জন স্টোনহাউজ : মুক্তিযুদ্ধের এক প্রতারক বন্ধু

[পোস্টটা অনায়াসে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম ডাকটিকেট নিয়ে হতে পারতো। হতে পারতো বুদ্ধিজীবি হত্যাকাণ্ডের দায়ীদের ব্যাপারে সম্পূরক রেফারেন্স। কিন্তু জন স্টোনহাউজ তা হতে দিলেন কই! মুক্তিযুদ্ধের এই বিদেশী বন্ধূ প্রতারণা ও তা থেকে রেহাই পেতে যে চালাকি করেছিলেন, তা রহস্য উপন্যাসকেও হার মানায়। অত্যন্ত ইন্টেরেস্টিং ঠেকেছিলো বলেই তার পেছনে গত ক’দিন কাটিয়েছি। মোশতাক সিরিজটা টপকে এটাকেই প্রায়োরিটি দিলাম। আত্মবিশ্বাস আছে, পড়ার পর সেই ক্ষোভটা থাকবে না ব্লগার বন্ধুদের]

২১ নভেম্বর, ১৯৭৪। পত্রিকায় খবরটা দেখে নিশ্চয়ই মন খারাপ হয়েছিলো বাংলাদেশের মানুষের। ঘটনা একদিন আগের। ফ্লোরিডায় সমুদ্রস্নানে নেমে আর ওঠেননি জন স্টোনহাউজ। মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম এক সুহৃদ ছিলেন এই ব্রিটিশ সাংসদ। স্বাধীনতার প্রথম ডাকটিকেট প্রকাশনায় বিশাল ভূমিকা রেখেছিলেন। যদিও সে বাবদ একটা বিশাল অঙ্কের অর্থ নয়-ছয় করার অভিযোগও ছিলো তার বিরুদ্ধে। স্বাধীনতার পর কৃতজ্ঞ বাংলাদেশ সরকার তাকে সম্মাণসূচক নাগরিকত্বও দিয়েছিলো। সুযোগটা হেলায় হারাননি। যুদ্ধবিধস্ত এই দেশে কয়েকপদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ফেঁদেছিলেন। ঘটনার মাসকয়েক আগে অবশ্য তার ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল আইমেক্সের বাংলাদেশ অফিসে তালা ঝুলিয়ে দেন স্টোনহাউজ। বদলে একটি ইনভেস্টমেন্ট ব্যাঙ্ক খোলার পরিকল্পনা ছিলো। সে বাবদ প্রায় ৮ লাখ পাউন্ড ঋণও করেছেন। আরো বিনিয়োগকারী খুঁজতেই মায়ামি ভ্রমণ এবং সলিল সমাধি। তার বয়স হয়েছিলো মাত্র ৪৮ বছর।

সুদর্শন এবং আকর্ষণীয় পুরুষ ছিলেন স্টোনহাউজ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে রয়েল এয়ারফোর্সের এই বিমানযোদ্ধা মাত্র বত্রিশেই সংসদ নির্বাচন জিতেছিলেন লেবার পার্টির হয়ে। প্রথমে এভিয়েশন মিনিস্ট্রির দায়িত্বে এবং তারপর পোস্টমাস্টার জেনারেল হয়েছেন। নতুন ব্রিটিশ আইনে পদটির বিলুপ্তি ঘটলে ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রীর পদ পান তিনি। ১৯৭০ সালে প্রধানমন্ত্রী হ্যারল্ড উইলসনের দ্বিতীয় দফা দায়িত্বকালে আর সুযোগ মেলেনি। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে লন্ডনে প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী যেসব ব্রিটিশ এমপির নৈতিক সমর্থন আদায়ে সফল হন, স্টোনহাউজ তাদের একজন। এবং সম্পর্কটা শুধু সমর্থনেই থেমে থাকেনি, আরো ব্যাপ্তি দেন তিনি।

পোস্টমাস্টার জেনারেল থাকার সময়ই বিমান মল্লিকের সঙ্গে পরিচয় স্টোনহাউজের। লন্ডন প্রবাসী এই ভারতীয় বাঙালী ব্রিটিশ সরকারের গান্ধী সিরিজের ডাকটিকেট ডিজাইন করেছিলেন। বাংলাদেশ সরকারের সাংস্কৃতি বিষয়ক সম্পাদক ড. এনামুল হকের সঙ্গে তার যোগাযোগ করিয়ে দেন তিনি। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ সমর্থনমূলক প্রচারণার জন্য ডাকটিকেট প্রকাশের সিদ্ধান্তটা পাশ হতে দেরী হয়নি। জুনেই আটটি ডাকটিকেট ডিজাইন করে এনামুল হকের মাধ্যমে মুজিবনগর সরকারকে পাঠান বিমান মল্লিক। এরপর সেগুলো প্রকাশনা ও বিপননের দায়িত্ব নেন স্টোনহাউজ। ফরম্যাট ইন্টারন্যাশনাল সিকিউরিটি প্রেস নামে লন্ডনের একটি সংস্থাকে নিজেদের খরচে এই ডাকটিকেট ছাপাতে রাজী করান তিনি। সিদ্ধান্ত হয় ডাকটিকেট বিক্রির দায়িত্বও নেবে তারা, যার পুরোটাই দেওয়া হবে মুজিবনগর সরকারকে।

বিমান মল্লিকের সাক্ষাতকার

২৬ জুলাই কলকাতায় এক সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশের হাইকমিশনার হোসেন আলী ঘোষণা দেন এর প্রকাশনার। এরপর হাউজ অব কমন্সেও এক সংবাদ সম্মেলন আয়োজিত হয়। ২৯ জুলাই বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের মুখপাত্র হয়ে আত্মপ্রকাশ করে ৮টি চারকোণা কাগজ। হাউজ অব কমন্সের হারকোর্ট রুমে আয়োজিত প্রকাশনা উৎসবে স্টোনহাউজ ছাড়াও অতিথি ছিলেন সাংসদ পিটার শোর এবং গণ্যমান্য লোকজন। তারা সবাই বাংলাদেশের স্বাধীনতার লড়াইয়ের প্রতি তাদের নৈতিক সমর্থনের অঙ্গীকার করেন। স্ট্যাম্পগুলোর মোটিফ ছিলো বাংলাদেশের মানচিত্র (১০ পয়সা), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণহত্যা (২০ পয়সা), সাড়ে ৭ কোটি মানুষ (৫০ পয়সা), স্বাধীনতার পতাকা (১ রূপি), শেকল ভাঙ্গা (২ রূপি), ‘৭০ এর নির্বাচন ও ফলাফল (৩ রূপি), শেখ মুজিবর রহমান (৫ রূপি) এবং বাংলাদেশকে সমর্থন (১০ রূপি)।

কলকাতা ও লন্ডনের বাংলাদেশ মিশন থেকে এদিন ২২ রূপি ও ১.০৯ পাউন্ড দামে ফার্সট ডে কাভার বিক্রি করা হয়। লন্ডনে প্রথম দিনই বিক্রিবাবদ আয় হয় ২৩ হাজার ডলারেরও বেশী। উল্লেখযোগ্য হচ্ছে ডাকটিকেটগুলোয় বাংলা ও ইংরেজি দুভাষাতেই বাংলা এবং দেশ আলাদা লেখা হয়েছিল। তখন স্রেফ প্রোপোগান্ডা হিসেবে এসব স্ট্যাম্পকে দেখা হলেও বিজয়ের পর রাতারাতি তা পরিণত হয় কালেক্টরদের আরাধ্যে। ১৬ ডিসেম্বর থেকে স্ট্যাম্পগুলোর ওপর বাংলাদেশ ইজ লিবারেটেড ছাপ দিয়ে বিক্রি করা হয়। প্রকাশের পরপরই বিশ্বব্যাপী ব্যাপক মিডিয়া কাভারেজ পায় এসব ডাকটিকেট। ৮ আগস্ট নিউইয়র্ক টাইমস লেখে : On July 29, in London socalled stamps of Bangladesh appeared. A’First Day’ ceremony was staged for this so called ‘definitive’ series. The site was the House of Commons and John Stonehouse, MP, until recently Britain’s Postmaster General and Abu Sayeed Chowdhury, Vice Chancelor of Dacca University, in East Pakistan, were the principles involved. … Someday, if there ever is a Bangladesh, they may be recognized as the first definitive stamps of the Bengal Nation; There are so called ‘first day covers’ available in New Delhi, Calcutta and London.” Further report of a British journalist Anthony Lewis was, “A spokesman for the Steering Committee of Bangladesh, United Kingdom observed that the stamps were a symbol of the authority of the Bangladesh Government over the territories they hold. They claim 78 percent under their control.

যাহোক, ইতিহাসের স্বার্থে যেটুকু না বললেই নয় তা হচ্ছে ২০ ডিসেম্বর ১৯৭১ ঢাকা জি.পি.ওতে এই আটটি ডাকটিকেটের (সঙ্গে ১০ পয়সা, ৫ টাকা ও ১০ টাকা মূল্যমানের আরো তিনটি লিবারেশন ওভারপ্রিন্ট ভার্সন) নতুন প্রকাশনা উৎসব হয় এবং স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম ডাকটিকেট হিসেবে স্বীকৃতি পায়। ১৯ ডিসেম্বর কলকাতা হয়ে নতুন সংস্করণের প্রতিটির ১০টি করে শিট (প্রতি শিটে ১০০) নিয়ে ঢাকা আসেন স্টোনহাউজ। এগুলোতে রূপির জায়গায় টাকা এবং বাংলাদেশ কথাটা একসঙ্গে লেখা হয়। তবে ডাক যোগাযোগের ক্ষেত্রে এগুলোর আনুষ্ঠানিক ব্যবহারে বাংলাদেশ সরকারকে রাজী করাতে পারেননি স্টোনহাউজ। সরকার পাকিস্তান লেখা ডাকটিকেটের ওপর বাংলাদেশ ছাপ মেরে কাজ চালায় ২৯ এপ্রিল, ১৯৭৩ পর্যন্ত।

এত প্রীতির সম্পর্ক থাকার পরও স্টোনহাউজ সরকারকে কেনো নতুন ডাকটিকেটে রাজী করাতে পারলেন না সেটা নিয়ে স্পষ্ট কোনো বক্তব্য নেই। ধারণা করা হয়, মুক্তিযুদ্ধের সময় মাগনা করলেও এখন পয়সা দিতে হবে এমন দাবিতেই প্রস্তাবটা ভেস্তে যায়। তবে এমনিতেও বিব্রত হওয়ার কারণ ছিলো। কারণ মুক্তিযুদ্ধকালে এসব ডাকটিকেটের বিক্রির সঠিক হিসাবটা বাংলাদেশ সরকারকে দেওয়া হয়নি। পুরো অর্থই মুজিবনগর সরকারকে দেওয়ার কথা থাকলেও দৃষ্টিকটু রকম কম পরিমাণ তারা পেয়েছে। এই কেলেঙ্কারিতে স্টোনহাউজের সঙ্গী হিসেবে ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদের নামও আসে ব্রিটিশ প্রেসে। ডুবে যাওয়ার আগে জানা যায় আরো ভয়াবহ ঘটনা। বাংলাদেশের বন্যা ও ঘূর্ণিঝড় দূর্গতদের জন্য একটি ত্রাণ তহবিলের একাউন্ট থেকে ৬ লাখ পাউন্ড গায়েব। দৈনিক গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে অঙ্কটা আরো বেশী। The 1975 Downing Street file on the Stonehouse affair released today by the National Archives at Kew in south-west London confirms that he not only left a wife and daughter behind but a Department of Trade inquiry into what happened to £1.25m he had raised from the British Bangladeshi community for flood relief. 

এরপরের কাহিনী চমকপ্রদ। আগেই বলেছি রহস্য উপন্যাসকেও হার মানায়। এমনিতেই স্টোনহাউজের মৃত্যু নিয়ে গুজবের শেষ নেই। এফবিআইর ধারণা মাফিয়ারা গুম করেছে তাকে। খবর বেরিয়েছে তিনি আসলে কেজিবির গুপ্তচর ছিলেন, তাকে রাশানরা দেশে নিয়ে গেছে। অন্যদিকে সিআইএর এক এজেন্ট সাক্ষাতকার দেয় স্টোনহাউজ তার কমরেড ছিলেন। একই সঙ্গে বেরুতে থাকে স্টোনহাউজের দেনা ও ব্যবসায়িক প্রতারণার নানা কেলেঙ্কারির তথ্য। সেক্রেটারি শীলা বাকলি এসব ব্যাপারে কিছুই জানেন না বলে জানান গোয়েন্দাদের। স্ত্রী বারবারা তো পুরোই দিশেহারা একমাত্র মেয়েকে নিয়ে।

ব্রিটিশরা ব্যর্থ হলেও কাকতালীয় এক ঘটনায় সফল হয় অস্ট্রেলিয়ান গোয়েন্দারা। হাউজমেইডকে খুন করে ফেরারী ব্রিটিশ অভিজাত পরিবারের সদস্য লর্ড লুকানের খোঁজে নেমেছিলো তারা। ইতিহাসের এখনও অনুদঘাটিত অন্যতম এই রহস্যের কিনারা করতে না পারলেও সেন্ট কিলডার এক বিলাসবহুল ফ্লাটে তারা আবিষ্কার করে জন স্টোনহাউজকে! সেদিন ছিলো ২৪ ডিসেম্বর। পরদিন ক্রিসমাস।

স্টোনহাউজকে গ্রেপ্তারের পর বেরিয়ে পড়ে অবিশ্বাস্য সব ঘটনা। সেবছরের শুরু থেকেই নতুন পরিচয়ে উধাও হওয়ার পরিকল্পনা ছিলো স্টোনহাউজের। এজন্য তিনি স্থানীয় এক কবরখানা থেকে তার বয়স ও গঠনের সঙ্গে মেলে এমন মৃতমানুষের খোজে নামেন। পেয়েও যান। জোসেফ মার্কহ্যাম নাম নিয়ে পাসপোর্ট করেন স্টোনহাউজ। মহড়াও দেন। আর পুরো পরিকল্পনাটা শেয়ার করেন শুধু তার প্রেয়সী শীলার সঙ্গে। ঠিক হয় দুজনে নিউজিল্যান্ডে নতুন জীবন শুরু করবেন। মার্কহ্যামের নামে বেশ কয়েকটি ব্যাঙ্ক একাউন্ট করে বড় অঙ্কের অর্থ ট্রান্সফার করেন স্টোনহাউজ। এরপর তার সেই গায়েবী খেলা।

দীর্ঘ কূটনৈতিক দড়ি টানাটানির পর’৭৫ সালের জুন মাসে অস্ট্রেলিয়া থেকে স্টোনহাউজকে ব্রিটেনে ফেরত পাঠানো হয়। আগস্ট মাসে বিচার শুরু হয় তার। এর আগে পদত্যাগ করে লেবার সরকারকে বাটে ফেলে দেওয়ার কাজও সারেন স্টোনহাউজ। ২১টি বিভিন্ন ধরণের প্রতারণা মামলায় বিচার হয় তার, শাস্তি হয় ৭ বছরের কারাবাস। হৃদসমস্যার কারণ দেখিয়ে ৩ বছর খেটেই বেরিয়ে যান। বিয়ে করেন শীলাকে। ‘৮৮ সালে হার্টএটাকেই মৃত্যু হয় তার।

কিন্তু তারপরও আমার ক্ষমা তিনি পান না। কারণ আছে। ১৯৭১ সালের ২০ ডিসেম্বর পিটিআইকে এক সাক্ষাতকার দিয়েছিলেন স্টোনহাউজ। সেখানে বুদ্ধিজীবি হত্যার সঙ্গে জড়িত ১০জন পাকিস্তানী সেনা কর্মকর্তা ও জামাতে ইসলামীর খুনে আল-বদরের কমান্ডারের ব্যাপারে তার কাছে তথ্য প্রমাণ রয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। আমার শুধু মনে হতে থাকে এই লোকই হয়তো চৌধুরী মঈনুদ্দিন ও আশরাফুজ্জামানের মতো ভয়াবহ ঘাতকদের মোটা টাকার বিনিময়ে লন্ডন ও যুক্তরাষ্ট্রে পালাতে সাহায্য করেছে। হয়তো মিথ্যা অনুমান। কিন্তু সত্যিটা তিনি বলে জাননি। বন্ধু হলে ঠিকই বলতেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *