চির অম্লান ছয় শহীদ বুদ্ধিজীবী

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার প্রাক্কালে ঘটেছিল ইতিহাসের এক নৃশংসতম ঘটনা। হানাদার পাকিস্তানী সেনাদের পরাজয়ের পূর্ব মুহূর্তে নরঘাতক ইয়াহিয়া, টিক্কা, নিয়াজী ও ফরমান আলীর জল্লাদ বাহিনীর যোগসাজশকারী আলবদর, আল্শামসের দল এ দেশের প্রতিভাবান ব্যক্তি ও বুদ্ধিজীবীদের নিজ নিজ বাসা থেকে ধরে রায়েরবাজার, মিরপুর প্রভৃতি স্থানে নিয়ে হত্যা করে। তাঁরা শহীদ হলেও তাঁদের কীর্তি, অবদান বেঁচে রয়েছে আমাদের মাঝে। ক’জন শহীদ বুদ্ধিজীবীর আত্মত্যাগের ওপর সংক্ষিপ্ত আলোকপাত করা হলো।

শহীদুল্লাহ কায়সার:
সাংবাদিক ও সাহিত্যিক শহীদুল্লাহ কায়সার। পুরো নাম আবু নঈম মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ। পিতা মাওলানা মোহাম্মদ হাবীবুল্লাহ কলকাতা মাদ্রাসা-ই-আলীয়ার প্রথমে ছাত্র, পরে অধ্যাপক এবং সর্বশেষ অধ্যক্ষ পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। মাতা সুফিয়া খাতুন। জন্ম ১৬ ফেব্রুয়ারি ১৯২৭ খ্রি. ফেনী জেলার সোনাগাজী উপজেলার নবাবপুর ইউনিয়নের মজুপুর গ্রামে।

শহীদুল্লাহ কায়সার ১৯৪২ সালে মাদ্রাসা-ই-আলীয়ার এ্যাংলো-পার্শিয়ান বিভাগ থেকে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। অতঃপর প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হন। এই কলেজ থেকে ১৯৪৪ সালে আই.এ এবং ১৯৪৬ সালে অর্থনীতিতে অনার্সসহ দ্বিতীয় বিভাগে দ্বিতীয় স্থান অধিকার করে বি.এ ডিগ্রী লাভ করেন। এরপর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতিতে এম.এ ক্লাসে ভর্তি হন। একই সময়ে রিপন কলেজে আইন বিষয়ে অধ্যয়ন শুরু করেন।

শহীদুল্লাহ কায়সার কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে অধ্যয়নকালে বামপন্থী রাজনীতির প্রতি আকৃষ্ট হয়ে এই রাজনীতির সঙ্গে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। ঢাকায় পৌঁছে কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে যুক্ত হন। ১৯৪৭ সালের সেপ্টেম্বরে গণতান্ত্রিক যুবলীগ গঠনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। তিনি ১৯৫১ সালে পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারির বাংলা ভাষা আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন। ভাষা আন্দোলনে বলিষ্ঠ ও লড়াকু ভূমিকা রাখার কারণে শহীদুল্লাহ কায়সার ৩ জুন ১৯৫২ সালে গ্রেফতার হন। তৎকালীন সরকার তাঁকে সাড়ে তিন বছর কারাগারে আটকে রাখে। কারাগার থেকে বের হওয়ার অল্প কয়েকদিনের মধ্যে পাকিস্তান সরকার তাঁকে আবার গ্রেফতার এবং কারারুদ্ধ করে। আন্দোলনের মুখে বাধ্য হয়ে ৮ সেপ্টেম্বর ১৯৫৬ সালে তাঁকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়।

শহীদুল্লাহ কায়সার ১৯৪৯ সালে তৎকালীন সাপ্তাহিক ইত্তেফাক পত্রিকায় যোগদানের মাধ্যমে পূর্ণভাবে সাংবাদিকতা জীবন শুরু করেন। অতঃপর ১৯৫৮ সালে দৈনিক সংবাদ পত্রিকায় সহকারী সম্পাদক পদে নিযুক্ত হন। দৈনিক সংবাদ পত্রিকায় তিনি যুগ্ম সম্পাদক পদে উন্নীত হন। দৈনিক সংবাদ সম্পাদনার পাশাপাশি তিনি নিয়মিত ‘দেশপ্রেমিক’ ছদ্মনামে ‘রাজনৈতিক পরিক্রমা’ ও ‘বিশ্বকর্মা’ ছদ্মনামে ‘বিচিত্র কথা’ শীর্ষক উপসম্পাদকীয় লিখতেন। তাঁর লেখায় আমাদের ভাষা, স্বাধিকার ও স্বাধীনতার মর্মকথা ফুটে উঠত।

শহীদুল্লাহ কায়সার রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, ভাষা সৈনিক, সাংবাদিক ও সাহিত্যিক। তিনি তাঁর লেখায় বাঙালি জীবনের আশা-আকাঙ্খা, দ্বন্দ্ব-সংঘাত ও সংগ্রামী চেতনা তুলে ধরেছেন নিপুণ কারিগরের মতো। তিনি জনজীবনের আলেখ্য রূপায়ণে দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। তাঁর দু’টি বিখ্যাত উপন্যাস সারেং বৌ (১৯৬২) ও সংশপ্তক (১৯৬৫)। রাজবন্দীর রোজনামচা (১৯৬২) তাঁর স্মৃতিকথা। তাঁর ভ্রমণ বৃত্তান্ত গ্রন্থ পেশোয়ার থেকে তাশখন্দ (১৯৬৬)। তিনি সারেং বৌ উপন্যাসের জন্য ১৯৬২ সালে আদমজী ও বাংলা একাডেমি পুরস্কার লাভ করেন। ১৯৮৩ সালে সাংবাদিকতায় একুশে পদক ও ১৯৯৮ সালে সাহিত্যে স্বাধীনতা পদক লাভ করেন।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের চূড়ান্ত বিজয়ের মাত্র কয়েকদিন পূর্বে ১৪ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে পাক হানাদার বাহিনীর এ দেশীয় দোসর আলবদর বাহিনীর সদস্যরা তাঁর বাসভবন থেকে তাঁকে অপহরণ করে নিয়ে যায়। এরপর তাঁর আর কোন সন্ধান পাওয়া যায়নি। তিনি শহীদের মর্যাদায় অভিষিক্ত।

জহির রায়হান:
জহির রায়হান বাংলা সাহিত্য, সংস্কৃতি, সাংবাদিকতা ও চলচ্চিত্রে কিংবদন্তি হয়ে আছেন। কলম আর ক্যামেরার ভাষায় তিনি আজীবন সংগ্রাম করে গেছেন সকল প্রকার অসত্য, অন্যায় আর অসুন্দরের বিরুদ্ধে। পিতা প্রদত্ত ও প্রকৃত নাম জহিরুল্লাহ। জহির রায়হান তাঁর সাহিত্যিক নাম এবং এ নামেই তিনি সকলের কাছে পরিচিত ছিলেন। প্রখ্যাত সাহিত্যিক, সাংবাদিক শহীদ শহীদুল্লাহ কায়সার তাঁর অগ্রজ এবং বিশিষ্ট চলচ্চিত্র পরিচালক ও প্রযোজক জাকারিয়া হাবিব তাঁর অনুজ।

জহির রায়হান ১৯ আগস্ট ১৯৩৩ সালে ফেনী জেলার সোনাগাজী উপজেলার নবাবপুর ইউনিয়নের মজুপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। সাংবাদিকতার জীবনে জহির রায়হান ১৯৫৭ সালে ‘প্রবাহ’ এবং ১৯৭০ সালে ‘এক্সপ্রেস’ পত্রিকা সম্পাদনা করেন। এছাড়া তাঁর সম্পাদনায় আরও কিছু পত্র-পত্রিকা প্রকাশিত হয়। জহির রায়হান ১৯৫১ সালে বামপন্থী আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন। বাহান্নর ভাষা আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে জড়িত থাকার কারণে কিছুদিন কারাগারে কাটান। কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে তিনি ফটোগ্রাফি শেখার জন্য কলকাতা প্রমথেস বডুয়া মেমোরিয়াল ফটোগ্রাফি স্কুলে ভর্তি হন। ছাত্রজীবন শেষ হওয়ার অনেক আগে অর্থাৎ ১৯৫৬ সালের শেষের দিকে জহির রায়হান চলচ্চিত্রের সংস্পর্শে আসেন। তখন ঘটনাক্রমে উর্দু ছবি ‘জাগো হুয়া সাবেরার’ পরিচালক এ জে কারদারের সঙ্গে পরিচিত হন। তাঁকে সহকারী পরিচালক নিযুক্ত করেন। এরপর তিনি চিত্র পরিচালক এহতেশাম ও সালাউদ্দিনের সহকারী হিসেবে ‘এদেশ তোমার আমার’, ‘যে নদী মরুপথে’ ছবিতে কাজ করেন। ১৯৫৬ সালে ঢাকায় ফিল্ম ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশন স্থাপিত হওয়ার পর জহির রায়হানের জীবনে বিরাট সুযোগ এসে যায়। তিনি তখন ছবি পরিচালনার কাজে হাত দেন। ১৯৬১ সালে তাঁর পরিচালিত প্রথম ছবি ‘কখনো আসিনি’ মুক্তি পাওয়ার পর তিনি একে একে নির্মাণ করতে থাকেন বাংলা, উর্দু, ইংরেজী ছবি। যথাক্রমে- ‘সোনার কাজল’ (১৯৬২), ‘কাঁচের দেয়াল’ (১৯৬৩), ‘সঙ্গম’ (১৯৬৪), ‘বাহানা’ (১৯৬৫), ‘বেহুলা’ (১৯৬৬), ‘আনোয়ারা’ (১৯৬৭), ‘জীবন থেকে নেয়া’ (১৯৭০), ‘জ্বলতে সুরুজকে নীচে’ এবং তাঁর উল্লেখযোগ্য নির্মাণ ‘লেট দেয়ার বি লাইট’।

স্বাধীনতার পরপরই তিনি তৈরি করেন বাংলাদেশে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর গণহত্যার প্রামাণ্য চলচ্চিত্র ‘Stop Genocied’, ‘Birth of Nation’, ‘Innocent Million,’ ‘Liberation Fighter’s ছবি। জহির রায়হান একজন মসিযোদ্ধা হিসেবে মুক্তিযুদ্ধে বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেন। Bangladesh Liberation Council of Intelligentsia-এর সাধারণ সম্পাদক নিযুক্ত হন ১৯৭১ সালে।

১৯৬১ থেকে ’৭১ মাত্র দশ বছরে জহির রায়হান উপরে উল্লেখিত জনপ্রিয় ও দর্শকনন্দিত ছবি নির্মাণ করেছেন। বাংলাদেশে চলচ্চিত্র শিল্প বলতে গেলে তাঁর হাতে গড়া। এ দেশের প্রথম ইংরেজী ছবির নির্মাতা তিনি। সমগ্র পাকিস্তানে তিনিই প্রথম রঙ্গিন ছবি ‘সঙ্গম’ তৈরি করেন এবং প্রথম সিনেমাস্কোপ ছবি ‘বাহানা’ তাঁর সৃষ্টি। তাঁর ‘কাঁচের দেয়াল’ শ্রেষ্ঠ ছবি হিসেবে ‘নিগার’সহ অসংখ্য পুরস্কার পেয়েছে।

সুসাহিত্যিক জহির রায়হানের প্রকাশিত গ্রন্থের মধ্যে ‘সূর্যগ্রহণ’ (১৯৫৬), ‘শেষ বিকেলের মেয়ে’ (১৯৬০), ‘হাজার বছর ধরে’ (১৯৬৪), ‘বরফ গলা নদী’ (১৯৬৮), ‘আরেক ফাল্গুন’ (১৯৬৯), ‘আর কত নদী’ (১৯৭০), ‘কয়েকটি মৃত্যু’ (১৩৮২ বাংলা), ‘তৃষ্ণা’ (১৩৬২ বাংলা) ইত্যাদি। তাঁর উপন্যাসের ভাষা ঋজু ও সাবলীল এবং স্থানে স্থানে কাব্যগুণম-িত। তিনি অনেক সরস ছোট গল্পেরও রচয়িতা। মধ্যবিত্তের আশা-আকাক্সক্ষা তাঁর গল্পগুলোতে আন্তরিকতার সঙ্গে অঙ্কিত। ১৯৬৪ সালে ‘হাজার বছর ধরে’ উপন্যাসের জন্য তিনি আদমজী পুরস্কার, ১৯৭২ সালে বাংলা একাডেমি তাঁকে সাহিত্যে মরণোত্তর পুরস্কার, ১৯৭৭ সালে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে ভূষিত হন। জহির রায়হান ১৯৭৭ সালে নাট্যশিল্পে মরণোত্তর একুশে পদক, ১৯৭১ সালে উপন্যাসে বাংলা একাডেমি পদক, ১৯৭২ সালে পুনরায় বাংলা একাডেমি পদক এবং ১৯৯২ সালে সাহিত্যে স্বাধীনতা পদকে ভূষিত হন।

দেশ স্বাধীন হওয়ার পরপরই জহির রায়হান ১৯৭১ সালের ১৭ ডিসেম্বর কলকাতা থেকে ঢাকায় আসেন। এসেই শুনতে পান অগ্রজ শহীদুল্লাহ কায়সার নিখোঁজ। জানতে পারেন বর্বর পাক হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসর রাজাকারদের হাতে বাংলার অসংখ্য বুদ্ধিজীবী শহীদ কিংবা নিখোঁজ হওয়ার খবর। জহির রায়হান ছোটাছুটি করতে লাগলেন অগ্রজের খোঁজে। তাঁরই প্রচেষ্টায় গঠিত হলো বুদ্ধিজীবী হত্যা তদন্ত কমিটি। ১৯৭২ সালের ৩০ জানুয়ারি জহির রায়হান খবর পেলেন কয়েক বুদ্ধিজীবীসহ শহীদুল্লাহ কায়সারকে আটক রাখা হয়েছে মিরপুরে। ছুটে গেলেন সেখানে। তারপর নাটকীয়ভাবে হারিয়ে গেলেন চিরদিনের জন্য। আজও বাংলাদেশের মানুষ জানে না জহির রায়হানের কোন খোঁজ।

ড. এন এ এম ফয়জুল মহী:
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা বিভাগের খ্যাতনামা অধ্যাপক ড. এন এ এম ফয়জুল মহী। জন্ম ১০ আগস্ট ১৯৩৯ খ্রিস্টাব্দে ফেনীর নৈরাজপুর গ্রামে। পিতা মরহুম নুরুল ইসলাম চৌধুরী একজন বিশিষ্ট আইনজীবী ও সাংবাদিক ছিলেন।

তিনি ১৯৬৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রথম বিভাগে প্রথম স্থান অধিকার করে এম.এড পাস করেন। প্রতিভাবান ও মেধাবী ছাত্র ড. এন এ এম ফয়জুল মহীকে তৎকালীন পাকিস্তান সরকার উচ্চতর শিক্ষার জন্য বৃত্তি দিয়ে আমেরিকায় পাঠায়। এ কৃতী ছাত্র আমেরিকায় বৃত্তি নিয়ে পড়তে গিয়ে অত্যন্ত গৌরব ও সাফল্যজনকভাবে ’৬৭ সালে ঈড়ষড়ৎধফড় ঝঃধঃব ঈড়ষষবমব থেকে এম.এ এবং একই কলেজ থেকে ১৯৬৮ সালে এ.ডি (ডক্টর অব এডুকেশন) ডিগ্রী লাভ করেন। তিনি আমেরিকা ঝঃধঃব ঈড়ষষবমব থেকে চজঙএজঅগগঊ ঙঋ ওঘউটঝঞজওঅখ অজঞঝ ঋঙজ ঞঐঊ ঝঈঐঙঙখঝ ঙঋ ঊঅঝঞ চঅকওঝঞঅঘ বিষয়ের ওপর ডক্টরেট করেন। তিনি ২৫ অক্টোবর ১৯৬৮ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের শিল্পকলা বিভাগের লেকচারার হিসেবে যোগদান করেন এবং একই বছর ১৯ ডিসেম্বর সহকারী অধ্যাপক পদে উন্নীত হন।

সেদিন ছিল ১৪ ডিসেম্বর ’৭১। বদর বাহিনীর ৬ নরঘাতক সকাল ৮টা ৩০ মিনিটে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফুলার রোডের ৩৫/জি আবাসিক এলাকায় ড. এন এ এম ফয়জুল মহীর বাসভবনে ঢুকে তাঁর চোখ বেঁধে গাড়িতে তুলে নিয়ে যায় এবং এদিনই তাঁকে রায়েরবাজারের বধ্যভূমিতে হত্যা করে। দুইদিন পর ১৬ ডিসেম্বর বাঙালির মুক্তির স্বাধীনতা অর্জিত হলো। স্বাধীনতা লাভের পর অনেক শহীদ অধ্যাপকের লাশ উদ্ধার করা হয়। এঁদের মাঝে খুঁজে পাওয়া গেছে স্বনামধন্য অধ্যাপক ড. এন এ এম ফয়জুল মহীর মরদেহ। তাঁকে সমাহিত করা হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মসজিদের উত্তর পাশে। বাংলাদেশ সরকার তাঁর স্মরণে ডাকটিকেট প্রকাশ করে।

সেলিনা পারভীন:
শহীদ বুদ্ধিজীবী সেলিনা পারভীন ছিলেন একাধারে লেখক, কবি, সাংবাদিক ও সম্পাদক। সর্বোপরি স্বাধীনচেতা, সংগ্রামী নিষ্ঠাবান, আত্মপ্রত্যয়ী এক মমতাময়ী নারীর পথিকৃৎ। জন্মেছেন ৩১ ডিসেম্বর ১৯৩১ খ্রিস্টাব্দে। পিতা ফেনী টিচার্স ট্রেনিং স্কুলের প্রধান শিক্ষক আবদুর রহমান বি এ বি টি। মাতা মোসাম্মৎ সাজেদা খাতুন। ৬ ভাই ও ৩ বোনের মধ্যে সেলিনা পারভীন ছিলেন তৃতীয় এবং বোনদের মধ্যে দ্বিতীয়। শৈশবে পিতা প্রদত্ত নাম ছিল মনোয়ারা বেগম মনি। তিনি ১৯৫৪ সালে এফিডেভিট করে সেলিনা পারভীন নাম নেন।

সেলিনা পারভীন ফেনী বালিকা বিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করার সময় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণে ১৯৪২ সালে শিক্ষাজীবন বিঘিœত হয়। ১৯৪৯ সালে প্রাইভেট ম্যাট্রিক পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেও উত্তীর্ণ হতে পারেননি। তিনি আনুষ্ঠানিক শিক্ষা সমাপ্ত করার সুযোগ না পেলেও একজন বিশেষ কৃতী ও ব্যক্তিত্বশালী শিক্ষাবিদের কন্যা হিসেবে স্বশিক্ষিত হবার অনুকূল পরিবেশ পেয়েছিলেন। তাছাড়া তাঁর ছিল তীক্ষè মেধা ও সৃজনশীল প্রতিভা। তৎকালীন সামাজিক অবস্থার কারণে খুব অল্প বয়সে ১৯৪৩ সালে ইচ্ছার বিরুদ্ধে সেলিনা পারভীনকে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হতে হয়। স্বাধীনচেতা সেলিনা পারভীন সংসার করেননি। ১৯৪৮ সালে বিবাহ ভেঙ্গে যায়। এই সময় তিনি সাহিত্য চর্চায় ব্রতী হন। এক বিস্ময়কর জীবন বেছে নিলেন সেলিনা পারভীন। অপরিসীম মনোবল ও প্রবল আত্মবিশ্বাস সম্বল করে তিনি এই বৈরী সমাজে জীবনের দুর্গম পথে একাকী যাত্রা শুরু করেন।

সেলিনা পারভীন ১৯৬৫ সালে স্যার সলিমুল্লাহ এতিমখানায় শিক্ষকতার চাকরি নেন। সে চাকরি পছন্দ না হওয়ায় ছেড়ে দেন। ১৯৬৬ সালে তিনি সাপ্তাহিক বেগম পত্রিকায় সম্পাদিকার সেক্রেটারি হিসেবে কাজে যোগদান করেন। বেগম পত্রিকায় থাকা অবস্থায় তিনি সাহিত্য, সাংবাদিকতা ও নিবন্ধ রচনায় দক্ষতা অর্জন করেন। এ সময় তাঁর লেখা আজাদ, ইত্তেফাক, দৈনিক পাকিস্তান, পূর্বদেশ ও বেগম পত্রিকায় নিয়মিত প্রকাশিত হতে থাকে। ১৯৬৮ সালে সেলিনা পারভীন সাপ্তাহিক ললনা পত্রিকায় যোগদান করেন। ১৯৬৯ সালে পত্রিকাটি বন্ধ হয়ে যায়। এর পরের বছর তিনি ‘শিলালিপি’ পত্রিকা প্রকাশ করেন এবং পত্রিকাটির প্রকাশনা ও সম্পাদনার দায়িত্ব একাই পালন করেন।

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পাকসেনা রাও ফরমান আলী সেলিনা পারভীনকে শিলালিপির লেখক, কবি ও প্রচ্ছদ বাংলার লোকশিল্পের অলঙ্কার দেখে এসব বন্ধ করতে নির্দেশ দিয়েছিলেন এবং আরো পরামর্শ দিয়েছিলেন পাক সামরিক নির্দেশমতো পাকিস্তানী ভাবধারার লেখা ও ছবি পত্রিকায় প্রকাশ করতে। সেলিনা পারভীন সে নির্দেশ ও পরামর্শ পালন করেননি। এ সময় শিলালিপি প্রকাশনার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে পাকিস্তানী সামরিক বাহিনী।

১৯৭১ সালের ১৩ ডিসেম্বর আলবদর বাহিনী সেলিনা পারভীনকে তাঁর সিদ্ধেশ্বরীর বাসা থেকে ধরে নিয়ে যায়। ১৪ ডিসেম্বর অন্যান্য দেশবরেণ্য বুদ্ধিজীবীর সঙ্গে রায়েরবাজারের বধ্যভূমিতে তাঁকে নির্মমভাবে হত্যা করে। ১৮ ডিসেম্বর আজিমপুর নতুন কবরস্থানে শহীদের জন্য সংরক্ষিত স্থানে তাঁকে সমাহিত করা হয়।

সিরাজুল হক খান:
শহীদ সিরাজুল হক খান ১ জানুয়ারি ১৯২৪ সালে ফেনী জেলার সাতচকিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি স্থানীয় ফুলগাজী হাইস্কুল থেকে ১৯৩৯ সালে ম্যাট্রিক, ফেনী কলেজ থেকে ১৯৪১ সালে আই.এ ও ১৯৪৩ সালে বি.এ পাস করেন। ঢাকা টিচার্স ট্রেনিং কলেজ থেকে ১৯৪৯ সালে বি.এড, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট থেকে ১৯৬৫ সালে এম.এড এবং যুক্তরাষ্ট্রের নর্দান কলোরাডো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৬৭ সালে এ. ডি. (ডক্টরেট অব এডুকেশন) ডিগ্রী লাভ করেন।

কর্মজীবনের প্রাথমিক পর্যায়ে তিনি প্রায় ১৭ বছর বিভিন্ন সরকারি স্কুলে শিক্ষকতা করার পর ১৯৬৮-এর জানুয়ারিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক নিযুক্ত হন। সিরাজুল হক ছিলেন একজন খ্যাতনামা পাঠ্যপুস্তক প্রণেতা। তিনি স্কুল টেকস্ট বুক বোর্ড কর্তৃক অনুমোদিত বহু ইংরেজী, বাংলা ও ইতিহাসের পাঠ্যপুস্তক রচনা করেছেন। তিনি ছিলেন কৃতী শিক্ষক, মুক্তবুদ্ধি ও অসাম্প্রদায়িক চিন্তার অধিকারী।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের বিজয়ের প্রাক্কালে ১৯৭১-এর ১৪ ডিসেম্বর পাকিস্তানী সৈন্যদের সহযোগী আলবদর বাহিনীর সদস্যরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাস থেকে তাঁকে ধরে নিয়ে যায়। তাঁর লাশ পাওয়া যায়নি। তাঁর আত্মদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ ডাক বিভাগ ১৯৯২ সালে দুই টাকা মূল্যের স্মারক ডাকটিকেট প্রকাশ করে।

মামুন মাহমুদ:
বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনীর গৌরব শহীদ মামুন মাহমুদ। সমগ্র কর্মময় জীবনে নিজেকে শাসকগোষ্ঠীর সারিতে নয়, জনগণের প্রকৃত সেবক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তাঁর মতো সৎ, দক্ষ, স্বদেশপ্রেমী ন্যায়নিষ্ঠ পুলিশ অফিসার অত্যন্ত বিরল। বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পূর্বমুহূর্ত পর্যন্ত এ দেশের প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলনে পুলিশকে দেখা গেছে তার প্রভুর আজ্ঞাবাহী ভূমিকায়, জনগণের পাশে তাদের তেমন দেখা যায়নি। সেদিক থেকে মামুন মাহমুদ ছিলেন ব্যতিক্রম।

উচ্চপদস্থ পুলিশ কর্মকর্তা মামুন মাহমুদ ১৯২৮ সালে কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন। পিতা ডাঃ অহিদুদ্দীন মাহমুদ, মাতা বিখ্যাত সমাজকর্মী, সাহিত্যিক ও বাংলাদেশের নারী মুক্তি আন্দোলনের পথিকৃৎ শামসুন্নাহার মাহমুদ। স্থায়ী নিবাস ফেনী জেলার পরশুরাম উপজেলার গুথুমা গ্রামে। মামুন মাহমুদ ১৯৪২ সালে কলকাতার বালাগঞ্জ সরকারি বিদ্যালয় থেকে প্রবেশিকা পাস করেন। প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে আই.এ এবং আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বি.এ পাস করেন।

১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর সপরিবারে ঢাকায় চলে আসেন। ঢাকায় ই.পি.সি.এস পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে পুলিশ সার্ভিসে যোগদান করেন। কর্মময় জীবনে তিনি পুলিশ বিভাগে বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলায় দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ১৯৫৮ সালে চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার পদে নিযুক্ত হন। ১৯৬৬ সালে তাঁকে খুলনায় পুলিশ সুপার পদে বদলি করা হয়। একই বছর তাঁকে ঢাকায় বদলি করা হয়।

গর্বিত মা শামসুন্নাহার মাহমুদের বড় পুত্র মামুন ছিলেন একজন সাহসী, দেশপ্রেমিক, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদকারী, ন্যায়পরায়ণ পুলিশ অফিসার। জন্মের পর থেকে কখনও অন্যায়ের বিরুদ্ধে মাথানত করতে তাঁকে দেখা যায়নি। এমনকি তিনি সব সময় অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর ছিলেন।

মামুন মাহমুদ খুলনায় পুলিশ সুপার পদে দায়িত্ব পালনকালে পি.এ ইলেক্ট্রিক নামক প্রতিষ্ঠানের মালিক তার চুরির দায়ে ধরা পড়লে ওপর থেকে তাকে ছেড়ে দেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়। মামুন মাহমুদ এতে রাজি হননি, তাই ওই মামলার তদন্তভার উর্ধতন কর্তৃপক্ষের ওপর ন্যস্ত করা হয়। একই সময় খুলনায় মুসলিম লীগের এক প্রভাবশালী নেতা চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত হওয়ায় গ্রেফতার হয়। উপর মহল থেকে তাকেও ছেড়ে দেয়ার নির্দেশ দেয়া হলে তিনি তা অগ্রাহ্য করে প্রকৃত সত্য উদঘাটন করেন।

স্বদেশপ্রেমী পুলিশ অফিসার মামুন মাহমুদ ১৯৬৬ সালে যখন বাঙালির মুক্তির সনদ ৬ দফা আন্দোলন তুঙ্গে, সর্বত্র ১৪৪ ধারা জারি করা হয়; কিন্তু তিনি খুলনাতে ১৪৪ ধারা জারি করেননি। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে তৎকালীন গবর্নর মোনায়েম খাঁ তাঁকে ঢাকায় ডেকে পাঠান এবং সতর্ক করে দেন।

১৯৭০ সালের ১৭ জানুয়ারি ঢাকার পল্টন ময়দানে মাওলানা মওদুদীর মিটিং বানচালকারী জনতার ওপর গুলির নির্দেশ দিলে মামুন মাহমুদ সেই নির্দেশ অমান্য করেন। ফলে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তাঁকে ঢাকা থেকে ময়মনসিংহে বদলি করা হয়।

১৯৭১ সালের মার্চ মাসে মামুন মাহমুদ রাজশাহী রেঞ্জের ডি.আই.জি হন। ২৬ মার্চ জনৈক পাঞ্জাবী ক্যাপ্টেন পাস অর্ডার ছাড়া সরকারি ট্রেজারিতে ঢোকার চেষ্টা করলে ট্রেজারির রক্ষীরা তাকে বাধা দেয়। এই সময় সেই ক্যাপ্টেন রক্ষীদের গ্রেফতার করার নির্দেশ দিলে মামুন মাহমুদ তা অস্বীকার করে বলেন, ‘আমার রক্ষীরা কোন অন্যায় করেনি, তারা পাস অর্ডার ছাড়া কাউকে ট্রেজারিতে ঢুকতে দেয়নি, তারা তাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য পালন করেছে মাত্র।’

২৫ মার্চ রাত দেড়টায় ঝাঁকে ঝাঁকে পাকিস্তানী সৈন্য রাজশাহী পুলিশ লাইন ও পদস্থ বাঙালি সরকারি কর্মচারীদের বাসভবন ঘিরে ফেলে। ২৬ মার্চ ছিল মামুন মাহমুদের বিবাহ বার্ষিকী। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরুর প্রাক্কালে এই ২৬ মার্চ সন্ধ্যা ৭টায় রংপুর থেকে ব্রিগেডিয়ার আবদুল্লাহ ওয়ারলেসে কথা বলতে চান এই বলে স্ত্রী, পুত্র, কন্যার সামনে থেকে তাঁকে ক্যান্টেনমেন্টে ডেকে নিয়ে যাওয়া হয়। তিনি আর ফিরে আসেননি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *