ছাত্রলীগের ইতিহাস : বাঙালির আত্মপরিচয়ের ইতিহাস

লেখক: রুদ্র সাইফুল
তারিখ: ৪ জানুয়ারী ২০১৭

বাঙালির আত্মপরিচয়ের সংগঠন ছাত্রলীগকে নিয়ে আলোচনার পূর্বে আমরা একটু পিছনে যাবো; ১৯৪৩ সালের শেষের দিকে বঙ্গীয় প্রাদেশিক মুসলিম লীগের কাউন্সিলে আবুল হাশিম সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৪৪ সালে আবুল হাশিম ঢাকায় আসেন এবং ১৫০নং মোগলটুলিতে ৯ এপ্রিল শামসুল হকের নেতৃত্বে মুসলিম লীগ কর্মী শিবির স্থাপিত হয়। এই কর্মী শিবিরের অধিকাংশ কর্মী ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র।

১৯৪৭ সালের ১৮ জুলাই ‘ইন্ডিয়ান ইন্ডিপেন্ডেন্স এ্যাক্ট’-এ ভারতবর্ষের দুটি প্রধান মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চল নিয়ে পাকিস্তান নামের রাষ্ট্র গঠনের প্রস্তাব করা হয়। ১২ আগস্ট প্রকাশিত ‘র্যা ডক্লিফ রোয়েদাদ’-এ পূর্ববঙ্গ ও পশ্চিমবঙ্গের মধ্যে সীমানা আনুষ্ঠানিকভাবে নির্ধারিত হয়। ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট মধ্যরাতে ব্রিটিশ রাজত্বের অবসান ঘটে রক্তপাত, পারষ্পরিক ঘৃণা ও ধর্মীয় ছলনাময়ী দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে সৃষ্টি হয় ভারত ও পাকিস্তান নামের দুটি রাষ্ট্র। ভারতবর্ষের বিভাজনে বাঙলা ভূখণ্ডটিও বিভক্ত হয়ে পড়ে পূর্ব ও পশ্চিম বাঙলা নামের আড়ালে। পূর্ব বাঙলায় থেকে যায় ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিভাগ, রাজশাহী বিভাগের রংপুর, বগুড়া, রাজশাহী ও পাবনা জেলা; প্রেসিডেন্সি বিভাগের খুলনা জেলা; চারটি থানা ছাড়া সিলেট; নদীয়া, যশোহর, পশ্চিম দিনাজপুর, জলপাইগুড়ি ও মালদা জেলার অঙ্গচ্ছেদ করা হয়। বাঙালিরা অনেক সম্ভব-অসম্ভবের বুক-বাধা আশা নিয়ে, জিন্নাহ’র উগ্র সাম্প্রদায়িকতা ও মুসলিম উৎপীড়নের মিথ্যা অভিযোগ মেনে নিয়ে ‘ধর্ম-ভিত্তিক’ পাকিস্তান রাষ্ট্রের সঙ্গে যুক্ত হয়।

পাকিস্তান রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশের পর থেকেই মুসলিম লীগ ধীরে ধীরে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর হাতছাড়া হয়ে খাজা নাজিমুদ্দিন, নুরুল আমিন ও ইউসুফ আলী চৌধুরীর পকেট প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়; এতে করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মুসলিম ছাত্রনেতারা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর বলয়ে থেকেই নতুন কিছু করার চেষ্টা করতে থাকে। নতুন কিছু করার প্রত্যয় থেকেই মেধাবী ছাত্রদের মিলিত প্রয়াস ‘পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ’। ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক হলে এক সভায় পূর্ব পাকিস্তানের প্রথম প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠন ‘পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ’ গঠিত হয়; সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাকালীন প্রথম আহবায়ক ছিলেন নাঈমউদ্দিন আহমেদ। ছাত্রলীগ সাংগঠনিক ভাবে কার্যত্রক্রম শুরু করলে এর সভাপতি মনোনিত হন দবিরুল ইসলাম এবং সাধারণ সম্পাদক মনোনীত হন খালেক নেওয়াজ খান।

১৯৪৮ সালের জানুয়ারিতে ১৫০নং মোগলটুলিতে শামসুল হক ও শেখ মুজিবুর রহমান এক কর্মী সম্মেলন আহ্ববান করেন। মূলত, এই সম্মেলনেই আওয়ামী মুসলিম লীগের সূচনা হয়। আওয়ামী মুসলিম লীগের সূচনাপর্বে যাঁরা নেতৃত্ব দেন তাদের অধিকাংশই ছিলেন ছাত্রলীগের নেতৃস্থানীয় কর্মীবৃন্দ।

ছাত্রলীগ প্রতিষ্ঠার পর থেকেই গণমুখী আন্দোলনের সাথে জড়িয়ে পরে, জড়িয়ে পরে বাঙালির মুক্তির সংগ্রামের ভিত্তমূল স্থাপনের মহান দায়িত্ব পালনে। প্রতিষ্ঠার কিছুদিন পরেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের দাবি-দাওয়া আদায়ের উদ্দেশে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কিংবদন্তিতুল্য তরুণ নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে ছাত্রলীগ ১৯৪৮ সালের মার্চ মাসের ৩ তারিখ থেকে ধর্মঘট শুরু করে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি শিক্ষার্থী শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি আস্থা রেখে ছাত্রলীগের এই ধর্মঘটকে সমর্থন করে; ছাত্রলীগ ৫ মার্চ পর্যন্ত ছাত্র ধর্মঘট চালিয়ে যাবার সিদ্ধান্ত নেয়। ছাত্রলীগের ইতিহাসে প্রথম এই আন্দোলন সফল হয় এবং প্রবল আন্দোলনের মুখে কর্তৃপক্ষ মৌখিক আশ্বাস দিতে বাধ্য হয়, আশ্বাসের পরিপ্রেক্ষিতে ১০ মার্চ থেকে ধর্মঘট প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়, কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ অনির্দিষ্টকালের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করে দেয়। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ছাত্রলীগকর্মী ২৭ জন ছাত্রের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করে, তরুণ নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের শাস্তি হয় ১৫ টাকা জরিমানা। তিনি জরিমানা না দেওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিস্কৃত হন।

পাকিস্তানের গণপরিষদে বাঙলা ভাষার স্থান না হওয়ায় ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ছাত্রলীগের নেতৃত্বে প্রতিবাদ সভা, সাধারণ ধর্মঘট ও বিক্ষোভ প্রদর্শন করে। ঐদিন পুলিশ ছাত্রদের বাধা দেয় এবং বহু ছাত্রকে গ্রেফতার করে। কারাবরণ করেন শেখ মুজিবুর রহমান, অন্যান্য বন্দী নেতাদের মধ্যে ছিলেন শামসুল হক, অলি আহাদ, শওকত আলি, কাজী গোলাম মাহবুব প্রমুখ; কেন্দ্রীয় নেতাদের গ্রেপ্তারের পরেও ছাত্রলীগের নেতৃত্বে ছাত্র আন্দোলন চলতে থাকে। শেষ পর্যন্ত ১৫ মার্চ প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন ছাত্রদের সাথে একটি চুক্তিপত্র স্বাক্ষর করেন। এর চারদিন পর মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ ঢাকা আসেন, ২১ মার্চ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) এক জনসভায় বক্তৃতা করেন এবং উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার স্পষ্ট ঘোষণা দেন। ২৪ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে জিন্নাহ ভাষণ দেন। ওই বক্তৃতায় তিনি বলেন:
‘…রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রদেশের যোগাযোগের ভাষা হিসেবে একটি ভাষা থাকবে এবং সে ভাষা হবে উর্দু অন্য কোনো ভাষা নয়। কাজেই স্বাভাবিকভাবে রাষ্ট্রভাষা হবে উর্দু, যা এই উপমহাদেশের লক্ষ লক্ষ মুসলমানের দ্বারা পুষ্ট হয়েছে, যা পাকিস্তানের এক থেকে অন্য প্রান্ত সকলেই বোঝে এবং সর্বোপরি যার মধ্যে অন্য যে কোন প্রাদেশিক ভাষা থেকে অধিক ইসলামী সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্য বাস্তব রূপ লাভ করেছে এবং যে ভাষা অন্যান্য ইসলামী দেশগুলিতে ব্যবহৃত ভাষার সর্বাপেক্ষা কাছাকাছি।’

১৯৪৮ সালের ২৪ মার্চ ছাত্রলীগের নেতৃত্বে রাষ্ট্রভাষা কর্ম পরিষদের একটি প্রতিনিধিদল জিন্নাহ’র সাথে সাক্ষাৎ করে বাঙলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবি জানিয়ে একটি স্মারকলিপি পেশ করেন। ওই প্রতিনিধি দলে ছিলেন শামসুল হক, কামরুদ্দিন আহমেদ, আবুল কাশেম, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দিন আহমেদ, মোহাম্মদ তোয়াহা, আজিজ আহমদ, অলি আহাদ, নঈমুদ্দিন আহমদ, এবং শামসুল আলম।

১৯৪৮ সালের ২৭ নভেম্বর পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলি খান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় খেলার মাঠে এক ছাত্রসভায় ভাষণ দেন। এই সভায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের তরফ থেকে বাঙলা ভাষার দাবি পুনরায় উত্থাপন করা হয়। কিন্তু লিয়াকত আলি খান কোনো মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকেন। ১৯৪৮-১৯৪৯-১৯৫০ ভাষার দাবিতে ছাত্রলীগের নেতৃত্বে ঘটনাবহুল সময় পার করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা।

১৯৫২ সালের ২৬ জানুয়ারি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন ঢাকায় নিখিল পাকিস্তান মুসলিম লীগের অধিবেশনে সভাপতির ভাষণে ঘোষণা করেন উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা; এই ঘোষণার পর ছাত্রলীগের নেতৃত্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা প্রতিবাদে ফেটে পড়ে; প্রতিবাদস্বরূপ ৩০ জানুয়ারি ঢাকায় ছাত্র ধর্মঘট পালিত হয় এবং আতাউর রহমান খানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় ছাত্রলীগের নেতৃত্বে বিশ্ববিদ্যালয় সংগ্রাম পরিষদের প্রতিনিধিদের নিয়ে ‘সর্বদলীয় কর্মপরিষদ’ গঠিত হয়। ৪ ফেব্রুয়ারি পুনরায় ছাত্র ধর্মঘট পালিত হয় এবং স্থির হয় ২১ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রভাষা দিবসরূপে পালিত হবে। ২০ ফেব্রুয়ারি সন্ধায় নুরুল আমিন সরকার ঢাকায় ১৪৪ ধারা জারি করে। নবাবপুরে আওয়ামী লীগ অফিসে আবুল হাশিমের সভাপতিত্বে ১৪৪ ধারা না ভাঙার সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু ছাত্রলীগের নেতৃত্বে বিশ্ববিদ্যালয় সংগ্রাম পরিষদ ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করতে বদ্ধপরিকর ছিলো। সংগ্রাম পরিষদের সভায় ছাত্রলীগ নেতা ডা. গোলাম মওলার নেতৃত্বে সংগ্রামর পরিষদের নেতৃস্থানীয় ছাত্রনেতারা ১৪৪ ধারা ভাঙার পক্ষে ভোট দেন; ছাত্রলীগের সদস্যরা ১০ জন করে অসংখ্য দলে বিভক্ত হয়ে শৃঙ্খলার সাথে ১৪৪ ধারা ভঙ্গের সিদ্ধান্ত নেয়।

১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ছাত্রলীগের নেতৃত্বে ছাত্ররা ১১৪ ধারা ভাঙা শুরু করলে ছাত্রদের সাথে পুলিশের ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া শুরু হয়ে যায়। এদিকে বিকাল তিনটার দিকে আইন পরিষদে বাজেট অধিবেশন শুরু হবার কথা ছিলো। ছাত্ররা ভাষার দাবিতে পরিষদ ভবনের দিকে যেতে শুরু করে, কিন্তু পুলিশ বাধা দেয় ও এক পর্যায়ে ছাত্রদের মিছিলে গুলিবর্ষণ শুরু করে। প্রথম দফা গুলিতে রফিকউদ্দিন ও জব্বার নিহত হয়। দ্বিতীয় দফা গুলিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবুল বরকত আহত হয়, রাতে হাসপাতালে মারা যান তিনি। এদিকে কারাগারে অনশন ধর্মঘট শুরু করেন শেখ মুজিবুর রহমান, সেই সাথে তিনি ছাত্রলীগ নেতাদের ভাষা আন্দোলনের দিকনির্দেশনা প্রদান করেন চিরকুট মারফত। ২২ ফেব্রুয়ারি ঢাকা মেডিকেল কলেজ প্রাঙ্গণে গায়েবি জানাজা অনুষ্ঠিত হয় এবং ছাত্ররা এক বিরাট শোক শোভাযাত্রা বের করে। হাইকোর্ট ও কার্জন হলের মাঝামাঝি রাস্তায় পুলিশ ছাত্রদের বাধা দেয় এবং গুলি চালায়। এসময় শফিউর রহমান ও রিকশাচালক আউয়াল নিহত হন। ২৩ ফেব্রুয়ারি ছাত্ররা একটি শহীদ মিনার নির্মাণ করে। ২৪ ফেব্রুয়ারি সকালে অনানুষ্ঠানিকভাবে শহীদ শফিউর রহমানে পিতা আর ২৬ ফেব্রুয়ারি আবুল কালাম শামসুদ্দিন আনুষ্ঠানিকভাবে শহীদ মিনারের উদ্বোধন করেছিলেন। ইতিমধ্যে পুলিশ নিরাপত্তা আইনে আবুল হাশিম, আবদুল হামিদ খান ভাসানী, অধ্যাপক মুনীর চৌধুরী, অধ্যাপক অজিতকুমার গুহ, পুলিন দে, অধ্যাপক পৃথ্বিশ চক্রবর্তী, অলি আহাদ প্রমুখকে গ্রেফতার করে। নুরুল আমিন সরকার ভাষা আন্দোলনকারীদের ‘ভারতের চর’, ‘হিন্দু’ ইত্যাদি আখ্যা দেয়।

১৯৫৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হল ইউনিয়নের বাৎসরিক নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, এই নির্বাচনে সংখ্যা গরিষ্ঠতা লাভ করে ছাত্রলীগ। পাকিস্তান সরকার ১৯৫৫ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ‘শহীদ দিবস’ পালনে বাধা দেয়। সেদিন ছাত্রলীগের এত সদস্যকে গ্রেফতার করা হয়েছিলো যে, ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে স্থান সংকুলান না হওয়ায় তাদের লালবাগ কেল্লায় অবস্থিত তৎকালীন পুলিশ হেড কোয়ার্টারে তাবু খাটিয়ে আটক করে রাখা হয়েছিলো।

১৯৫৭ সাল থেকে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার নির্মাণ শুরু হয় যা শেষ হয় ১৯৬৩ সালে। সার্বিক তত্ত্বাবধায়ন করেছিলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মাহমুদ হোসেনের নেতৃত্বে গঠিত কমিটি; আর এই কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার দ্রুত নির্মাণের জন্য প্রতিনিয়ত নিরাপদ নির্মাণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে ছাত্রলীগ।

১৯৬১ সালে পূর্ব পাকিস্তানে রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকী পালনে বাধা দেওয়া হয়। কিন্তু আইয়ুব সরকারের সব ভয়ভীতি উপেক্ষা করে ছাত্রলীগের নেতৃত্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষকদের উদ্যোগে গঠিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রিক রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকী কমিটি মহাসমারোহে রবীন্দ্র জন্ম-শতবার্ষিকী উদ্যাপন করে; এই উদ্যোগের পুরোভাগে ছিলেন বিচারপতি মাহবুব মোর্শেদ ও অধ্যাপক খান সারওয়ার মুরশিদ। এই বছরেই পাকিস্তানের দুই অংশের জন্য পৃথক অর্থনীতি প্রবর্তনের প্রয়োজনীয়তাও ছাত্রলীগ প্রচার করতে থাকে, ছাত্রলীগের এই প্রচারাভিযানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরাও যোগ দেন।

১৯৬২ সালে ছাত্রলীগের নেতৃত্বে প্রচণ্ড ছাত্র বিক্ষোভের সূচনা ঘটে; ছাত্র বিক্ষোভ এমন আকার ধারণ করে যে, সে বছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সর্বমোট ২৭ দিনের বেশি ক্লাস হয়নি। ছাত্রলীগের নেতৃত্বে ছাত্র ইউনিয়নের ছাত্র-ছাত্রীরাও এই আন্দোলনে অংশ নেয়। ১৯৬২ সালের অক্টোবর মাসে আবদুল মোনায়েম খান পূর্ব পাকিস্তানের গভর্ণর হয়ে আসেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. মাহমুদ হোসেন মোনায়েম খানের কথা মতো ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের বহিস্কার ও ছাত্র আন্দোলন বন্ধে উদ্যোগ না নিয়ে পদত্যাগ করেন। ঐ সময়ে ছাত্রলীগের আন্দোলন ও আইয়ুব বিরোধী ছাত্র আন্দোলন দমন করার জন্য মোনায়েম খান ‘জাতীয় ছাত্র ফেডারেশন’ (এনএসএফ) নামে একটি সশস্ত্র ক্যাডার বাহিনী গঠন করে; এনএসএফ ১৯৬৩ সাল থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এক ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে অসংখ্য ছাত্রলীগ সদস্যকে নির্মমভাবে হত্যা করেছিলো।

১৯৬৪ সালের ২২ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে ছাত্রলীগের নেতৃত্বে ছাত্ররা চান্সেলর মোনায়েম খানের কাছ থেকে ডিগ্রি নিতে অস্বীকার করে; এতে সমাবর্তন পণ্ড হয়ে যায়। ১৯৬৬ সালে এনএসএফ সন্ত্রাসীরা শুধু ছাত্রলীগের সদস্যদের উপরই আক্রমণ করেনি তারা অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক ড. আবু মাহমুদকেও কুপিয়ে আহত করেছিলেন ছাত্রলীগের সদস্যদের প্রতি নৈতিক সমর্থন প্রদান করার জন্য; ছাত্রলীগের নেতৃত্বে সাধারণ ছাত্র ও শিক্ষক সমাজ এই ঘটনার বিরুদ্ধে ব্যাপক প্রতিবাদ গড়ে তোলেন।

১৯৬৬ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি, শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালিদের প্রতি জাতিগত এই বৈষম্যের বাস্তবচিত্র তুলে ধরে লাহোরে আহুত ‘সর্বদলীয় জাতীয় সংহতি সম্মেলন’-এ ঐতিহাসিক ছয় দফা দাবি উপস্থাপন করেন। পরবর্তী সময়ে এই ছয় দফা পূর্ব পাকিস্তানের আন্দোলনকে ভিন্নমাত্রা দান করেছিলো। ছাত্রলীগের নেতৃত্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা এই সময়ে ছয় দফার যৌক্তিকতা তুলে ধরে সাধারণ মানুষের মধ্যে ছয় দফার পক্ষে প্রচার চালান, সেই সাথে শেখ মুজিবুর রহমানের দেখিয়ে দেওয়া লক্ষ্যকে নিজেদের লক্ষ্য মনে করেই হাঁটতে থাকেন।

আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার খবরে উত্তাল হয়ে ওঠে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার বিপক্ষে তুমুল জনমত গড়ে তুলতে সক্ষম হয় ছাত্রলীগ। ১৯৬৮ সালের ১৯ জুন পাকিস্তান সরকার শেখ মুজিবুর রহমানসহ ৩৫ ব্যক্তিকে গ্রেফতার করে এক রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা দায়ের করে। এই মামলা ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা’ নামে পরিচিত। আসামীরা সকলেই রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তা ছিলেন। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার আসামীরা হলেন শেখ মুজিবুর রহমান, আহমেদ ফজলুর রহমান (সিএসপি), কমান্ডার মোয়াজ্জেম হোসেন, স্টুয়ার্ড মুজিবুর রহমান, সাবেক এলএস সুলতানউদ্দীন আহমদ, এলএসসিডিআই নূর মোহাম্মদ, ফ্লাইট সার্জেন্ট মাহফিজ উল্লাহ, কর্পোরাল আবদুস সামাদ, সাবেক হাবিলদার দলিল উদ্দিন, রুহুল কুদ্দুস (সিএসপি), ফ্লাইট সার্জেন্ট মো. ফজলুল হক, বিভূতি ভূষণ চৌধুরী ওরফে মানিক চৌধুরী, বিধান কৃষ্ণ সেন, সুবেদার আবদুর রাজ্জাক, সাবেক কেরাণী মুজিবুর রহমান, সাবেক ফ্লাইট সার্জেন্ট মো. আব্দুর রাজ্জাক, সার্জেন্ট জহুরুল হক, এ. বি. খুরশীদ, খান মোহাম্মদ শামসুর রহমান (সিএসপি), এ কে এম শামসুল হক, হাবিলদার আজিজুল হক, মাহফুজুল বারী, সার্জেন্ট শামসুল হক, শামসুল আলম, ক্যাপ্টেন মো. আব্দুল মোতালেব, ক্যাপ্টেন এ. শওকত আলী, ক্যাপ্টেন খোন্দকার নাজমুল হুদা, ক্যাপ্টেন এ. এন. এম নূরুজ্জামান, সার্জেন্ট আবদুল জলিল, মাহবুবু উদ্দীন চৌধুরী, লে. এম রহমান, সাবেক সুবেদার তাজুল ইসলাম, আলী রেজা, ক্যাপ্টেন খুরশীদ উদ্দীন এবং ল্যান্স নায়েক আবদুর রউফ।

১৯৬৮ সালের ১৯ জুন, ঢাকা সেনানিবাসে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার বিচার শুরু হয়। বিচারকার্য চলার সময় থেকেই ছাত্রলীগের নেতৃত্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় উত্তাল হয়ে ওঠে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আকাশ স্লোগানে স্লোগানে কেঁপে ওঠে, ‘জেলের তালা ভাঙবো, শেখ মুজিবকে আনবো।’ ছাত্রলীগের নেতৃত্বে এই গণ-আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় দেশব্যাপী সরকার বিরোধী আন্দোলন পূর্ণতা লাভ করে এবং ধীরে ধীরে বাঙলার স্বায়ত্বশাসনের দাবি প্রবল হয়ে উঠতে থাকে। ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরাই নির্ধারণ করেন সেই সময়ের রাজনৈতিক স্লোগান; যেমন, ‘তোমার আমার ঠিকানা, পদ্মা মেঘনা যমুনা।’ ‘পিন্ডি না ঢাকা, ঢাকা ঢাকা।’ ‘জাগো জাগো, বাঙালি জাগো’। এই ধারাবাহিকতায় ছাত্রলীগের নেতৃত্বেই স্বায়ত্বশাসনের আন্দোলন বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের পথকে উন্মূক্ত করে। এই আন্দোলন শুরুতে অহিংস আন্দোলন ছিলো, ক্রমান্বয়ে তা সহিংসতার দিকে ধাবিত হতে থাকে; ফলে ছাত্রলীগের নেতৃত্বেই ছয় দফা দাবি গণদাবিতে পরিণত হয়।

গণঅভ্যুত্থান আন্দোলন তীব্রতর হয়ে উঠে ১৯৬৯ সালের জানুয়ারি মাসে। মূলত এই আন্দোলনের কেন্দ্রীয় শক্তি হিসেবে কাজ করেছে ছাত্রলীগের নেতৃত্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-সমাজ। ছাত্র আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন ছাত্রলীগ নেতা সিরাজুল আলম খান, আবদুর রাজ্জাক, কাজী আরেফ আহমেদ, আবদুর রউফ, খালেদ মোহাম্মদ আলী, তোফায়েল আহমেদ, আ স ম আবদুর রব, নূরে আলম সিদ্দিকী, শাহজাহান সিরাজ, সামসুদ্দোহা, মোস্তফা জামাল হায়দর, জাহাঙ্গীর হোসেন, সেতারা হোসেন এবং ফোরকান বেগমসহ অনেকে। ছাত্রদের সাথে যুক্ত হয়েছিলো সে সময়ের নানা পেশার মানুষ। এই আন্দোলনের তীব্রতা বুঝা যায়, সে সময়ের আন্দোলনরত ছাত্র-জনতার আত্মত্যাগের তালিকা দেখলে।

১৯৬৯ সালের ৪ জানুযারি ছাত্রলীগের জন্মদিন উপলক্ষে ছাত্রলীগের নেতৃত্বে সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ তাদের ঐতিহাসিক ১১ দফা কর্মসূচি পেশ করেন। জানুয়ারির ৫ তারিখে কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ তাদের ১১ দফা দাবী পেশ করে যার মধ্যে শেখ মুজিবের ছয় দফার সবগুলো দফাই অন্তর্ভুক্ত ছিলো। ছাত্রলীগের নেতৃত্বে থাকা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সিদ্ধান্তক্রমে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহারের দাবীতে দেশব্যাপী ছাত্র আন্দোলনের প্রস্তুতি গৃহীত হয়। এই সংগ্রাম এক সময় গণ-আন্দোলনে রূপ নেয়। এই গণ-আন্দোলনই ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান নামে পরিচিত। মাসব্যাপী প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ আন্দোলন, ১৪৪ ধারা ভঙ্গ, কারফিউ, পুলিশের গুলিবর্ষণ এবং বেশকিছু হতাহতের পর আন্দোলন চরম রূপ ধারণ করলে পাকিস্তান সরকার ছাড় দিতে বাধ্য হয়। তৎকালীন রাষ্ট্রপতি আইয়ুব খান রাজনৈতিক নেতাদের সাথে এক গোলটেবিল বৈঠকের পর এই মামলা প্রত্যাহার করে নেন। এর সাথে শেখ মুজিবসহ অভিযুক্ত সকলকে মুক্তি দেয়া হয়।

১৯৬৯ সালের ৭ ও ৮ জানুয়ারি গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পক্ষে রাজনৈতিক ঐক্য ডেমোক্রেটিক অ্যাকশন কমিটি সংক্ষেপে ড্যাক (DAC) গঠিত হয়। ২০ জানুয়ারি ছাত্রলীগের মিছিলে গুলিবর্ষণের ঘটনায় নিহত হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগ নেতা আসাদুজ্জামান। ২১ ফেব্রুয়ারি ছাত্রলীগের নেতৃত্বে ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার করা হয়। ছাত্রলীগের নেতৃত্বে কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ এই বছরের ২৩ ফেব্রুয়ারি উপমহাদেশের অবিসংবাদিত নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের সম্মানে ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) এক জনসভার আয়োজন করে। লাখো জনতার এই সম্মেলনে শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধি প্রদান করা হয়। উপাধি প্রদানের ঘোষণা দিয়েছিলেন ছাত্রলীগ নেতা ও ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আহবায়ক তোফায়েল আহমেদ। এই সভায় রাখা বক্তৃতায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের ১১ দফা দাবীর পক্ষে তাঁর পূর্ণ সমর্থন ব্যক্ত করেন।

১৯৭০ সাল, প্রতিটি মুক্তিকামী বাঙালির মতোই ছাত্রলীগের জীবনেও একটা গুরুত্বপূর্ণ দিক, এই বছরেই সাধারণ নির্বাচনে বিপুলভাবে জয়লাভ করে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বের গুণাবলি এবং ছাত্রলীগ কর্মীদের অক্লান্ত প্রচেষ্টায় বাংলাদেশের মানুষ বেছে নেয় তাদের যোগ্য নেতৃত্ব।

১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে ছাত্রলীগের ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ, একটি জাতিরাষ্ট্র জন্মদানের জন্য একটি ছাত্র সংগঠন যে মুখ্য ভূমিকা পালন করতে পারে তার একমাত্র প্রমাণ ছাত্রলীগ। একাত্তরের ৭ মার্চে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণ এবং সমাবেশ আয়োজনের পুরো দায়িত্ব সম্পন্ন করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মুক্তিকামী সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীরা। বাঙালির জাগরণে মুখ্য ভূমিকা পালনের জন্য ছাত্রলীগ ছিলো পাকিস্তানী শাসকচক্রের অন্যতম প্রধান শত্রু, তাই ওরা সমূলে ধ্বংস করতে চেয়েছিলো ছাত্রলীগকে, আর ছাত্রলীগকে সমূলে ধ্বংস করার জন্য ছাত্রলীগের জন্মদাতা প্রতিষ্ঠান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপর নেমে আসে ধ্বংসলীলা।

ছাত্রলীগের জন্মদাতা প্রতিষ্ঠান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছিলো বাংলাদেশের স্বাধীনতা চেতনার উন্মেষকেন্দ্র। বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য সশস্ত্র সংগ্রামেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবদান অবিস্মরণীয়। একাত্তরের মার্চ মাসে পাকিস্তানের সামরিক ও আমলাচক্রের মুখপাত্র জেনারেল ইয়াহিয়া খান এবং জুলফিকার আলী ভুট্টো বাঙলার ছাত্র রাজনীতি সমূলে ধ্বংস করার অভিযান অপারেশন সার্চ লাইট শুরু করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই। ছাত্রলীগ তথা বাঙলার ছাত্র রাজনীতি এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে ধ্বংস করার জন্যই ‘অপারেশন সার্চলাইট’। এইচ আওয়ার নির্ধারিত হয়েছিলো ২৬ মার্চ রাত ১ টার সময়। ক্যান্টনমেন্ট বের হয়ে সেনাবাহিনী প্রথম প্রতিরোধের সম্মুখীন হয় ফার্মগেট এলাকায়, তেজগাঁও কলেজ ছাত্রলীগের সদস্যদের প্রবল বাধার সম্মুখিন হয় সেনাবাহিনী। রাস্তায় পড়ে থাকা একটি বিশাল গাছ সেনাবাহিনীর গতিরোধ করে, রাস্তার পাশের এলাকা পুরানো গাড়ি আর স্টিম রোলার দিয়ে বন্ধ করে রেখেছিলো ছাত্রলীগের সদস্যরা। ছাত্রলীগের নেতৃত্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মুসলিম হলের ছাত্ররা হলের সামনে একটি বড় গাছের গুড়ি ফেলে রেখে সেনাবাহিনীকে বাধা দেয়। ভোর ৪ টার মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভবনগুলো দখল করে নেয় হানাদারেরা। ১৮নং পাঞ্জাব, ২২নং বেলুচ এবং ৩২নং পাঞ্জাব রেজিমেন্টের বিভিন্ন ব্যাটেলিয়ন নিয়ে গঠিত বিশেষ ভ্রাম্যমাণ বাহিনী লেফটেন্যান্ট কর্নেল তাজের নেতৃত্বে স্বয়ংক্রিয় রাইফেল, ট্যাংক বিধ্বংসী রিকয়েললেস রাইফেল, রকেট লঞ্চার, মর্টার, ভারি ও হাল্কা মেশিনগানে সজ্জিত হয়ে ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ থেকে ২৭ মার্চ সকাল পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস ঘেরাও করে আক্রমণ, গণহত্যা, লুণ্ঠন, অগ্নিসংযোগ এবং ধ্বংসযজ্ঞ চালায়; ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগ সদস্যরা প্রবল প্রতিরোধ গড়ে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত। ঐ রাতে দৈবক্রমে পাকিস্তানি হানাদারদের আক্রমণ থেকে বেঁচে যাওয়া অধ্যাপক ড. মফিজুল্লাহ্ কবির তাঁর ১৯৭১-৭২ সালের বার্ষিক রিপোর্টে লেখেন, ‘ঐ রাতে ছাত্রলীগ সদস্যসহ প্রায় ৩০০ ব্যক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় নিহত হয়। সেই সাথে ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০ জন শিক্ষক ও ২৬ জন অন্যান্য কর্মচারী। সবচেয়ে নারকীয় ঘটনা ঘটে জগন্নাথ হলে, সেই রাতে ৩৪ জন ছাত্রলীগ সদস্য শুধু জগন্নাথ হলেই নিহত হয়। ২৬ মার্চ রমনা কালীবাড়িও আক্রান্ত হয়, সেখানে নিহত হয় জগন্নাথ হলের ৬ জন ছাত্রলীগ সদস্য। হানাদার বাহিনী হত্যা করে মধুর ক্যান্টিনের মধুসূদন দে’কেও (মধুদা)। মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে পাকিস্তানী সৈন্যরা মুধুর ক্যান্টিন ডিনামাইট দিয়ে উড়িয়ে দিতে শুরু করলে উর্দু বিভাগের শিক্ষক আফতাব আহমদ সিদ্দিকী খবর পেয়ে তাদের বাধা দেন এবং জানান যে এই ভবনেই ১৯০৬ সালে মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলো। ১০ নভেম্বর সশস্ত্র সৈন্যরা রোকেয়া হলে প্রবেশ করে এবং ত্রিশজন ছাত্রলীগ সদস্য ছাত্রীর উপর বর্বর পাশবিক নির্যাতন চালিয়ে তাঁদের হত্যা করে, পাকিস্তানি হানাদারেরা প্রভোস্ট বাংলোও অবরোধ করে রাখে।

১৯৭১ সালের মার্চে অসহযোগ আন্দোলনের দিনগুলিতে ছাত্রলীগের নেতৃত্বে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের কর্মকাণ্ড পরিচালিত হতো ইকবাল হল (বর্তমান শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হল) থেকে। ছাত্রলীগের মূল নেতৃবৃন্দকে হত্যা করার জন্য অপারেশন সার্চ লাইটের প্রথম লক্ষ্যবন্তু ছিলো জহুরুল হক হল। সেদিন রাত থেকে ২৬ মার্চ সারা দিন রাত ঐ হলের উপর নীলক্ষেত রোড থেকে মর্টার, রকেট লাঞ্চার, রিকয়েলস রাইফেল এবং ভারী মেশিন গান ও ট্যাংক থেকে প্রচণ্ড আক্রমণ পরিচালিত হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কে এ মুনিম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৯৭১-৭২ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনে লিখেছিলেন, শুধু জহুরুল হক হলেই ছাত্রলীগের প্রায় ২০০ জন সদস্য নিহত হন। ২৬ মার্চ সকালের দিকে সেনাবাহিনীর কন্ট্রোল রুম ও ৮৮ ইউনিটের মধ্যে যে কথোপকথন হয় তা থেকে জানা যায় ক্যাম্পাসে ৪০০ জন ছাত্রলীগ সদস্য নিহত হয়।

১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পনের মধ্যে দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘স্বাধীন বাংলাদেশ’ রাষ্ট্রের যাত্রা শুরু হয়। ১৭ ডিসেম্বর থেকে আল-বদর বাহিনী কর্তৃক অপহৃত শিক্ষকদের ছাত্রলীগের নেতৃত্বে অনুসন্ধান শুরু হয়। মিরপুর, রায়ের বাজার, মোহাম্মদপুরের বধ্যভূমি থেকে যে সব শিক্ষকের লাশ সনাক্ত করা সম্ভব হয়েছিলো ছাত্রলীগের আবেদনে তাদের দাফন করা হয় বিশ্ববিদ্যালয় মসজিদ প্রাঙ্গনে। মসজিদ প্রাঙ্গণেই শহীদ শিক্ষদের জানাজা অনুষ্ঠিত হয় এতে যোগদেন বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমেদ।

১৯৭২ সালের এপ্রিল মাসে কলকাতা রবীন্দ্রসদনের মাঠে আয়োজিত হয় প্রথম ‘বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী মেলা’। ডাকসুকে আমন্ত্রণ জানানো হয় ছাত্র-ছাত্রী অভিনীত একটি নাটক মৈত্রী মেলায় মঞ্চস্থ করার জন্য। সেখানে মুনীর চৌধুরীর বানার্ড শ’য়ের ‘নেভার ক্যান টেল’-এর বাংলা রুপান্তর ‘কেউ কিছু বলতে পারে না’ নাটকটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র-ছাত্রীরা মঞ্চস্থ করে, লক্ষ্য করার বিষয় এই মঞ্চ নাটকে অভিনীত সকলেই ছিলেন ছাত্রলীগের সক্রিয় সদস্য।

১৯৭২ সালের ৬ মে জাতির পিতা প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আনুষ্ঠানিকভাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সফরে আসেন। ছাত্রলীগের নেতৃত্বে ডাকসু থেকে তাঁকে আজীবন সদস্য পদ দেওয়া হয়, সেই সাথে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ১৯৪৯ সালের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের ধর্মঘটের সময় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিস্কৃত শেখ মুজিবুর রহমানের বহিস্কার আদেশ প্রত্যাহার করে। স্বাধীন বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধু সরকারের উন্নয়নকাণ্ডে প্রকাশ্য ভূমিকা রাখতে শুরু করে ছাত্রলীগ।

১৯৭৪ সাল, ছাত্রলীগের ইতিহাসে রক্তাক্ত এক বিষাদময় সময়, এই বছরেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মহসিন হলে আবদুর রাজ্জাক গ্রুপের ছাত্রলীগের নেতা সফিউল আলম প্রধান নির্মমভাবে খুন করে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির মেধাবী ৭জন নেতাকে, এই ৭জন সবাই ছিলো শেখ ফজলুল হক মনি গ্রুপের। এই হত্যাকাণ্ডের পরে আবদুর রাজ্জাকের সহযোগিতায় পালাতে সক্ষম হয় সফিউল আলম প্রধান, তবে শেষ রক্ষা হয়নি; পুলিশের হাতে গ্রেফতার হয় প্রধান।

১৯৭৫ এর ১৫ আগস্ট সকাল ১০ টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলর রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আনুষ্ঠানিকভাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পরিদর্শন এবং টিএসসিতে শিক্ষকদের উদ্দেশে ভাষণ প্রদানের কথা ছিলো। কিন্তু ১৫ আগস্ট শেষ রাতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সহ পুরো পরিবারের সকলকে নির্মমভাবে হত্যা করে দেশবিরোধী ঘাতকচক্র। সেই সময়ে প্রথম প্রতিবাদ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা, ছাত্রলীগের নেতৃত্বে বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদে মিছিল নিয়েও বের হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা, ছাত্রলীগের নেতৃত্বে এই মিছিলে যোগ দেয় ছাত্র ইউনিয়নের তৎকালীন সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম।

বঙ্গবন্ধুর খুনীচক্রের ক্রীড়ানক খন্দকার মোশতাক আহমদের সরকার ১৯৭৫ এর ২৩ সেপ্টেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মতিন চৌধুরীকে অব্যহতি প্রদান করে এবং পরে গ্রেফতার করে, এর প্রতিবাদে প্রবল আন্দোলন গড়ে তোলে ছাত্রলীগের সদস্যরা। ১৯৭৫-এর ৭ নভেম্বর প্রথমে প্রধান ও পরে উপ-প্রধান সামরিক প্রশাসকরূপে বঙ্গবন্ধুর খুনীচক্রের অন্যতম সদস্য জেনারেল জিয়াউর রহমান দায়িত্ব পালন করে, ছাত্রলীগের আন্দোলনের কারণে ঘাতক জিয়ার মুভমেন্ট দেশব্যাপী বাধাগ্রস্থ হয়েছিলো।

১৯৭৭ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি স্বৈরশাসক হিসেবে ঘাতক জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করে, বন্দুকের নলে ক্ষমতা গ্রহণের প্রতিবাদে দেশব্যাপী সরব হয় ছাত্রলীগ। জেনারেল জিয়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক ড. মুজাফফর আহমদকে বাংলাদেশ সরকারের বস্ত্র উপদেষ্টা নিয়োগ করেন, ড. মুজাফফরকে নিয়োগ প্রদানের বড় কারণ ছিলো ছাত্রলীগের রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করা। জিয়ার শাসনামলে ১৯৭৭ সালে ছাত্র ইউনিয়ন তার সাথে পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদ খননকার্যে অংশগ্রহণ করে, এর ফলে ছাত্রলীগের নেতৃত্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে ছাত্র ইউনিয়নের বিরুদ্ধে ব্যাপক আন্দোলন গড়ে ওঠে, ওই সময় থেকেই ছাত্রলীগের অর্জনকে বাধাগ্রস্থ করার লক্ষ্যে বাংলাদেশের প্রতিক্রিয়াশীল কর্মকাণ্ডে পর্দার অন্তরালে থেকে জড়িয়ে যায় এক সময়ের সাংস্কৃতিক কর্মে জড়িত সংগঠন ছাত্র ইউনিয়ন।

১৯৭৮ সালের ২৮ অক্টোবর রাষ্ট্রপতি ও বিশ্ববিদ্যালয় চ্যান্সেলর জিয়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আসেন, তাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্যাকআপ সাপোর্ট দেয় মাহমুদুর রহমান মান্নার নেতৃত্বে থাকা ছাত্ররা। এই দিনই ছাত্রলীগের মারমুখী সদস্যদের হাতে টিএসসিতে লাঞ্ছিত হন জেনারেল জিয়া; রাষ্ট্রপতি জিয়াকে লাঞ্ছিত করার কারণ দেখি ছাত্র ইউনিয়নের নেতৃত্বে বাম ছাত্র সংগঠনগুলো ঐদিনই ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগ বিরোধী মিছিল বের করে।

১৯৭৯-১৯৮০ সাল ছিলো ছাত্র রাজনীতির বাক-স্বাধীনতা হরণের বোবা সময়, এই সময়ে ছাত্রলীগকে রাজনীতি থেকে নির্বাসন দেওয়ার অপচেষ্টার ছক এঁকেছিলো বিভিন্ন বাম ছাত্র সংগঠনগুলো। ঘাতক জিয়ার প্রকাশ্য রাষ্ট্রযন্ত্র এই সময়ে ছাত্রলীগ নির্মূলের জন্য বাম ছাত্র সংগঠনগুলোকে ব্যাপকভাবে অর্থ সহযোগিতা করতে শুরু করে।

১৯৮১ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি ছাত্রলীগ ও শিক্ষকদের ডাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ধর্মঘট পালিত হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ধর্মঘট শুরু হয় ১৪ ফেব্রুয়ারি; শেষ পর্যন্ত ১৮ মার্চ বিশ্ববিদ্যালয় অর্ডিন্যান্স সংশোধনী গৃহীত হলে শিক্ষক ধর্মঘটের অবসান ঘটে, কিন্তু অবাদ রাজনীতি ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার দাবীতে ছাত্রলীগের আন্দোলন চলতেই থাকে।

১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে সেনাবাহিনীর কতিপয় বিপ্লবী অফিসারের এক অভ্যুত্থানে স্বৈরশাসক রাষ্ট্রপতি ঘাতক জিয়াউর রহমান নিহত হয়। এই সময়ে টালমাটাল এক অস্থির সময় পার করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, এই অস্থির সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র রাজনীতির মূল ভূমিকায় ফিরে আসে ছাত্রলীগ।

১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ জেনারেল হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ বন্দুকের নলের বদৌলতে ক্ষমতা গ্রহণ করেন। এতে ছাত্রলীগ পুনরায় নতুন স্বৈরশাসকের ক্ষমতা গ্রহণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করে। সামরিক সরকার ছাত্র আন্দোলনে বাধা দিতে চেষ্টা করে এবং অনেক ছাত্রলীগ সদস্যকে গ্রেফতার করে।

১৯৮২ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর ‘শিক্ষা দিবসে’ সামরিক সরকার ছাত্রলীগ সদস্যদের শহীদ মিনারে ফুল দিতে বাধা দেয় এবং কয়েকজন ছাত্রলীগ সদস্যকে গ্রেফতার করলে বিক্ষোভ শুরু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গুলোতে; প্রবল প্রতিবাদে ছাত্রলীগ সদস্যদের মুক্তি দিতে বাধ্য হয় সামরিক জান্তা।

১৯৮২ সালের ১৪ নভেম্বর অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে ছাত্রলীগের সমাবেশে ২৯ নভেম্বর দেশব্যাপী দাবী দিবস পালনের সিদ্ধান্ত ঘোষিত হয়। ঐ দিবসে ছাত্রলীগ নেতারা সামরিক স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হবার জন্য রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি আহ্ববান জানায়।

১৯৮৩ সালের ১৮ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ফজলুল হালিম চৌধুরীকে বাধ্যতামূলক অব্যাহতি প্রদান করা হয়, তাঁর অপরাধ ছিলো ছাত্রলীগকে পূর্ণ সহযোগিতা করা; সেই সাথে সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন আন্দোলনে ছাত্রলীগের পাশে দাঁড়ানো। পুরো আশির দশক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অস্থিতিশীল ছিলো, ছাত্রলীগকে নির্মূলের জন্য বিভিন্ন ষড়যন্ত্র শুরু হতে থাকে, এই ষড়যন্ত্রকে উপেক্ষা করে বীরের মতো মাথা উঁচু করে দাঁড়ায় ছাত্রলীগ।

১৯৮৮-১৯৮৯-১৯৯০ এর ইতিহাস মোটামুটি আমাদের সবারই জানা, ছাত্রলীগের নেতৃত্বে স্বৈচার এরশাদের পতন দাবিতে মুখর হয়ে ওঠে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস, বরাবরের মতোই ছাত্রলীগের নেতৃত্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বাঙালির আশ্রয়স্থল হিসেবে স্বৈচার এরশাদের পতনে মূল ভূমিকা পালন করে।

১৯৯১ সালের ১০ অক্টোবর ছাত্রলীগের নেতৃত্বে গণতন্ত্রের মুক্তির দাবীতে মিছিলে যোগদান করে পুলিশের গুলিতে প্রাণ হারায় অসংখ্য ছাত্র-জনতা। এই ঘটনার পরে ছাত্রলীগের নেতৃত্বে সেই সকল প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠন গণতন্ত্রের মুক্তির পক্ষে একাত্মতা ঘোষণা করে। ছাত্রলীগের নেতৃত্বে গঠন করা হয় সর্বদলীয় ছাত্র জোট, জোটের প্রধান ছিলেন ১১ জন ছাত্র।

১৯৯১ সালের ২৬ নভেম্বর শহীদ মিনারে আয়োজিত একটি সভায় ছাত্রলীগের নেতৃত্বে ছাত্র জোটের এই ১১ জন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হাজার হাজার ছাত্র একত্র হয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠায় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়। পরবর্তী বিজয় দিবস তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনেই অনুষ্ঠিত হয়েছিলো, বরাবরের মতোই দাবী আদায়ে সফল হয়েছিলো ছাত্রলীগ।

১৯৯১ সালে ২৭ ফেব্রুয়ারি সংসদ নির্বাচনে কারচুপি করে বিজয়ী হয় বিএনপি, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ক্ষমতা গ্রহণ করে ঘাতক জিয়ার স্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া; ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ সারাদেশে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠন ছাত্রদল। ছাত্রলীগকে ছাত্র রাজনীতি করার সুযোগ দেয়নি তখন ছাত্রদল, প্রকাশ্য দিবালোকে ছাত্রলীগের সদস্যদের নির্বিচারে কুপিয়ে আহত করতো ছাত্রদলের সদস্যরা।

১৯৯১-১৯৯৫ ছাত্র রাজনীতির অস্থির সময় অতিবাহিত পুরো বাংলাদেশে, ঐ সময়ে ছাত্রলীগকে নির্মূলের জন্য বিশেষ মিশন নিয়ে খালেদা প্রশাসন। অস্থির সময়ের মধ্যেই সাজানো নির্বাচনের মাধ্যমে ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি সব বিরোধী দলের বিরোধীতার পরও ক্ষমতায় বসে খালেদা জিয়া, তবে বেশিদিন ক্ষমতা দখল করে থাকতে পারেনি সে। ছাত্রলীগ ও সাধারণ মানুষের প্রবল আন্দোলনের মুখে ক্ষমতা ছেড়ে নতুন করে নির্বাচন দিতে বাধ্য হয় খালেদা প্রশাসন।

১৯৯৬ সালের ১২ জুন পুনরায় নির্বাচন দিলে আওয়ামী লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে ক্ষমতায় আসে, এই নির্বাচনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে ছাত্রলীগ। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ক্ষমতাগ্রহণ করেন বঙ্গবন্ধুর কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা। নতুনভাবে নতুন উদ্যোমে দেশ গঠনের ব্রত নিয়ে গঠনমূলক ছাত্র রাজনীতি শুরু করে ছাত্রলীগ। ১৯৯৬-২০০০ সাল, বাংলাদেশের ছাত্র রাজনীতিতে ছাত্রলীগ নতুনভাবে জেগে ওঠে, মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের ছাত্র রাজনীতি পুনরায় মুক্তভাবে রাজনীতি করার সুযোগ পায়; বাংলাদেশের জন্মদাতা সংগঠন ছাত্রলীগ মুক্ত বাতাসে সুস্থ্য ছাত্র রাজনীতি ফিরিয়ে আনে।

২০০১ সালের ১ অক্টোবরের নির্বাচনে দেশবিরোধী একাত্তরের ঘাতকচক্র জামাতকে সাথে নিয়ে ষড়যন্ত্রের ডালে চড়ে বিজয়ী হয় বিএনপি, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ক্ষমতা গ্রহণ করে ঘাতক জিয়ার স্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। ২০০১ পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশে জঙ্গীবাদী ছাত্র রাজনীতি ক্রমশ বৃদ্ধি পেতে থাকে, সরকারি সহযোগিতায় এইসব ছাত্র সংগঠন তাদের কাজ চালিয়েছে; তাদের মূল টার্গেট ছিলো ছাত্রলীগকে সমূলে শেষ করা। বিএনপি-জামাতের জঙ্গিবাদী রাজনীতির বিরুদ্ধে ছাত্রলীগ ব্যাপকভাবে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলো।

২০০২ সালের ২৩ জুলাই গভীর রাতে পুলিশ ও ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠন ছাত্রদল নির্বিচারে ঝাঁপিয়ে পড়ে শামসুন্নাহার হলের ছাত্রলীগসহ সাধারণ ছাত্রীদের উপর। পুলিশ ও ছাত্রদলের সদস্যরা শামসুন্নাহার হলে ঢুকে ছাত্রলীগ সদস্য ও সাধারণ ছাত্রীদের বেধড়ক লাঠিপেটা করে এবং অসংখ্য ছাত্রীকে আটক করে থানায় নিয়ে যায়। শামসুন্নাহার হলের তৎকালীন ক্ষমতাসীন ছাত্রদলের সভানেত্রী লুসি ও তার আশ্রিতা বহিরাগতদের দৌরাত্মে ছাত্রলীগসহ সাধারণ ছাত্রীদের নাভিশ্বাস চরমে ওঠে। এসব কারণে সাধারণ ছাত্রীদের নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনে ছাত্রলীগ সমর্থন দেওয়াতে অপ্রত্যাশিতভাবে বর্বরোচিত পুলিশি হস্তক্ষেপ ছিলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তথা ছাত্র রাজনীতির ইতিহাসে পুরুষ পুলিশ দিয়ে ছাত্রী নির্যাতনের প্রথম নিদর্শন। হামলাকারী পুরুষ পুলিশ দলটির নেতৃত্ব দেয় ঢাকা দক্ষিণের তখনকার এডিসি আবদুর রহীম। সেই রাতে পুলিশের অশ্লীলতা আর নিষ্ঠুরতার শিকার হয় ছাত্রলীগ কর্মীসহ শত শত সাধারণ ছাত্রী। রুমে ঢুকে, করিডোরে যাকে যেখানে পেয়েছে, নির্বিচারে পিটিয়েছে পুলিশ আর ছাত্রদলের ক্যাডারেরা। এরপর ফৌজদারি মামলার আসামীর মতো ধরে নিয়ে রেখেছে হাজতে।

পরেরদিন ২৪ জুলাই ছাত্রলীগের নেতৃত্বে প্রতিবাদকারী ছাত্র-ছাত্রী ও শিক্ষকদের উপর কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ, রাবার বুলেট ও লাঠি চার্জ করে পুলিশ। ছাত্রলীগ নেতা-কর্মীসহ অনেক ছাত্র ও শিক্ষক আহত হয়, অথচ তখনকার উপাচার্য অধ্যাপক আনোয়ারুল্লাহ চৌধুরী ছাত্রলীগের নেতৃত্বে দশ হাজার সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীর সাহসী আন্দোলনকে ‘বহিরাগতদের আন্দোলন’, ‘বিচ্ছিন্ন ঘটনা’ ইত্যাদি নামে-উপনামে আখ্যায়িত করে দ্বায় এড়ানোর চেষ্টা করেন। ২৭ জুলাই বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করে ছাত্র-ছাত্রীদের অবিলম্বে হলত্যাগের নির্দেশ দেন। পুলিশের দখলে চলে যায় ক্যাম্পাস। তারপর ছাত্রলীগের নেতৃত্বে হাজার হাজার ছাত্র-ছাত্রী রোকেয়া হলের সামনের রাস্তাকে তাদের ‘মুক্তাঞ্চল’ ঘোষণা করে বিক্ষোভ প্রদর্শন করতে থাকে। ২৯ তারিখে পুলিশ আবার হামলা চালায় ছাত্রলীগের নেতৃত্বে প্রতিবাদী শিক্ষার্থীদের উপর। আহত হয় অর্ধশত ছাত্র, শিক্ষক আর সাংবাদিক। ঘটনার দীর্ঘ আটদিন পর ০১ আগস্ট উপাচার্য আনোয়ারুল্লাহ চৌধুরী ছাত্রলীগের প্রবল আন্দোলনের মুখে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। এছাড়াও প্রক্টর অধ্যাপক নজরুল ইসলাম ও হল প্রভোস্ট অধ্যাপক সুলতানা শফি পদত্যাগ করতে বাধ্য হন।

২০০৪ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি বাংলা একাডেমির বইমেলা থেকে বের হওয়ার সময় টিএসসি কাছে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের দেয়ালের পাশেই ছাত্রশিবির সদস্যদের হাতে নির্মমভাবে আহত হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের শিক্ষক প্রথাবিরোধী লেখক অধ্যাপক ড. হুমায়ুন আজাদ। এই হামলার প্রতিবাদে ছাত্রলীগের নেতৃত্বে ফুঁসে ওঠে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়; ছাত্রলীগের নেতৃত্বে রাস্তায় নেমে আসে সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীরা, ছাত্র-শিক্ষকদের সেই মিলিত আন্দোলনেও হামলা করেছিলো ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠন ছাত্রদল ও পুলিশ। তবুও থেমে থাকেনি ছাত্রলীগের নেতৃত্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, পুরনো অভ্যাস মতোই অপশক্তির বিরুদ্ধে বলিষ্ঠতা নিয়ে আন্দোলন গড়ে ছাত্রলীগ। ২০০৪ সালের ১১ আগস্ট জার্মানির মিউনিখে রহস্যময়ভাবে মৃত্যুবরণ করেন বাংলাদেশের এই প্রথাবিরোধী লেখক অধ্যাপক ড. হুমায়ুন আজাদ।

২০০৪ সালের ২১ আগস্টে বাংলাদেশের প্রধান রাজনৈতিক দল ও তৎকালীন বিরোধী দল আওয়ামী লীগের উপর বর্বরোচিত হামলা হয়, ইতিহাসের বর্বরোচিত এই গ্রেনেড হামলায় অসংখ্য নেতাকর্মী প্রাণ দেন, আহত হন বিরোধী দলীয় নেতা বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা। এর প্রতিবাদেও ছাত্রলীগের নেতৃত্বে উত্তাল হয়ে ওঠে বাঙলার ছাত্র রাজনীতি। ছাত্রলীগের ডাকে সময়ের সাহসী পদক্ষেপ গ্রহণ করে রাস্তায় নেমে আসে পুরো বাংলাদেশের ছাত্র-শিক্ষকেরা। জঙ্গীবাদের উত্থান ও বিভিন্ন দেশবিরোধী পদক্ষেপের কারণে ক্ষমতাসীন বিএনপি-জামাত চারদলীয় জোটের বিরুদ্ধে সকল আন্দোলনের অন্যতম মূল ভূমিকা পালন করে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ।

২০০৭ সালের সিআইএ মদদপুষ্ট সামরিক তত্ত্ববধায়ক সরকারের সময় সেনাবাহিনী কর্তৃক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র নির্যাতনের বিরুদ্ধে ছাত্রলীগের নেতৃত্বে উত্তাল হয়ে ওঠে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ পুরো বাংলাদেশের ছাত্র সমাজ। সেনাবাহিনীর সাথে হামলা পাল্টা হামলার ঘটনা ঘটতে থাকে। এক পর্যায়ে সিআইএ মদদপুষ্ট ও সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার আন্দোলনরত ছাত্র-শিক্ষকদেরে গ্রেপ্তার করে আন্দোলন বন্ধ করার পায়তারা করেও লাভবান হয়নি। অনড় অবস্থানে থেকে আন্দোলন চালিয়ে যায় ছাত্রলীগ, মুক্তি পায় গ্রেপ্তারকৃত ছাত্রলীগ সদস্যা ও অন্যান্য ছাত্রনেতা এবং শিক্ষকরা।

এরপরের ইতিহাস আমাদের সকলের জানা ইতিহাস, দেশবিরোধী ঘাতকচক্র ও প্রতিক্রিয়াশীল রাজনীতির বিরুদ্ধে বলিষ্ঠতা নিয়ে ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে ছাত্রলীগ; বিগত কয়েক বছরে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ রক্ষার তাগিদে অসংখ্য ছাত্রলীগ সদস্যের রক্তে রঞ্জিত হয়েছে বাঙলার রাজপথ, ছাত্রলীগ সদস্যদের লাল রক্তে বাংলাদেশ প্রতিবারই নতুনভাবে ঋণী হয়ে যায় এই সংগঠনটির কাছে। ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি থেকে আজ পর্যন্ত একই লক্ষ্যে অবিচল একটি নাম ‘ছাত্রলীগ’, এককভাবে কোনো সংগঠনের কাছে যদি পুরো বাংলাদেশ ঋণী থাকে, তাহলে সেই সংগঠনটির নামও ‘ছাত্রলীগ’। তাইতো স্বগর্বে আমরা বলতে পারি, ছাত্রলীগ মানেই বাংলাদেশ। বঙ্গবন্ধুর সাথে কণ্ঠ মিলিয়ে আমরাও বলি, ‘ছাত্রলীগের ইতিহাস, বাংলাদেশের ইতিহাস’।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *