চাঁদের আলোয় ঢাকা সূর্যালোক তাজউদ্দীন আহমদ -সুকান্ত পার্থিব

“বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের মহানায়ক তাজউদ্দীন আহমদের জন্মদিনে গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি স্বরূপ লেখাটি নতুন পাঠকদের জন্যে পূনরায় প্রকাশ করা হলো”।

একজন মানুষ যখন জীবন-সংসারের সব মায়া-মমতা ত্যাগ করে নিজের প্রাণ বাজি রেখে মাতৃভূমিকে অকৃত্রিম ভালোবাসে, আর সেই ভালোবাসার প্রতিদান স্বরূপ যদি তিরস্কারে ভূষিত হয় তখন তার জীবনে কি পাবার বাঁকি থাকে? বাস্তবতার আলোকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, রিক্ত হাত-পা আর দেশপ্রেমের অপার মহিমা নিয়েই নিঃসঙ্গতায় দিনাতিপাত করতে হয় তাকে! বিজ্ঞান-প্রযুক্তির অসাধ্য সাধিত অবদানে অনেকের কাছেই তুচ্ছ মনে হয় যখন কৃত্রিম আলো আমাদের চারপাশকে গ্রাস করে থাকে! কিন্তু, সূর্যের আলো ব্যতিত জীবনের স্পন্দন অনেকটাই হুমকীর সম্মুখীন! তবুও রাত্রিকালে আমরা আলোকিত হয়ে থাকি বিজ্ঞানের মহোত্তম দান ইলেকট্রিক বাল্বে। চাঁদের যে আলো রাত্রের আকাশ থেকে পৃথিবীকে সুমিষ্ট আলোয় আলোকিত করে তাও তো সূর্যের কাছ থেকেই প্রাপ্ত। ঘন ঘন মস্ত বড় বিল্ডিংয়ের ভিড়ে কোন বদ্ধ ঘরে সূর্যের আলো পৌঁছায় না, সেখানে ইলেকট্রিক বাল্বই একমাত্র অবলম্বন। সেখানে সূর্যের আলোর কামনা করা অনেকটাই বৃথা বৈ কি! তেমনি কৃত্রিমতার মাঝে বাস করতে করতে দিব্যালোকের কথা যেন চেতনা হতে বিচ্ছুত হওয়া শুরু করেছে বোঁটা থেকে পাকা ফল খসে পড়ার মতো! প্রকৃত ইতিহাসকে আড়াল করার পাঁয়তারায় কোন স্বার্থান্বেষী কুচক্রী মহল সূর্যের আলোর স্থলে অধিষ্ঠিত করেছে কৃত্রিম আলোক শক্তিকে। কিন্তু, ঐ কৃত্রিম আলোও তো সূর্যের আলোক শক্তি থেকে সৌর পদ্ধতি বা সোলার সিস্টেমের মাধ্যমে উৎপাদন করা যায়। মিথ্যা, পশ্চাদগামীতা আর কল্পনায় ঘেরা কৃত্রিম আলোর জগতের মানুষেরা হয়ত ভুলতে বসেছে সৌরশক্তি ছাড়া উদ্ভিদের খাদ্য প্রক্রিয়া ও প্রাণিকূলের যথাযথ জীবনধারণ প্রকৃতপক্ষে নিষ্প্রভ! এতকিছু সত্ত্বেও যেখানে অস্তিত্ত্ব টিকে রাখা চরম হুমকির সম্মুখীন সেক্ষেত্রে স্থুল জ্ঞান-বুদ্ধিসম্পন্ন প্রাকৃতিক আলোহীন বদ্ধ ঘরের মানুষজন কৃত্রিম আলো নিয়ে মাতামাতিতে সদা ব্যস্ত। একজনের অবদানকে খাটো করার সমীকরণে ফেলে সত্য ও বাস্তবতাকে অস্বীকার করে কৃত্রিমতাকে নিয়ে তবে কেন এত বাড়াবাড়ি?
বাঙালির মুক্তি সংগ্রামে যাঁর অমিত সাহসী নেতৃত্বে ও প্রগাঢ় দেশপ্রেমের মহিমায় নতুন প্রাণ ফিরে পেয়েছিল সমগ্র জাতি; সেই মহান দেশপ্রেমিক হলেন তাজউদ্দীন আহমদ। ‘যিনি এই বাংলাদেশের বুকে কৃত্রিম আলোকের ভিড়ে গভীর অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়েছেন’- এই কথাটি দৃঢ়ভাবে বললে অসত্য কিংবা অযৌক্তিক দেখায় না! জীবনোৎসর্গের প্রত্যয়ে সম্মুখপানে লড়ে একজন, তাঁর কৃতির পুরস্কার হিসেবে যশ, উপমা, সম্মান–এ ভূষিত হয় আরেকজন! বাঙালির জাতীয় জীবনে নতুন প্রজন্মের কাছে শেখ মুজিবুর রহমান’কে স্রষ্টার পরবর্তী আসনে আসীন করতে আওয়ামী লীগ ও এদের সমর্থিত তথাকথিত বুদ্ধিজীবী মহল বতি ব্যস্ত ‘মুজিব বন্দনায়’। যেন মুজিব একাই পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর সাথে সম্মুখ অস্ত্র যুদ্ধ মোকাবেলা করে ছিনিয়ে এনেছেন বাঙালির শাশ্বত স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব! বাঁকি নেতৃবৃন্দ বসে বসে তা অবলোকন করেছেন আর কি! ভারতে আশ্রিত তথা পাকিস্তান বিদ্বেষী হবেন না বলে আমাদের মহান নেতা পরিবার ও নিজের কথা ভেবে মুক্তিযুদ্ধের সমন্বয় সাধন ও সংগঠিত করতে আত্মগোপন করতে দ্বিধাবোধ করেছিলেন। তবে কি তাঁর মহৎ দেশপ্রেম সভা-সমাবেশে জনগণকে তুখোড় বক্তৃতা কিংবা বজ্র্যকন্ঠে জ্বালাময়ী ভাষণে আশার বাণীতে সীমাবদ্ধ? বজ্র্যনিনাদ ভাষণ দিলেই কি আপামর জনগণ সঠিক দিক নির্দেশনা পেয়ে প্রতিরোধের প্রস্তুতি শুরু করতে পারে যদি জনগণ অসহায় নিরস্ত্র হয়ে পড়ে থাকে?
তৎকালীন সার্বিক পরিস্থিতি বিচার করে বাঙালির মুক্তির সনদ ‘ছয় দফা’ স্বায়ত্তশাসন অর্জনের জন্যে দলীয় সিদ্ধান্তেই তাজউদ্দীনের মতো মেধাবী দূরদৃষ্টিসম্পন্ন নেতার হাতেই রচিত হয়েছিল। মুজিব অসাধারণ বক্তা ছিলেন তৎকালীন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে, যার ফলে ১৯৪৭ এর পর থেকেই সভা সমাবেশে সোহরাওয়ার্দী-ভাষানীর পাশেই সামনের সারিতেই হতো তাঁর অবস্থান। তাঁদের অনুপ্রেরনায় নেতৃত্বের অগ্রভাগে অংশগ্রহনের লক্ষ্যে বিশেষত তাজউদ্দীনসহ অন্যান্য নেতাকে নিয়ে এগিয়ে যেতেন নির্দ্বিধায় সাহসী ভূমিকায়। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কলা-কৌশল, নীতি, ব্যবস্থা-অবস্থা, পরিস্থিতি এবং জনগণের প্রাপ্য অধিকার আদায় এসব বিষয়ে সুপষ্ট ও সম্যক ধারনা পেতে শেখ মুজিব সবসময় সাহায্যের জন্যে নির্ভর করেছেন তাজউদ্দীনের মতো মেধা-মনন-প্রজ্ঞাসম্পন্ন রাজনীতিবিদের উপর। বাস্তবিকপক্ষে, মুজিব অনেকাংশে ছিলেন আত্মঅহংকারী, উচ্চাভিলাষী, আবেগপ্রবণ! সে কারণে আবার অনেক ক্ষেত্রেই নিজের অদূরদর্শী মস্তিষ্কের সিদ্ধান্তকেই সঠিক বলে মেনে নিয়েছেন এবং তিরস্কৃত করেছেন অন্য নেতৃবৃন্দের উপদেশ-অনুরোধ। তার যথার্থ প্রমাণ মেলে ১৯৭১ এর ২৫ মার্চে।
২৫ মার্চ, ১৯৭১ সন্ধ্যাবেলা, প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান যখন চলে গিয়েছিলেন পশ্চিম পাকিস্তানে, তখন একটা চরম সঙ্কটপূর্ণ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল পূর্ব পাকিস্তানে। সবাই ভাবতে থাকেন বিপদাসন্ন এই মুহূর্তে কি তাদের করণীয়? এসময় তাজউদ্দীন আহমদসহ আরও কিছু নেতা ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে শেখ মুজিবের বাড়িতে সমবেত হয়েছিলেন। তাজউদ্দীন আহমদ ওই রাতেই স্বাধীনতার ঘোষণার ছোট্ট একটি খসড়া তৈরি করে টেপরেকর্ডারে ধারণ করার জন্য শেখ মুজিবকে পড়তে দেন। শেখ মুজিব খসড়াটি পড়ে নিরুত্তর থাকেন এবং এড়িয়ে যান। এ ঘটনাটি তাজউদ্দীন আহমদের কাছ থেকে শুনেছিলেন মুজিবনগরে প্রতিষ্ঠিত স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের বিশেষ প্রতিনিধি মঈদুল হাসান। পরবর্তীতে এসবকিছুর আলোকপাত ঘটেছে ‘মুক্তিযুদ্ধের পূর্বাপর কথোপকথন’ নামক গ্রন্থে। মুক্তিযুদ্ধের পরপরই মঈদুল হাসান যখন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করছিলেন, তখন তাজউদ্দীন আহমদকে ঐ ব্যাপারে তিনি জিজ্ঞেস করেছিলেন। ঘোষণাটা ছিল তাজউদ্দীন আহমদের নিজের লেখা। লেখাটা ছিল এমন—“পাকিস্তানি সেনারা আমাদের আক্রমণ করেছে অতর্কিতভাবে। তারা সর্বত্র দমননীতি শুরু করেছে। এ অবস্থায় আমাদের দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে সবাইকে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে এবং আমি (তথা শেখ মুজিবুর রহমান) বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করলাম নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি হিসেবে”।
তাজউদ্দীন আহমদের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি যখন শেখ মুজিবকে বললেন, ‘মুজিব ভাই, এটা আপনাকে বলে যেতেই হবে; কেননা কালকে কি হবে, আমাদের সবাইকে যদি গ্রেফতার করে নিয়ে যায়, তাহলে কেউ জানবে না তাদের কি করতে হবে? এ ঘোষণা কোনো না কোনো জায়গা থেকে কপি করে আমরা জানাব। যদি বেতার মারফত কিছু করা যায়, তাহলে সেটাই করা হবে’। তাজউদ্দীন আহমদ ঘোষণাটি দিতে অনুরোধ জানালে মুজিব উত্তর দেন, ‘এটা আমার বিরুদ্ধে একটি দলিল হয়ে থাকবে। এর জন্য পাকিস্তানিরা আমাকে দেশদ্রোহের জন্য বিচার করতে পারবে’। এ কথার ফলে স্পষ্টভাষী ও সত্যবাদী তাজউদ্দীন অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হয়ে সঙ্গে সঙ্গে রাত সম্ভবত ৯টার পরপরই ৩২ নম্বর ছেড়ে চলে যান। তিনি যখন রেগে বেরিয়ে যাচ্ছেন, তখন ৩২ নম্বর বাড়ির দরজার বাইরে তাজউদ্দীনের হাত ধরে তৎকালীন আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক আবদুল মোমিন বললেন, ‘তুমি রেগে চলে যাও কেন’? তখন তাজউদ্দীন তার কাছে ঘটনার বর্ণনা করে বললেন, ‘বঙ্গবন্ধু এইটুকু ঝুঁকি নিতেও রাজি নন। অথচ আমাদের ওপর একটা আঘাত বা আক্রমণ আসছেই’। সেসময় তাজউদ্দীন আহমদ ব্যাখ্যা করে বলেছিলেন, ‘যেখানে আন্দোলনের সর্বোচ্চ নেতা; যাঁকে এতবার করে বলেছি, আজকে সন্ধ্যাতেও বলেছি, তিনি কোথাও যেতে চাইলেন না’ এবং তাঁকে স্বাধীনতার ঘোষণার জন্য যে সংক্ষিপ্ত একটা ঘোষণা বা বার্তা টেপরেকর্ডে ধারণ বা ওই কাগজে স্বাক্ষর করার জন্য বলায় তিনি বললেন, ‘এটাতে পাকিস্তানিরা তাঁর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা করতে পারবে! তিনি এতটুকুও যখন করতে রাজি নন, তখন এ আন্দোলনের কি-ই বা ভবিষ্যৎ’? মুক্তিযুদ্ধ আরম্ভকালে ‘মুক্তিযুদ্ধের কর্ণধার’ হিসেবে নেতৃত্বের আসনে অধিষ্ঠিত হবার চেয়েও পাকিস্তানিদের হাতে গ্রেফতারের গর্ববোধ মুজিবের একক দিকদর্শীহীন সিদ্ধান্তের কারণে বেশি পরিমাণে জেগেছিল তাঁর ভেতরে! ফলশ্রুতিতে, যার মাশূল গুনতে হয়েছিল তাজউদ্দীনসহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দের! যখন মুজিব আত্মগোপন করতে অসম্মতি জানিয়েছিলেন তখন তাজউদ্দীন নিজেও মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনার উদ্দেশ্যে সঙ্ঘবদ্ধ হতে চরম হোঁচট খেয়েছিলেন। তাই, পরিবারকেও বিদায় বেলায় দিকনির্দেশনামূলক কোনকিছু বলে যেতে পারেন নি। ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলাম ও ড. কামাল হোসেন-এর সাথে বাসা থেকে এক কাপড়ে বেড়িয়ে যাবার তিন দিন পর তাঁর স্ত্রী জোহরা তাজউদ্দীনের কাছে একটা চিরকুট লিখে পাঠিয়েছিলেন বিশ্বস্ত জনৈক ব্যক্তির হাতে। তাতে কয়েকটি লাইন এভাবে লেখা ছিল-“আমি চলে গেলাম। আসার সময় বলে আসতে পারিনি। মাফ করে দিও। তুমি ছেলেমেয়ে নিয়ে সাড়ে ৭ কোটি মানুষের সঙ্গে মিশে যেয়ো। কবে দেখা হবে জানি না। বাংলাদেশের মুক্তির পর”। উপরোক্ত লাইনগুলোর মাঝেই প্রকাশ পায় তাজউদ্দীনের প্রগাঢ় দেশপ্রেমের, যে মানুষটি নিজের প্রাণের ও পরিবারের মায়ার বন্ধনে আবদ্ধ না হয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন স্বদেশ রক্ষার মহৎ বাঞ্ছনায়।
কোন জাতির ক্রান্তিলগ্নে সেই জাতিকে রক্ষা করতে যে মহৎ প্রাণ আবির্ভূত হয় সকল মায়ার বন্ধন ছিন্ন করে তিনিই জাতির প্রকৃত কান্ডারী, আদর্শবান দেশপ্রেমিক মহান নেতা। এমন ভূমিকায় জাতির ত্রাতা হিসেবে মুক্তিযুদ্ধে অসীম সাহসে জ্বলে উঠে বলিষ্ঠ নেতৃত্ব প্রদান করেছিলেন তাজউদ্দীন আহমদ। বিশ্ব জনপ্রতিনিধির সমর্থন পেতে যিনি ছুটেছিলেন একজন থেকে আরেকজন গুরুত্বপূর্ন ব্যক্তির কাছে বৈঠকের পর বৈঠকে অংশ নিতে। স্বাধীন বাংলাদেশের সরকার গঠনের সময় নিজেসহ সবাইকে অঙ্গীকার করিয়েছিলেন যে, “স্বাধীন না হওয়া পর্জন্ত কেউ সংসার ধর্ম পালন করবেন না, যা তিনি অক্ষরে অক্ষরে সেই অঙ্গীকার রক্ষা করেছিলেন। তিনি উক্ত সরকারের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেয়ায় ঘোর বিরোধিতা করেছিলেন শেখ মুজিবের ভাগ্নে টগবগে কম্পনরত রক্তের অধিকারী যুব নেতা শেখ ফজলুল হক মণি। দলের অভ্যন্তরের কোন্দলে ও সিদ্ধান্তহীনতায় মুক্তিযুদ্ধ সংগঠিত করতে প্রতি পদে পদে বাধাগ্রস্থ হয়েছেন তাজউদ্দীন। তবুও তিনি অবিচল থেকেছেন সঠিক দূরদর্শী সিদ্ধান্তে ও দিক নির্দেশনায়। ৯ আগস্ট, ১৯৭১ ভারত-সোভিয়েট মৈত্রী চুক্তি সম্পাদন হবার পর মুক্তিযুদ্ধে কাঙ্ক্ষিত বিজয়কে দ্রুত ত্বরান্বিত করার লক্ষ্যে রাশিয়ার পূর্ণ সমর্থন ও সহযোগিতা পাবার নতুন এক দ্বারের উন্মোচন হয়েছিল যাতে ভারত স্বতঃস্ফুর্তভাবে বাংলাদেশকে সরাসরি সাহায্য করতে পারে। তাই, দিল্লীর আশ্বস্ততায় তাজউদ্দীন বাংলাদেশের স্বাধীনতাকামী সকল রাজনৈতিক দলকে সঙ্গে নিয়ে “জাতীয় মোর্চা বা জাতীয় মুক্তি ফ্রন্ট” গঠনের সাহসী উদ্দ্যোগ নিয়েছিলেন, যা অস্থায়ী প্রেসিডেন্ট সৈয়দ নজরুলের অসম্মতিতে ও দলীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার অভাবে আঁতুর ঘরেই ভেঙ্গে পড়েছিল। তবুও ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সাথে তাঁর ফলপ্রসূ আলোচনার মাধ্যমে ভারতের সাহায্যের সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করেছিল। ফলশ্রুতিতে, তাজউদ্দীনের নেতৃত্বে ভারত সরকারের মাধ্যমে মুক্তিযোদ্ধাদের যথোপযুক্ত অস্ত্র-ট্রেনিং প্রদান, পরবর্তীতে ভারতীয় মিত্রবাহিনীর সরাসরি অংশগ্রহন, বাংলাদেশের বামপন্থী সংগঠনগুলোর সহযোগিতা বিশেষত কমরেড মণি সিংহ–এর সাহসী প্রচেষ্টায় রাশিয়ার প্রত্যক্ষ সমর্থন, বাঙালি জাতিকে পৌঁছে দিয়েছিল স্বাধীনতা অর্জনের আকাঙ্ক্ষিত বিজয়ের অভূতপূর্ব মুহূর্তে।
পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে শেখ মুজিবুর রহমান দেশে ফিরে আসার সময় তাঁর জন্যে ভারত সরকার লন্ডনে একটি বিমান পাঠানোর প্রস্তাব দিয়েছিল। কিন্তু, মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী শক্তি ইঙ্গ-মার্কিন সাম্রাজ্যবাদীদের সন্তোষ রক্ষার্থে মুজিব দেশে ফিরেছিলেন ব্রিটিশ এয়ারওয়েজে। মুক্তিযুদ্ধের পরপরই এই হলো মিত্র বা অকৃত্রিম বন্ধুর প্রতি শেখ মুজিবের ভালোবাসার একটি অসামান্য নিদর্শন! স্বাধীন বাংলাদেশে ফেরার পর মুজিব একবার ভুল করেও তাজউদ্দীন আহমদ বা সৈয়দ নজরুল বা মনসুর আহমদ বা এইচ.এম কামরুজ্জামান (বিশেষভাবে যারা মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনার অগ্রসারী ছিলেন) –এর কাছে জানতে চাননি কিভাবে দেশ স্বাধীন হয়েছিল তাঁদের দিকদর্শী নেতৃত্বে? পরবর্তীতে, ১৯৭২ সালে ড. কামাল হোসেন, তাজউদ্দীন আহমেদ–এর দূরদৃষ্টিসম্পন্ন মেধা-প্রজ্ঞা-আদর্শ-স্বপ্নে রচিত হয়েছিল স্বাধীন বাংলাদেশের অনবদ্য এক সংবিধান যার চারটি মূলনীতি তাজউদ্দীন নিজেই উত্থাপন করেছিলেন মুক্তিযুদ্ধের চেতনার আলোকে।
শেখ মুজিবের অনুপুস্থিতে যে মহান দেশপ্রেমিক তাজউদ্দীন মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বে কান্ডারীর ভূমিকা পালন করেছিলেন তাঁকেই মুজিব ১৯৭৪ এর ২৬ অক্টোবরে মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করেছিলেন। প্রকৃত ও পরিক্ষিত দেশপ্রেমিকের প্রতি এটি হলো শেখ মুজিবের কৃতজ্ঞতা ও ভালোবাসার আরেকটি অনন্য উপহার! তাঁদের মাঝে নীতিগত বিরোধ দেখা দেবার ফলেই সুন্দর সম্পর্কে ফাটল ধরেছিল। আদর্শ ও আত্মত্যাগী চারিত্রিক দৃঢ়তাসম্পন্ন ব্যক্তিত্বই তাজউদ্দীনের কাছে ছিল মহত্তোম বিষয়। পদত্যাগ করতে তাই ব্যক্তি নয় নীতিগত বিষয়কেই তিনি প্রাধান্য দিয়েছিলেন। মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগের দিন সকালে অশ্রুসিক্ত চোখে এক সচিবের সাথে আলাপকালে দুঃখ ভারাক্রান্ত কন্ঠে তাজউদ্দীন বলেছিলেন-‘কোনো দিন নিজের কথা ভাবিনি। আমি বঙ্গবন্ধুর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশকে দেখেছিলাম’। পদত্যাগের পরবর্তী সময়ে পূর্ব পাকিস্তানের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী আতাউর রহমান খানকে এক প্রশ্নের উত্তরে তাজউদ্দীন বলেছিলেন-“আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে। মুজিব ভাই চায় আমেরিকার সঙ্গে যোগাযোগ বেশি করতে। আর আমি চাই না”। এই হলো আদর্শবাদী কৃতজ্ঞ চিত্তের অধিকারী তাজউদ্দিন! শেখ মুজিবকে তিনি নিজের প্রাণের সম ভালোবাসতেন, শ্রদ্ধা করতেন, তিনিই তাঁর সুদূরপ্রসারী চিন্তা-চেতনা-আদর্শ-দেশাত্মবোধ আর মহোত্তম অবদানকে সঠিকভাবে মূল্যায়ন না করে ঠেলে দিয়েছিলেন গহীন অন্ধকারে। সেই অন্ধকারে নিমজ্জনের ফলাফল পরবর্তীতে দীর্ঘকালব্যাপী সমগ্র জাতির জন্যে গহীন থেকে হয়ে উঠেছিল গহীনতর! ফলে, মুখের বুলি আর বক্তৃতার ফুলঝুরিতেই জরাগ্রস্থ হয়ে সীমাবদ্ধ সোনার বাংলা গড়ার স্বপ্ন!
সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশকে সঠিকভাবে গড়ার অভিপ্রায়ে সার্বিক উন্নতির জন্যে সবসময় ভেবেছিলেন নির্ভুল অর্থনৈতিক পরিকল্পনা ও ব্যবস্থার কথা, যা গণমানুষের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়। সম্পূর্ণ অসাম্প্রদায়িক ও উদার চিন্তার মানুষ হিসেবে বলেছিলেন-“বাংলাদেশ হবে একটি সম্পূর্ণ ধর্ম নিরেপেক্ষ রাষ্ট্র। এ দেশের নিরন্ন দুঃখী মানুষের জন্য রচিত হোক এক নতুন পৃথিবী। যেখানে মানুষ মানুষকে শোষণ করবে না। আমাদের প্রতিজ্ঞা হোক ক্ষুধা, রোগ, বেকারত্ব আর অজ্ঞানতার অভিশপ্ত থেকে মুক্তি”। তরুন প্রজন্মকে নতুন পথের সন্ধান দেবার লক্ষ্যে তাদেরকে নিয়ে একত্রে দেশ মাতৃকাকে গড়ে তুলতে স্পষ্ট কন্ঠে বলেছিলেন-“বক্তৃতা কমাতে হবে। এখন ভেবে দেখতে হবে বক্তৃতায় যা বলা হয়েছে তা করা হয়েছে কি না”! তাজউদ্দীনের এই মহামূল্যবান উক্তি এই সময়ের রাজনীতিবিদদের চরিত্র গঠনে চলার পথের পাথেয় হয়ে রবে।
যে খোন্দকার মোশতাক মুক্তিযুদ্ধে বিভিন্ন পদক্ষেপে তাজউদ্দীনকে সরাসরি বিরোধিতা করেছিলেন, তাঁরই প্ররোচনা ও চক্রান্তে শেখ মুজিব পাকিস্তান ও আমেরিকা প্রীতিতে মুগ্ধ হয়ে সাম্প্রদায়িকতার পথে হেঁটে ঐসব পাকিস্তানপন্থীদের সিদ্ধান্তকেই গ্রহন করেছিলেন সাদরে। ১৯৭৫ সালের জুলাই মাসের শেষে তাজউদ্দীন জানতে পারেন যে, সেনাবাহিনীর মাঝে একটি গ্রুপ রয়েছে যারা শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি চরম অসন্তুষ্ট। তারা তাঁকে মেরে ফেলার পরিকল্পনা করছে। মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগের পরেও শেখ মুজিবের প্রতি অগাধ শ্রদ্ধা-ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে বিনম্র চিত্তে সেই রাতেই শেখ মুজিবকে নিজে গিয়ে সচেতন করেছিলেন তাজউদ্দীন। কিন্তু, শেখ মুজিব বিভিন্ন স্ববিরোধী সিদ্ধান্তে মেতে লক্ষ্যহীন কন্টকাকীর্ণ পথে পা বাড়িয়ে তাঁর চোখে দেখা বিশ্বস্তের লেবাশধারীদের হাতেই তাজউদ্দীনের আশঙ্ক্ষা সত্যে রূপায়িত হয়েছিল খোন্দকার মোশতাক ও বিপথগামী লক্ষ্যভ্রষ্ট সেনাবাহিনীর চক্রান্তে শেখ মুজিবুর রহমান স্বপরিবারে হত্যার মাধ্যমে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টে। তাঁর সপরিবারে হত্যার খবর শুনে গভীর মর্মাহত হয়ে অশ্রুসজল নয়নে তাজউদ্দীন তাঁর স্ত্রীকে বলেছিলেন-“আমি মন্ত্রিসভায় থাকলে বঙ্গবন্ধুর ওপর কেউ আঘাত করতে পারত না। দুঃখ একটাই, মুজিব ভাই জেনে গেলেন না কে বন্ধু কে শত্রু”? শেখ মুজিবকে হত্যার পরপরই তাজউদ্দীনসহ বাঁকি তিন জাতীয় নেতা গৃহবন্দী হবার পরে ২২ আগস্ট, ১৯৭৫ এ নিক্ষিপ্ত হলেন কারাগারে। তাজউদ্দীন পুলিশের কাছে গ্রেপ্তার হবার প্রাক্কালে পরিবারের সদস্যদের প্রতি শুধু দৃঢ় চিত্তে বলে গিয়েছিলেন- ‘মনে করো চিরদিনের জন্য যাচ্ছি’। ৩ কন্যা, ১ পুত্রসহ স্ত্রীকে ছেড়ে যাবার মুহূর্তে একবিন্দুও বিচলিত ছিলেন না তিনি। কিন্তু অন্যায়ের কাছে আপোস না করা দেশপ্রেমিক রাজনীতিবিদের এটাই ছিল অন্যতম বীরোচিত পদক্ষেপ। অতঃপর, খুনী বিশ্বাসঘাতক মোশতাকের ষড়যন্ত্রে ও খুনী বিপথগামী কিছু সেনাকর্মকর্তা ও সদস্যের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় ১৯৭৫ এর ৩ নভেম্বর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে ঝাঁঝালো গুলিবর্ষনে, বেয়নেটের পাশবিক আঘাতে নৃশংসভাবে ধুঁকে ধুঁকে মৃত্যুবরণ করতে হয়েছিল তাজউদ্দীনসহ অন্য তিন জাতীয় নেতাকে।
স্বাধীনতা অর্জনের চল্লিশ বছর পরেও বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের রক্তক্ষয়ী সঠিক ইতিহাস সম্পূর্ণরূপে আজও কারো হাতে রচিত হয়নি! কখনো কোন সত্যানুসন্ধানীর হাতে রচিত হলে সেখানে অবশ্যই উঠে আসবে ‘চাঁদের ছায়ায় অন্ধকারে নিমজ্জিত সূর্যালোক তাজউদ্দীন আহমদ’–এর অনন্য ভাস্বর অবদানের কথা, তখন আর স্বার্থান্বেষী রাজনৈতিক মহলের প্ররোচনায় ইতিহাস থেকে পৃথক হবে না তাজউদ্দীনের নাম। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ের অনেক সত্য আলোর সামনে এসেছে মুজিবনগর সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব মঈদুল হাসানের মূলধারা’৭১ প্রকাশ পাবার পর। তাজউদ্দীনের একটি ডায়েরিতে লিপিবদ্ধ ভাষা আন্দোলন ও তার পরবর্তী ইতিহাস ‘তাজউদ্দীনের ডায়েরি’ নামে প্রকাশিত হলেও মুক্তিযুদ্ধের ঘটনাবলী ও তার পরবর্তী প্রায় চার বছরের ইতিহাস সম্বলিত ডায়েরি কপটচারীরা উধাও করার ফলে এখনো তার সন্ধান মেলেনি। তার সন্ধান মিললে ভবিষ্যতে তা প্রকাশের মাধ্যমে বাঙালি জাতির বহু অজানা ইতিহাস এবং দেশের জন্মকথার অনেক অজানা সত্য আলোর মুখ দেখবে।
গৌরবোজ্জ্বল কর্মময় জীবনে কোনো কাজেই তাজউদ্দীন দাবি করেননি নিজের কৃতিত্ব। বাংলা মাকে গভীরভাবে ভালোবেসে বলেছিলেন- ‘মুছে যাক আমার নাম কিন্তু বেঁচে থাক বাংলাদেশ’। এভাবেই আত্মঅহংকার বিসর্জন দিয়ে সবসময় কর্তব্য বিবেচনা করে নিঃস্বার্থভাবে, একাগ্রচিত্তে কাজ করে গেছেন জীবনের শেষ দিন অবধি। সত্য ইতিহাস অনুসন্ধানীদের খোলা চোখে শেখ মুজিব কখনোই আলোকিত হতে পারবেন না নিজের আলোয়, যদি সেই আলো তাজউদ্দীনের কাছ থেকে প্রাপ্ত না হয়! তাজউদ্দীনহীন ‘মুজিব বন্দনা বা জয়গান’ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও মিথ্যে। দেশপ্রেমের নিঃসঙ্গ জ্বলন্ত অগ্নিসারথী তাজউদ্দীন আহমদ মহাকালের অনুসন্ধান করে বের করা এমন এক শ্রেষ্ঠ মহৎ আদর্শবান ব্যক্তিত্ব; যার জন্ম বাংলা মায়ের গর্ভে না হলে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের গৌরবময় সময়ের ইতিহাস অঙ্কুরেই বিনষ্ট হতো!

সহায়ক রচনাপঞ্জিঃ
1. “আমার ছোটবেলা ১৯৭১ এবং বাবা তাজউদ্দীন আহমদ” – সিমিন হোসেন রিমি।
2. “আলোকের অনন্তধারা”, গ্রন্থনা ও সম্পাদনায় সিমিন হোসেন রিমি।
3. “ইতিহাসের পাতা থেকে” – সিমিন হোসেন রিমি।
4. “জাতীয় চার নেতা স্মারক গ্রন্থ”।
5. “মূলধারা ‘৭১”, মঈদুল হাসান।
6. ‘মুক্তিযুদ্ধের পূর্বাপর কথোপকথন’, প্রথমা প্রকাশনী।
7. মতিউর রহমান, ‘ইতিহাসের সত্য সন্ধানে’-সাক্ষাৎকার “জোহরা তাজউদ্দীন” (পৃষ্ঠাঃ ৫১-৬৩)।
8. মতিউর রহমান, ‘ইতিহাসের সত্য সন্ধানে’-সাক্ষাৎকার “জে এন দীক্ষিত” (পৃষ্ঠাঃ ১৬৪-১৮০)।
9. সৈয়দ আবদাল আহমদ, “বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতা ঘোষণা দেন নি”।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *