জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ – আবুল বাহার

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ভাষণকে ঐতিহাসিক দলিল হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে ইউনেস্কো। এ ভাষণকে স্বীকৃতি দিয়ে ‘মেমরি অব দ্য ওয়ার্ল্ড ইন্টারন্যাশনাল রেজিস্টারে’ (এমওডব্লিউ) তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। এমওডব্লিউ-তে এটাই প্রথম কোনো বাংলাদেশি দলিল, যা আনুষ্ঠানিক ও স্থায়ীভাবে সংরক্ষিত হবে। ১৯৭১ সালে ৭ মার্চ তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এ ঐতিহাসিক ভাষণে বাঙালির স্বাধীনতার ডাক দিয়েছিলেন। মঙ্গলবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয়, ইউনেস্কো মহাপরিচালক ইরিনা বোকোভা সোমবার ৩০ অক্টোবর প্যারিসে সংস্থার কার্যালয়ে ওই সিদ্ধান্তের কথা জানান। এটি ইউনেস্কো পরিচালিত বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ তথ্যচিত্র ঐতিহ্যের একটি তালিকা।

স্বীকৃতির ঐতিহাসিক মুহূর্তে শিক্ষামন্ত্রী এবং বাংলাদেশ ইউনেস্কো জাতীয় কমিশনের চেয়ারম্যান নুরুল ইসলাম নাহিদ প্যারিসের ইউনেস্কো সদর দফতর থেকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ফোন করে অভিনন্দন জানান। এ সময় প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশকে ধারাবাহিক সমর্থন দেয়ার জন্য ইউনেস্কোর মহাপরিচালক মিজ ইরিনা বোকোভাকে ধন্যবাদ জানান।

ইউনেস্কো জানিয়েছে, তাদের মেমোরি অব দ্য ওয়ার্ল্ড (এমওডব্লিউ) কর্মসূচির ইন্টারন্যাশনাল অ্যাডভাইজরি কমিটি (আইএসি) ২৪ থেকে ২৭ অক্টোবর প্যারিসে দ্বিবার্ষিক বৈঠক শেষে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণসহ মোট ৭৮টি দলিলকে ‘ডকুমেন্টারি হেরিটেজ’ হিসেবে ‘মেমোরি অব দ্য ওয়ার্ল্ড ইন্টারন্যাশনাল রেজিস্টারে’ যুক্ত করার সুপারিশ দেয়। মেমোরি অব দ্য ওয়ার্ল্ডে (এমওডব্লিউ) বর্তমানে ডকুমেন্ট ও সংগ্রহ দাঁড়াল ৪২৭টি। পরে মহাপরিচালক ইরিনা বোকোভা ওই সুপারিশে সম্মতি দিয়ে বিষয়টি ইউনেস্কোর নির্বাহী পরিষদে পাঠান এবং সোমবার আনুষ্ঠানিকভাবে সেই তথ্য প্রকাশ করেন। আইএসির এ কমিটিতে ছিলেন ১৫ জন বিশেষজ্ঞ। কমিটির চেয়ারম্যান ছিলেন সংযুক্ত আরব আমিরাতের ন্যাশনাল আর্কাইভের মহাপরিচালক আবদুল্লাহ আলরাইজি। তারা বিশ্বের বিভিন্ন দেশের পক্ষ থেকে নতুন করে প্রস্তাব করা ঐতিহাসিক দলিল পরীক্ষা ও মূল্যায়ন করেন। দুই বছরের প্রক্রিয়া শেষে ২০১৬-১৭ সালের জন্য দলিলগুলোকে মনোনয়ন দেয়া হয়। মনোনয়নগুলো স¤‹র্কে সুপারিশ করে ইউনেস্কোর মহাপরিচালক ইরিনা বোকোভা বলেন, ‘আমি গভীরভাবে বিশ্বাস করি, এ কর্মসূচি পরিচালিত হওয়া উচিত দালিলিক ঐতিহ্য ও স্মৃতি সংরক্ষণের জন্য। যাতে বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্ম সংলাপ, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, পারস্করিক বোঝাপড়া ও শান্তির চেতনা তাদের মনে লালন করতে পারে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ ‘বিশ্ব প্রামাণ্য ঐতিহ্য’ হিসেবে ইউনেস্কোর মেমোরি অব দ্য ওয়ার্ল্ড ইন্টারন্যাশনাল রেজিস্টারে যুক্ত হওয়ায় যুগান্তরের কাছে বঙ্গবন্ধুর অনেক সহকর্মী প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন।

প্রতিক্রিয়ায় বঙ্গবন্ধুর অন্যতম সহচর সাবেক ডাকসু ভিপি, বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ বলেছেন, বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ভাষণ আজ তা প্রমাণিত। এটি দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা ছিল। আমরা বিশ্বাস করতাম একদিন এ ভাষণ আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পাবে। বঙ্গবন্ধুর অলিখিত ১৮ মিনিটের এ ভাষণে বাঙালি জাতিকে জাতীয় মুক্তির মোহনায় দাঁড় করিয়েছিল। পৃথিবীতে অন্য কোনো ভাষণ এতবার উচ্চারিত হয়নি। বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, সেদিন রেসকোর্স ময়দান মানুষে কানায় কানায় পূর্ণ ছিল। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর প্রস্তুতি ছিল, বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতা ঘোষণা করলেই এ সমাবেশে হামলা চালাবে। বঙ্গবন্ধু এ ভাষণের মাধ্যমে একদিকে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন, অন্যদিকে পাকিস্তান ভাঙার দায়িত্ব নেননি। ফলে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর কিছুই করার ছিল না। পরদিন পাকিস্তান সেনাবাহিনী এক গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বলেছিল, চতুর মুজিব আমাদের সামনে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে গেলেন, আমরা কিছুই করতে পারলাম না। বঙ্গবন্ধুর কৌশল ছিল বিচ্ছিন্নতাবাদী না হয়ে বাংলাদেশকে স্বাধীন করা। সেদিন তিনি সফল হয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধু দূরদর্শী ছিলেন, ভাষণে তিনি একদিকে স্বাধীনতার ডাক দিলেন, অন্যদিকে সুকৌশলে ৪টি শর্তের বেড়াজালে শাসকের চক্রান্তকে আটকে দিলেন এবং সামরিক শাসকদের বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতা হিসেবে চিহ্নিত করার পাতানো ফাঁদেও পা দিলেন না। একদিকে ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’ যেমন বললেন; তেমনি চার শর্তের জালে ফেললেন শাসকদের ষড়যন্ত্রের দাবার ঘুঁটি। তিনি বললেন, সামরিক শাসন তুলে নিতে হবে, সেনাবাহিনীকে ব্যারাকে ফিরিয়ে নিতে হবে, নির্বাচিত প্রতিনিধির কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে এবং আন্দোলনে নিহতদের বিষয়ে বিচার বিভাগীয় তদন্ত করতে হবে। একই সঙ্গে তিনি বাঙালি জাতিকে বলেছিলেন, ‘আমি যদি হুকুম দেবার নাও পারি, তোমাদের যার যা কিছু আছে, তাই দিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করো। মনে রাখবা- রক্ত যখন দিয়েছি আরও রক্ত দেব, এ দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়ব ইনশাআল্লাহ।’

তোফায়েল আহমেদ বলেন, বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণে মহান মুক্তিযুদ্ধের সুস্কষ্ট দিকনির্দেশনা ছিল। সে মোতাবেক আমরা কাজ করেছি। বঙ্গবন্ধু এমন একজন নেতা ছিলেন, তিনি অন্তরের গভীরে যা বিশ্বাস করতেন, বক্তৃতায় তাই ব্যক্ত করতেন। ফাঁসির মঞ্চে গিয়েও তিনি তা থেকে বিচ্যুত হননি। বঙ্গবন্ধুর সংগ্রামের সহযাত্রী বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব আমাদের বলেছিলেন, সংগ্রামী জনতার উদ্দেশে তিনি কী বলবেন, তাই নিয়ে ৬ মার্চ সারারাত ভেবেছেন। বেগম মুজিব বলেছিলেন, ‘তুমি যা বিশ্বাস করো, তাই বলবে।’

তৎকালীন ডাকসু ভিপি, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জেএসডি সভাপতি আসম আবদুর রব তার প্রতিক্রিয়ায় বলেন, ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণকে ওয়ার্ল্ড ইন্টারন্যাশনাল রেজিস্টারে স্মারক হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করায় ইউনেস্কোকে অভিনন্দন।

তৎকালীন ছাত্রলীগের সভাপতি নুরে আলম সিদ্দিকী তার প্রতিক্রিয়া জানাতে যুগান্তরকে বলেন, বিলম্বে হলেও সত্য যে প্রতিষ্ঠা পায় বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণের এ স্বীকৃতি তারই প্রমাণ। নিষ্কলুষ সূর্যোদয়ের মতো সত্য এ ভাষণ শুধু বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের ক্ষেত্রে নয়, পৃথিবীর যে কোনো প্রান্তে মুক্তিকামী জনগণের জন্য এটি একটি অগ্নিগর্ভা প্রেরণা। এ ভাষণ যে কোনো মানুষের হৃদয়কে উদ্বেলিত করে, উচ্ছ্বসিত করে সংগ্রামী চেতনায় উজ্জীবিত করে। সেদিন ১৮ মিনিটের এ ভাষণটি সন্দেহাতীতভাবে কালজীয়। বিচ্ছিন্নতাবাদীদের অপবাদকে পাশ কাটিয়ে বাংলার প্রান্তিক জনগণকে আগ্নেয়গিরির গলিত লাভার মতো বিস্ফোরিত করার এমন নিখুঁত শব্দ চয়ন পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল। বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক এ ভাষণের সবচেয়ে ভালো লাগার অংশটুকু স¤‹র্কে তিনি বলেন, ‘আমি যদি হুকুম দেবার নাও পারি, তোমাদের যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকবেলা করো।’

এ প্রসঙ্গে সাবেক আরেক ডাকসু ভিপি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম যুগান্তরকে বলেন, বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি ভাষণ ছিল। সেই গুরুত্ব উপলব্ধির মাধ্যমে ‘মেমোরি অব দ্য ওয়ার্ল্ড ইন্টারন্যাশনাল রেজিস্টারে’ যুক্ত করে ইউনেস্কো সঠিক কাজটি করেছে। এটি অবশ্যই প্রশংসার দারিদার। তবে এটাও সত্য যে, এ ভাষণ জনতার সংগ্রাম ও পরিস্থিতির সৃষ্টি। তাই সেই জনগণের সংগ্রামকে অভিনন্দন জানাই।

ফিরে দেখা ৭ মার্চ : ১৯৭১ সালের ৭ মার্চের সেদিনে ঢাকা ছিল মিছিলের শহর। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে দলে দলে মানুষ হেঁটে, বাস-লঞ্চে কিংবা ট্রেনে চেপে রেসকোর্স ময়দানে সমবেত হয়েছিলেন। ধর্ম-বর্ণ-গোত্র নির্বিশেষে লাখ লাখ মানুষের জনসমুদ্রে পরিণত হয়েছিল সেদিনের রেসকোর্স ময়দান। মুহুর্মুহু গর্জনে ফেটে পড়েছিলেন বাঁশের লাঠি হাতে সমবেত লাখ লাখ বিক্ষুব্ধ মানুষ।

এমন পরিস্থিতিতে বিকাল ৩টা ২০ মিনিটে শুভ্র পাজামা-পাঞ্জাবি আর হাতাকাটা কালো কোট পরে বাঙালির প্রাণপুরুষ বঙ্গবন্ধু সেদিন দৃপ্তপায়ে ওঠেন মঞ্চে। মাইকের সামনে দাঁড়িয়ে আকাশ-কাঁপানো স্লোগান আর মুহুর্মুহু করতালির মধ্যে হাত নেড়ে অভিনন্দন জানান অপেক্ষমাণ জনসমুদ্রের উদ্দেশে।

তারপর শুরু হয় সেই ঐতিহাসিক ভাষণ-

তিনি বলেন- ‘… আর যদি একটা গুলি চলে, আর যদি আমার লোকদের হত্যা করা হয়, তোমাদের কাছে আমার অনুরোধ রইল, প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলো। তোমাদের যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করতে হবে এবং জীবনের তরে রাস্তাঘাট যা যা আছে সবকিছু, আমি যদি হুকুম দেবার নাও পারি তোমরা বন্ধ করে দেবে।’

পাকিস্তানি সৈন্যদের উদ্দেশে বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘… তোমরা আমার ভাই, তোমরা ব্যারাকে ফিরে যাও, কেউ তোমাদের কিছু বলবে না। কিন্তু আর আমার বুকের ওপর গুলি চালাবার চেষ্টা করো না। সাত কোটি মানুষরে দাবায়ে রাখতে পারবা না। আমরা যখন মরতে শিখেছি, তখন কেউ আমাদের দাবাতে পারবে না।’

মুক্তিকামী উত্তাল জনসমুদ্র যখন স্বাধীনতার ঘোষণা শুনতে অস্থিরচিত্তে অপেক্ষমাণ, ঠিক তখনই বঙ্গবন্ধু চির উন্নত শিরে সুস্কষ্ট দৃঢ়তায় উচ্চারণ করেন, ‘তোমাদের যা কিছু আছে, তাই নিয়ে প্রস্তুত থাকো। মনে রাখবা, রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরও দেব- এ দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়ব ইনশাআল্লাহ। এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’

মন্ত্রমুগ্ধের মতো বাঙালি জাতি সেদিন এই ভাষণ বুকে ধারণ করে স্বাধীনতা ও মুক্তির সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েন। মাত্র ৯ মাসেই ছিনিয়ে আনেন প্রিয় স্বাধীনতা।

এ ঘটনায় ‘ইউনেস্কো’কে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সাধারণ স¤‹াদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন। মঙ্গলবার বিবৃতিতে ইউনেস্কো কর্তৃক সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণকে বিশ্ব ঐতিহ্যের দলিল হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করায় সংস্থাটির প্রতি কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *