কাঁকন বিবিঃ খাসিয়া মুক্তি বেটি

পাকিস্তানী মেজর তাঁকে দেখে বলেছিলেন- একেতো বাঙালী মনে হয়না, মনে হয় অন্য জাত। হ্যাঁ তিনি বাঙালী নন, তিনি খাসিয়া নারী। খাসিয়া মুক্তি বেটি হিসেবেই তিনি অধিক পরিচিত তাঁর এলাকায়। জাতিগত পরিচয়ের বাইরে তিনি নিজেকে মানুষ হিসেবে দাঁড় করিয়েছিলেন মুক্তির কাতারে। অথচ এই সংগ্রামী আদিবাসী যোদ্ধার কছে পৌছাতে আমাদের সময় লেগেছে যুগের বেশী। সে সমস্যা কাঁকন বিবির নয়. সমস্যা আমাদের। অতি স¤প্রতি প্রধানমন্ত্রী সম্মাননা এবং আর্থিক সাহায্য তুলে দেন এই মুক্তিযোদ্ধা, বীরাঙ্গনার হাতে। এই বীরমাতার প্রতি বিনম্র শোদ্ধায় আজকের লেখা।
মাতৃসূত্রীয় খাসিয়া পরিবারে জন্ম এই কাঁকনের। বর্তমানে তিনি কাঁকন বিবি হিসেবে অধিক পরিচিত এই খাসিয়া নরীর নাম কাকাত হেনইঞ্চিতা। ১৯৪৮ সালে সুনামগঞ্জের সীমান্তের কাছে নওত্রই গ্রামে এক খাসিয়া পরিবারে তাঁর জন্ম। বাবার নাম নেহা ও মায়ের নাম দামেলি নেয়তা। তিন ভাই বোনের মধ্যে সবার ছোট কাঁকন। মায়ের গর্ভে থাকতে বাবাকে আর জন্মের দেড় মাস পরে মাকে হারান তিনি। তারপর নানীর হাত ঘুরে বড় বোনের কাছে হয় তাঁর আশ্রয়।
তাঁর বড় বোন কাপলি নিয়তা আনসার বাহিনীতে কর্মরত এক মুসলমান কমান্ডারকে বিয়ে করেন। সেই সূত্রে বোনের সাথে কাতলবাড়ীতে কাটে কাঁকন বিবির শৈশবের বেশী আর কৈশরের একটা বড় অংশ। হঠাৎ করেই বড় বোনের উদ্যোগে ধর্মপরিবর্তন করে মুসলমান হয়ে যান কাঁকন। তখন তার নাম হয় নুরজাহান। এরপর সুনামগঞ্জে ফিরে বিয়ে করেন শহীদ উদ্দিনকে। বিয়ের পরপরই একটি ছেলে হয়ে মারা যায় কাঁকন বিবির। শুধু তাই নয় এভাবে পাঁচ পাঁচটি ছেলে মারা যাবার পর একমাত্র কন্যা সখিনা পেটে থাকা অবস্থায় তাঁর প্রথম স্বামী তাঁকে তালাক দেন। পরবর্তীতে বোনের উদ্যোগে বোগলা ক্যাম্পের সীমান্ত রক্ষী আব্দুল মজিদ খানকে বিয়ে করেন কাঁকন।

একাত্তরের শুরুতে কাঁকন বিবির স্বামী তার দেশ পাকিস্তানকে রক্ষা করতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন, ভুলে যান স্ত্রী কাঁকনের কথা। এই অবস্থায় কাঁকন বিবি অর্থনৈতিক ও মানসিক সমস্যার সম্মুখীন হয়ে হন্যে হয়ে খুঁজতে শুরু করেন। তখন পর্যন্ত এই যুদ্ধ এবং যুদ্ধের কারণ নিয়ে মাথা ঘামানের মতো অবস্থা তাঁর ছিলনা। তবে এই খোঁজার মধ্যে দিয়েই কাঁকন বিবি আবিস্কার করেন ভয়ানক এক পৃথিবীতে। দেখেন শ্রেষ্ঠ জল্লাদখানা গুলোর অত্যাচার। এই ব্যাপারে তিনি বলেন- আমি খানা খোরাক লাগি তাকে তালাশ করি, যেয়ে দেখি মা বোনরে ধরিয়া ধরিয়া আনিছে, ওরা বয়স একবারেই ছুটু ছুটু। এই ছুটু ছুটু মেয়ে থাইকা ধরিয়া ধরিয়া আনিছে রাজাকাররা, শুধু আনিয়াই থুইনাই, রাইখা রাইখা তাগো ইজ্জত মারিতেছে, এইডা বলিতে অহনু শরম লাগে, মনে অহনও কেমন কেমন লাগে, কচি কচি মুকগুইলি মন টানে। স্বামীকে খুঁজতে গিয়ে কাঁকন বিবি একদিন ধরা পরে পাকিস্তানীদের হাতে। রাজাকাররা তাঁকে ধর্ষণসহ নানাভাবে শারীরিক নির্যাতন করে। পাকিস্তানী সৈন্যরা তাঁকে টেংরা ক্যাম্পে নিয়ে যায় এবং মুক্তিবাহিনীর লোক হিসেবে সন্দেহ করে নির্মম অত্যাচার চালায়। লোহার শিক গরম করে তার শরীরের বিভিন্ন অংশে ঢুকিয়ে দিয়ে তথ্য আদায়ের চেষ্ট করে। কাঁকন বিবি বলেন যে তার স্বামী পাঞ্জাবী সৈন্য কিন্তু এখন তিনি স্বামীর কোন ঠিকানা জানেন না। এরপর পাকিস্তানীরা ওয়ালেসের মাধ্যমে খবর নিয়ে কাঁকন বিবির কথার সত্যতা খুঁজে পায়। এরপর তারা ভাবে তাঁর স্বামী যেহেতু পাকিস্তানের পক্ষে কাজ করে তাহলে কাঁকনও তাদের পক্ষে কাজ করতে অবাধ্য হবেনা। তারা কাঁকন বিবিকে একটি কাগজ দিয়ে বলে পাকিস্তানীরা ধরলে এই কাগজ দেখাতে, কিন্তু মুক্তিবাহিনী ধরলে না দেখাতে। তারা তাঁকে ভিক্ষুক সেজে গ্রামে গ্রামে ঘুরে মুক্তিযোদ্ধাদের খবর সংগ্রহ করতে বলে। প্রথমে ভয়ে কাঁকন বিবি তাতে রাজি হয় কারণ সে বুঝতে পারে এটা না করলে তাঁকে হত্যা করা হবে।

এরপর থেকে তাঁকে হাজিরা দিতে হতো বিভিন্ন পাকিস্তানী ক্যাম্পে। কেননা হাজিরা না দিলে তাঁর জীবনের ভয় ছিল। কিন্তু পাকিস্তানী সেনা ক্যাম্পে যাতায়াতের সুবাদে তিনি দেখেন বাঙালী নারীদের উপর ভয়াবহ অত্যাচার, দেখেন কীভাবে বাঙালী লোকজনকে ধরে এনে অত্যাচার করছে। এরপর হঠাৎই তাঁর মত পাল্টে যায়। এতোদিনের যাপিত ভয় কোথায় যেন পালিয়ে যায়। তিনি হয়ে ওঠেন অসম্ভব সাহসী এক নারী। এরপর তিনি মুক্তিবাহিনীর কাছে এসে সব খুলে বলেন। মুক্তিবাহিনীও তাকে কাজে লাগাবার চেষ্টা করে এবং সফল হয়। তারপরই মুক্তিযোদ্ধারা দেখেন কাঁকন বিবির সব ভয়াবহ রুপ। এরপর থেকে কাঁকন বিবি নিয়মিত ভাবে খবর সংগ্রহ করতে থাকেন মুক্তিবাহিনীর কাছে, পাকিস্তানীরা কোথায় ক্যাম্প গেড়েছে, কোথায় কখন কিভাবে আক্রমনের পরিকল্পনা করছে, এইসব। যা মুক্তিবাহিনীকে সফলতা এনে দেয়। এরপর কাঁকন বিবি চলে আসেন ৫ নং সেক্টরের সেক্টর কমান্ডার মীর শওকত আলী এবং ক্যাপ্টেন হেলাল উদ্দিনের কাছে। সেখানে গিয়ে তিনি ৫নং সেক্টরের লক্ষীপুর ক্যাম্পে মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্য কারার সুযোগ পান। এরপর সুযোগ পেয়ে যান মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে কাজ করার। শহীদ কোম্পানীতে তিনি যুদ্ধক্ষেত্রে মুক্তিযোদ্ধাদের খাবার ও অস্ত্র সরবারহ করতেন।

আগষ্টে এই অঞ্চলে পাকিস্তানীদের প্রতিরোধের পরিকল্পনা চলছিল। মুক্তবাহিনী গভীর রাতে ব্রিজ ধ্বংস করার সিদ্ধান্ত নেয়। এবং এর পুরো দায়িত্ব পড়ে কাঁকনের উপর। কাঁকন অপারেশন সফল করার জন্য কলাগাছের ভেলায় করে বোমা, অস্ত্র ও অন্যান্য রসদ বহন করে একাই দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে জার্ডিয়া সেতুর কাছে পৌছান। তাঁর সিগন্যাল পেয়ে অন্য কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা সেখানে পৌছান। মাইন বিস্ফোরণে এই সেতু ধ্বংসের সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব কাঁকন বিবির। এই এলাকার সবগুলো গেরিলা অপারেশন এ অংশ নেনে তিনি। মহব্বতপুর, কান্দাগাঁয়ের যুদ্ধ,বসরাই টেংরাটিলার যুদ্ধ, বেটিরগাঁও নুরপুরের যুদ্ধ, দোয়ারাবাজারের যুদ্ধ, টেবলাইয়ের যুদ্ধ, সিলাইর পাড়ের যুদ্ধ, পূর্ব বাংলার যুদ্ধ এই রকম ২০টির মতো যুদ্ধে তিনি সামনে থেকে অংশগ্রহন করেন। তিনি অস্ত্র চালাননি সত্যি কিন্তু গোলা বারুদ অস্ত্র বয়ে বেড়িয়েছেন। এমনকি পাকিস্তানীদের গোলাবারুদ চুরি করে পৌছে দিয়েছেন মুক্তিবাহিনীর কছে।

নভেম্বর মাসের দিকে তিনি গুপ্তচরবৃত্তির দায়ে পাকিস্তানী বাহিনীর হাতে ধরা পড়েন। তারপর তার উপর যে নির্মম পৈচাশিক অত্যাচার চালানো হয় তার যন্ত্রণা হয়তো ভুলে গেছেন তিনি কিন্তু সেই নির্মমতার চি‎হ্ন এখনো মুছে যায়নি তাঁর শরীর থেকে।
বাংলাদের স্বাধীন হবার পর এলাকায় খাসিয়া মুক্তিবেটি নামে পরিচিত হলেও তাঁর ওপর দিয়ে বয়ে যায় অসংখ্য ঝড়। একপ্রকার আশ্রয়হীন হয়ে পড়েন এই অসীম সাহসী নারী। এমনকি ভাইদের কাছে গেলেও তারা তাঁকে গ্রহণ করেনি।ভীষণ লজ্জার হলেও সত্য আশ্রয়হীন এই সাহসী যোদ্ধা জীবনধারনের জন্য একসময় শুরু করেন ভিক্ষাবৃত্তি। এসময় লক্ষীপুর গ্রামের দিনমজুর আব্দুল করিম যে ঘরটায় হাঁস মুরগী রাখতেন সেই ঘরে তাঁর কাঁকন বিবিকে থাকতে আশ্রয় দেন।

দৈনিক সংবাদ প্রথম মিডিয়াতে তুলে আনে এই বীর সাহসী নারীকে। তার ফলশ্র“তিতে ১৯৯৭ সালে নারী প্রগতি সংঘ তাঁকে ঢাকায় এনে সংবর্ধিত করে। বর্তমানে একমাত্র কন্যা সখিনার স্বামী আব্দুল রফিকের কাছে থাকেন কাঁকন বিবি। শেষ জীবনে যুদ্ধের বীরগাঁথার স্মৃতি, অত্যাচারের যন্ত্রণা, নির্মমতার চি‎হ্ন, অনেক যোগ্য সম্মান না পাওয়ার অক্ষেপ, দারিদ্রের কষাঘাতে জর্জরিত জীবন নিয়ে মৃত্যুর দিন গুনছেন আমাদের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ সন্তানদের একজন, আদিবাসী খাসিয়া নারী, খাসিয়া মুক্তিবেটি- কাঁকন বিবি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *