীদের জন্য। মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য। গ্রামটি গোমতি নদীর পাড় ঘেঁষে। আস্তানার ঘরগুলো ডাকবাংলোর মতো ছাউনি দেওয়া। মেঝেতে খড় বিছিয়ে দেওয়া হয়েছিল রাতে শোয়ার জন্য। দু-তিন দিন পরপর আগরতলা থেকে সেখানে কর্মকর্তারা আসেন মুক্তিবাহিনীতে রিক্রুট করার জন্য। আর্মি, ইপিআর এবং রাজনীতিবিদদের নিয়ে গড়ে তোলা হয় এই রিক্রুট দল। কামালদের মতো যারা মুক্তিযুদ্ধে যেতে আগ্রহী ওদের রিক্রুট টিম নিয়ে যায় বক্সনগর ট্রানজিট ক্যাম্পে। সেটি ছিল আসলে ভারতীয় একটি স্কুল। স্কুল ভবনেই ক্যাম্প। এ প্রসঙ্গে কামাল জানান, ‘আমরা বিভিন্ন জায়গা থেকে আসা ৩৫-৪০ জন তরুণ-যুবক ঠাঁই পেয়েছিলাম সেই ক্যাম্পে। প্রথম দু-তিন দিন সেখানে কোনো খাবারের ব্যবস্থা ছিল না। খুবই মানবেতর জীবনযাপন করতে হয়েছিল তখন। প্রায় ২৫ দিন আমরা ছিলাম সেখানে। তখন একদিন ক্যাম্প ভিজিটে আসেন কর্নেল শওকত আলী। সময়টা এপ্রিলের শেষ দিকে কিংবা মে মাসের প্রথম।
সেখান থেকে পরে কামালদের নিয়ে যাওয়া হয় মেলাগড় ট্রেনিং ক্যাম্পে। সেখানে শুরু হয়ে গেল গেরিলা প্রশিক্ষণ পর্ব। উঁচু টিলা আর শালবনে ঘেরা গহীন জঙ্গল চারদিকে। জলাশয়গুলো টিলা থেকে ২০-২৫ ফুট নিচুতে। সেখান থেকেই জল সংগ্রহ করতে হতো। জঙ্গল থেকে বাঁশ-বেত এসব কেটে কেটে নিজেরাই ব্যারাকের মতো ঘর তৈরি করেছিল থাকার জন্য।
প্রথম এক মাস প্রশিক্ষণ চললো পুরোদমে। আর্মস ট্রেনিং, এক্সক্লুসিভ ট্রেনিং, আর্মসহীন অবস্থায় শত্রুর কাছ থেকে আর্মস ছিনিয়ে নিয়ে আর্মস সংগ্রহ করার ট্রেনিংসহ নানা কৌশল ও প্রশিক্ষণ। কর্নেল খালেদ মোশাররফ, মেজর হায়দার, মেজর হুদা, কর্নেল শওকত আলী, হাবিলদার মুনির। যাকে মুনরি ওস্তাদ বলত মুক্তিযোদ্ধারা। এদের মাধ্যমেই প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালিত হতো।
কামাল বলেন, এক্সক্লুসিভ প্রশিক্ষণ হতো শালবনে। ব্রিজের পিলার ভাঙার প্রশিক্ষণের সময় মোটা মোটা শাল গাছকে পিলারের ডামি হিসেবে ব্যবহার করা হতো। পিলারের ডায়ামিটার নির্ধারণ করার জন্য মডেল করা হতো শাল গাছকে। গেরিলাযুদ্ধ মানেই আইকিউর পরীক্ষা। নিজের জীবন রক্ষা করে কীভাবে যুদ্ধ করতে হয়, তাই ছিল গেরিলা প্রশিক্ষণের মূলমন্ত্র।
প্রশিক্ষণ শেষে সম্ভবত আগস্টের শেষ দিকে কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে কামাল এবং তাদের গেরিলা বাহিনী। তার আগে চূড়ান্ত ব্রিফ দিয়ে মেজর হায়দার এবং কর্নেল শওকত আলী পাসিং-আউট করেন ওদের। মুক্তিযোদ্ধা কামাল বলেন, পপসংগীত শিল্পী আজম খান, চারুশিল্পী শাহাবুদ্দিনÑ আমরা সবাই একই ক্যাম্পে একই সাথে গেরিলা প্রশিক্ষণ গ্রহণ করি। অবশ্যি ওদের প্লাটুন ছিল ভিন্ন ভিন্ন।
স্মৃতি হাতড়ে কামাল বলেন, যে রাতে আমাদের পাসিং আউট হয় সেই রাতে সেই জঙ্গলে এক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল। কোনো বাদ্যযন্ত্র ছিল না হাতের কাছে। তাতে কী! হাঁড়ি-পাতিল, চামচ-প্লেট, গ্রেনেডের কৌটা এসব ছিল বাদ্যযন্ত্রের বিকল্প হিসেবে। এতে সুর মূর্ছনায় কোনো কমতি ছিল না। সেই অনুষ্ঠানে আজম খান দেশপ্রেমের ওপর বেশ কিছু গান করেছিলেন। যা আমাদের ভীষণভাবে উদ্বুদ্ধ করেছিল দেশের প্রতি। মাতৃভূমির প্রতি।
আজকের খ্যাতিমান শিল্পী শাহাবুদ্দিনের সেদিন আঁকার কোনো সরঞ্জাম ছিল না। লঙ্গরখানায় রান্নার জন্য যে কয়লা আসতো তাই দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের অসংখ্য স্কেচ এঁকেছিলেন সেদিন। স্কেচগুলো ছিল এক কথায় দারুণ মর্মস্পর্শী। যা আমাদের মনে প্রচ- রকম সাড়া জাগিয়েছিল সেদিন।
বাংলাদেশ সীমান্তে যখন পৌঁছেছে ওরা, তখন নিকষ কালো রাত। বৃষ্টি হচ্ছিল গুঁড়ি গুঁড়ি। সেখান থেকে চান্দিনা হয়ে চাঁদপুরের দিকে অগ্রসর হয় তারা। ১২৭ জনের দল ওদের। কমান্ডার ছিলেন মোহাম্মদ আলী, ডেপুটি কমান্ডার ছিলেন মীর আকতার আহমেদ। এ প্রসঙ্গে কামাল জানান, ভারত সীমান্ত থেকে চাঁদপুর পর্যন্ত প্রত্যেক মুক্তিযোদ্ধা যার যার কাঁধে বহন করে অস্ত্র আনে। বিপুল অস্ত্রের সম্ভার। কোন নৌকায় এসব অস্ত্র বোঝাই করা হবে এবং কোন মাঝিরা যাবে সেই ফরিদপুর পর্যন্ত তা আগে থেকেই বিশ্বস্ত সোর্স পাঠিয়ে ঠিক করে রেখেছিল ভারতীয়-ক্যাম্প কর্তৃপক্ষ। তারপরও কামালরা স্থানীয় বিভিন্ন লোকজনের মাধ্যমেও নিশ্চিত হয় তাদের জন্য নির্ধারিত নৌকা সম্পর্কে। সেসব নৌকার মাঝিদের সম্পর্কে। এ প্রক্রিয়াটি ছিল খুবই জোরাল এবং গুরুত্বপূর্ণ। কারণ পাসিং আউটের সময় আমাদের সতর্ক করে দেওয়া হয়েছিল আর্মস, এক্সক্লুসিভ কোনোভাবেই যেন হাতছাড়া না হয়।
পথে পাক আর্মির ট্র্যাপে পড়ে গিয়েছিল ওরা। অল্পের জন্য রক্ষা পেয়ে যায় তখন। একসময় তারা গিয়ে পৌঁছে চাঁদপুরে। যেতে হবে ফরিদপুরের জাজিরা অঞ্চলে। নদীপথে, মূলত ফরিদপুর, শরীয়তপুর অঞ্চল ছিল ওদের জন্য নির্ধারিত যুদ্ধক্ষেত্র। সুতরাং, গন্তব্যে পৌঁছার জন্য বড় বড় ৩টি নৌকা ভাড়া করে তারা চাঁদপুর ঘাট থেকে। বিশাল আকৃতির নৌকা ছিল এক একটি। প্রতিটি নৌকার পাটাতনের নিচ বোঝাই করা হয় নানা রকম আর্মস দিয়ে। এলএমজি, এসএলআর, স্টেনগান, থ্রিনট থ্রি রাইফেল, এনটি পারসনাল মাইন, এন্টি ট্যাঙ্ক মাইন, গ্রেনেড, ডেটোনেটর প্রভৃতি। কামাল বলেন, আমাদের কাছে তখন জীবনের চেয়ে এসব আর্মসের মূল্য ছিল অনেক বেশি। আমরা ১২৭ গেরিলা। নৌকায় এত মানুষ দেখলে আর্মিদের সন্দেহ হতে পারত, তাই আমরা বেশির ভাগই ছইয়ের ভেতরে পাটাতনের নিচে, পাটের বড় বড় গাঁটের আড়ালে লুকিয়ে থাকতাম। শুধু পালাক্রমে কয়েকজন করে মাঝির বেশে দাঁড় বাইতাম। খালি গায়ে লুঙ্গি পরে, মাথায় গামছা বেঁধে দাঁড় বাইতাম। মূলত দিনেই বেশি দাঁড় বাইতাম আমরা। কারণ দিনে ধরা পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি ছিল খুব বেশি। রাত ছিল সে তুলনায় বেশ নিরাপদ। ভরা বর্ষা। প্রমত্তা পদ্মা। ঢেউ ফুলে ফেঁপে ২০ ফুট ওপরে নৌকা তুলছে আবার আছড়ে নিচে ফেলছে। বিশেষ করে চাঁদপুর তিন নদীর মোহনায় প্রকৃতি ছিল অসম্ভব বৈরী। নদীর ছিল রুদ্ররূপ। মাঝে মাঝে গানশিপের ছুটে চলা। সার্চলাইট ফেলে আর্মিদের তল্লাশি। সব মিলিয়ে ভয়ঙ্কর ছিল সেই রাত।
বোঝাই অস্ত্র নিয়ে যখন পদ্মা পাড়ি দিচ্ছে ওরা তখন উত্তাল পদ্মার আতঙ্কের চেয়ে বড় আতঙ্ক ছিল ওদের কখন পাক আর্মিদের নজরে পড়ে যায়! কারণ গানশিপ নিয়ে মুহূর্তে মুহূর্তে মিলিটারি চলে যাচ্ছে ওদের পাশ দিয়ে। নদীর দুপাড়ে সতর্ক পাহারা মিলিটারি এবং রাজাকারদের। তারা কেউ পেছন পেছন আসছে কিনা। কিংবা নদী পাড়ে নৌকা ভিড়ানোর জন্য ডাক পড়ে কিনাÑ সেই আতঙ্ক আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ছিল ওদের পুরো পথজুড়ে। তার ওপর ছিল যে কোনো সময় ঝড়ের তা-ব শুরুর আশঙ্কা। বিশেষ করে গানশিপগুলো যখন ওদের নৌকার পাশ দিয়ে চলে যেত তখন সেই আতঙ্কের রূপ ছিল ভয়াবহ। কারণ গানশিপ থেকে আর্মিরা হঠাৎ হঠাৎ লঞ্চ, নৌকা ডেকে থামাচ্ছে। চেক করছে তন্ন তন্ন করে। এ প্রসঙ্গে কামাল বলেন, তারপরও এক ধরনের দৃঢ়তা এবং মনোবল নিয়েই আমরা পথ চলেছি। কারণ আঘাত এলে পাল্টা আক্রমণের প্রস্তুতি এবং মানসিকতা সবসময়ই ছিল আমাদের মনে। কোনো প্রতিরোধ ছাড়াই ওদের কাছে নিজেদের সমর্পণ করব তার সামান্যতম আভাস আমাদের চিন্তায়, আমাদের ভাবনায় ঠাঁই পায়নি সেদিন।
এমনই অবস্থায় দাঁড় টেনে নৌকা বেয়ে বিশাল পদ্মা পাড়ি দেওয়ার মানসিক শক্তি সেদিন কোত্থেকে জড়ো হয়েছিল তা আজও ভাবনা জাগায় কামালের মনে। মনে সেদিন অপার শক্তি সঞ্চিত না হলে ভয়াল প্রকৃতির সেই প্রতিকূলতা, বৈরিতাকে পরাজিত করে এগিয়ে চলা সম্ভব হতো না। তখন পদ্মা ছিল প্রচ- উত্তাল। তবু এক মুহূর্তের জন্য নৌকা কোথাও ভিড়ে নি, থামে নি। এভাবে সারারাত, সারাদিন, আবার রাতভর নৌকা বেয়ে মাঝরাতের দিকে জাজিরা পৌঁছে কামালরা।
ভয়ঙ্কর এই অভিযানে মাঝিরা ছিল অসম্ভব রকম সহযোগিতাপ্রবণ। তাদের কাজে মাঝিদের সহযোগিতা-সহমর্মিতা ছিল অবাক করার মতো। এত প্রতিকূল পথেও সবরকম সহায়তা সেদিন পেয়েছিল ওরা মাঝিদের কাছ থেকে। মুক্তিযোদ্ধাদের কাজে এমনই সহযোগিতা করতে পেরে তারা সেদিন নিজেদের ধন্য মনে করেছিল। এ প্রসঙ্গে কামাল বলেন, তারা ইচ্ছে করলে সেদিন আমাদের ভুল পথে নিয়ে যেতে পারত। পাক আর্মিদের হাতে তুলে দিতে পারত। কিন্তু আমাদের প্রতি তারা আত্মিকভাবেই সহমর্মী ছিল। এক ধরনের দায়বদ্ধতা ছিল আমাদের প্রতি, দেশের প্রতি।
উত্তাল ঢেউ পাড়ি দিয়ে সুদূর ফরিদপুরে গন্তব্য। অথচ নৌকায় ছিল না পর্যাপ্ত খাবার। মুড়ি-গুড়-চিড়া সামান্য যা ছিল তা-ও দিয়ে দেওয়া হয়েছিল মাঝিদের। কারণ ওরা ছিল ক্লান্ত-অবসন্ন। তার ওপর ওদের পেটে কিছু না পড়লে নৌকা চালিয়ে নেওয়াই দুরূহ হয়ে পড়ত সেদিন। তাই সামান্য যা ছিল তা মাঝিদের দিয়ে আড়াইদিন। রাতে নদীপথে শুধু জল খেয়ে ছিল কামালরা। ভোলার সিরাজ ভাই হাল ধরে রাখতে পারতেন খুব শক্ত করে। জোয়ান মদ্দ শরীর। কালোমতো দেখতে। মাঝির বেশে ভীষণ মানাত সিরাজ ভাইকে। এভাবে মুক্তিযোদ্ধারা মাঝি সেজে, আসল মাঝিদের বিশ্রাম দিত পালাক্রমে।
ভীষণ উত্তাল পদ্মার ¯্রােত ধরে তখন অসংখ্য মানুষের লাশ বয়ে যাচ্ছিল। তাদের হাত-পা আর চোখ ছিল বাঁধা। পদ্মা পাড়ি দেওয়ার সময় পাকিস্তানি গানশিপের নজর ফাঁকি দেওয়ার জন্য নৌকার সামনে-পিছনে ছিল বড় বড় সব পাটের গাঁট।
জাজিরা এসে কামালদের গেরিলা দলটি দুভাগে ভাগ হয়ে যায়। ইদ্রিস মাস্টারের নেতৃত্বে এক গ্রুপ চলে যায় শরীয়তপুরের পালং থানার দিকে। আরেক গ্রুপ চলে আসে মোহাম্মদ আলীর নেতৃত্বে মাদারীপুরের দিকে। মাদারীপুর, ভাইগ্যার বিলে ক্যাম্প ফেলে ওরা। যাদের বাড়ি ক্যাম্প করা হয় ওরা ছিল সেই এলাকার সম্ভ্রান্ত হিন্দু পরিবার।
ভাইগ্যার বিল থেকে তাদের প্রথম মিশন শুরু হয় আমগ্রাম ব্রিজ এবং সমাদ্দর ব্রিজ অপারেশনের মধ্য দিয়ে। পাক আর্মিদের যাতায়াত ব্যবস্থাকে পর্যুদস্ত করার জন্য এই ব্রিজ দুটো ধ্বংস করা হয় প্রথমেই। ফলে ফরিদপুর-মাদারীপুরের মধ্যে স্বাভাবিক যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে। সমাদ্দর ব্রিজ যখন ধ্বংস করতে প্রস্তুতি নেয় কামালদের বাহিনী, তখন ওদের দেখে পাশের বাড়ি থেকে একজন হ্যারিকেন নিয়ে কেডাও, কেডাও করে এগিয়ে আসতে থাকে। কামালরা তখন মাটিতে গর্ত খুঁড়ে এক্সক্লুসিভ বসাতে ছিল ব্যস্ত। তখন অনাহূত এই আগন্তুককে রাজাকার ভেবে তাকে গুলি করে ওরা। পরে জানা গেল সে আসলে স্বাধীনতার পক্ষের একজন। তবে গায়ে গুলি লাগায় একটা সুবিধে হয়েছিল, লোকটির বাড়ি এবং আশপাশের ঘরবাড়ি আর্মিরা পুড়িয়ে দেয় নি। কোনোরকম নির্যাতন চালায় নি। সাধারণত কোনো এলাকায় মুক্তিযোদ্ধারা অপারেশন চালালে পাক আর্মিরা সেই এলাকার সব ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দিত। সাধারণ মানুষকে হয়রানি করত নানাভাবে। হত্যা করত নির্বিচারে!
পরের মিশন ছিল ওদের কালকিনি থানা। কিন্তু শেষ অবধি সেই অপারেশন সফল হয়নি। যে রিপোর্টের ভিত্তিতে কালকিনি থানা আক্রমণ করা হয়েছিল তা ছিল বিভ্রান্তিমূলক। কারণ গুপ্তচরের তথ্য ছিল থানার ঘাঁটিটি দুর্বল। তেমন অস্ত্রের মজুদ সেখানে নেই। আঘাত হানলে পাকবাহিনী পালানোর পথ পাবে না। অথচ আঘাত শুরু হতেই পাল্টা আঘাত এলো। এবং ভারী ভারী সব অস্ত্র দিয়ে আঘাত হানল পাকবাহিনী। এ অবস্থায় কামালদের দল ‘হিট অ্যান্ড রান’ পদ্ধতিতে পেছন ফিরতে বাধ্য হয়। ভাগ্যিস সেই হামলায় তাদের কোনো যোদ্ধা নিহত হয়নি কিংবা কোনো আর্মস হারাতে হয়নি। স্মৃতি হাতড়ে এ প্রসঙ্গে কামাল বলেন, যাকে বিশ্বাস করে আমাদের গুপ্তচর করা হয়েছিল সে ছিল আসলে একজন রাজাকার। তাই আমাদের বিভ্রান্ত করাই ছিল ওর মূল উদ্দেশ্য।
এরপর কামালদের গেরিলা দলটি চলে যায় ভাটিয়াপাড়া। আলফাডাঙ্গা থানায় ছিল ভাটিয়াপাড়া ওয়ারলেস কানেকটিং টাওয়ার। ঢাকা-যশোর ক্যান্টনমেন্টের মধ্যে সকল যোগাযোগ রক্ষা হতো ভাটিয়াপাড়া কানেকটিং টাওয়ারের মাধ্যমে। এই টাওয়ার ধ্বংস করতে হলে সুইচরুমে যারা চাকরি করে তাদের সহযোগিতা ভীষণভাবে প্রয়োজন ছিল। কিন্তু সুইচরুমের লোকজন মুক্তিযোদ্ধাদের কাজে সহযোগিতা করবে কিনা এবং তারা কোন চিন্তাধারার লোকজন তা জানার জন্য গ্রামবাসীদের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়। তাতে নিশ্চিত হয় সুইচরুমের লোকদের সমর্থন পাবে। সে অনুযায়ী পরিকল্পনা চূড়ান্ত হয়। সুইচম্যান, ওয়ারলেস সুইচ অফ করে চাবি নিয়ে চলে আসবে। যাতে পরের পালায় যার ডিউটি সে যেন আর সুইচ অন করতে না পারে। সুইচ অফ থাকলে আর্মিরা ঢাকা বা যশোর ক্যান্টনমেন্টে বার্তা পাঠাতে পারবে না সাহায্য চেয়ে। সুইচ অফ করে চলে আসার সংকেত পাওয়া মাত্র ভাটিয়াপাড়া ক্যাম্পে আক্রমণ করা হয় তিন দিক থেকে। অন্যদিকে নদী। এদিকে টাওয়ার ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় পাকবাহিনী সাহায্য চেয়ে কোনো বার্তা পাঠাতে পারছে না কোথাও। শেষে নড়াইল হয়ে তিন দিন পর পাক আর্মিদের দূত যশোর ক্যান্টনমেন্টে খবর পৌঁছায়। তখন পাকবাহিনী আকাশ থেকে আক্রমণ চালিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের পর্যুদস্ত করার চেষ্টা করে। এ অবস্থায় ৭২ ঘণ্টা যুদ্ধ চালিয়ে শেষে কামালদের বাহিনী পিছু হটতে বাধ্য হয়। এই যুদ্ধে কামালরা কয়েকজন সহযোদ্ধাকে হারায়। পাকবাহিনীরও কিছু সৈন্য এবং রাজাকার মারা যায়।
এ প্রসঙ্গে মুক্তিযোদ্ধা কামাল বলেন, ভাটিয়াপাড়ায় পাকিস্তানিদের ঘাঁটি এত শক্তিশালী ছিল যে ১৬ ডিসেম্বর সারাদেশে পাকবাহিনী আত্মসমর্পণ করলেও ভাটিয়াপাড়ার আর্মিরা আত্মসমর্পণ করে ১৯ ডিসেম্বর। মুক্তিযোদ্ধা এবং মিত্রবাহিনী ঢাকা থেকে পাকবাহিনীর কয়েকজন সিনিয়র অফিসারকে ভাটিয়াপাড়া নিয়ে গেলে সেখানে তাদের কথায় নিশ্চিত হয়ে তবে ভাটিয়াপাড়ার আর্মিরা আত্মসমর্পণ করে।
ভাটিয়াপাড়া টাওয়ার ধ্বংসের পরপরই ঘোড়াখালি রেলওয়ে ব্রিজ ধ্বংস করে কামালদের গেরিলা দল। গোপালগঞ্জ-যশোরের মধ্যে যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে দেওয়ার জন্যই এই আঘাত হানা হয়। এরপর চলে আসে ওরা ফরিদপুরে। লক্ষ্য বাকু-া ব্রিজ। তখন ছিল রোজার মাস। সময়টা ছিল ভোররাত। খবর এলো বাকু-া বাজার ক্যাম্পে ১৫ রাজাকার সেহেরি খাচ্ছিল। তখন অতর্কিতে চারদিক থেকে ওদের ঘিরে ফেলা হয় এবং একটিও গুলি খরচ না করে তাদের আর্মসলেস করা হয়। পরে ব্রিজের নিচে এক্সক্লুসিভ পাতার জন্য ওদের দিয়ে সেখানে বালুর বস্তা বহন করাসহ আনুষঙ্গিক সব ধরনের প্রস্তুতি ওদের হাতেই সম্পন্ন করা হয়েছিল।
বাকু-া ব্রিজ ধ্বংসের পর কামালদের দল আবার মাদারীপুর ফিরে আসে। সে সময় প্রচুর রাজাকার নিজেরাই খবর পাঠাতে থাকে ওরা স্যারেন্ডার করবে বলে। আশ্বাস পেলে ওরা স্যারেন্ডার করত এবং তাদের আর্মস দিয়ে দিত মুক্তিযোদ্ধাদের। অনেকে পরে মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে মিশে পাকবাহিনীর বিরুদ্ধেও যুদ্ধ করেছে।
যুদ্ধমাঠের স্মৃতি হাতড়ে কামাল বলেন, ডিসেম্বরের ৮ কিংবা ৯ তারিখে রাতে খবর পাই বিভিন্ন দিক থেকে পাক আর্মিরা পালাচ্ছে। সম্ভবত শাজাহান নামে পাক আর্মিদের একজন ড্রাইভার ছিল। অবশ্যি সে ছিল বাঙালি। সারাদিন পাক আর্মিদের সাথে থাকত। রাতে থাকত আমাদের সাথে। ওর কাছ থেকেই সারাদিনের নানা খবর পেতাম পাকবাহিনীর কার্যক্রমের। তাদের গতিবিধির। সে বলল, আজ রাতে সম্ভবত পাক আর্মিরা এখান থেকে পালাতে পারে। এখানকার সমাদ্দর ব্রিজ শুরুতেই আমরা ধ্বংস করে দিয়েছিলাম বলে ভাঙা ব্রিজের বিভিন্ন জায়গায় বালির বস্তা ফেলে তার ওপর কাঠ বিছিয়ে গড়ি চলাচলের বিকল্প ব্যবস্থা করে নিয়েছিল পাকবাহিনীরা। ওদের পালানোর খবর পেয়ে তক্তার নিচে এন্টিপারসনাল মাইন এবং এন্টি ট্যাংক মাইন পেতে পজিশন নিয়ে রইলাম অ্যামবুশ করার জন্য।
ভোরবেলায় দেখি পাক আর্মিরা গাড়ির বহর নিয়ে রওনা দিয়েছে। বহরের প্রথম গাড়িটা ব্রিজের ওপর উঠতেই প্রচ- শব্দে বিস্ফোরিত হলো মাইন। গাড়িটি গেল উড়ে। জানমালের নিরাপত্তার জন্য এবং যুদ্ধের কৌশল হিসেবে সামনের গাড়িটি ছিল ব্ল্যাংক। কোনো সৈন্য ছিল না তাতে। ব্ল্যাংক গাড়িটি বিস্ফোরিত হতেই পেছনের গাড়িবহর থেকে আর্মিরা লাফিয়ে পড়ে পাশের বাঙ্কারে আশ্রয় নিল। এবং বাঙ্কার থেকে পজিশন নিয়ে বৃষ্টির মতো গুলি ছুড়তে লাগল। সেখানে টানা ৭২ ঘণ্টা মুখোমুখি যুদ্ধ হয় পাকবাহিনীর সাথে। একসময় ওরা সাদা ফ্ল্যাগ দেখিয়ে আত্মসমর্পণ করার সংকেত দিলে কামালদের দল আক্রমণের রাশ টেনে ধরে। সে সময় কাপুরুষের মতো পাকবাহিনীরা ফের হামলা চালায়। তখন বাচ্চু নামে তাদের এক সহযোদ্ধা মারা যায় এবং আখতার নামে আরেক সহযোদ্ধার পেটে গুলিবিদ্ধ হয়। এবং মারাত্মক রক্তক্ষরণ হয় তার। তারপরও সে বেঁচে গেছে এবং আজও বেঁচে আছে। জানালেন কামাল।
সেই যুদ্ধে পাকবাহিনী একসময় পরাস্ত হয় এবং আত্মসমর্পণ করে। যারা আত্মসমর্পণ করে তাদের মধ্যে মেজর খাটাক্ নামে একজন বেলুচ অফিসার ছিল। একজন পাঞ্জাবি মেজর ছিল। ২১ সৈনিক ছিল। আর ছিল ২২ রাজাকার। রাজাকার ২২ জনকে ভাইগ্যার বিলে জীবন্ত কবর দেওয়া হয়। এবং পাক আর্মিদের ভারতীয় আর্মির হাতে সমর্পণ করা হয়।
রোজার মাসের আরেকটি ঘটনা। খবর এলো মাদারীপুর আমগ্রাম ব্রিজ ক্রস করবে পাক আর্মিরা। যদিও এই ব্রিজটি একবার ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছিল। বিকল্প ব্যবস্থায় তা আবার চলাচল উপযোগী করেছে পাকবাহিনীরা। আর্মিদের গাড়িবহরে আঘাত হানার জন্য ব্রিজের নিচে এন্টি ট্যাংক মাইন পেতে রাখা হয়। এবং সেখানে পাহারায় রাখা হয় শাজাহান কবীর নামে এক মুক্তিযোদ্ধাকে। কথা ছিল দূর থেকে আর্মিদের গাড়িবহর দেখামাত্র কামালদের মূল গেরিলা দলকে সে সংকেত দেখাবে। কিন্তু তার বদলে আর্মি দেখামাত্র সে দেয় দৌড়। তাকে দৌড়তে দেখে পেছন থেকে গুলি করে পাক আর্মি। মারাত্মক রকম জখম হয় সে। তার সাথে একটি বেয়োনেট পেয়েছিল আর্মিরা। তবু তাকে হত্যা করেনি। বরং সেবা শুশ্রƒষা করেছিল ক্যাম্পে নিয়ে। পরে তাকে হাসপাতালেও ভর্তি করিয়েছিল পাক আর্মিরা। সে সময় মেজর খাটাক তাকে বিশেষভাবে সেবা করেছে, খবর নিয়েছে। দেশ স্বাধীন হলে জার্মানিতে তার চিকিৎসা হয়। এবং আজও সে বেঁচে আছে এবং ভালো আছে।
আমাদের স্বাধীনতাযুদ্ধে নৌকার মাঝিদের ভূমিকা প্রসঙ্গে মুক্তিযোদ্ধা কামাল বলেন, যুদ্ধে মাঝিদের ভূমিকা ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। মাঝিরা যদি বিশ্বাসঘাতকতা করত তা হলে যুদ্ধচিত্র আমূল বদলে যেতেও পারত। কারণ মুক্তিযোদ্ধাদের প্রধান বাহনই ছিল নৌকা। সবসময় ওদের নৌকা বোঝাই থাকত বিভিন্ন রকম হাতিয়ার এবং এক্সক্লুসিভ। কখনও ভূমিতে কোনো আর্মস রাখা হতো না। কারণ যে কোনো সময় বিরূপ পরিস্থিতিতে যাতে হাতিয়ারসহ পালানো যায়, তাই হাতিয়ার সবসময় নৌকাতেই রাখা হতো। সবক্ষেত্রেই বাহন হিসেবে নৌকা ছিল নিরাপদ। কারণ পাক আর্মিরা যথাসম্ভব চেষ্টা করত জলপথ এড়িয়ে চলতে। জলকে ভীষণ ভয় পেত ওরা। অন্যদিকে যোগাযোগের ক্ষেত্রে সড়কপথ ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য বিপদসংকুল। ঝুঁকিপূর্ণ। কামাল বলেন, মাঝিরা যদি আমাদের বিভ্রান্ত করত, আমাদের গোপনীয়তা রক্ষা না করত এবং গ্রামের সাধারণ মানুষরা যদি প্রয়োজনীয় তথ্য দিয়ে সঠিক পথ, নিরাপদ পথ চিনিয়ে দিয়ে সহযোগিতা না করত তা হলে সার্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতি অন্যরকমও হতে পারত।
কামালদের দলে একজন মুক্তিযোদ্ধা ছিল, যার বাড়ি মাদারীপুরে। এক্ষেত্রে বিশ্বস্ত নৌকা ঠিক করার জন্য মাদারীপুরের মুক্তিযোদ্ধা বিশেষ ভূমিকা রেখেছিল। স্থানীয় বলে অনেক তথ্যই জানা ছিল ওর। প্রয়োজনে স্থানীয় লোকজন কিংবা মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগিতা নিয়ে, পরামর্শ নিয়ে যাদের ওপর নির্ভর করা যায়, যাদের বিশ্বাস করা যায় এমন নৌকা, মাঝি কিংবা ভ্রমণপথ ঠিক করা হতো।
অনেক সময় দেখা গেছে মিলিটারি পেছন থেকে ধেয়ে আসছে। তখন মুক্তিযোদ্ধারা যাতে দ্রুত নিরাপদ জায়গায় সরে যেতে পারে স্থানীয় জনগণ নিজের জীবন উপেক্ষা করে সেটুকু নিশ্চিত করেছে আগে। এমনই সহযোগিতা করতে গিয়ে অনেক ক্ষেত্রে তারা গুলির মুখে পড়েছে। পাক আর্মিদের হাতে ধরা পড়ে জীবন পর্যন্ত দিয়েছে। এদের অবদান শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করেন কামাল।
বাকু-া ব্রিজ অপারেশনের সময় প্রবীণ মাঝি চাঁন মিয়া এবং সমাদ্দর ব্রিজ অপারেশনের সময় অন্য একজন মাঝির ভূমিকা, যার নাম এখন আর মনে নেই, কৃতজ্ঞতার সাথে স্মরণ করেন কামাল। তিনি বলেন, ওদের সার্বিক মুভমেন্ট ছিল সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের মতো। অনেক সময় তারা অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করেছে। অপারেশনের সফলতায় উল্লসিত হয়েছে।
গ্রামের সাধারণ মানুষের নিরন্তর চেষ্টা ছিল কোন বাড়ি রাজাকারদের, কোন বাড়ি স্বাধীনতার বিপক্ষের লোকের তা চিনিয়ে দিতে। কোনো শত্রুর বাড়ি আশ্রয় নিয়ে মুক্তিযোদ্ধারা যাতে বিপদে না পড়ে সে জন্য সঠিক তথ্য মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে পৌঁছে দিতে সবসময় তারা সচেষ্ট থাকত ভাটিয়াপাড়া অংশ। এ প্রসঙ্গে কামাল বলেন, ভাটিয়াপাড়া অপারেশন শুরু হয় রাত ১টার দিকে। জায়গাটি ছিল ঝোপ-জঙ্গলে ঠাসা। চারদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার। মোটা মোটা গাছের গুঁড়ির আড়ালে আমরা পজিশন নিয়ে আছি। রাতভর চলে সেই অপারেশন। আমাদের সারা গায়ে অসংখ্য জোঁক কামড়ে ধরে আছে। রক্ত খাচ্ছে শুষে শুষে। ভোরের দিকে দেখি কে যেন আমার পায়ে সুড়সুড়ি দিচ্ছে। ফিরে তাকাতেই দেখি এক বৃদ্ধ দাঁড়িয়ে। বয়েসের ভারে ন্যুব্জ শরীর। হাতে ধামা। ধামায় গুড়-মুড়ি। আরেক হাতে লোটা, তাতে ডাবের পানি। আমি ফিরে তাকাতেই বলে, বাজান দুইডা খাইয়া ল, কালকা সারারাত কিছু খাস নাই।
আমি ক্ষিপ্ত হয়ে উঠি, আপনি চলে যান, গায়ে গুলি লাগবে। তবু বৃদ্ধ সরে যায় নি। হৃদয় নিংড়ানো ভালোবাসাসহ আমাকে খাইয়ে তবে তিনি ফিরে গেলেন। এটা দেশের প্রতি, মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি সাধারণ মানুষের ভালোবাসার এক অনন্য বহিঃপ্রকাশ।
কামাল বলেন, প্রশিক্ষণ শেষে পাসিং আউটের সময় আমাদের কঠিন এবং দৃঢ়ভাবে শপথ করানো হয়েছিল যেন যুদ্ধের সময় রাজাকারদের বাড়ি, কোনো দেশদ্রোহী বা শত্রুর বাড়ি আক্রমণ করলে কোনোভাবেই যেন বৃদ্ধ-বৃদ্ধা, শিশু, নাবালক ছেলেমেয়ে এবং নারীদের ওপর কোনোরকম অত্যাচার না হয়। সোনা, রুপা, অর্থ, সম্পত্তির ওপর যেন সামান্য লোভ কাজ না করে। কোনো লোলুপ দৃষ্টি যেন সেদিকে না যায়।

অনুলিখন : আনিস রহমান

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *