জঙ্গি হামলার নেপথ্যে কারা?

পবিত্র ধর্মকে রাজনীতিতে অপব্যবহার করার বিরুদ্ধে তৃণমূলের এই উদ্যোগ ও তৎপরতা জনগণের মধ্যে আশার সঞ্চার করছে। কারও সন্তান কিংবা কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্ররা যাতে জঙ্গিদের খপ্পরে না পড়ে সেজন্য সচেতন প্রচেষ্টা লক্ষণীয় হয়ে উঠছে।

প্রবাদ বলে, দুর্জনের ছলের অভাব হয় না। কেবল ব্যক্তি ও সমাজজীবনে নয়, রাজনৈতিক অঙ্গনের জন্যও কথাটা সর্বৈব সত্য। মুখোশ পরিবর্তন করতে তাদের লাজলজ্জার বালাই থাকে না। এরা বহুরূপী। সদাসর্বদাই মুখে শেখ ফরিদ বগলে ইট নিয়ে অগ্রসর হয়। রাজনীতির নানা টানাপড়েন ও ডামাডোলের মধ্যে যেসব ইস্যু সামনে আসে, তার আড়ালে তারা মুখোশ পাল্টায়, ডিগবাজিও দেয়। এসব করার ভেতর দিয়ে তারা থাকে জাতে মাতাল তালে ঠিক। অমঙ্গল-অকল্যাণের অশুভ লক্ষ্য-উদ্দেশ্যমুখী থাকতে তারা সিদ্ধহস্ত। সেই পাকিস্তানি আমল থেকে বর্তমান পর্যন্ত আমাদের রাজনীতির অঙ্গনের দিকে ফিরে তাকিয়ে আলোচনা-পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে, পবিত্র ধর্মের মুখোশের আড়ালে যারা রাজনীতিকে অপব্যবহার করে কায়েমি স্বার্থ রক্ষা করতে এবং দেশের উন্নয়ন-অগ্রগতির বিরুদ্ধে অন্ধত্ব-সাম্প্রদায়িকতা, বিভক্তি-উগ্রতা-সংঘাত উসকে দিয়ে অরাজকতা-অনিশ্চয়তা-অস্থিতিশীলতার পরিবেশ সৃষ্টি করে রাজনৈতিক ফায়দা লুটতে চায়; তারা বারবার মুখোশ পাল্টিয়ে রাজনীতিতে টিকে থাকছে এবং এমনকি কখনও অস্ত্রের জোরে কিংবা হুকুমের বা ষড়যন্ত্র-চক্রান্তের ভোট করে ক্ষমতায় এসেছে।
পূর্বাপর ঘটনাপ্রবাহ পর্যবেক্ষণ করলে এটা সুস্পষ্ট হয়ে উঠবে, বর্তমান দিনগুলোতেও মুখোশ পাল্টিয়ে ওই জাতি ও জনবিরোধী অপশক্তি তথা বিএনপি-জামাতের ২০-দলীয় জোট জনগণকে বিভ্রান্ত এবং রাজনৈতিক অঙ্গনে মাতবরি করতে ‘জাতীয় ঐক্য’-এর স্লোগান তুলেছে। জাতিবিরোধী অবস্থান নিয়ে নির্বাচিত ও সাংবিধানিক সরকার উৎখাতের জন্য গৃহযুদ্ধ বাধানোর সর্বাত্মক প্রচেষ্টা থেকে ভোল পাল্টিয়ে এবারে সরকারের সাথে জাতীয় ঐক্যের স্লোগান তুলেছে। কী অভিনব ডিগবাজি! পেট্রল সন্ত্রাসে পরাজিত হওয়ার পর মাঝে ছিল কলের গানের মতো সরকারকে দোষারোপ করে এবং পতন চেয়ে কিছু আনুষ্ঠানিক বিবৃতি ছাড়া কেবল নীরবতা। বিএনপির দুই ও এক নম্বর নেতা, লন্ডনে ‘সুপুত্র’ তারেক আর ঢাকায় ‘সুযোগ্য মাতা’ খালেদা জিয়া যখন নীরবতার মুখোশ পরে ছিলেন, তখনই অনুমান করা গিয়েছিল এই নীরবতা কোনো একটা অমঙ্গলের পূর্বাভাস। রাজনীতির প্রত্যক্ষ যুদ্ধে পরাজিত হয়ে বিএনপি-জামাতের মতো ষড়যন্ত্র-চক্রান্ত ভেতর দিয়ে ঠা-া মাথায় অঘটন ও খুন করতে পটু কোনো দল বা জোট কি হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকতে পারে! ‘মরণ কামড়’ দিতে পারে বলে তখন অনুমান করা হয়েছিল।
এই নীরবতার সময়টা বিবেচনায় নিতে বিস্মিত হতে হবে এ দিকটি খেয়াল করে যে, বিগত নির্বাচন ও পরবর্তীতে নির্বাচনের বর্ষপূর্তিতে বিএনপি-জামাতের ২০-দলীয় জোট যখন যুদ্ধংদেহী মনোভাব নিয়ে মাঠে নামে, পেট্রলবোমা দিয়ে নিরীহ মানুষ-পুলিশ মারে, সম্পদ ধ্বংস করে, বিভিন্ন ধর্মের উপাসনালয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পুড়িয়ে দেয়; তখন কিন্তু উগ্র জঙ্গিবাদী কর্মকা- বন্ধ থাকে। তখন বন্ধ থাকল আর নীরবতার সময় টার্গেট কিলিং এবং এমনকি গুলশান ও শোলাকিয়ার মতো জঙ্গিবাদী ঘটনা কেন ঘটল, এটাই সবচেয়ে বড় রহস্যের বিষয়। আরও রহস্যজনক যে, গুলশান ও শোলাকিয়ার রক্তাপ্লুত ঘটনার সাথে সাথেই বিএনপি-জামাত জোট নেত্রী খালেদা জিয়া সরব হলেন এবং দেশ ও জনগণকে রক্ষায় অতি উদ্বেগ প্রকাশ করে ‘জাতীয় ঐক্য’-এর আওয়াজ তুললেন। যে জোটের নেত্রী সরকারকে করতে চাইছিলেন যেনতেন প্রকারে উৎখাত, সেই সরকারের সাথে জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলার আহ্বান জানালেন। কী অপূর্ব ডিগবাজি! কেবল পুতুলই পারে এমন ডিগবাজি দিতে! সাথে সাথে এই স্লোগান নিয়ে ঝাঁপিয়ে মাঠে নামল বিএনপি-জামাত সমর্থিত বুদ্ধিজীবী তথা থিংকট্যাঙ্কের কুশীলবরা। প্রশ্নটা হলো খালেদা জিয়া কোন উদ্দেশ্যে বা মতলবে নীরব হয়েছিলেন? আর কোন উদ্দেশ্যেই জাতীয় ঐক্যের আওয়াজটা তোলা হলো?
প্রসঙ্গত কিছু সময় পরপর ডিগবাজি দেওয়ার পিছনে কি উদ্দেশ্য রয়েছে, তা বিবেচনায় নিতে হলে পিছনে ফিরে তাকাতে হবে। যথাযথ আইন অনুযায়ী বিচারের ভেতর দিয়ে মানবতাবিরোধী যুদ্ধাপরাধী কাদের মোল্লার ফাঁসির রায় হলে প্রথমে জামাত শুরু করে আন্দোলনের নামে চোরাগোপ্তা হামলা-আক্রমণ। এই সময় বিএনপির নীতি ছিল, মৌনতাই সম্মতি। যদি জামাতের সন্ত্রাসী কর্মকা- পরিস্থিতিকে অরাজক-অনিশ্চিত-অস্থিতিশীল করতে পারে, তবে জোটই তো পাবে এর ফসল। বিএনপি ভাবছিল, জামাত কিছু না কিছু করতে পারবেই। কিন্তু মানুষ খুন ও আগুন দেওয়া ছাড়া কিছুই করতে পারল না। এরই মধ্যে চলে আসে নির্বাচন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আলোচনার আহ্বান তখনকার বিরোধীদলীয় নেত্রী খালেদা জিয়া চরম অভদ্রতার সাথে প্রত্যাখ্যান করে বিএনপি-জামাত জোট নির্বাচন বয়কটে নামে এবং পাকিস্তানি মদত নিয়ে তথাকথিত আন্দোলনের নামে গৃহযুদ্ধ বাধাতে উঠে-পড়ে লাগে। কার্যত জামাত যা একা করছিল, তা-ই করতে নামে বিএনপি-জামাতের ২০-দলীয় জোট। গোপন জায়গা থেকে আহ্বান দিয়ে মানুষবিহীন আন্দোলনের নামে ক্যাডার-সন্ত্রাসী নামিয়ে শুরু করে পেট্রল বোমাবাজি।
বিএনপি-জামাত জোট ও তাদের মুরুব্বীরা ভেবেছিল যে, বোমাবাজি ও অগ্নিসংযোগ করে আওয়ামী লীগকে কোণঠাসা বা সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা নস্যাতের ভেতর দিয়ে ঘোলা পানিতে মৎস্য শিকার করে নিন্মোক্তভাবে এক ঢিলে দুই পাখি মারা সম্ভব। প্রথমত, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও শাস্তি বন্ধ করা আর দ্বিতীয়ত, নির্বাচন ভ-ুল করে অবৈধ শক্তিকে ক্ষমতায় আনা। কিন্তু দুবারই হাওয়া ভবন খ্যাত, অর্থপাচার দুর্নীতি ও গ্রেনেড মামলার আসামি লন্ডন প্রবাসী তারেক জিয়া নির্দেশিত অশুভ তৎপরতা সরকার ও জনগণের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় ভেস্তে যায়। দুবারই পরাজয় মেনে নিতে হয় বিএনপি-জামাত জোটকে। এই গ্লানি নিয়ে ন্যূনতমভাবে তথাকথিত আন্দোলনের নামে মাঠে নামা দূরে থাক, মাথা তুলে দাঁড়ানো আদৌ সম্ভব নয় বিএনপি-জামাত জোটের। বিধ্বস্ত হওয়াটাই ছিল কপালের লিখন।
অতঃপর করণীয় কি? বসে তো আর থাকা যায় না। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ যদি মানুষের জীবন-জীবিকা সুনিশ্চিত করে যেতে থাকে, বিশ্ব দরবারে যদি মাথা তুলে দাঁড়ানোর প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখে; তবে ক্ষমতা একদিকে হবে মুলা আর রাজনীতি-সংগঠনও যাবে আঁস্তাকুড়ে। আম ও ছালা দুই-ই যাবে। এটা তো আর মেনে নেওয়া যায় না! পুতুলের খেলার জন্য নানা ধরনের মুখোশ তো জমা আছেই! থরে থরে সংগোপনে রয়েছে সাজানো। পেট্রলবোমা নিয়ে তথাকথিত আন্দোলনের দিনগুলোতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে ওই দিকে ব্যস্ত রেখে ওই জঙ্গি মুখোশকে তো আর গোপনে খুব একটা কম শান দেওয়া হয় নি। বলাই বাহুল্য জঙ্গি গ্রুপগুলো এমন মুখোশ, যা দিয়ে বর্তমান বিশ্ব ও জাতীয় বাস্তবায়নে মরণ কামড় দেওয়া সহজ।
অবস্থাদৃষ্টে বলা যায়, ২০-দলীয় জোটের সমর্থনে মানুষ যখন নাই, নেতা-কর্মীরা যখন আরও ‘আঙ্গুল চোষা’ হয়ে গেছে, পায়ের তলা থেকে মাটি সরে গেছে; তখনই পাকিস্তানি মদতে গড়ে ওঠা জঙ্গিপনার ঢাকনাটা খুলে দেওয়া হয়েছে। কথাটার সত্যতা পাওয়া যাবে এটা স্মরণ করলে যে, জঙ্গিদের সাথে ঢাকাস্থ পাকিস্তানি হাইকমিশনের লোকদের সরাসরি সংযোগের ঘটনা ইতোপূর্বে ফাঁস হয়েছে এবং এজন্য সরকার দূতাবাসের জঙ্গি কানেকটেড লোকদের বহিষ্কারও করেছে। যখন ওরা ধরা পড়ে বহিষ্কৃত হয়, তখন কিন্তু বিএনপি-জামাত জোট নেত্রী খালেদা জিয়া মুখে কুলুপ এঁটে বসে থাকেন। অন্যদিকে তিনি বক্তৃতা-বিবৃতি দেন এই অভিযোগ এনে যে, সরকার তার দল ও জোটের সমর্থকদের গুম করছে। এখন কিন্তু দেখা যাচ্ছে সরকার গুম করছে না, তার জোটের সমর্থকরাই জঙ্গি দল বা গ্রুপের সাথে যোগ দিতে বাড়ি থেকে পালিয়ে যাচ্ছে। কল্যাণপুরে ১০ জঙ্গি নিহত হওয়ার পর দেশবাসী যখন বড় কোনো বিপদ থেকে রক্ষা পাওয়ায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রশংসা করছে, তখন বিএনপির পক্ষ থেকে প্রশ্ন তোলা হচ্ছে, ওরা জঙ্গি কি-না। বিএনপি এখন সরাসরি এমনটাও বলতে শুরু করেছে যে, একাত্তরে কে কি করেছে ভুলে যান। অর্থাৎ, জামাতকে সাথে নিয়ে বিএনপি কখনও নীরব আর কখনও সরব থেকে জঙ্গিপনাকে আস্কারা প্রশ্রয় দিয়ে চলেছে। পঁচাত্তরে সপরিবারে জাতির পিতা ও তার সহযোগী জাতীয় চার নেতার হত্যার ভেতর দিয়ে যে সন্ত্রাস শুরু করা হয়েছিল, তারই ধারাবাহিকতায় বিশ্বব্যাপী জঙ্গি উত্থানের পটভূমিতে বাংলাদেশে ওই সন্ত্রাস আজ জঙ্গি রূপ নিয়ে দাঁড়িয়েছে।
প্রকৃত বিচারে পবিত্র ধর্মের নামে রাজনীতি, যার পরিণতিতে মুক্তিযুদ্ধে ৩০ লাখ মানুষের মৃত্যু ও জাতির বিবেক বুদ্ধিজীবী হত্যা থেকে শুরু করে বিগত বিএনপি-জামাত আমলে কিবরিয়া-আহসানউল্লাহ মাস্টার প্রমুখ রাজনীতিক ও হুমায়ুন আজাদসহ বুদ্ধিজীবী হত্যা, যুক্তরাষ্ট্রের হাইকমিশনার আনোয়ার চৌধুরীকে হত্যা প্রচেষ্টা, ২১ আগস্ট বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউর জনসভার গ্রেনেড মেরে তখনকার বিরোধীদলীয় নেত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যার চেষ্টা ও আইভি রহমানসহ ২৪ জনকে হত্যা আর এখনকার টার্গেট কিলিং ও গুলশান-শোলাকিয়ার হত্যাকা- একই ধারার রাজনীতির সুতায় গাঁথা। একটু খেয়াল করলেই দেখা যাবে, ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর দেশ যখন মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ধারায় অগ্রসর হতে থাকে, তখন বিশেষত ‘ফেনী পর্যন্ত ভারত হয়ে যাবে’, ‘মসজিদ থেকে উলুধ্বনী হবে’ প্রভৃতি জুজুর ভয় দেখিয়েও যখন আন্দোলনে জনগণকে নামাতে বিফল হয় বিএনপি-জামাতের চারদলীয় জোট, তখনই যশোরে উদীচীর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে বোমা হামলা হয় এবং তারপর তা ক্রমেই বাড়তে থাকে। এবারেও কিন্তু আন্দোলনে ব্যর্থ হওয়ার পর আবারও জঙ্গি তৎপরতা শুরু হয়েছে। বিএনপি-জামাত যে রাজনৈতিক ধারার প্রতিনিধিত্ব করে, সেই রাজনীতির মানেই হচ্ছে প্রতিশোধ স্পৃহা চরিতার্থ করতে হিং¯্রতা। এর রূপ ও পদ্ধতি পাল্টায়; কিন্তু টার্গেট পাল্টায় না।
প্রশ্ন হলো, কেবল কি দেশকে অশান্তি অরাজকতা অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলে দিয়ে পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতেই অন্ধত্ব উগ্রতা ও হিং¯্রতাকে ব্যবহার করা হচ্ছে? এর উত্তরে বলতে হয়, এটা হচ্ছে আশু হীন উদ্দেশ্য। দীর্ঘমেয়াদি জাতি ও জনবিরোধী অসৎ উদ্দেশ্যও এর সাথে জড়িত। আর তা হচ্ছে প্রতিহিংসা চরিতার্থ করে দেশকে ক্রমাগত প্রতিক্রিয়াশীল ও দক্ষিণমুখী করা। জন্মের মধ্য দিয়ে গণতান্ত্রিক অসাম্প্রদায়িক ও দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর রাজনীতির যে চেতনা, গণসমর্থন ও নেতৃত্ব রয়েছে, তা উৎখাত করে পাকিস্তানি ধারায় দেশকে ক্রমে নিয়ে যাওয়া। একটু খেয়াল করলেই এটা স্মরণে আসবে যে, বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া প্রায়শই বলতে ভালোবাসেন, বিএনপি-জামাত জোটই জাতীয় রাজনীতির মূলধারা। প্রকৃত বিচারে দেশকে ‘মিনি পাকিস্তান’ বানাতে জাতীয় রাজনীতির মূলধারার প্রধান দল বর্তমানে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগকে নিশ্চিহ্ন করে বিএনপি-জামাত জোট নিজে মূলধারার একচ্ছত্র নিরঙ্কুশ শক্তি হিসেবে ক্ষমতা দখল করে দেশকে আরও দক্ষিণে নিতে চাইছে বলেই বর্তমানে জঙ্গিপনাকে ব্যবহার করতে অতি উৎসাহী হয়ে উঠছে।
প্রসঙ্গত জাতি নিয়ে সেই পাকিস্তানি আমল থেকে যে বিতর্ক মহান মুক্তিযুদ্ধের ভেতর দিয়ে শেষ হয়ে গেছে বলে মনে করা হয়েছিল, সেটাই পুনরায় হত্যা-ক্যু-পাল্টা ক্যুয়ের ভেতর দিয়ে জাতিকে বিভক্ত করে রাষ্ট্র ও সমাজজীবনে প্রতিষ্ঠার সূচনা করে গেছেন সেনাশাসক জিয়াউর রহমান। তারপর নানা ঘাত-প্রতিঘাতের ভেতর দিয়ে প্রত্যাখ্যাত ওই ধর্মের অপব্যবহারকারী তথাকথিত জাতীয়তাবাদকেই জাতীয় রাজনীতির মূলধারায় পরিণত করতে চাইছেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী পার্টির নেতা খালেদা জিয়া জামাতসহ উগ্র দল গ্রুপ গোষ্ঠী ব্যক্তিদের সাথে নিয়ে। বস্তুতপক্ষে যা হওয়া সম্ভব নয়, তা অর্থাৎ সোনার পাথর বাটি হতে চাইছে বিএনপি-জামাত জোট। আর এই জন্য জঙ্গিপনাকে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে উসকে দিতে পিছপা হচ্ছে না।
বলাই বাহুল্য অন্যান্য উল্লেখ করার মতো কারণ থাকার সাথে এই বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে বর্তমানে বিএনপি-জামাতের ২০-দলীয় জোট নেত্রী খালেদা জিয়ার ‘জাতীয় ঐক্য’ গড়ার আহ্বান নিয়ে আলোচনায় যেতে হবে। প্রসঙ্গত, আমাদের রাজনৈতিক অঙ্গনে ‘জাতীয় ঐক্য’ কথাটা কম-বেশি প্রায়শই আলোচনায় উঠে আসে। ধারাবাহিকভাবে টার্গেট কিলিং বিশেষত গুলশান ও শোলাকিয়ায় জঙ্গি হামলার পর এবারে বিএনপি-জামাতের ২০-দলীয় জোট নেত্রী খালেদা জিয়া এই কথাটা তোলেন। ঈদের পরে ১৩ জুলাই রাতে ২০-দলীয় জোটের সভায় জাতীয় ঐক্যের বিষয়ে পূর্ণ সমর্থন প্রদান করা হয় এবং তা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে একটি জাতীয় কনভেনশন করারও প্রস্তাব ওঠে। এই প্রস্তাব বৈঠকে উপস্থিত জামাতসহ সব দল সমর্থন করে। জামাতের সমর্থন নিয়ে জাতীয় ঐক্যের আওয়াজ! পারে বটে বিএনপি! দলটি মনে করে মানুষ বুঝি অন্ধ নতুবা ‘পাগল ও শিশু’!
তবে বৈঠকেই ২০-দলের কেউ কেউ বলেন যে, জামাতের কারণে আরও কিছু দল ও ব্যক্তি জাতীয় ঐক্যের আহ্বানে সাড়া দিতে চান না। তখন জামাত প্রতিনিধি নিজেদের জাতীয় ঐক্যে থাকার অভিপ্রায় ব্যক্ত করে বলেন, যারা এমন বলেন ভোটের রাজনীতিতে তাদের অবস্থান নেই। এই মতামত খ-ন করা হয় এই বলে যে, এটা ভোটের বিষয় না। যারা জামাতের সাথে থাকতে রাজি নন, তাদের জাতীয় রাজনীতিতে অবস্থান ও প্রভাব গুরুত্বপূর্ণ। তখন জামাত প্রতিনিধি সিদ্ধান্ত গ্রহণের ভার জোট নেত্রী খালেদা জিয়ার হাতে অর্পণ করেন। সভা শেষে বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হয়, ‘আমাদের নেত্রী নিঃশর্তভাবে জাতীয় ঐক্যের ডাক দিয়েছেন। সরকারের উচিত এই ডাকে সাড়া দেওয়া।’ কি অদ্ভুত কা-! আওয়ামী লীগকে ‘উচিত’ শিখাচ্ছে বিএনপি। ‘আমাদের’ কথার অর্থ তো দাঁড়ায় বিএনপি-জামাত জোট নেত্রী! আর নিঃশর্ত বলতে কি বোঝানো হচ্ছে? জামাতকে বাদ দেওয়া শর্তের অধীন না করা কি! সবচেয়ে বিস্ময়ের বিষয় হলো, সরকার উৎখাত থেকে সরকারের সাথে জাতীয় ঐক্য। ডিগবাজি দিতে পারেও বটে বিএনপি!
ওই সভায় জাতীয় ঐক্য গড়ার বিষয়ে জোট সংশ্লিষ্ট দলগুলোর সমর্থন পেয়ে আরও রাতে বিএনপির নীতি-নির্ধারণী ফোরামে বিষয়টি আলোচনা হয়। দেশবাসীর জানাই আছে গভীর রাতেই মাথা খোলে খালেদা জিয়াসহ বিএনপির হাইকমান্ডের! সভায় জাতীয় ঐক্য গড়ার লক্ষ্যে প্রক্রিয়া শুরু করে ধাপে ধাপে অগ্রসর হওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। বিশিষ্ট নাগরিকদের সভা দিয়ে আরম্ভ করে ১৮ জেলায় জঙ্গিবিরোধী সমাবেশ প্রভৃতি অনুষ্ঠানের ভেতর দিয়ে জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা কার্যকর করার সিদ্ধান্ত ওই সভা থেকে করা হয়। সব কিছু সাজানোই ছিল। পরদিনই অনুষ্ঠিত হয় বিশিষ্ট নাগরিকদের নিয়ে সভা। সভায় জামাত প্রসঙ্গটিই একমাত্র হয়ে ওঠে। একটু খেয়াল করলেই দেখা যাবে, যেসব বিশিষ্টজন উপস্থিত ছিলেন, তারা বিএনপি-জামাত ঘরানার এবং সেখানে কেউ বিএনপির সাথে জামাতের সম্পর্ক সম্পূর্ণ ছেদের বিষয়টি তোলেন নি। জামাতকে বাইরে রেখে এই উদ্যোগ গ্রহণ করা হোক, অন্তত তিন বা ছয় মাস জোটকে নন-ফাংশনাল করে রাখা হোক, জামাত নিজে থেকেই সরে যেতে পারে, জামাত মুক্তিযুদ্ধের সময়কার কৃতকর্মের জন্য মাপ চেয়ে নিক প্রভৃতি ধরনের কথা ওই বৈঠক থেকে উঠে আসে। দু-নম্বরি নেতা তারেক জিয়ার ‘আত্মার আত্মীয়’ জামাতকে গ্রহণযোগ্য করার উদ্দেশে বিএনপি ও দলটির  থিংকট্যাঙ্কের কতই না প্রচেষ্টা!
বিএনপির সামনে এখন মূল সমস্যা হলো জামাতের সাথে ‘কোন প্রক্রিয়ার সম্পর্ক থাকবে’ এটা নির্ণয় করা। এক কথায় বিষয়টি নীতিগত নয়, বিষয়টি কৌশলের। অর্থাৎ, জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠার স্লোগান তোলা এবং তা নিয়ে বর্তমানে রাজনীতির মাঠে নামার বিষয়টাই হচ্ছে মুখ্য। ভোটের সময়ের সম্পর্কটাকে কেউ-ই ভাঙতে চাইছেন না। জামাতের কারণে ‘কিছু দল ও ব্যক্তি’, যারা বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়ার জাতীয় ঐক্যের আহ্বানে সাড়া দিতে পারছেন না; মূলত তাদের জমায়েত করতেই এ রকম একটা কৌশল গ্রহণ করতে পরামর্শ দিয়েছেন বিএনপির আহ্বানে সভায় আসা বিশিষ্টজনরা। কৌশলের অংশ হিসেবে ওই বৈঠক থেকে জাতীয় ঐক্যে আওয়ামী লীগসহ সব দলকে সমবেত করার প্রসঙ্গটি উত্থাপিত হয়। চিঠি দেওয়া, চা-চক্রের দাওয়াত দেওয়ার প্রশ্নটিও উঠে আসে। যে নেত্রী প্রধানমন্ত্রীর দাওয়াত প্রত্যাখ্যান করেন, পুত্র কোকোর মৃত্যুর পর গুলশান কার্যালয়ে শোক জানাতে গেলে প্রধানমন্ত্রীকে যিনি প্রবেশ করতে দেন না; প্রধানমন্ত্রীর সেই দলকে চিঠি দিয়ে দাওয়াত দেওয়া জাতীয় ঐক্যের জন্য! ভাবনাটা চমৎকার! জনগণকে বিভ্রান্ত করার জন্য ডিগবাজি দিতে কতই না কৌশল! ওই বৈঠকের পর থেকেই জাতীয় ঐক্যের বিষয়টা লাইম-লাইটে আনার উদ্যোগ লক্ষণীয় হয়ে ওঠে। বর্তমানে ২০-দলীয় জোটপক্ষীয় বিশিষ্টজনদের অনেকেই জোট নেত্রী খালেদা জিয়ার এই আহ্বান ও কর্মকা-ে রীতিমতো সোচ্চার এবং প্রশংসায় পঞ্চমুখ। এবারে বিএনপি কিছু একটা করে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারবে বলে তারা মনে করে আশ্বস্ত ও উৎসাহিত হয়ে উঠছেন।
জাতীয় ঐক্যের আহ্বানটি যে নীতিগত নয় কৌশলগত, তা আরও সুস্পষ্ট হবে যদি জোট নেত্রী খালেদা জিয়ার ১৪ জুলাই সভার বক্তব্য বিবেচনায় নেওয়া হয়। ওই বৈঠকে খালেদা জিয়া বাংলাদেশের সাম্প্রতিক জঙ্গি তা-বে সরকার ও প্রতিবেশী দেশের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ তোলেন। বলাই বাহুল্য আওয়ামী লীগসহ সরকারকে নিয়ে যদি জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলার প্রস্তাব খালেদা জিয়ার নীতিগত হতো এবং তিনি যদি বিদ্যাবুদ্ধি নিয়ে রাজনৈতিক দিক থেকে কৌশলী হতেন, তবে জাতীয় ঐক্যের আহ্বানের সাথে এই অভিযোগ উত্থাপিত হতো না। মনের কথাটা থলের বিড়ালের মতো এভাবে বের হয়ে আসায় বিএনপি সমর্থক বিশিষ্টজনদের কেউ কেউ ভীষণ ক্ষুব্ধ। কোনো কোনো কলাম লেখক এমন লিখেছেন যে, ‘জঙ্গিবাদ মোকাবেলার মাধ্যমে বিএনপিকে আন্তরিকতার প্রমাণ দিতে হবে। ব্লেইম গেম ছাড়তে হবে।… অভিযোগের ভিত্তি কি, কোন তথ্যসূত্রে তিনি এমন অভিযোগ করেছেন, তার একটা ব্যাখ্যা দরকার। তা না হলে ঐক্যবদ্ধ জাতীয় উদ্যোগের জন্য তার আহ্বান মেকি বলে প্রমাণিত হবে।… তা হবে দেশ ও জাতির সঙ্গে প্রতারণার শামিল।’
উল্লিখিত কথার উত্তর বিএনপি নেত্রীর কাছ থেকে পাওয়া যাবে বলে মনে করার কোনো কারণ নেই। তাই বলতেই হয়, ২০-দলীয় জোট সমর্থিত বিএনপি নেত্রীর জাতীয় ঐক্যের আহ্বান প্রকৃত বিচারে নতুন পরিস্থিতিতে নতুনভাবে সরকারবিরোধী মেরুকরণের আহ্বানেরই নামান্তর। বিএনপি দলটি এখন কার্যত বিধ্বস্ত। এর জন্য দায়ী হচ্ছে দলটির নীতি-কৌশল। হাওয়া ভবনের অপশাসন-দুঃশাসন ও ২০০৯ সালের নির্বাচনে সর্বৈব পরাজয়ের প্রেক্ষাপটে সংসদ, নির্বাচন, সংবিধান সব বয়কট করে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে পাকিস্তানি সমর্থনে যুদ্ধংদেহী মনোভাব নিয়ে বিগত সময়ে দু-দুবার মাঠে নেমে বিএনপি নিজেই নিজের পায়ে কুড়াল মেরেছে। ইতোমধ্যে দলটি প্রমাণ করেছে, খালেদা জিয়া-তারেক জিয়া দল পরিচালনায় যে নীতি-কৌশল নিয়েছে, তা সর্বতোভাবে ব্যর্থ হওয়ায় বিএনপি আজ মুখ থুবড়ে পড়েছে। এ থেকে উত্তরণের পথ হিসেবেই বেছে নেওয়া হয়েছে জাতীয় ঐক্যের স্লোগান। তাই বিএনপির বিশিষ্টজনরা বলছেন, এটা সুযোগ। কিন্তু উল্লিখিত কথা বিএনপি নেত্রী বলায় বাস্তবে শুরুতেই কৌশল মার খেয়েছে। জাতীয় ঐক্য নয়, বিধ্বস্ত অবস্থা থেকে মাথা তুলে দাঁড়ানোর লক্ষ্যে সরকারবিরোধী জোট নতুন আঙ্গিকে সাজানোর ইচ্ছেই এই স্লোগান তুলে ধরার প্রধান উদ্দেশ্য। জামাতকে সুকৌশলে দূরে রেখে কিংবা বলা যায়, নির্বাচনের সময় ব্যবহারের জন্য ভোল্টে জমা রেখে অন্যসব জোটবহির্ভূত দলগুলোকে এক করাই বিএনপির আশু উদ্দেশ্য বলে প্রতীয়মান হচ্ছে।
জোট নেত্রী খালেদা জিয়ার উল্লিখিত আহ্বান এবং বাস্তবায়নে তৎপরতা শুরু হওয়ার পর জোটবহির্ভূত ‘আরও কিছু দল ও ব্যক্তির’ প্রতিক্রিয়া ও তৎপরতা লক্ষণীয়। প্রসঙ্গত, পূর্বাপর রাজনৈতিক অবস্থান ও পদক্ষেপ থেকে এটা সুস্পষ্ট যে, জোটবহির্ভূত ছোট ছোট দলগুলো, জামাত যাদের বলেছে ‘ভোট নেই’, তারা কিন্তু চাতক পাখির মতো বসে আছে বিএনপি কবে জামাত ছাড়ে, সেই আশা নিয়ে। আর তাই ওইসব দল থেকে ইতোমধ্যে বিএনপিকে প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে জামাত ছাড়ার পরামর্শ বা চাপ দিচ্ছে বলে জানা যাচ্ছে। এই পরামর্শ চাপ বা আহ্বান ইতোপূর্বেও বিভিন্ন সময়ে বারবার এসেছে, ওইসব ছোট ছোট দলের পক্ষ থেকে। কিন্তু ‘আত্মার আত্মীয়’ জামাতকে বিএনপি ছাড়ে কীভাবে? মুরব্বীরা কি আদৌ ছাড়তে দেবে? যদি আম ও ছালা দু-ই হারাতে হয় বিএনপির? তবে কি হবে? এসব প্রশ্ন সামনে নিয়েও বলতে হয়, সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত দলটি জামাতকে ভল্টে রাখার কৌশল নিতেই পারে, যাতে নির্বাচনের সময় ব্যবহার করা যায়। তারেক জিয়া ইতোমধ্যে জামাতকে দূরে রাখার কথা বলে দিয়েছেন বলে জানা যায়। যদি তেমনটা হয়, তবে সম্পূর্ণ এক নতুন জোটগত পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে দেশের রাজনীতিতে।
একটু খেয়াল করলেই দেখা যাবে, ‘আরও কিছু দল ও ব্যক্তির’ সাথে কিন্তু এক ধরনের পরোক্ষ ঐক্য হয়েই আছে বিএনপির। বিগত নির্বাচন ছিল জাতির কাছে এক বিশেষ রাজনৈতিক সন্ধিক্ষণ। সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা থাকবে কি থাকবে না ছিল এর মূল বিষয়। তখন নানা টানাপড়েনের মধ্যে যে রাজনৈতিক পোলারাইজেশন হয়, তাতে সিপিবি-বাসদ জোট, গণফোরাম, কৃষক-শ্রমিক-জনতা লীগ, বিকল্প ধারা, এলডিপি প্রভৃতি দলগুলো বিএনপি-জামাত জোটের নির্বাচন বয়কটের পক্ষ নেয় এবং সাংবিধানিকভাবে অনুষ্ঠিত নির্বাচন বয়কট করে। এর মধ্যে কোনো কোনো দল ইতোমধ্যে ২০-দলীয় জোটে যোগ দিয়েছে আর কোনো কোনো দল আছে লাইনে। জামাত গিট্ঠু বা খটকা যদি বিএনপি সুকৌশলে খুলতে পারে, তবে বহুল আকাক্সিক্ষত বিএনপির সাথে নতুন মেরুকরণে যোগ দিতে তারা ঝাঁপিয়ে পড়তেই পারে। নতুন মেরুকরণে বিএনপির এই প্রচেষ্টা কতটা কার্যকর হয়, তা ভবিষ্যৎই বলতে পারবে।
তবে দৃঢ়তার সাথেই বলা যায়, জাতীয় ঐক্য আসলে আমাদের দেশে সোনার পাথর বাটিরই নামান্তর। জাতীয় ঐক্য বললেই তো আসবে জাতি প্রশ্নটি। সেই পাকিস্তানি আমল থেকে জাতি প্রশ্নে বিতর্ক শুরু হয়েছিল। দ্বি-জাতিতত্ত্বভিত্তিক সাম্প্রদায়িক জাতীয়তা না-কি অসাম্প্রদায়িক জাতীয়তা। মনে করা হয়েছিল, সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের পর নবজাত দেশে সংবিধানে জাতীয় চার নীতি যুক্ত হওয়ার পর এই সমস্যার সমাধান হয়ে গেছে। কিন্তু না! পঁচাত্তরে সপরিবারে বঙ্গবন্ধু এবং জাতীয় চার নেতার হত্যা ও ক্যুয়ের ভেতর দিয়ে আবার সেই বিতর্ক ফিরে এসেছে। একটু খেয়াল করলেই দেখা যাবে, বর্তমান বিশ্ব প্রেক্ষাপটে আমাদের দেশে যত হচ্ছে পবিত্র ধর্মকে অপব্যবহার করে রাজনীতি ও সাম্প্রদায়িকতা, ততই কিন্তু জাতীয় ঐক্য, যার প্রধান ভিত্তি হলো স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব, তা বিপদাপন্ন হচ্ছে।
বর্তমানের উগ্র জঙ্গি তৎপরতায় যেভাবে বাংলাদেশ ভারতের সাথে যুক্ত হয়ে পড়ছে, তাতেও কিন্তু বিপদ আছে স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের। যারা উল্লিখিত অবস্থান ও নীতি নিয়ে পূর্বাপর অগ্রসর হচ্ছে, তাদের সাথে জাতীয় ঐক্য কখনও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পক্ষের শক্তির হতে পারে না। বস্তুতপক্ষে যে জাতীয় ঐক্য সৃষ্টি হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে সেই জাতীয় ঐক্য আসলে তছনছ হয়ে যায়, পঁচাত্তরের পর হত্যা-ক্যু-পাল্টা ক্যু এবং সেনাশাসক জিয়ার সামরিকীকরণ ও পাকিস্তানিকরণের ভেতর দিয়ে। এদিক বিচারে জাতীয় ঐক্য আবার হতে পারে যদি জাতীয়ভাবে সকল দল গোষ্ঠী ব্যক্তি জন্মলগ্নের আদর্শকে মেনে নেয়। শিকড় থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে কোনোভাবেই জাতীয় ঐক্য হয় না। যদি তা হয়, তবে তা হবে জাতির আত্মহননেরই নামান্তর। সর্বোপরি জামাত ও ‘আমরা হব তালিবান’ স্লোগান দেওয়া দলগুলো আছে বিএনপির সাথে জোটে। এসব দলের সাথে নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি গ্রুপগুলোর সংশ্লিষ্টতা সুস্পষ্ট। তাই সেসব দলের সাথে ঐক্যজোট থাকা অবস্থায় বিএনপির সাথে ক্ষমতাসীন জোটের কোনোক্রমেই আলোচনা হতে পারে না। তদুপরি উপর্যুপরি দুবার আগুন সন্ত্রাস চালিয়ে মানুষ মারা ও সম্পদ ধ্বংস করার জন্য জনগণের কাছে মাপ চাওয়া ব্যতীত ক্ষমতাসীন জোট বিএনপির সাথে আলোচনায় বসতে পারে না।
প্রকৃত বিচারে অতীতে জঙ্গি হামলায় যারা মদত দিয়ে রাজনৈতিক ফায়দা লুটেছেন, তারা এখন জঙ্গিবিরোধী জাতীয় ঐক্য চাইছেন কেন, বিষয়টি বিবেচনায় নিলে বেশ সন্দেহ ও রহস্যের উদ্রেক হয়। সরকার যখন জঙ্গি উৎখাতে জিরো টলারেন্স দেখাচ্ছে, সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা নিচ্ছে; তখন জাতীয় ঐক্যের ইস্যু তুলে রাজনীতির ডামাডোলের আড়ালে তাদের প্রটেকশন বা রক্ষার পরিবেশ সৃষ্টি করার পাঁয়তারা চলছে বলে মনে করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। এসব ফন্দিফিরিক্কি প্রকাশ হয়ে পড়ায় বিএনপি যতই মুখোশ পাল্টিয়ে ডিগবাজি দিক, বিধ্বস্ত বিএনপি পুনরায় মাথা তুলে দাঁড়াতে পারবে বলে মনে করার কোনো কারণ নেই।
ইতোমধ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, জাতীয় ঐক্য হয়ে গেছে। বলাই বাহুল্য বর্তমান সময়ের গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় দেশপ্রেমিক কর্তব্য হচ্ছে জঙ্গি হামলার বিপদ থেকে জনগণকে রক্ষার জন্য জাতীয় ঐক্য। সরকার এই কর্তব্য পালনে বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে অগ্রসর হচ্ছে। একটু খেয়াল করলেই দেখা যাবে, বর্তমান সময়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আহ্বান ও নির্দেশে সরকারি উদ্যোগগুলো তৃণমূল থেকে জাতীয় ঐক্য গড়ার লক্ষ্যে পরিচালিত হচ্ছে। ফলে স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব ও গণতন্ত্র-উন্নয়ন নিশ্চিত করার জন্য জঙ্গিবিরোধী জাতীয় ঐক্য ক্রমে জাতীয় জাগরণে রূপ নিচ্ছে। মানুষ জঙ্গিবাদকে দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে। দেশের আনাচে-কানাচে সর্বত্র জঙ্গিবিরোধী সচেতন ও সক্রিয় সামাজিক আন্দোলনের বিস্তৃতি ঘটছে।
পবিত্র ধর্মকে রাজনীতিতে অপব্যবহার করার বিরুদ্ধে তৃণমূলের এই উদ্যোগ ও তৎপরতা জনগণের মধ্যে আশার সঞ্চার করছে। কারও সন্তান কিংবা কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্ররা যাতে জঙ্গিদের খপ্পরে না পড়ে সেজন্য সচেতন প্রচেষ্টা লক্ষণীয় হয়ে উঠছে। এক লাখ ওলেমা মাশায়েকদের জঙ্গি সন্ত্রাসবিরোধী বিবৃতি ধর্মপ্রাণ জনগণকে শান্তির পথ দেখাচ্ছে। জঙ্গিদের কার্যক্রম বন্ধে জঙ্গিদের আস্তানা উৎখাত ও গ্রেফতার এবং আইনের ফাঁক দিয়ে যাতে বের না হতে পারে, সে ব্যাপারে সরকারি কার্যক্রম সুস্পষ্ট হয়ে উঠছে। এসব কর্মকা- অগ্রসর হওয়ায় সরকার আন্তর্জাতিকভাবে উচ্চ প্রশংসিত হচ্ছে। সরকার ও জনগণের এসব উদ্যোগ ও তৎপরতা অগ্রসর করতে ঐতিহ্যবাহী ও জনগণের আস্থাসম্পন্ন বৃহত্তম দল আওয়ামী লীগ যথাযথ ভূমিকা রাখবে বলেই জনগণ কামনা করে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *