‘কারাগার হবে অপরাধীদের সংশোধনাগার কর্মমুখর করা হবে বন্দিজীবন’

কারাগারে বন্দী অপরাধীদের বিভিন্ন বৃত্তি ও প্রশিক্ষণমূলক কার্যক্রম গ্রহণের মাধ্যমে সংশোধন করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে কারাগারগুলোকে সংশোধনাগারে পরিণত করতে নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। কারাগারকে শুধু শাস্তি কার্যকরের স্থানই নয়, সংশোধনাগার হিসেবে সমাজে প্রতিষ্ঠা করতে কারাগারে কর্মরতদের বন্দীদের সেবা প্রদানের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। একই সাথে কারাগারের দায়িত্বরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিভিন্ন সুবিধা প্রদানের বিষয়টি তিনি দেখবেন বলে আশ্বস্ত করেছেন। গত ৩ এপ্রিল রাজধানীর উপকণ্ঠে কেরানীগঞ্জের তেঘরিয়া ইউনিয়নের রাজেন্দ্রপুরে স্থাপিত নতুন ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সাড়ে ৪ হাজার বন্দী ধারণক্ষমতার নতুন এই কারাগারের সুইচ টিপে ও ফিতা কেটে উদ্বোধনী ফলক উন্মোচন করেন। এ সময় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল এমপি, স্থানীয় এমপি বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু এমপি, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মোজাম্মেল হক খান, কারা মহাপরিদর্শক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ ইফতেখার উদ্দীন উপস্থিত ছিলেন। এরপর তিনি নতুন এই কারাগারটির বিভিন্ন অংশের অবস্থান সম্পর্কে সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে জানতে চান ও এ সম্পর্কে সংশ্লিষ্টদের বিভিন্ন নির্দেশনা দেন। এরপর কারাগারে একটি গাছের চারা রোপণ করেন। এরপর গাড়িতে করে ৩১ একর জমির ওপর পুরুষ বন্দীদের জন্য নির্মিত এই কারাগারের বিভিন্ন অংশ ঘুরে দেখেন প্রধানমন্ত্রী।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, অপরাধ করলে শাস্তি দিলামÑ এতেই শেষ না। একজন ছিঁচকে চোর যদি জেলখানায় গিয়ে আরও বড় চোরদের সংস্পর্শে আসে, তা হলে জেলখানা থেকে বেরিয়ে সে পাকা চোর হয়ে ওঠে। ট্রেনিংটা সেখানেই পেয়ে যায়।
কারাবন্দিদের বৃত্তিমূলক বিভিন্ন প্রশিক্ষণের ওপর জোর দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের লক্ষ্য তাদের উৎপাদনমুখী কার্যক্রমের আওতায় নিয়ে আসা। একটি মানুষের জীবনে প্রয়োজনীয় অনেক কিছুই কারাবন্দিরা তৈরি করতে পারে। কারাবন্দিরা যেসব পণ্য তৈরি করবে সেজন্য তারা নির্দিষ্ট পরিমাণ মজুরি পাবে এবং সেটা জমা থাকবে। যখন সে মুক্তি পেয়ে বাড়ি ফিরবে, তখন এই টাকা দিয়ে একটা ছোটখাটো ব্যবসা বা দোকান দিয়ে সমাজে স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারবে। সে কারাগারে বন্দী থাকা অবস্থায় তার মজুরির একটা অংশ পরিবারকেও দেওয়া হবে। কারণ অপরাধ করে একজন কিন্তু তার জন্য ভুক্তভোগী হয় গোটা পরিবার। কাজের মধ্য দিয়ে বন্দী অবস্থায় তার কাজের প্রবণতা বৃদ্ধি পাবে। নিজেকে সংশোধন করে বন্দীদের জীবন কর্মমুখর করতে হবে।
পুরান ঢাকার কারাগারটি সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী বলেন, মোগল আমলে এই কারাগারটি একটি দুর্গ হিসেবে ব্যবহৃত হতো। পরবর্তীতে পাকিস্তান আমলেও এটি পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় কারাগার হিসেবে ব্যবহারিত হয়। আড়াই হাজারের কিছু বেশি বন্দীকে রাখার জন্য তৈরি করা কারাগারটিতে অমানবিকভাবে হাজার হাজার বন্দীকে মানবেতর জীবনযাপন করতে হতো। এ কারাগারটি তৈরির মাধ্যমে এই কষ্ট অনেকটা লাঘব হবে। এমন কিছু বন্দী আছে যাদের অভাবে স্বভাব নষ্ট হয়ে যায়। এসব অপরাধীদের অপরাধ প্রবণতা কমিয়ে আনতে কাজ হবে। আবার কিছু দুর্ধর্ষ বন্দী রয়েছে তাদের কোনোক্রমেই ভালো করা যাবে না। তাই তাদের শাস্তি দিতে হবে।
এ সময় কারান্তরীণ অবস্থায় বন্দীর পরিবারের কী অবস্থা হয় তার জ্বলন্ত উদাহরণ তিনি। প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমার পিতা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জীবনের এক উল্লেখযোগ্য সময় কারাগারেই কাটিয়েছেন। জীবনের দুটি বছর কোনো সময়ই কারাগারের বাইরে কাটাতে পারেন নি। প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাকে ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠার জন্য প্রথমবারের মতো কারাগারে যান বঙ্গবন্ধু। এরপর কিছুদিন পরপর কয়েকবার কারাগারে যান। এরপর ১৯৫২ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি কারাগার থেকে মুক্তি পান তিনি। এরপর ’৫৪ সাল, ’৫৬ সাল, ’৬২ সাল, ’৬৬ সাল, ’৬৯ সাল, ’৭১ সালসহ অসংখ্যবার দেশের জন্য গ্রেফতার হয়ে কারাগারে কাটাতে হয়েছে।
পিতার কারাগারের জীবন নিয়ে স্মৃতিচারণ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, একসময় কারাগার থেকে বঙ্গবন্ধুকে ক্যান্টনমেন্টে নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর দীর্ঘদিন আমরা বঙ্গবন্ধু বেঁচে আছেন নাকি মারা গেছেন তার কোনো খোঁজ পাইনি। এরপর যখন তাকে আদালতে আনা হলো তখন কেবল আমরা জানতে পারলাম যে বঙ্গবন্ধু জীবিত। এমনকি তার সাথে পরিবারের সবাইকে দেখা পর্যন্ত করতে দেওয়া হতো না। আমি পরিবারের বড় ছিলাম বলে দেখা করতাম। ১৯৭১ সালে বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করে পাকিস্তান নিয়ে যাওয়ার পর আমরা তিনি জীবিত নাকি মারা গেছেন তাও একবার পর্যন্ত জানতে পারিনি। এরপর ১৯৭২ সালের ৮ জানুয়ারি পাকিস্তান কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে লন্ডনে পৌঁছার পরই কেবল জানলাম যে তিনি জীবিত রয়েছেন।
শেখ হাসিনা বলেন, বন্দীদের জন্য পাবলিক টেলিফোনের ব্যবস্থা করা হবে। কারাগারের আটক বন্দীদের চুরি করে মোবাইল টেলিফোনে কথা বলা বন্ধ করতে পাবলিক টেলিফোনে মাসে হয়তো একবার পরিবারের সাথে কথা বলার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। পরিবারের সদস্যদের সাথে বন্দীরা যোগাযোগ করতে পারলে মনটা ভালো থাকবে ও অপরাধ প্রবণতা অনেকাংশে কমবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বন্দীদের অপরাধ প্রবণতা থেকে বের করে আনা একান্ত প্রয়োজন। অপরাধীদের কীভাবে অপরাধ প্রবণতা থেকে সরিয়ে আনা যায়, সে বিষয়ে চিন্তা করতে ও ব্যবস্থা নিতে হবে। যারা জঘন্য অপরাধ করেছে তাদের কথা বলব না, যাদের সুযোগ আছে, তাদের সংশোধনের মাধ্যমে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে হবে। অপরাধীদের অপরাধ প্রবণতা থেকে সরিয়ে আনতে বহুমুখী কর্মসূচি নেওয়ার কথাও বলেন শেখ হাসিনা। কারাগার থেকে যেন বড় অপরাধী তৈরি না হয়, সেদিকে সর্তক থাকার নির্দেশ দিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, অনেক সময় ছিঁচকে চোর কারাগারে ঢুকে। কারাগারে বড়-বড় চোর, অপরাধীদের সাথে মিশে আরও বড় চোর হয়ে বের হয়। সেটা যেন না হতে পারে, সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। কারাবন্দিদের প্রশিক্ষণ ও উৎপাদনমুখী কাজের মধ্য দিয়ে অপরাধ প্রবণতা থেকে বের করে সুস্থ-স্বাভাবিক জীবনে নিয়ে আসার পরামর্শ দেন তিনি।
আধুনিক প্রযুক্তির এই বিশ্বে নতুন নতুন অপরাধের ধরন ও প্রতিকারের বিষয়টি মাথায় রেখে পদক্ষেপ নেওয়ার পরামর্শ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সমাজে নতুন নতুন অপরাধ প্রবণতা বাড়ছে। এসব অপরাধ থেকে অপরাধীদের সরিয়ে আনার জন্য কাজ করতে হবে। অপরাধীদের সুস্থ জীবনে ফিরিয়ে আনা আমাদের সবার দায়িত্ব।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *