জামাতে মওদুদীর ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি জেনারেল এ টি এম আজহারুল ইসলাম এবং আমাদের ইসলামী আন্দোলন


তিনি এটিএম আজহারুল ইসলাম, গ্রাম বালুয়াভাটা প্রফেসরপাড়া, থানা বদরগঞ্জ, জেলা রংপুর। জামায়েতে মওদুদীর বর্তমান ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি জেনারেল। বাংলাদেশের ইসলামী আন্দোলনের প্রথম সারির নেতা। যিনি প্রতি মূহুর্তে হুংকার দিচ্ছেন সরকারকে, ৭১’ এর মানবতা বিরোধী অপরাধের বিচারের মানে ইসলামের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র।19 এপ্রিল 2010 এক সমাবেশে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এ টি এম আজহারুল ইসলাম বলেছেন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের নামে সরকার দেশকে বিভক্ত করতে চাইছে।

২৬ শে মার্চ ২০১০ তারিখে মানবতা বিরোধী অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন টিম যাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের প্রমানিত তথ্য প্রমান আছে এবং তার মনে করছে ১৯৭১ সালের বাংগালী নিধন যজ্ঞের কেন্দ্রে যারা ছিলেন এমন ৩৬ জনের নাম প্রকাশ করে। মাননীয় নেতা এ টি এম আজহারুল ইসলাম তাদের মধ্যে একজন। আসুন ফিরে দেখি একাত্তর। ইসলামী আন্দোলনের শীর্ষ পর্যায়ের এ নেতা কতটা রক্ত ঝরিয়ে ছিলেন তার প্রিয় দেশ মাতৃকার। সাদা পাঞ্জাবী আর টুপির মুখোশের আড়ালে লুকিয়েরা মুখটা কতটা হিংস্র হতে পারে আপনার বোধ সেটুকু হয়তো স্পর্ষ করতে পারবে না। আসুন দেখি কতটা ধারালো নখরে আচড়ে দিয়েছিলেন এদেশের বুক।

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে বাঙালি নিধনে পাক বাহিনীর সহায়তায় গঠিত কুখ্যাত রাজাকার, আল-বদর বাহিনীর নেতৃস্থানীয়দের অন্যতম বর্তমানে জমায়েতে মওদুদীর নেতাদের একজন এটিএম আজহারুল ইসলাম। রংপুর জেলার বদরগঞ্জ উপজেলার লোহানীপাড়ার বাসিন্দা এটিএম আজহারুল ইসলাম মুক্তিযুদ্ধের সময় ধর্মব্যবসায়ী জমায়েতে মওদুদীর ক্যাডারভিত্তিক অঙ্গসংগঠন ছাত্রসংঘের (বর্তমানে ছাত্রশিবির) জেলা কমিটির সভাপতি ছাড়াও আল-বদর বাহিনীর রংপুর শাখার কমান্ডার নিযুক্ত হন। এ এস এম সামছুল আরেফিনের লেখা মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ব্যক্তির অবস্থান বইয়ের ৪২৮ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে জনাব আজহার আলবদর বাহিনীর রাজশাহী জেলা শাখার প্রধান ছিলেন। রংপুরের কারমাইকেল কলেজের ৬ শিক্ষক এবং ১ শিক্ষক-পত্নীকে হত্যায় নেতৃত্ব দিয়ে রংপুরকে এক আতঙ্কের জনপদে রূপ দেন এটিএম আজহারুল ইসলাম। মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে পাকিস্থান স্বরাষ্ট দপ্তরের ফোর্টনাইটলি সিক্রেট রিপোর্ট অন দ্য সিচুয়েশন ইন ইস্ট পাকিস্তানে এ টি এম আজহার মুক্তিযোদ্ধাদের শায়েস্তা করতে তৎপর ছিলেন বলে উল্লেখ আছে।

মুক্তিযোদ্ধাদের দেয়া তথ্য মতে, মুক্তিযুদ্ধের সময় আজহারুল ইসলাম ৭০ জনের একটি সশস্ত্র আল-বদর স্কোয়াডের নেতৃত্ব দিতেন।সেই স্কোয়াডের ঘাঁটি ছিল রংপুরের টাউন হল এলাকায়। উল্লেখ্য ১৯৭১ সালের ১৭ আগস্ট পাকিস্তানি বাহিনী তাদের এ দেশীয় দোসর ধর্মব্যবসায়ী জমায়েতে মওদুদী সৃষ্ট সশস্ত্র সংগঠন আল-বদরকে মিলিশিয়া বাহিনীর স্বীকৃতি দেয়। এ উপলক্ষে ওইদিন আলবদর বাহিনী দেশের বিভিন্ন এলাকায় সভা-সমাবেশের আয়োজন করে। এরই অংশ হিসেবে রংপুর সদরে আয়োজিত আলবদর বাহিনীর সভায় সভাপতিত্ব করেন এটিএম আজহারুল ইসলাম। (সূত্র : দৈনিক সংগ্রাম, ১৮ আগস্ট, ১৯৭১)। সভায় আজহারুল ইসলাম এবং তার সহযোগীরা বাঙালির রক্ত পানের শপথ নেয় বলে সভাস্থলে উপস্থিত একাধিক প্রত্যক্ষদর্শী বিভিন্ন সময় সাক্ষ্য দিয়েছেন। আজহারুল এবং তার সহযোগীরা পাকিস্তানি সেনা কর্মকর্তাদের মনোরঞ্জনের জন্য ভয়-ভীতি দেখিয়ে এলাকার হিন্দু সম্প্রদায়ের, এমন কি অপেক্ষাকৃত নিরীহ মুসলিম পরিবারের সুন্দরী তরুণী এবং গৃহবধূদের ধরে এনে সরবরাহ করতেন।

১৯৭১ সালের সেপ্টেম্বরের প্রথম দিকে আলবদর কমান্ডার আজহারুল ইসলামের নেতৃত্বে পরিচালিত এক অভিযানে রংপুরের ঐতিহ্যবাহী বিদ্যাপীঠ কারমাইকেল কলেজের ৬ শিক্ষক এবং ১ শিক্ষক-পত্নীকে তুলে আনা হয়। তারা হলেন রসায়ন বিভাগের প্রভাষক কালাচাঁদ রায়, গণিতের প্রভাষক চিত্তরঞ্জন রায়, দর্শনের প্রভাষক সুনীল বরণ চক্রবর্তী, বাংলার প্রভাষক রামকৃষ্ণ অধিকারী, উর্দু বিভাগের শাহ সোলায়মান আলী ও রসায়নের আবদুর রহমান এবং কালাচাঁদ রায়ের স্ত্রী (নাম জানা যায়নি)। ওই সময়কার ছাত্রনেতা রফিকুল ইসলাম এবং তার ভাই সাখাওয়াত রাঙ্গা (বর্তমানে জেলা জাসদের সাধারণ সম্পাদক) এবং রংপুরের অন্যান্য মুক্তিযোদ্ধার তথ্য মতে, আজহারুলের উপস্থিতিতে এবং নির্দেশে তার সহযোগী আলবদর সদস্যরা রংপুরের সর্বমহলে সমাদৃত ওই ৭ জনকে কলেজের পার্শ্ববর্তী দমদমা এলাকায় নিয়ে বেয়োনেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে নির্মম নির্যাতনের পর ব্রাশফায়ারে মৃত্যু নিশ্চিত করে। এ ঘটনায় আতঙ্কে শিউরে ওঠে সমগ্র রংপুরবাসী। প্রত্যক্ষদর্শী একজন মুক্তিযোদ্ধা জানান, ‘নিহত শিক্ষকদের বীভৎস লাশ যারা দেখেছেন, তাদের কাছে আজহারুল মানুষরূপী এক নরপিশাচ হিসেবে চিহ্নিত।’

১৯৭১ সালের ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহের দিকে বাঙালির বিজয় নিশ্চিত হতে থাকলে আজহারুল ইসলাম রংপুর ছেড়ে চলে আসেন ঢাকায়। এরপর মেতে ওঠেন ইতিহাসের আরেক নৃশংস ও জঘন্যতম হত্যাযজ্ঞে।উল্লেখ্য শান্তি কমিটি, রাজাকার বাহিনী প্রভৃতি দিয়েও কোনোভাবে যখন পরাজয় ঠেকিয়ে রাখতে পারছিলো না পাক বাহিনী, তখন ঠিক পরাজয়ের প্রাক্কালে বাঙ্গালী জাতিকে ধ্বংস করে দেওয়ার অন্যতম উপায় হিসেবে গেস্টাপো বাহিনীর কায়দায় তারা মেতে ওঠে বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডে। আর সেকারণেই গঠিত হয় আল-বদর আল-শামস বাহিনী। যার পূর্ণ নেতৃত্বে ছিলো জামায়াত ইসলামী। এবং যাদের প্রধান কাজ ছিলো পাকিস্তানি জেনারেল রাও ফরমান আলীর সঙ্গে বৈঠক করে বুদ্ধিজীবী হত্যার নীল নকশা প্রণয়ন করা। দেশের প্রখ্যাত লেখক, সাংবাদিক, অধ্যাপক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, বিজ্ঞানী, আইনজীবী, ক্রীড়াবিদ ও সমাজকর্মীসহ বিভিন্ন পেশার শত শত বুদ্ধিজীবী হত্যার জন্য দায়ী এই আল-বদর বাহিনী। আজহারুল, নিজামী ও মুজাহিদ গংয়ের নেতৃত্বে দেশবরেণ্য বুদ্ধিজীবীদের ধরে ধরে মোহাম্মদপুরের ফিজিক্যাল ট্রেনিং কলেজে স্থাপিত টর্চার সেলে নিয়ে চালানো হতো অকথ্য নির্যাতন। সেখান থেকে তাদের নিয়ে হত্যা করা হতো রায়েরবাজারের বধ্যভূমিতে। ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর আত্মসমর্পণের দিন নরঘাতক আজহার তার অন্য কয়েকজন সহযোগীর সঙ্গে পাকিস্তানে পালিয়ে যান। সেখান থেকে পাড়ি জমান সৌদি আরব। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরবর্তী অনুকূল পরিস্থিতিতে দেশে ফিরে আসেন আজহারুল। ১৯৭৭ সাল থেকে আবারো প্রকাশ্যে সক্রিয় হন জামায়াতের রাজনীতিতে। তবে ১৯৭১-এর অপকর্মের জের ধরে আজহারুল ১৯৮৬ সাল পর্যন্ত নিজ জেলা রংপুরে আসতে পারতেন না। দৈনিক সমকাল, ১৮ ডিসেম্বর, ২০০৮

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *