চরমপত্র : ইথারে এক অন্য মুক্তিযুদ্ধ

প্রাক কথন : হুমায়ুন আহমেদের আগুনের পরশমণি ছবিতে একটি দৃশ্য আছে। কানের কাছে রেডিও নিয়ে সপরিবারে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র শুনছেন আবুল হায়াত। শুনছেন চরমপত্র। উত্তেজনায় মুঠি পাকাচ্ছেন। শোনা যাচ্ছে বিচ্চু, মছুয়া, গাবুইরা মাইর জাতীয় কিছু শব্দ। এটাই ছিল মুক্তিযুদ্ধের সময়কার এক নিয়মিত ছবি। অবরুদ্ধ বাংলাদেশের স্বাধীনতা কামী বাঙালীর কাছে চরমপত্র ছিল এক সঞ্জীবনী সুধা। মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্ব ও পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর নাস্তানাবুদ হওয়ার সরস বয়ানে তারা হেসে গড়াতেন। কখনোবা মুঠো পাকাতেন যুদ্ধ যোগদানের অক্ষমতা ঢাকতে, যা আসলে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি তাদের প্রাণভরা ভালোবাসারই আরেকটি অভিব্যক্তি। আর ট্রেঞ্চে ট্রেঞ্চে মুক্তিযোদ্ধারাও শুনতেন সতীর্থদের বীরত্ব গাঁথা। তারা উদ্বেল হতেন। সেইসঙ্গে সোৎসাহে বুক বাঁধতেন ওপার বাংলায় শরণার্থী আরো এক কোটি বাঙালী। এত কিছু করে ফেলতেন রেডিওতে ঢাকাইয়া উচ্চারণের এক মুক্তিযোদ্ধা। এম আর আখতার মুকুল।

১৯৭১ সালের ২৫ মে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র চালু হওয়ার দিন থেকে ১৬ ডিসেম্বর বিজয়ের দিন পর্যন্ত মুকুল পড়ে গেছেন তার স্বরচিত এই অমর কীর্তি। তার ভাষায়- ‘চরমপত্র ছিলো একেবারে ব্যাঙ্গাত্মক ও শ্লেষাত্মক মন্তব্যে ভরপুর একটা একক অনুষ্ঠান। একটা মানসম্মত রেকর্ডিং স্টুডিওর অভাবে প্রতিদিন ছোট্ট একটা ঘরে টেপ রেকর্ডারে চরমপত্র রেকর্ডিং করতে হয়েছে। এবং ৮ থেকে ১০ মিনিটের এই টেপ নিয়মিতভাবে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারিত হয়েছে। এই অনুষ্ঠানে আমি প্রতিদিন গল্পের ছলে দূরূহ রাজনীতি ও রণনীতির ব্যাখ্যা ছাড়াও রণাঙ্গনের সর্বশেষ খবরাখবর অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে উপস্থাপন করেছি।’
শুরুতে শুদ্ধভাষাতেই চরমপত্র পড়েছেন মুকুল। পরে তার ভাষায় আঞ্চলিকতা এসেছে। এবং সেটা সচেতনভাবেই। এ প্রসঙ্গে বলেছেন, ‘রণাঙ্গন পরিদর্শনের অভিজ্ঞতায় যখন দেখতে পেলাম মুক্তিযোদ্ধাদের শতকরা ৯৫ জনই হলেন গ্রামবাংলার সন্তান, তখন ভাষার ব্যবহারে চমক আনলাম।…মোটামুটিভাবে ঢাকাইয়া তথা বাঙাল ভাষা ব্যবহার করলেও মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে একাত্মতা সৃষ্টির লক্ষ্যে আমি যথেচ্ছভাবে বিভিন্ন জেলার আঞ্চলিকভাষা ব্যবহার করেছি। এমনকি বক্তব্য জোরালো করার জন্য আমি বিদ্রোহ কবি নজরুল ইসলামের পদাংক অনুসরণ করে উর্দু ও ফার্সি পর্যন্ত ব্যবহার করেছি।’

দুটো প্রাসঙ্গিক তথ্য। চরমপত্র নামটি দিয়েছিলেন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের একনিষ্ঠ কর্মী আশফাকুর রহমান খান। আর চরমপত্রের অনন্য চরিত্রটি মুকুল ছক্কু মিয়াকে সৃষ্টি করেছিলেন তার পরিচিত এক ঢাকাইয়া আহসানউল্লাহর আদলে। বকশিবাজারের এই আহসানউল্লাহ মুক্তিযুদ্ধের সময় রাজাকার বাহিনীতে নাম লিখিয়েছিল, তাকে হত্যা করে মুক্তিযোদ্ধারা।]

স্বাধীন বাংলা বেতার থেকে প্রচারিত চরমপত্রের একটি অডিও ক্লিপ
৪ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালের একটি কথিকা :

দম্ মাওলা, কাদের মাওলা!
ডরাইয়েন না, ডরাইয়েন না। এম্তেই একটা আওয়াজ করলাম, আর কি!

এত কইরা কইছিলাম- চেতাইস না, চেতাইস না। বঙ্গবন্ধুর বাঙালীগো চেতাইস না। বাংলাদেশের কেঁদো আর প্যাঁকের মইদ্দে হাঁটু হান্দাইস না। নাহ। আমার কাথা হুলনো না। তহন কী চিরকীত? ৭২ ঘণ্টার মাইদ্দে সব ঠান্ডা কইরা দিমু। কি হইলো, ঠ্যাটা মালেক্যা, পিঁয়াজি-ইয়াহিয়া সাব? অহন হেইসব চোটপাট গ্যালো কই? ৭২ ঘণ্টার জায়গায় ২১০ দিন পার হইছে- গেনজাম তো শেষ হইলো না। আইজ কাইলতো কারবার উল্টা কিসিমের দেখতাছি। হানাদার মছুয়াগো অবস্থা দিনকে দিন তুরহান্দ খরতনাক হইয়া উঠতাছে। সাতক্ষীরা-খুলনা, যশোর-কুষ্টিয়া, রাজশাহী-চাপাইনবাবগঞ্জ, রংপুর-দিনাজপুর, সিলেট-ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইল-মধুপুর, কুমিল্লা-চিটাগাং, মাদারীপুর-পালং আর ঢাকা-মুন্সিগঞ্জ- হগ্গল জায়গাথনে ওয়ার্ল্ডের বেস্ট পাইটিং ফোর্সরা খালি ঝাইড়া দৌড়াইতাছে।

জেনারেল পিঁয়াজি অক্করে থঃ।
এইডা কি? এইডা কি?
মেজর শের মোহাম্মদ। তোমারে না সাতক্ষীরায় ডিউটি দিছিলাম? তুমি ঢাকার সেকন্ড ক্যাপিটালে আইলা ক্যামতে? তোমার মুখে এতবড় দাড়ি গজাইলো ক্যামতে? তোমার সোলজারগো খবর কি? তোমার পরণে তপহন দেখতাছি কির লাইগ্যা?

ছ্যার কইতাছি, কইতাছি। পয়লা একটুক দম লইতে দেন। সাতক্ষীরা যাওনের আগে বিগ্রেডিয়ার ফকির মোহাম্মদনে বোলা থা- পহেলা আপ, দুসরা বাপ, উসকো বাদ দুনিয়া। সাতক্ষীরায় যাইয়া দেখি পাকিস্তান আর্মির বহুত খতরনাক অবস্থা।
ঈদের নামাজের পর থাইক্যাই বাঙালী বিচ্চুগুলা অক্করে পাগলা হইয়া উঠছে। হাজার হাজার বিচ্চু তিনদিক থাইক্যা আইস্যা আরে বাড়ি রে বাড়ি। সাতক্ষীরায় আমাগো মর্টার, মেশিনগান, গ্রেনেড, বাংকার, ট্রেঞ্চ কিছুই কুলাইলোনা। আমাগো সোলজারগো লাশ অক্করে পাহাড়। বেগতিক দেইখ্যা একটা মরা রাজাকারের লুঙ্গি পিন্দা হেই কাম করলাম। দিলাম দৌড়। যে রাস্তা দিয়া ভাগছি, দেখি খালি মেজিক কারবার। হগ্গল জায়গায় বিচ্চুরা ওত পাইতা রইছে। এক ঝাপট মাইরা হেরা কালীগঞ্জ থানা দখল কইরা লইলো। হেরপর আরামসে নদী পার হইয়া বিচ্চুরা অহন খুলনা টাউনের দিকে যাইতাছে।

মুক্তিবাহিনীর আরো দুইটা দল যশোর থিকা ৭ মাইল দূরে চৌগাছায় আস্তানা গাড়ছে। হেই জায়গায় আমগো পাকিস্তানী সোলজাররা যেমতে কইরা গরুর গোসের কাবাব খাইছিল, এইবার বিচ্চুরা কয়েক ঘণ্টার মাইদ্দে আমগো হেইসব সোলজারগো কাবাব বানাইল। গেরামের বাঙালীরা মহাখুশী। হেরা গামছা উড়াইয়া বিচ্চুগো খোস আমদেদ জানাইতাছে।

ছ্যার, সত্যি কথা কইতে কি, রাজাকারগো কাছে অহন দুইটা মাত্র রাস্তা খোলা রইছে। হয়, একটা রাইফেল আর ৩০ রাউন্ড গুলি লইয়া সারেন্ডার করা। আর না হয় ‘মউত তেরা পুকার তা।’ দুই কিছিমের কারবারই চলতাছে। পাকিস্তানী সোলজারগো আঃ বাঃ ফ্রি। মানে কিনা আহার ও বাসস্থান ফ্রি হইয়া গেছে। হগ্গল সোলজারই আজরাইল ফেরেশতার খাতায় নাম লিখাইতাছে। এই রিপোর্ট পাইয়া লেঃ জেনারেল আমীর আবদুল্লাহ খান নিয়াজী কি রাগ? আতকা ঘাড় তেড়া কইরা দ্যাখে কি, সিলেট সেক্টরের লেঃ কর্ণেল জান মোহাম্মদ, মেহেরপুরের মেজর বসির খান, রংপুরের কর্ণেল অম্বর খান আর মাদারিপুর-বরিশালের মেজর মাহবুব মোহাম্মদ মাথা নিচু কইরা খাড়াইয়া রইছে। হগ্গল জায়গার রিপোর্ট খুব খতরনাক। পিপ-পিপ। পিপ-পিপ। জেনারেল পিঁয়াজী সা’বে রেডিওগ্রামে মছুয়া সম্রাট প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের কাছে রিপোর্ট পাঠাইলো। ‘আমগো অহন কুফা টাইম শুরু হইছে। আরো সোলজার পাঠান বঙ্গাল মুল্লুকে।’

ব্যাস। খুনী ইয়াহিয়া খান হুইস্কির গ্লাস হাতে শিয়ালকোট থাইক্যা জলদি ইসলামাবাদে ওয়াপস আইলো। এডভাইজারগো লগে গুফতাগু করার করনের পর, প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া নয়া কিছিমের ট্রিকস করার লাইগ্যা দোস্তগো কাছে খবর পাঠাইলো। ফরেন সেক্রেটারি সোলতাইন্যা নিউইয়র্ক-প্যারিস-বন থাইক্যা ধাওয়া খাইয়া ফেরত আইলো আর বঙাল মুল্লুকের গবর্ণর ঠ্যাটা মালেইক্যা ঢাকার থনে পিন্ডি যাইয়া হাজির হইলো। বুড্ডা বিল্লী নুরুল আমীন আগের থনেই পাকিস্তানে রইছে। ইসলামের যম, গোলাম আযম আর খুলনার খবরের কাগজের হকার এজেন্ট-মন্ত্রী মওলানা ইউসুইপ্যা ইসলামাবাদে যাইয়া ‘ইয়েচ ছ্যার’ কইলো। আর লারকানার পোংটা পোলা জুলফিকার আলী ভুট্টো মদের গিলাস হাতে তু মেরি মানকি মোতি হ্যায় গান গাইতে গাইতে চাকলালা বিমানবন্দরে উপস্থিত হইলো। টেলিগ্রাম পাইয়া নতুন মামু, পুরানা চাচা, পরানের দোস্ত- হগ্গলে আইস্যা হাজির হইলো।

এদিকে ঢাকার কারবার হুনছেননি? হেই দিন আতকা কই থনে আমাগো কাল্লু মিয়া, যারে মহল্লার মাইনষে আদর কইরা কাল্লু কইয়া ডাকে- হেই কাল্লু আইস্যা হাজির। বেডায় চিতকার করতাছিল। ভাইসাবরা কারবার হুনছেননি? পিআইএ প্লেন সার্ভিস নাইক্যা। দুই চাইর খান যে টেরেন চলতাছিল, হেইগুলার চাক্কা বন্দো। বাস সার্ভিস তো আগেই ইস্তফা। ঢাকা থাইক্যা বাইরাইনের হগ্গল রাস্তা বন্দ্।

চিল্লানী থামাইয়া কাল্লু আমাগো কাছে আগগুইয়া আইলো। আস্তে কইরা জিগাইলো, আচ্ছা ভাইসাব, বিচ্চু কারে কয়? হেরা দেখতে ক্যামন? হেগো ডেরেশ কি রকমের?

আতকা আমাগো বকশিবাজারের ছক্কু মিয়া একটা বাইশ হাজার টাকা দামের হাসি দিয়া গলাটার মাইদ্দে জোর খাকরানি মাইরা কইলো, আমাগো কাউলা একটা আহাম্মক। যুদ্ধের শুরু হওয়ার সাড়ে আটমাস বাদে হালায় জিগাইতাছে বিচ্চুগো ডেরেশ কি রকমের! তয় হোন। এরা হইতাছে দিনকা মোহিনী, রাতকা বাঘিনী, পলক পলকে মছুয়া ঘষে।’ হেইদিন যারা বনানীতে প্রাক্তন গবর্নর মোনেম খাঁরে মার্ডার কইরা হের লাস গায়েব কইরা ফালাইলো- হেগো বিচ্চু কয়। এগো কোনো ডেরেশ নাই।

হ-অ-অ-অ। হেই দিক্কার কারবার হুনছেননি? লেংড়া, কানা খোড়া, বোচা যেইসব বুড়াবুড়ি পাঞ্জাবি মছুয়া আর্মি থনে চাকরিতে রিটায়ার করনের পর স্মাগলিং আর বিলেক মার্কেটের বিজিনেস করতেছিল, জঙ্গি প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান হগ্গলেরেই লড়াই করনের লাইগ্যা কল করছে। রিপোর্ট না করলে ৭ বছরের সশ্রম কারাদন্ড। এইগুলারেই কয় কামানের খোরাক। এই খবর শুইন্যা বিচ্চুগো মুখ দিয়া অক্করে লালা পড়তে শুরু করছে। মছুয়া কোবায়ে কি আরাম ভাই, মছুয়া কোবায়ে কি আরাম!

যেই রকম খবর পাইতাছি, তাতে মনে হয় রোজার ঈদের পর থাইক্যাই বাঙালি গেরিলারা পাগলা হয়ে উঠছে। হাতের কাছে দালাল, রাজাকার আর মছুয়া সোলজার পাইলেই বাড়ি, আরে বাড়ি রে বাড়ি! পাকিস্তান বাহিনীর অবস্থা অক্করে ছেরাবেরা।

এইদিকে জাতিসংঘের সেক্রেটারি জেনারেল উ থান্ট প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ারে সাপোর্ট দেওনের লাইগ্যা যে ট্রিকস করছিল, হেইটা ভি গরবর হইয়া গেল। উথান্ট সাবে ঢাকায় জাতিসংঘের ৩৫ জন সাদা চামড়ার অফিসার পোস্টিংয়ের পর হেগো হাত দিয়া দিব্বি পাকিস্তান আর্মিরে মালপানি আর রসদ জোগাইতেছিল। হেরাই অহন মুক্তিবাহিনীর মাইরের চোটে ঝাইড়া ব্যাংকারে দৌড়াইতাছে। ব্যাংকারে বইস্যা বিদেশী সাংবাদিকগো কইছে যে ঢাকার অবস্থা খুব খারাপ। সমস্ত ফরেনাররা ভাগনের লাইগ্যা সুটকেস গুছাইতাছে। যে কোনো টাইম আসল কারবার হয়ে যেতে পারে। আসলেই বাঙালি গেরিলারা ডেইঞ্জারাস!

এ্যাঃ এ্যাঃ। চাইরো মুড়া পানি পাইয়া মুন্সিগঞ্জের বিচ্চুরা একটা জব্বর কাম কইরা বইছে। তাগো কাথাবার্তার ধরনটাই আলাদা।
কই না তো! আমাগো মুন্সিগঞ্জে কোনো টাইমেই মছুয়া আছিলো না তো! আমরা কোনোদিনই পাকিস্তানী কোনো সোলজার দেখি নাইক্যা!

কয় কি! হাড্ডির হিসাব পর্যন্ত নাই, সব লাশ গায়েব। আজরাইল ফেরেশতা পর্যন্ত মাথা খুজতাছে। কেইসটা কি! জান কবজ করলাম ঠিকই। কিন্তু লাস নাইক্যা! অক্করে ভানুমতির খেইল!

এইদিকে সিলেট টাউন আন্দার, রংপুরে কোদালিয়া মাইর, মেহেরপুরে ঘেরাও, ঈশ্বরদি এয়ারপোর্ট ডাবিশ, কুষ্টিয়ায় মছুয়ারা মউত কা সামান লে চলে; কিশোরগঞ্জে সাইলেন্ট বায়স্কোপ, চাঁদপুর, বরিশাল মাদারিপুরে দরিয়ার মইদ্দে চুবানি। যশোরে গেঞ্জাম আর বগুড়ায় ইডা কেংকা কইরে হলো রে!

ঢাকা এয়ারপোর্টের কন্ট্রোল টাওয়ার গুড়া, রানওয়েতে অনেকগুলা পুকুর, কংক্রিটের বাংকারে শয়ে শয়ে পাকিস্তানী সোলজারগো লাশ। আজরাইল ফেরেশতা ওভারটাইম কইরাও হিসাব মিলাইতে পারতাছে না। খালি নোট করতাছে, শের মোহাম্মদ খান, লাহোর এবং গয়রহ। এই গয়রহের মধ্যে কিন্তু শ তিনেক মছুয়া সোলজারের নাম রইছে।

এইদিকে একদল মুক্তিবাহিনী আবার মেহেরপুরে হাজির হইয়া আরে ধাওয়ানী রে ধাওয়ানী। একই সঙ্গে মর্টার আর মেশিনগানের গুলি।

কইছিলাম না, আমাগো টাইম আইব? এক মাঘে শীত যাইব না। ভোমা ভোমা সাইজের পাকিস্তানী সোলজাররা একদিনের যুদ্ধে গোটা কয়েক ট্যাংক ফালাইয়া চোঁ দৌড়। খানিক দূর যাইতেই দেহে কি? আরেকদল বিচ্চু খালি ডাকতাছে, আ টি টি টি। গেরামের গৃহস্তের বউরা যেমন কইরা মুরগিরে আধার খাওনের লাইগ্যা ডাক দেয়। ঠিক হেমতে কইরা বাঙালী গেন্দা পোলাগুলা কী সোন্দর ডাক দিতাছে আ টি টি টি।

হেরপর বুঝতেই পারতেছেন। ঘ্যাটাঘ্যাট, ঘ্যাটাঘ্যাট, ঘ্যাটাঘ্যাট, ঘ্যাটাঘ্যাট। কয়েক শ মছুয়া হালাক হইল। এই খবর না পাইয়া, পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট সেনাপতি ইয়াহিয়া খান অক্করে ঘং ঘং কইর‌্যা কাইন্দা ভরাইছে। হালাকু খান, তৈমুর লং, নাদির শাহ, হিটলার, মুসোলিনি তোজো আর আব্বাজান আইয়ুব খানের নামে কসম খাইয়া খালি সমানে বিদেশি রাষ্ট্রগুলারে টেলিগ্রাম করতাছে। হেল্প, হেল্প।

কিন্তুক মউলুবি সাবে বহুত লেট কইরা ফেলাইছেন। অখন বাংলাদেশের লড়াইয়ের ময়দানে খুন কা বদলা খুনের কারবার চলতাছে। মুক্তিবাহিনীর বিচ্চুরা হইতাছে, দিনকা মোহিনী, রাতকা বাঘিনী, পলক পলকে মছুয়া ঘষে।

হেইর লাইগ্যা শুরুতে কইছিলাম, দম মাওলা, কাদের মাওলা।

পাদটিকা : চরমপত্রের যুদ্ধকালীন কথিকাগুলোর মধ্যে উপরেরটি ক্লাসিক পর্যায়ে পড়ে। এক্ষেত্রে সময় ও একটা বড় ভূমিকা রেখেছে। মুক্তি বাহিনী বাংলাদেশের অনেক অঞ্চলই মুক্ত করে ফেলেছে। ভারতকে আক্রমণ করেছে পাকিস্তান আগের দিন ৩ ডিসেম্বর। ওই বিমান হামলা আর ব্ল্যাক আউটের মধ্যেই এমআর আখতার মুকুল এটি রচনা করেন যা অসাধারণ বললে কম বলা হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *