চোত্তাখোলা, আগরতলার জেল ও বঙ্গবন্ধু

১৯৬২ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি ছিল সোমবার। ২০১৮ সালের ৫ ফেব্রুয়ারিও তাই! বেশিরভাগ মানুষ জানেন না, ১৯৬২ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলার মানুষের চিরকালীন স্বপ্নটা বুকে নিয়ে ছুটে গিয়েছিলেন ত্রিপুরার আগরতলায়। যদি ভারতের সাহায্য নিয়ে দেশটাকে স্বাধীন করা যায়! তাকে জেলে থাকতে হয়েছিল একদিন!
দিন ফিরে আসে? না কি দিন ফিরে যায়?
অনেক অনেক বছর পরে আখাউড়া হয়ে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে কেউ যদি আগরতলা যেতে চায়, তাহলে সীমান্তের একেবারে শেষপ্রান্তে বাংলাদেশ পুলিশের ছোট্ট একটা স্মৃতিস্তম্ভ নজরে আসতে পারে। ত্রিপুরা পৌঁছানোর শুরুতে মানুষ যেন ধারণা করতে পারে (যেন কানে কানে বলছে ত্রিপুরা— ‘মনে রেখ আমিও ছিলাম’!), সে জন্য ১৯৭১-এ ত্রিপুরা তার দুয়ার খুলে দিয়েছিল এই দেশের মানুষের জন্য। সেই সময়ে ত্রিপুরার জনসংখ্যা ছিল মাত্র ১৫ লাখের মতো। আর বাংলাদেশ থেকে শরণার্থী হয়ে ত্রিপুরা গিয়েছিল ১৫ লাখের বেশি মানুষ! ২০১৭ বা ২০১৮ সালে যেসব রোহিঙ্গা বার্মা থেকে বাংলাদেশে আসতে বাধ্য হয়েছে, তাদের দেশে ফেরার স্বপ্ন কতটা আছে জানি না। বাংলার উদ্বাস্তু মানুষের স্বপ্ন বিফলে যায়নি। বাংলার মানুষের লাল টুক টুক স্বপ্ন কেউ বেচতে পারেনি! কারণ মানুষ শুধু শরণার্থী বা উদ্বাস্তু হয়েই ত্রিপুরা যায়নি। স্বপ্নের আগুনে পোড়া চোখ নিয়ে ঢাকা, কুমিল্লা, চট্টগ্রাম, ব্রাহ্মণবাড়িয়া আর ফেনীর অনেক স্বপ্নবাজ যুবক ত্রিপুরার চোত্তাখোলা গিয়েছিল মুক্তিযুদ্ধের প্রশিক্ষণ নিতে।
চোত্তাখোলা ছিল এ দেশের স্বপ্নবাজ যুবকদের প্রথম প্রশিক্ষণ ক্যাম্প। আর ছিল মেলাঘর। হাজারও মুক্তিযোদ্ধার স্মৃতি আছে মেলাঘরকে ঘিরে। চোত্তাখোলার কথা বলা হচ্ছে এ কারণে যে চোত্তাখোলা দাঁড়িয়ে আপনি যত খুশি ভেবে নিতে পারেন আমাদের রক্তের সঙ্গে ইতিহাস কতটা নিবিড়। এই দুই জায়গার কোনও এক প্রাচীন বৃক্ষের সামনে দাঁড়িয়ে মনে হবে, এই গাছের ছায়ায় প্রশিক্ষণ নিতে আসা গেরিলাদের একটু জিরিয়ে নিতে দিতেন খালেদ মোশাররফ। হয়তো বীরদর্পে হেঁটে যেতেন তিনি গেরিলাদের সামনে দিয়ে। পাহাড়ের কাঁটা বিছানো পথে হয়তো ক্রলিং করাতেন গেরিলাদের, হয়তো ডিগবাজি দিতে বলতেন, আধপেটা খেয়ে পাহাড়ি মশার কামড়ে ঘুমুতে না পারা গেরিলাদের সাঁতার দিতে নামাতেন লেকের জলে। স্বপ্নটা তিনি গেঁথে দিতে পারতেন বুকে, জীবনের সর্বোচ্চ দিয়ে বাজি ধরতে শেখাতেন দেশমাতৃকার জন্য। যেকোনও গেরিলার কাছে তাই দেশটা হয়ে যেত নিরন্তর স্বপ্নের নাম— সাধ জাগে তাই তোমার হাসি রক্ত দিয়ে কিনি! বাঁধলে লড়াই তোমায় আমি দারুণভাবে চিনি। নতুন করে বাংলাদেশ জেগে ওঠো তুমি!
খালেদ মোশাররফের সাথী আরেক স্বপ্নপুরুষের নাম হায়দার। গেরিলাদের ভেতরে যেন দারুণভাবে ভর করতে পারতেন তিনি! গেরিলাদের উজ্জীবিত করতে পারতেন দেশপ্রেমের চূড়ান্ত চূড়ায়। তার সঙ্গে যেন হেঁটে যেত গেরিলাদের উদ্বেল স্বপ্ন। জেনারেল নিয়াজি যখন আত্মসমর্পণ করতে আসেন, তখন তাদের সঙ্গে বীরদর্পে হেঁটে সমর্পণ মঞ্চের দিকে তাদের নিয়ে হেঁটে যান হায়দার। চোত্তাখোলা কিংবা মেলাঘরের পাহাড়ি রাস্তায় হয়তো এমন বীরদর্পেই হাঁটতেন তিনি।
‘বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধে ত্রিপুরা’ নামে একটা প্রামাণ্যচিত্র তৈরি হয়েছে। এই প্রামাণ্যচিত্রের ভেতর কেমন যেন একটা ঘোর লাগার ব্যাপার আছে। খোয়াইয়ের সেই সময়কার সাবডিভিশনাল অফিসার স্মরজিৎ চক্রবর্তীর ডায়েরি থেকে জানা যায়, ১৯৬২ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আগরতলা গিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে ছিলেন আমির হুসেন ও টি চৌধুরী (ধারণা করা হচ্ছে ভদ্রলোকের নাম তারেক চৌধুরী)। এই তিনজন মানুষ গিয়েছিলেন আসরামবারি হয়ে তেলিয়ামুড়ায়। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা হয়েছিল ত্রিপুরার প্রথম মুখ্যমন্ত্রী শচীন্দ্রলাল সিংহের। দেশ স্বাধীন করার সব ধরনের সহযোগিতা চেয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু। শচীন্দ্রলাল বঙ্গবন্ধুর আর্জি পৌঁছে দিয়েছিলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরুর কাছে। বঙ্গবন্ধুর এই নীরব ও গোপন গমন পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থার লোকজন জেনে গিয়েছিল। ধামাচাপা দেওয়া সম্ভব হয়নি। আর তাই ত্রিপুরা থেকে বঙ্গবন্ধুকে বাংলাদেশে (সেই সময়কার পূর্ব পাকিস্তানে) পুশব্যাক করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। নিয়মরক্ষার জন্য বঙ্গবন্ধুকে এক রাত আগরতলার জেলে রাখা হয়েছিল!
যারা মনে করেন বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতা চাননি, তাদের জন্য এটি পিলে চমকানো তথ্য। নিয়মতান্ত্রিক ও বিপ্লবী— এই দুই পন্থাতেই হেঁটেছিলেন বঙ্গবন্ধু। একমাত্র স্বপ্ন ছিল দেশটা স্বাধীন করা। ভারত থেকে অস্ত্র এনে তাদের সহযোগিতায় দেশ স্বাধীন করার এই পরিকল্পনা ষড়যন্ত্র ও দেশদ্রোহিতা হিসেবে নিয়েছিল পাকিস্তানি জান্তা। বঙ্গবন্ধু আগরতলা যাওয়ার ছয় বছর পর ১৯৬৮ সালের জানুয়ারি মাসে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতার মামলা হয়, যা আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা হিসেবেই পরিচিত। বঙ্গবন্ধু গ্রেফতার হলে ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রী শচীন্দ্রলাল তার জন্য উকিল নিয়োগ করতে চেয়েছিলেন। শচীন্দ্রলাল বিখ্যাত কমিউনিস্ট নেতা ও আইনজীবী স্নেহাংশু আচার্য্যকে বঙ্গবন্ধুর হয়ে মামলা লড়তে অনুরোধ করেছিলেন। পরে স্নেহাংশু আচার্য্য নীরোদ সি চৌধুরীর সঙ্গে পরামর্শ করেন এবং বঙ্গবন্ধুর পক্ষে মামলা লড়তে আসেন ব্রিটিশ আইনজীবী টমাস উইলিয়াম।
সত্য ঘটনা হলেও প্রবল গণআন্দোলনের মুখে বঙ্গবন্ধুকে মামলা থেকে মুক্তি দেওয়া হয়, কিন্তু হত্যা করা হয়েছিল লে. কমান্ডার মোয়াজ্জেম হোসেন ও সার্জেন্ট জহুরুল হককে। ‘বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধে ত্রিপুরা’ প্রামাণ্যচিত্রটি তৈরি করেছেন রাজু ভৌমিক যার দাদা ও বাবা বাংলাদেশ থেকে পালিয়ে ত্রিপুরায় আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছিলেন এবং এখনও সেখানেই থাকছেন। যারা শরণার্থী হয়ে ১৯৭১ সালে ত্রিপুরা গিয়েছিলেন, তাদের অনেকেই সেখানে থেকে গিয়েছেন পরবর্তীকালে!
স্বাধীনতার ৪৭তম বছরে কেউ যদি মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ ক্যাম্প চোত্তাখোলায় যান (ত্রিপুরার রাজধানী আগরতলা থেকে ১৩১ কিলোমিটার দূরে, বাংলাদেশের ফেনী জেলার বিলোনীয়া সীমান্ত থেকে মাত্র ৩০ কিলোমিটার দূরে), তাহলে একটু থমকে দাঁড়াবেন। পুরো পাহাড়ি আঁকাবাকা পথ আর তৃষ্ণা ফরেস্ট রেঞ্জ পেরিয়ে বানর, শিয়াল, বনমোরগ, বাইসন আর আর হাজারও পাখির কলকাকলিতে মুখর হয়ে আপনি পৌঁছাবেন চিত্তাখোলা ওরফে বাংলাদেশ ভারত মৈত্রী উদ্যানে। ২০ হেক্টরের মতো পাহাড়ি জমি, টিলা আর লেকের মনমুগ্ধকর পরিবেশ আপনাকে চমকে দেবে। সবচেয়ে উঁচু টিলার ওপর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বিশাল প্রতিমূর্তি। পাশেই রয়েছে ইন্দিরা গান্ধীর প্রতিমূর্তি। ১৯৭১ সালের করা কিছু বাংকারও রয়েছে এখানে। রয়েছে অস্ত্রহাতে ধাবমান মুক্তিযোদ্ধার মূর্তি, আছে আহত মুক্তিযোদ্ধাকে নিয়ে যাওয়ার ম্যুরাল। আছে মুক্তিযুদ্ধে ব্যবহৃত অস্ত্র, পোশাক আর মানচিত্র সম্বলিত মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘর, আছে সাভারের স্মৃতিসৌধের আদলে নির্মিত আরেকটি সৌধ। আছে কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধার কবর। সাতটি টিলা ও স্মৃতিবাহী লেক ঘেরা এই উদ্যানে রয়েছে শিশুদের আনন্দের জন্য অনেক আয়োজন।
মৈত্রী উদ্যানের টিলাঘেরা পথ কিংবা মেলাঘরের পাহাড়ি প্রান্তরে হাঁটলে যে কারও মনে পড়তে পারে— হাবিবুল আলম, জুয়েল, মায়া, খোকা, সাবু, বকর, হাফিজ, আজাদ, আজমরা একদিন এইখানে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়াতেন। প্রখর রৌদ্রের ভেতর তাদের সামরিক ট্রেনিং দেওয়া হতো। ট্রেনিং দিতেন মেজর (পরে ব্রিগেডিয়ার) খালেদ মোশাররফ, ক্যাপ্টেন (পরে লে. কর্নেল, ৭৫ সালে নিহত) হায়দার কিংবা ক্যাপ্টেন (পরে লে. কর্নেল ও জাতীয় পার্টি নেতা) গাফফার। খোকা (পরে বিএনপি নেতা ও ঢাকার মেয়র সাদেক হোসেন খোকা) আর সাবু (মেসবাহউদ্দীন) থাকতেন একসঙ্গে, টয়লেট ছিল না কোনও। পাহাড়ি মশার কামড় খেয়ে দু’জন দু’দিকে ফিরে প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতেন। আজম খান গাইতেন গান, হয়তো বেহালা বাজাতেন হাফিজ। সুরকার ও সংগীত পরিচালক আলতাফ মাহমুদের সঙ্গে খুব সখ্য ছিল হাফিজের। দিনের ট্রেনিং শেষ করে রাতে আধাপেটা খেয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে জুয়েল ভাবতেন ক্রিকেট জাতীয় দলের ওপেনার হয়ে কীভাবে লড়বেন। কীভাবে দুঃখ পেটাবেন, শত্রুকে ছাতু বানিয়ে ম্যাচ জিতবেন।
দেশ স্বাধীন হলেও ফিরে আসেনি হাফিজ কিংবা আজাদ। ফেরেননি সর্বকনিষ্ঠ গেরিলা বকর কিংবা জুয়েল। জুয়েলকে আহত অবস্থায় তুলে নিয়ে গিয়েছিল পাকিস্তানি হায়েনারা, কেটে ফেলেছিল দু’টো আঙুল। জুয়েল তবু কারও নাম বলেননি। আর পাকিস্তানিদের হাতে বন্দি হওয়া আজাদকে ভাত খেতে দেয়নি আর মাটিতে ঘুমুতে দেওয়া হয়েছিল বলে শহীদ আজাদের মা তারপর থেকে আর কখনও ভাত খাননি, নরম বিছানায় ঘুমাননি। ফেরেনি আজাদ, জুয়েল, জাকির, বকর, রুমি কিংবা হাফিজ।
বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী উদ্যান তথা চোত্তাখোলায় শহীদদের সমাধির পাশে দাঁড়িয়ে যে কারও মনে হতে পারে— ভাই কী নাম তোমার? তোমাদের কি দেখতে আসে কেউ বাংলাদেশ থেকে? আত্মীয়-স্বজনের খোঁজ খবর নেয়? হাফিজ কি কখনও ট্রেনিং ক্যাম্পে বেহালা বাজাতেন? নাকি বেহালা আর গিটারের সঙ্গে রাইফেলের দ্বন্দ্বটা চিরকালীন? তোমাদের সঙ্গে কি কখনও ক্রিকেট খেলেছিল জুয়েল?
চোত্তাখোলা কিংবা মেলাঘরে কি এখনও ফিরে ফিরে আসে জুয়েল কিংবা আজাদরা?
লেখক: রম্যলেখক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *