জয় বাংলা >> Joy Bangla

‘জয় বাংলা’ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের রণধ্বনি। তবে এটি কেবল মুক্তিযুদ্ধের সময়েই উচ্চারিত হয়নি। বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনকে তার চূড়ান্ত লক্ষ্যে স্বাধীনতার দিকে অগ্রসর করে নেয়ার জন্য প্রয়োজন ছিল এমন একটি রণধ্বনি অথবা বিজয়সূচক দেশাত্মবোধক ধ্বনিসমষ্টিÑ যা কেবল উদ্দীপকই নয়, জাতিসত্তার পরিচয় জ্ঞাপক। ঔপনিবেশিক শক্তিগুলোর পরাধীনতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ ছিল এমন প্রতিটি দেশের জাতীয় স্বাধীনতা আন্দোলন ও সশস্ত্র জাতীয় মুক্তি-সংগ্রামে এ জাতীয় বিজয়সূচক রণধ্বনি রয়েছে। যেমনÑ ল্যাটিন থেকে উদ্ভূত স্প্যানিশ ভাষায় ‘ভিভা’ বা ‘ভেনচেরেমোস’, ইংরেজিতে ‘ভিক্টরি’ এবং ফরাসি ‘ভিভ’ বা ‘ভিক্টোরিয়া’ প্রভৃতি শব্দগুচ্ছ বিজয়সূচক উদ্দীপক রণধ্বনি হিসেবে ওই সকল ভাষাভাষী উপনিবেশে দেশনামের সঙ্গে উচ্চারিত হতো। ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর ‘আজাদ হিন্দ্ ফৌজ’ তাদের রণধ্বনি হিসেবে ‘জয় হিন্দ্’ শব্দবন্ধকে জনপ্রিয় করে তোলেন।
বাংলাদেশে ‘জয় বাংলা’ প্রথম উচ্চারিত হয় ১৯৭০ সালের ৪ জানুয়ারিÑ ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে। এরপর একই বছর ১১ জানুয়ারি আওয়ামী লীগের উদ্যোগে আয়োজিত পল্টন ময়দানের জনসভা থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর বক্তৃতা শেষ করেন ‘জয় বাংলা’ বলে। প্রকৃতপক্ষে তখন থেকেই ‘জয় বাংলা’ ধ্বনি সকলের মুখে উচ্চারিত হতে থাকে এবং জনপ্রিয়তা অর্জন করে।
তবে এই স্লোগানের পেছনেও একটু ইতিহাস আছে। ছয়-দফা ও এক-দফা আন্দোলনের সময়েই দেশাত্মবোধক জাতীয়বাদী নানা স্লোগান উচ্চারিত হতে থাকে। ১৯৬৯ সালের ৫ ডিসেম্বর হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যুদিবস উপলক্ষে আয়োজিত সমাবেশে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঘোষণা করেন আজ থেকে পূর্ব পাকিস্তানের নাম হবে ‘বাংলাদেশ’। স্লোগান ওঠে ‘তোমার দেশ আমার দেশ বাংলাদেশ, বাংলাদেশ।’ এইসব স্লোগান ও ‘জয় বাংলা’ রণধ্বনিটি উৎসারিত হয়েছে ৩ বৈশাখ, ১৩৪৯ বঙ্গাব্দে দৈনিক নবযুগ পত্রিকায় প্রকাশিত কাজী নজরুল ইসলামের ‘বাঙালির বাংলা’ শীর্ষক একটি প্রবন্ধ থেকে। ওই প্রবন্ধে নজরুল লিখেছেন, ‘বাঙালিকে, বাঙালির ছেলেমেয়েকে ছেলেবেলা থেকে শুধু এই মন্ত্র শেখাও : এই পবিত্র বাংলাদেশ বাঙালির-আমাদের।’… ‘বাঙলা বাঙালির হোক। বাঙলার জয় হোক। বাঙালির জয় হোক।’ বস্তুত কাজী নজরুল ইসলামের উল্লিখিত লেখা থেকেই ‘জয় বাংলা’ রণধ্বনিটি চয়ন করা হয়েছে। ১৯৭১ সালের ৩ জানুয়ারি রেসকোর্স ময়দানে আওয়ামী লীগের নবনির্বাচিত জাতীয় পরিষদ সদস্য ও প্রাদেশিক পরিষদের সদস্যদের শপথ অনুষ্ঠানে প্রথমে রবীন্দ্রনাথের ‘আমার সোনার বাংলা’ গানটি পরিবেশিত হয়। পরে বঙ্গবন্ধু শপথবাক্যের অংশ হিসেবে ‘জয় বাংলা’ স্লোগানটিও উচ্চারণ করেন। শপথের পর অনুষ্ঠানে ‘জয় বাংলা, বাংলার জয়’ শীর্ষক একটি গণসংগীত পরিবেশিত হয়।
১৯৭১-এর ১ মার্চ ইয়াহিয়া খান জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত ঘোষণার পর ঢাকাসহ সমগ্র বাংলাদেশের লক্ষ লক্ষ মানুষ রাজপথে নেমে আসে। সেদিন স্বতঃস্ফূর্তভাবে স্লোগান ওঠে ‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধর বাংলাদেশ স্বাধীন কর।’ ওই দিন থেকে ‘জয় বাংলা’ স্লোগানটিও সর্বজনীন হয়ে ওঠে। ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি দখলদার বাহিনী নিরস্ত্র বাঙালিদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। গ্রেফতারের পূর্ব মুহূর্তে বঙ্গবন্ধু আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন এবং হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধের আহ্বান জানান। টেলিপ্রিন্টারে পাঠানো বঙ্গবন্ধুর আনুষ্ঠানিক স্বাধীনতা ঘোষণাটিও শেষ হয় ‘জয় বাংলা’ বলে। শুরু হয় সশস্ত্র প্রতিরোধ বা মুক্তিযুদ্ধ।
মুক্তিযুদ্ধের সূচনায় ১০ এপ্রিল অনুষ্ঠিত জনপ্রতিনিধিদের সভায় ‘স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র’ গৃহীত হয়। এই ঘোষণাপত্রটিকেই বলা যেতে পারে মুক্তিযুদ্ধকালীন মুজিবনগর সরকারের বৈধ সাংবিধানিক ভিত্তি। ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রটি পাঠ করা হয় এবং মুজিবনগর সরকার হিসেবে পরিচিত বাংলাদেশের প্রথম সরকার মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলায় আনুষ্ঠানিক শপথ গ্রহণ করে। এই শপথ অনুষ্ঠানে প্রদত্ত অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম ও প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ তাদের বক্তব্যেও ‘জয় বাংলা’ ধ্বনি উচ্চারণ করেন। মুক্তিযুদ্ধকালে বিভিন্ন সেক্টরে যুদ্ধরত মুক্তিযোদ্ধাদের রণধ্বনি হয়ে ওঠে ‘জয় বাংলা’। ‘জয় বাংলা’ বলতে বলতে অগণিত বীর মুক্তিযোদ্ধা পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীকে মোকাবিলা করতে গিয়ে হাসিমুখে প্রাণ দিয়েছেন। পাকবাহিনীর হাতে ধৃত মুক্তিযোদ্ধা, এমনকি সাধারণ বাঙালিকেও ‘জয় বাংলা’ বলার অপরাধে হত্যা করেছে অথবা ‘জয় বাংলা’ না বলে ‘পাকিস্তান জিন্দাবাদ’ বলার জন্য বেয়োনেট দিয়ে খুঁচিয়ে যন্ত্রণা দিয়েছে। ভারতে আশ্রয়গ্রহণকারী লক্ষ লক্ষ বাঙালিকে যেমন ‘জয় বাংলার’ লোক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, তেমনি মুক্তিবাহিনীকেও বলা হতো ‘জয় বাংলা বাহিনী’ হিসেবে। প্রকৃতপক্ষে ‘জয় বাংলা’ ধ্বনি পাকহানাদার বাহিনীর মধ্যে রীতিমতো ভীতির সঞ্চার করত। ‘জয় বাংলা’ রণধ্বনিটি ছিল মুক্তিযুদ্ধে বাঙালির শৌর্যবীর্য এবং বিজয় লাভের আত্মপ্রত্যয়ের অবিনাশী জয়ধ্বনি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *