> জাতীয় স্মৃতিসৌধে জনতার ঢল - বঙ্গবন্ধু শুধু একটি নাম

জাতীয় স্মৃতিসৌধে জনতার ঢল

নিজস্ব প্রতিবেদক
মহান বিজয় দিবসে জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে সাভারে জাতীয় স্মৃতিসৌধে জনতার ঢল নেমেছে। আজ শনিবার প্রত্যুষে ৩১ বার তোপধ্বনির মধ্য দিয়ে দিবসের সূচনা হয়। পূব আকাশে সূর্য উঁকি দেওয়ার পর সকাল সাড়ে ৬টার কিছু পরে সাভার জাতীয় স্মৃতিসৌধে বেদীতলে শহীদদের উদ্দেশে ফুল দিয়ে প্রথমে শ্রদ্ধা জানান রাষ্ট্রপতি মো. আব্দুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

দুই নেতা শ্রদ্ধা জানানোর পর সেখানে কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে শহীদদের স্মরণ করেন। এ সময় বিউগলে বেজে উঠে করুণ সুর। রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর শ্রদ্ধা জানানোর পর হাতে ফুল নিয়ে স্মৃতিসৌধে শহীদদের জন্য তৈরি বেদিতে শ্রদ্ধা জানান তারা। দেশের সূর্য সন্তানদের প্রতি তাদের গভীর শ্রদ্ধা আর ভালোবাসা নিবেদনে ফুলে ফুলে ঢেকে গেছে স্মৃতিসৌধের শহীদ বেদী।

বিজয় দিবসের আনন্দ আর উচ্ছ্বাসে স্মৃতিসৌধকে ঘিরে গোটা সাভার পরিণত হয়েছে উৎসবের নগরীতে। শহীদদের শ্রদ্ধা জানাতে শীতকে উপেক্ষা করে গভীর রাত থেকেই মহাসড়কের পাশে ভিড় করতে থাকেন শিশু-ছেলে-বুড়োসহ সব বয়সী মানুষ। এসেছিলেন যুদ্ধাহত অনেক মুক্তিযোদ্ধাও। তাদের অনেকের হাতে দেখা যায় লাল-সবুজের পতাকা আর রঙবেরঙের ফুল। পোশাকেও লাল-সবুজের সরব উপস্থিতি। অনেকের হাতে শোভা পাচ্ছে ব্যানার। অনেকের কণ্ঠে শোনা যাচ্ছে দেশের গান।

তাদের মতো লাখো জনতা জাতীর শ্রেষ্ঠ সন্তানদের স্মরণ করতে ভিড় করেছেন জাতীয় স্মৃতিসৌধে। সবার চোখে ছিল একটি সুন্দর বাংলাদেশের গড়ার স্বপ্ন। তাদের আনন্দ আর উচ্ছ্বাসে গোটা সাভার পরিণত এলাকা উৎসবের নগরীতে পরিণত হয়েছে।

রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী শ্রদ্ধা জানানোর পরপরই জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান। এরপর আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনা দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিয়ে দলের পক্ষ থেকে শহীদ বেদীতে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।

এরপর মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর নেতৃত্বে উপস্থিত বীরশ্রেষ্ঠ পরিবার, যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা ও বীর মুক্তিযোদ্ধারা পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। পরে একে একে মন্ত্রিপরিষদ সদস্য, বাংলাদেশে অবস্থিত বিদেশি কূটনীতিক, বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধে মিত্রবাহিনীর সদস্য হিসেবে অংশগ্রহণকারী ভারতীয় সেনাবাহিনীর আমন্ত্রিত সদস্যসহ অন্যরা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান। তারপরই বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনসহ সর্বস্তরের সাধারণ মানুষের জন্য স্মৃতিসৌধ উন্মুক্ত দেওয়া হয়।

সকাল ১০টায় তেজগাঁও পুরাতন বিমানবন্দরে জাতীয় প্যারেড স্কয়ারে সম্মিলিত বাহিনীর বর্ণাঢ্য কুচকাওয়াজ এবং বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রমভিত্তিক যান্ত্রিক বহর প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হবে। রাষ্ট্রপতি এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে কুচকাওয়াজ পরিদর্শন এবং সালাম গ্রহণ করবেন। প্রধানমন্ত্রীও কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকবেন।

মহান বিজয় দিবস বাঙালি জাতির হাজার বছরের শৌর্যবীর্য এবং বীরত্বের এক অবিস্মরণীয় দিবস। বীরের জাতি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করার দিন। পৃথিবীর মানচিত্রে বাংলাদেশ নামের একটি স্বাধীন ভূখণ্ডের নাম জানান দেওয়ার দিন।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃতে নয় মাস সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের পর ১৯৭১ সালের এই দিনে বিকেলে রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে) হানাদার পাকিস্তানি বাহিনী মিত্র বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করে। বিশ্বের মানচিত্রে অভ্যুদয় ঘটে নতুন রাষ্ট্র বাংলাদেশের।

যে অস্ত্র দিয়ে বর্বর পাকিস্তানি বাহিনী দীর্ঘ নয় মাস ৩০ লাখ বাঙালিকে হত্যা করেছে, দুই লাখ মা-বোনের সম্ভ্রম কেড়ে নিয়েছে সেই অস্ত্র পায়ের কাছে নামিয়ে রেখে একরাশ হতাশা এবং অপমানের গ্লানি নিয়ে লড়াকু বাঙালির কাছে পরাজয় মেনে নেয় তারা। সেই থেকে ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবস পালিত হয়ে আসছে। এবার বিজয়ের ৪৬তম বার্ষিকী।

একাত্তরের মানবতাবিরোধী যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের রায় কার্যকর হয়েছে এবং হচ্ছে এই স্বস্তি নিয়ে আজ কৃতজ্ঞ জাতি সশ্রদ্ধ বেদনায় স্মরণ করছে দেশের পরাধীনতার গ্লানি মোচনে প্রাণ উৎসর্গ করা বীর সন্তানদের। মহান বিজয় দিবসে উপলক্ষে পৃথক বাণীতে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং জাতীয় সংসদের বিরোধী দলের নেতা রওশন এরশাদ দেশবাসীকে অভিনন্দন জানিয়েছেন।

বিজয় দিবস সরকারি ছুটির দিন। সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়। রাজধানীসহ দেশের বড় শহরগুলোর প্রধান সড়ক ও সড়কদ্বীপ জাতীয় পতাকায় সজ্জিত করা হয়। রাতে গুরুত্বপূর্ণ ভবন ও স্থাপনায় করা হবে আলোকসজ্জা। হাসপাতাল, কারাগার ও এতিমখানাগুলোতে উন্নতমানের খাবার পরিবেশন করা হবে। সংবাদপত্র বিশেষ ক্রোড়পত্র প্রকাশ করেছে, বেতার ও টিভি চ্যানেলগুলো সম্প্রচার করছে বিশেষ অনুষ্ঠানমালা।

এ উপলক্ষে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি, বাংলা একাডেমি, জাতীয় জাদুঘর, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর, বাংলাদেশ শিশু একাডেমিসহ বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক আলোচনা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, শিশুদের চিত্রাঙ্কন, রচনা ও ক্রীড়া প্রতিযোগিতা এবং মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শনের আয়োজন করেছে।

এ ছাড়া মহানগর, জেলা ও উপজেলায় বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং শহীদ পরিবারের সদস্যদের সংবর্ধনা দেওয়া হবে। বাংলাদেশ ডাক বিভাগ স্মারক ডাকটিকেট প্রকাশ করবে। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে দেশের শান্তি ও অগ্রগতি কামনা করে বিশেষ দোয়া ও উপাসনার আয়োজন করা হবে এবং এতিমখানা, বৃদ্ধাশ্রম, হাসপাতাল, জেলখানা, সরকারি শিশুসদনসহ অনুরূপ প্রতিষ্ঠানগুলোতে উন্নতমানের খাবার পরিবেশন করা হবে। দেশের সব শিশুপার্ক ও জাদুঘর বিনা টিকিটে উন্মুক্ত রাখা হবে।

জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে একই ধরনের বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করা হবে। বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসগুলোতে দিবসের তাৎপর্য তুলে ধরে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করা হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published.