কবি সুফিয়া কামালের ১০৪তম জন্মবার্ষিকী উদযাপন

দেশের সমাজপ্রগতি আন্দোলনের অগ্রপথিক জননী সাহসিকা কবি সুফিয়া কামালের আদর্শে দেশ গড়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছে তার সৃষ্ট সংগঠন বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ। কবি সুফিয়া কামালের ১০৪তম জন্মবার্ষিকী পালন উপলক্ষে আয়োজিত জন্ম উৎসব অনুষ্ঠানে এই প্রত্যয় ব্যক্ত করে মহিলা পরিষদ। গত ২১ জুন বাংলা একাডেমির আবদুল করিম সাহিত্য বিশারদ মিলনায়তনে কবির প্রতিকৃতিতে ফুল দিয়ে অনুষ্ঠান শুরু করা হয়। দুটি পর্বে বিভক্ত অনুষ্ঠানে প্রথম পর্বে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও ‘সুফিয়া কামালের সাহিত্য মানবতাবাদ ও নারীর অধিকার’ শীর্ষক স্মারক বক্তৃতার আয়োজন করা হয়। স্মারক বক্তৃতা প্রদান করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক আকতার কামাল। দ্বিতীয় পর্বে আটজন বিশিষ্ট নারীকে সুফিয়া কামাল সম্মাননা পদক প্রদান অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি আয়শা খানম। স্বাগত বক্তব্য রাখেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক মালেকা বানু।
এ বছর সুফিয়া কামাল সম্মাননা পদক প্রদান করা হয়Ñ ভাষাসৈনিক হালিমা খাতুন, সুফিয়া আহমেদ, রওশন আরা বাচ্চু ও প্রতিভা মুৎসুদ্দি; বাংলাদেশ পুলিশের ডিআইজি মিলি বিশ্বাস; বেলাবোর নারী কৃষক ফরিদা বেগম; সাভারের নারী শ্রমিক আরতী রানী; কাউখালীর স্থানীয় সরকারের নির্বাচিত নারী জনপ্রতিনিধি মমতা শিকদারকে। আয়শা খানম কবি সুফিয়া কামালকে বাংলাদেশের বিবেক বলে অভিহিত করে বলেন, আত্মজাগরণ ও আত্মানুসন্ধানের মাধ্যমে তিনি তার সাহিত্যে যা বলেছেন নিজের জীবন চর্চায় তা বাস্তবায়ন করার পথ দেখিয়ে গেছেন। নিজের ব্যক্তিগত জীবনকে তিনি সামাজিক, রাষ্ট্রীয় ও মানবের সম্মিলিত জীবনে পরিণত করেছেন। নারীদের জন্য চ্যালেঞ্জিং যেসব পেশা, যেমন শান্তি মিশনে, সাংবাদিকতায়, ক্রীড়াঙ্গনে এখন নারীরা পুরুষের সাথে সমান তালে এগিয়ে এসেছেÑ এই অগ্রগতির আলোকিত পরিসরে সুফিয়া কামাল বাংলাদেশের বাতিঘরের মতো। তিনি বলেন, সুফিয়া কামালের রচনার মধ্যে যে আলোকদায়ী বক্তব্য তা নিয়ে ব্যাপকভাবে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করা হয়নি, বাংলা একাডেমির মাধ্যমেও তেমন হয়নি। মালেকা বানু বলেন, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক নারী-পুরুষের সমতাপূর্ণ একটি মানবিক সমাজ ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা ছিল তার জীবনব্যাপী সংগ্রামের প্রধান লক্ষ্য। নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা, অব্যাহত নারী নির্যাতন, নারীর  শ্রম শোষণ ও পাচারের মাধ্যমে নারীকে যেভাবে পণ্যে পরিণত করা হচ্ছে, এ সময়ে সুফিয়া কামালের রচনাবলী ও আদর্শ আমাদের আলোর দিশা দেখাতে পারে। অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন সংগঠনের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক উম্মে সালমা বেগম। সম্মাননা পদকপ্রাপ্ত আটজন বিশিষ্ট নারীর জীবনবৃত্তান্ত উপস্থাপন করেন সংগঠনের কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক রাখী দাশ পুরকায়স্থ, সহ-সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট মাসুদা রেহানা বেগম, আন্তর্জাতিক সম্পাদক রেখা সাহা, প্রকাশনা সম্পাদক সারাবান তহুরা, প্রচার ও গণমাধ্যম সম্পাদক দিল মনোয়ারা মনু, প্রশিক্ষণ গবেষণা ও পাঠাগার সম্পাদক রীনা আহমেদ, আন্দোলন সম্পাদক কাজী সুফিয়া আখতার ও পরিবেশ সম্পাদক পারভীন ইসলাম।

নির্মলেন্দু গুণের ৭১তম জন্মদিন পালিত
একদিন এক বিজ্ঞ কসাই/ ডেকে বললো, ‘এই যে মশাই,/ বলুন দেখি, পাঁঠা কেন হিন্দুরা খায়,/ গরু কেন মুসলিমে?/’ আমি বললাম, ‘সে অনেক কথা,/ ফ্রেশ করে তা লিখতে হবে,/ কর্ণফুলীর এক রীমে।’ কসাই শুনে মুচকি হাসে,/ ‘বেশ বলেছেন খাঁটি,/ আমি কিন্তু একই ছোরায়/ এই দুটোকেই কাটি।’
‘কসাই’ নামের এই কবিতাটি লিখেছেন কবি নির্মলেন্দু গুণ। অসাম্প্রদায়িক চেতনার এক জ্বলজ্বলে উদাহরণ এই কবিতা। গত ২১ জুন ছিল এই কবির ৭১তম জন্মদিন।
এ রকম বহু অসাম্প্রদায়িক, স্বাধীনতা ও মুক্তিকামী এবং প্রেমের কবিতা লিখে এক জীবন্ত কিংবদন্তিতে পরিণত হয়েছেন তিনি। তার ‘যুদ্ধ মানে শত্রু শত্রু খেলা,/ যুদ্ধ মানে আমার প্রতি তোমার অবহেলা’ তো মানুষের মুখে মুখে ঘোরে বলে শোনা যায়। এমনকি ‘স্বাধীনতা, এই শব্দটি কীভাবে আমাদের হলো’ কবিতাটি ইতোমধ্যে বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবিতার মর্যাদা পেয়েছে।
এই কবির জন্মদিন উপলক্ষে তার জন্মোৎসবের আয়োজন করে বাংলাদেশ ইকোলজি অ্যান্ড অটিজম ফিল্ম ফোরাম ও বাংলাদেশ কবিসভা। কেন্দ্রীয় পাবলিক লাইব্রেরির সেমিনার কক্ষে বেলা ১১টা, ১টা এবং ৩টায় দেখানো হয় কবির কবিতা নিয়ে নির্মিত চলচ্চিত্র। বিকেলে সেখানে আয়োজন করা হয় একটি শুভেচ্ছাসভার। সেখানে উপস্থিত থেকে কবিকে শুভেচ্ছা জানান অভিনেতা মামুনুর রশীদ, কবি মোহাম্মদ নূরুল হুদা, অধ্যাপক সৌমিত্র শেখর, সাংবাদিক সোহরাব হাসান, সাবেক সংস্কৃতি সচিব রণজিৎ কুমার বিশ্বাস, নূহ-উল-আলম লেনিন, আসলাম সানী, বিমল গুহ, মোহাম্মদ সামাদ, মাহবুব আজীজ, মাসুদ পথিক প্রমুখ।
বাবাকে নিয়ে কন্যা মৃত্তিকা গুণ যখন কথা বলছিলেন, তখনও কবি এসে পৌঁছাননি সভায়। মৃত্তিকা গুণ বলেন, ১০ বছর ধরে তিনি আমাকে স্কুলে আনা-নেওয়া করেছেন। কোনো দিনও দেরি করেননি। কবি হিসেবে তিনি আমার প্রিয়। আজ এখনও তার সাথে দেখা হয়নি। অন্য ভক্তদের মতো আমিও তার জন্য অপেক্ষা করছি। রাতে একসাথে খাব।
নূহ-উল-আলম লেনিন জানান, আমি ভাগ্যবান যে শেখ হাসিনার মতো নির্মলেন্দু গুণকেও সহপাঠী হিসেবে পেয়েছি। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনেই তার ‘প্রেমাংশুর রক্ত চাই’ বইটি হৈচৈ ফেলে দেয়। প্রত্যাশা করি সে আরও দীর্ঘদিন বাঁচুক, দেশ ও জাতিকে আরও অনেক কিছু দিক।
একটু দেরিতে এসে হাজির হন কবি। ৭১টি মোমবাতির প্রথমটি প্রজ্বালন করেন তিনি। কিছুক্ষণের মধ্যে অনুষ্ঠানস্থল ফুলে ফুলে ছেয়ে যায়। ভক্তদের শুভেচ্ছাসিক্ত কবি বলেন, আসার সময় সামান্য বৃষ্টি হয়েছে। ভেবে ভালো লাগল যে আমার জন্মদিনেও বৃষ্টি হয়।
সভায় কবিকে নিবেদিত কবিতা পাঠ করা হয়। আবৃত্তি করা হয় কবির লেখা কবিতা। আবৃত্তি করেন লায়লা আফরোজ।
অনেকেই আশঙ্কা করছিলেন, ক্রিকেটপাগল কবি বাংলাদেশ-ভারতের খেলা ফেলে সেখানে যাবেন না। কিন্তু ভক্তদের ভালোবাসা উপেক্ষা করতে পারেননি তিনি। সভায় তিনি জন্মদিন নিয়ে নিজের লেখা একটি কবিতাও পড়ে শোনান।

শিল্পকলায় বরেণ্য কবিদের কণ্ঠে কবিতা পাঠ
আয়োজনটি ছিল কবিদের নিয়ে। তাই অনুষ্ঠানজুড়ে বয়ে গেল কাব্যবীজের স্ফূরণ। কাব্যের চরণ ধরে উঠে এলো সমাজ, রাষ্ট্র ও দেশের কথা কিংবা প্রিয়তম-প্রিয়তমার মনের কথাটি। উচ্চারিত হলো এই জল, বায়ু ও মাটির বন্দনা। আর সেই কবিতার শব্দগাথায় সিক্ত হলো কবিতানুরাগী শ্রোতাকুল। গত ১৭ জুন আষাঢ়ের বিকেলে কাব্যগাথার এই শৈল্পিক উচ্চারণের আয়োজনটি অনুষ্ঠানটি হয়েছে শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় চিত্রশালা মিলনায়তনে। কবিতাপাঠের এ আসরে অংশ নেন দেশবরেণ্য কবিরা। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির আয়োজিত প্রতিমাসের নিয়মিত অনুষ্ঠানমালার ধারাবাহিকাতায় এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। প্রথিতযশা কবিরা অংশ নিলেন কবিকণ্ঠে কবিতাপাঠের এ আয়োজনে। অনুষ্ঠানে ভিন্ন মাত্রা যোগ করে কবিতার দোলায়িত ছন্দের সাথে সুরেলা শব্দধ্বনি তোলা সংগীতানুষ্ঠান।
অনুষ্ঠানে কবিতাপাঠ করেন কবি নির্মলেন্দু গুণ, রবিউল হুসাইন, জাহিদুল হক, অসীম সাহা, নূহ-উল-আলম লেনিন, নাসির আহমেদ, শিহাব সরকার, দিলারা হাফিজ, তারিক সুজাত ও অঞ্জনা সাহা। আর বাণীর সাথে সুরের আশ্রয়ে সংগীত করেন কণ্ঠশিল্পী সুজিত মোস্তফা ও অনুপমা মুক্তি। চমৎকার এ আয়োজনে সমন্বয়কারীর দায়িত্বে ছিলেন ছড়াকার কবি আসলাম সানী। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন তামান্না তিথি।
অনুষ্ঠান শুরু হয় গান দিয়ে। শুরুতেই নজরুলের ‘মোর প্রিয়া হবে এসো রাণী’ গানটি পরিবেশন করেন কণ্ঠশিল্পী সুজিত মোস্তফা। এরপরই তিনি গেয়ে শোনান বর্ষার গান ‘রিমঝিম রিমঝিম ঘন দেয়া বরষে’। সুজিত মোস্তফার পর কণ্ঠশিল্পী অনুপমা মুক্তি গেয়ে শোনান সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের ‘মধুর মধুর বংশী বাজে’ গানটি। এরপর একে একে পরিবেশন করেন পুরনো দিনের গান ‘হাতের কাঁকন ফেলেছি খুলে’ ও ‘তুমি সুতোয় বেঁধেছো শাপলার ফুল’।
অনুষ্ঠানে শুভেচ্ছা বক্তব্য প্রদান করেন বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির সচিব জাহাঙ্গীর হোসেন চৌধুরী। এরপর সংক্ষিপ্ত আলোচনায় কবি নির্মলেন্দু গুণ বলেন, আষাঢ়ের দ্বিতীয় দিবস বলা হলেও লোকনাথ পঞ্জিকায় আজ পহেলা আষাঢ়। বাংলা পঞ্জিকার এই তারিখ বিভাজনে আমরা একদিনের অনুষ্ঠান দুই দিন করতে পারি। বাংলা ভাষায় খুব কম কবি আছে যিনি বর্ষা নিয়ে কবিতা লেখেননি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *