গণহত্যার ছবি : নূরুল উলা

গতকাল অমি রহমান পিয়াল যে ভিডিওটি পোস্ট করেছে ঢাবি ক্যাম্পাসে গণহত্যা বিষয়ে সেটা রেকর্ড করেছিলেন প্রফেসর ড. নূরুল উলা । তাঁর জীবদ্দশায় ভিডিওটির বর্ননা লিখে গেছেন তিনি ।শ্রদ্ধেয় এম এম আর জালাল
সে লেখাটি সচলায়তনে তুলে দিয়েছেন । লেখাটির ইউনিকোডিত ভার্সন সামহয়ারইনের পাঠকদের সাথে শেয়ার করা হলো ।

গণহত্যার ছবি : নূরুল উলা

একাত্তরের পঁচিশে মার্চ রাতে একটু তাড়াতাড়ি ঘুমাতে গিয়েছিলাম । সেদিন খবরের কাগজে পড়েছিলাম বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে ইয়াহিয়া খানের সমঝোতা আসন্ন । তাই সবাই একটু নিশ্চিন্ত ছিলাম । মাঝরাতে প্রচন্ড এক বিস্ফোরণে ঘুম ভেঙ্গে গেল।

একটু বিরতির পরই শুরু হলো অবিরাম গোলাগুলি আর মর্টারের আওয়াজ । আমরা সবাই শোবার ঘর আর বাথরুমের মাঝামাঝি প্যাসেজে আশ্রয় নিলাম ছিটকে-আসা কোনো বুলেট থেকে রক্ষা পাবার আশায় । একটু পরে কৌতূহল সংবরণ করতে না পেরে হামাগুড়ি দিয়ে জানালার কাছে গিয়ে বাইরে কি হচ্ছে তার একটা আভাস নেবার চেষ্টা করলাম ।

আমি তখন থাকতাম ফুলার রোডে পুরাতন এ্যাসেম্বলি হলের উল্টোদিকে, প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকদের তৈরী চারতলার ফ্লাটে । আমার জানালা থেকে জগন্নাথ হল ছাত্রাবাস আর তার বিরাট মাঠ সরাসরি চোখে পড়ে । সে রাত ছিলো নিশ্ছিদ্র অন্ধকার, কিন্তু তার মাঝেও বুঝলাম জগন্নাথ হল ছাত্রাবাস আর তার চারপাশের রাস্তাগুলো মিলিটারি ছেয়ে গেছে । কিছু পরে দেখলাম হলের কতকগুলো ঘরে আগুন ধরে গেল । সেই আলোয় আবার দেখলাম কিছুসংখ্যক সৈন্য টর্চ হাতে প্রতিটি ঘরে তল্লাশি চালাচ্ছে । বেশিক্ষণ তাকাবার ভরসা পেলাম না । করিডোরে ফিরে এসে গোলাগুলির শব্দের মধ্যেই জেগে সারারাত কাটিয়ে দিলাম ।

ভোর হতেই আবার উঁকি মেরে দেখলাম – – কোথাও কাউকে চোখে পড়লো না”; কেবল রাস্তায় পড়ে আছে অনেক ইটের টুকরো আর মাঠের ওপর বিছানো দুটো বড় বড় সাদা চাদর । কিছুটা আশ্বস্ত হলাম এই ভেবে যে তেমন বেশি খুন-জখম হয়তো হয়নি ।

কিন্তু এরপরই যে দৃশ্যের অবতারনা হলো – কোনদিন কল্পনা করিনি সে দৃশ্য আমাকে জীবনে কখনো দেখতে হবে; আর কামনা করি, এ-রকম ভয়াবহ ঘটনা যেন কাউকে স্বচক্ষে দেখতে না হয় ।

তখন বেশ সকাল হয়ে গেছে । মাঠের পশ্চিমদিকে অর্থাৎ যেদিকে জগন্নাথ হলের প্রধান ছাত্রাবাস, সেদিক থেকে হঠাৎ আবির্ভূত হলো জনাবিশেক পাকিস্তানী সৈন্য, সঙ্গে দু’জন আহত ছাত্র । ছেলে দুটোকে সৈন্যরা বেশ যত্ন করেই কাঁধে ভর দিয়ে এনে চাদর দুটোর পাশে বসাল –-মনে হলো হাসপাতালে নিয়ে যাবে । একটু পরই চাদর দুটো টেনে সরিয়ে ফেলল – দেখলাম চাদর দিয়ে ঢাকা ছিলো বেশ কয়েকটি মৃতদেহ ।

আহত ছেলে দুটো বসেছিলো পূর্ব দিকে মুখ করে, লাশগুলো তাদের পেছনে । দুজন সৈন্য আরেকটু পূর্বে সরে গিয়ে তাদের মুখোমুখি দাড়িয়ে তাদের দিকে উচিয়ে ধরলো হাতের রাইফেল – কয়েক মুহূর্তের জন্য দেখলাম ছেলে দুটো হাত বাড়িয়ে কাকুতি-মিনতি করছে । তার পরই চললো গুলি ।

কোন সৈন্য দুটো কিংবা তিনটার বেশী গুলি খরচ করেনি । শেষের গুলিটা করলো শুয়ে-থাকা লাশের ওপর মৃত্যু সুনিশ্চিত করার জন্য । ওদের হাতে যে আগ্নেয়াস্ত্র ছিলো সেটা মাঝারি ধরনের আর তা থেকে যে গুলি বেরিয়েছে তার শব্দ তেমন প্রচন্ড নয় ।

ওদের হাতে যে আগ্নেয়াস্ত্র ছিল সেটা মাঝারি ধরনের আর তা থেকে যে গুলি বেরিয়েছে তার শব্দ তেমন প্রচন্ড নয় ।

জীবনে এই প্রথম স্বচক্ষে মানুষ মারা দেখলাম, আর সেটাও আহত লোককে ঠান্ডা মাথায় গুলি করে । মানসিক শক পূর্নভাবে উপলদ্ধি করার আগেই নিজের নিরাপত্তার কথা ভাবতে হলো – কারন তখন রাস্তা দিয়ে সামরিক গাড়ী মাইকে কারফিউ-এর ঘোষণা প্রচার করতে করতে গেল আর সেই সঙ্গে জানিয়েও গেল কেউ যেন জানালা দিয়ে বাইরে না তাকায় । কিন্তু তাকানো বন্ধ করলাম না, কারন আমার দৃঢ় বিশ্বাস ছিলো যে, যদি জানালার কাচ বন্ধ রাখি আর ঘরে কোন আলো জ্বালানো না থাকে তাহলে বাইরে থেকে কিছু দেখা যাবে না । কেবল আশা করছিলাম সবচাইতে খারাপ যা হবার তা হয়ে গেছে, আর কিছু ঘটবে না, আর কিছু দেখতে হবে না । তখনও জানতাম না এ কেবল আরম্ভ ।

অল্পক্ষণ পরে, কিছু সৈন্য আরো কয়েকজন আহত লোক নিয়ে এলো, এবারও পশ্চিম দিকের ছাত্রাবাস থেকে । তাদের ঠিক আগের মতন অর্থাৎ লোকগুলোর কাছে নিয়ে এসে আগ্নেয়াস্ত্র উঁচিয়ে ধরল । তারপর শুরু হলো গুলি, অনেকটা এলোপাথাড়ি । কেউ বসে ছিল, কেউ দাঁড়িয়ে, তাদের ওপর সামনে, বেশ কাছাকাছি থেকে গুলি চালাচ্ছে । আর পেছন থেকে উঠছে ধূলি । বুঝলাম কিছু গুলি দেহ ভেদ করে মাটিতে ঠেকছে । মাঠের ওপর পড়ে থাকা লোকের সংখ্যা বাড়তে থাকল ।

পরবর্তীকালে বিদেশী টেশিভিশনের সাংবাদিকরা আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, সেই সময় আমার মানসিক অবস্থা কেমন ছিল, আর কি করে আমার মাথায় এই হত্যাকান্ডের ছবি তোলার চিন্তা মাথায় এল । আসলে ছবি তোলার আইডিয়া আমার নয় । পর পর দু”বার এভাবে আহত আর নিরস্ত্র মানুষদের ঠান্ডা মাথায় খুন করা দেখে বুঝলাম আরো খুন হবে, আজ একটা সামগ্রিক গণহত্যা হবে । তখন বোকার মত বলে উঠলাম-আমাদের হাতেও যদি অস্ত্র থাকতো । তখন পাশ থেকে আমার চাচাতো ভাই নসীম বলে উঠলো – ভাইজান, ছবি তোলেন ।

তখন মনে পড়লো আমার বাসায় ভিডিও ক্যামেরাসহ এইটা ভিসিআর আছে । জাপানে তৈরী প্রাথমিক যুগের এই পোর্টেবল ভিসিআর ছিল বেশ ভারি আর আমার জানামতে দেশে প্রথম । যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ক্যামেরা সেট করে একটা কালো কাগজ ফুটো করে ক্যামেরার লেন্সটা তার মাঝে গলিয়ে দিয়ে জানালার কাচের ওপর রাখলাম । ঠিক যতটুকু ক্যামেরার লেন্স, বাদবাকী পর্দা দিয়ে ঢাকা থাকল আর জানালা সামান্য ফাঁক করে সরু মাইক্রোফোনটা একটু বের করে রাখলাম । ইতোমধ্যে আরো-দুটো ব্যাচকে ধরে এনে হত্যা করা হয়েছে । ছবির রেকর্ডিং-এ ধরা পড়েছে বাদবাকী তিনটি গণহত্যা । এর মধ্য সবচাইতে ভয়াবহ ছিল শেষেরটি ।

তখন বন্দী আনা শুরু হয়েছে মাঠের পূর্বদিক থেকে । যাদের নিয়ে আসা হচ্ছে তাদের পরনে লুংগী, গেঞ্জি অথবা খালি গা । বুঝলাম সব ঘুমন্ত অবস্থায় ধরা পড়েছে । আগের লাশগুলোর কাছে নিয়ে এসে ওদের ওপর গুলি করা হচ্ছে ।

এরপর মাঠ হঠাৎ করে ফাঁকা হয়ে গেল । ইতোমধ্যে মাঠে বেশ কিছু লাশ জমে উঠেছে । ভাবলাম এবার বুঝি এই হত্যাযজ্ঞের শেষ । কিন্তু না, একটু পরে দেখলাম প্রায় জনা চল্লিশেক অস্ত্রধারী সৈন্য মাঠের উত্তরদিকে লাইন করে দাঁড়াল । এরা ছিলো লম্বা আর ফরসা, মনে হলো পাঞ্জাবী সৈন্য । এরা কিন্তু কখনই প্রত্যক্ষভাবে হত্যাকান্ডে অংশগ্রহণ করেনি । যারা গুলি চালিয়েছিলো তারা ছিল অপেক্ষাকৃত বেঁটে আর কালো । এবার এমনি ধরনের জনা-দশেক সৈন্য মাঠের পূর্বদিক থেকে আবির্ভূত হল, সঙ্গে প্রায় পঁচিশ-ছাব্বিশজন মানুষ । ভাবলাম বোধ হয় লাশ সরাবার জন্য এনেছে ।

কিন্তু মানুষগুলো পড়ে থাকা লাশগুলোর কাছে আসার সাথে সাথে ওদের সঙ্গের সৈন্যরা আবার একটু পূর্বদিকে সরে গিয়ে রাইফেল তাক করল । কিছুক্ষণের জন্য চারদিক স্তব্ধ । এর মধ্যে দেখলাম একজন লোক, মুখে তার দাড়ি, হাঁটু গেড়ে বসে করজোরে প্রাণভিক্ষা চাইছে । তারপরই শুরু হলো গুলি । গুলির পর গুলির বর্ষণ হচ্ছে আর মানুষগুলো মাটিতে লুটিয়ে পড়ছে আর তাদের দেহ-ভেদ-করা গুলির আঘাতে মাঠ থেকে উঠছে ধূলা ।

গুলি যখন থামলো দেখলাম একমাত্র দাড়িওলা লোকটা তখনো বেঁচে আছে । মনে হলো ওর দিকে সরাসরি কেউ গুলা চালায়নি । লোকটা আবার হাতজোড় করে প্রাণভিক্ষা চাইতে শুরু করল । একজন সৈন্য তার বুকে লাথি মেরে তাকে মাটিতে শুইয়ে দেবার চেষ্টা করল । কিন্তু লোকটা তবু হাঁটু গেড়ে রইল । তখন তার ওপর চালালো গুলি । তার মৃতদেহ আর সবার সাথে একাকার হয়ে গেল ।

মাঠের উত্তরদিকে যে সৈন্যরা এতক্ষণ লাইন দিয়ে দাঁড়িয়েছিল তারা এখন সংঘবদ্ধভাবে চলে গেল । আর হত্যাকান্ডে অংশগ্রহণকারী সৈন্যদের কেউ কেউ পড়ে থাকা দেহগুলোর চারপাশে ঘুরে ঘুরে মনোযোগের সঙ্গে দেখল আর মাঝে মাঝে শেষবারের মতো গুলি করল মৃত্যু নিশ্চিত করার জন্য ।

কিছুক্ষণ পর সব সৈন্য চলে গেল । চারদিক নিস্তব্ধ আর ফাঁকা, কেবল জগন্নাথ হলের মাঠের ওপর পগে আছে অসংখ্য লাশ । দেখলাম রাস্তার ওপর দিয়ে একটা ভ্যান চলে গেল, তার ওপরে একটা গোল এন্টেনা ঘুরছে । বুঝলাম মাইক্রোওয়েভ ডিটেক্টর, কেউ কোন কিছু ব্রডকাস্ট করছে কিনা ধরার জন্য । আমি জানি আমার ভিডিও ক্যামেরা থেকে সামান্য কিছু তরঙ্গ ছড়াতে পারে, তাই তাড়াতাড়ি সেটা অফ করলাম ।

ভিডিও টেপ রিওয়াইন্ড করে চেক করে যখন দেখলাম সব ছবি ঠিকমতো উঠেছে তখন সেটা খুলে ভিতর থেকে যন্ত্রাংশ সরিয়ে নিয়ে সেটাকে অকেজো করে দিলাম । বেলা তখন দশটার বেশী হবে না । যেকোনো সময় আমাদের ওপর হামলা হতে পারে আশঙ্কায় ওখানে বেশিক্ষণ থাকা সমীচীন মনে করলাম না । কারফিউ সত্ত্বেও আমরা আত্মীয়-স্বজন ও পরিবার নিয়ে এলাম পুরনো ঢাকায় । আসার ঠিক পূর্ব মুহূর্তে অর্থাৎ বেলা একটার দিকে একটা বুলডজার দিয়ে মাটি খুড়তে দেখেছি । কিন্তু তারপর সেখানে কি হয়েছে বলতে পারব না । অনুমান করি, লাশগুলো পুঁতে ফেলার উদ্দেশ্যেই মাটি খোঁড়া হচ্ছে । স্বাধীনতা লাভের পর জেনেছি, আমার অনুমান ছিলো সত্যি ।

লেখক: প্রফেসর ড. নূরুল উলা, ইলেকট্রিকাল ইঞ্জিনিয়ারিং, বাদশাহ সউদ ইউনিভার্সিটি, সৌদি আরব ।

কৃতজ্ঞতা: এমএমআর জালাল

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *