ঢাকা থেকে আকিয়াব : পূর্ব পাকিস্তানের শেষ উড়ান

ভূমিকা :

অনেক আগে ভিয়েতনাম যুদ্ধের ওপর একটা তথ্যচিত্র দেখেছিলাম- দ্য লাস্ট ফ্লাইট ফ্রম সায়গন। আমেরিকানরা পালাচ্ছে। সঙ্গী হওয়ার জন্য ব্যাকুল তাদের সহযোগীরা, দুতাবাসের প্রাঙ্গনে ঢুকতে রীতিমতো সংঘাত। প্রাঙ্গন জুড়ে পোড়ানো হচ্ছে আমেরিকান ডলার-কোটি কোটি! শেষ একটি হেলিকপ্টার। সেটায় ওঠার জন্য তুমুল ধাক্কাধাক্কি। ঘটনার চার বছর আগে ঢাকায় ব্যাপারটা ঠিক তেমন ছিলো না। ১৬ ডিসেম্বর ঢাকা রেসকোর্সে আত্মসমর্পণের মধ্যে দিয়ে শেষ হয়েছিল একটি রক্তাক্ত মুক্তিযুদ্ধের, জন্ম নিয়েছিল বাংলাদেশ। তার আগের সময়টা কেমন ছিলো পাকিস্তানীদের! পরাজয় নিশ্চিত হয়ে যাওয়ার পর তারা এই দেশের সেরা সম্পদগুলো ধ্বংস করতে মেতেছে। নেমেছে বুদ্ধিজীবি হত্যায়। পুড়িয়ে ছাই করেছে ব্যাঙ্ক নোট। সোনাদানা জড়ো করে পাচার করার চেষ্টা করেছে জাহাজ দিয়ে। পাশাপাশি চেষ্টা করেছে নিজেরা পালানোর। তাতে সফল হয়নি যদিও। তবে সেই উত্তেজনাময় সময়েও পাকিস্তানী ফোর এভিয়েশন স্কোয়াড্রনের পাইলটরা জীবন বাজি রেখে পালিয়েছে। ১৫ ডিসেম্বর রাতে (ক্যালেন্ডারে ১৬) বেশ কিছু সেনা কর্মকর্তার পরিবার নিয়ে কিছু হেলিকপ্টার নিরাপদে বার্মা পৌঁছায়। এদের মধ্যে ছিলেন কুখ্যাত খুনী মেজর জেনারেল মোহাম্মদ রহিম খানও। ১৬ ডিসেম্বর আত্মসমর্পনের ঘন্টা খানেক আগে ভারতীয় বাহিনীর নাকের ডগা দিয়ে ঢাকা ছাড়ে আরো দুটো হেলিকপ্টার। পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর বিভিন্ন ফোরামে এই পলায়নকে বেশ বীরত্বের বলে চিত্রায়িত করা হয়েছে। আর তা জাহির করতে গিয়ে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যও পরস্পরবিরোধী। এনিয়ে বাংলাদেশ ও ভারতীয় দলিলপত্রে তেমন কোন উল্লেখ নেই। পাকিস্তানী উপাত্তগুলোই বিশ্লেষণ করে একটা আঁচ পাওয়ার চেষ্টা করেছি ঘটনার। আল্লাহু আকবর বলে জেহাদী জোশে তারা কিভাবে এই অসম্ভব সম্ভব করেছিল-পাকি ফোরামের সেই বীরগাঁথা প্রচারের কোনো আগ্রহ আমার নেই। আমি চেষ্টা করেছি ঘটনার আড়ালে ঘটনা জানতে। পাশাপাশি এই অজানা কাহিনীটি শেয়ার করতে।

প্রেক্ষাপট :

৩ ডিসেম্বর ভারত আক্রমণের সঙ্গে সঙ্গেই পূবের রণাঙ্গনে ভাগ্য নির্ধারিত হয়ে যায় পাকিস্তানের। আকাশ ও জলসীমার দখল নেয় মিত্রবাহিনী। উপর্যুপরি আক্রমণে পাকিস্তান বিমানবাহিনীর অধিকাংশ যুদ্ধবিমান ধ্বংস হয়ে যায়। আর বোমার আঘাতে রানওয়ে হয়ে পড়ে উড্ডয়নের অনুপযোগী। এরই মধ্যে জাতিসংঘ কর্মকর্তা ও তাদের পরিবারবর্গকে ঢাকা থেকে নিরাপদে সরিয়ে নিতে দিতে মহাসচিব উ থান্ট যুযুধান দুপক্ষকে আহবান জানান। এ উদ্দেশ্যে আসা ব্রিটিশ রয়েল এয়ার ফোর্সের একটি সি-ওয়ানথার্টি বিমান ৭ ডিসেম্বর তেজগাঁ বিমানবন্দরের ওপর চক্কর দিলেও নামতে পারেনি। ভারত সায় দিয়ে আক্রমণ স্থগিত রাখলেও পাকিস্তান অস্বীকৃতি জানায় বিমানটির অবতরনে, ফলে ব্যাংককে ফিরে যায় সেটি।

১১ তারিখ এক ইনটেলিজেন্স রিপোর্টে মিত্রবাহিনী জানতে পারে সেদিন রাতে রাও ফরমান আলীসহ শীর্ষ বেশ কজন সেনা অফিসারকে তুলে নিতে ৬টি এয়ারক্রাফট ঢাকায় ল্যান্ড করবে। পরিকল্পনাটা বানচাল করে দিতে চট্টগ্রাম ও ঢাকায় বোমাবর্ষন তীব্রতর করে ভারতীয় বিমানবাহিনী। চট্টগ্রাম বিমানবন্দরের রানওয়ে ও ট্যাক্সিট্র্যাক অকেজো হয়ে যায় তুমুল আক্রমনে। কুর্মিটোলা ও তেজগাঁয় রাত আড়াইটা থেকে ভোর চারটা পর্যন্ত ৮টি ক্যানবেরা বোমারু ৪ হাজার পাউন্ড ওজনের উচ্চতর বিধ্বংসী বোমা (এসব বোমার নাম ছিলো: রোড টু ঢাকা) ফেলে। চারটা মিগ ও দুটো ক্যারিবাস পর্যায়ক্রমে চক্কর দিতে থাকে এ এলাকায়। পরদিন ১২ ডিসেম্বর একটি হারকিউলিস বিমানে সাড়ে চারশোজন বিদেশী নাগরিক ঢাকা ত্যাগ করে।

এরপর থেকে ভারতের সঙ্গে সমঝোতায় আসার জন্য জাতিসংঘের মাধ্যমে যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব পাঠাতে থাকে ইস্টার্ন কমান্ড। ভারত দাবি জানায় নিঃশর্ত আত্মসমর্পনের। ১৫ ডিসেম্বর শেষবেলাতে পূর্ব রণাঙ্গনে আত্মসমর্পনের ব্যাপারে তোড়জোর শুরু হয়ে যায়। মিত্রবাহিনীর হাতে যাতে না পড়ে সেজন্য সামরিক সরঞ্জামগুলো ধ্বংস করার নির্দেশ আসে সদর দফতর থেকে। ১৬ ডিসেম্বর সকাল ৯টায় সময়সীমা বেধে দেওয়া হলে তা বাড়াতে আবেদন জানান পাক অধিনায়ক লে.জে. নিয়াজী। কারণ হিসেবে বলেন গোটা পূর্ব পাকিস্তানে সেনা ইউনিটগুলোতে আত্মসমর্পনের নির্দেশ দিতে সময় লাগবে তার। মিত্র বাহিনী মেনে নেয় অনুরোধ। সেইসঙ্গে ফিরিয়ে নেওয়া হয় সকল ভারতীয় যুদ্ধবিমান। আমাদের আলোচ্য ঘটনাও ঘটে সেই সময়কালেই। প্রসঙ্গত, তার দুদিন আগে রেঙ্গুন হয়ে চীনের কুওমিং পর্যন্ত ঢাকার সঙ্গে বিমানপথ উন্মুক্ত করে দেয় বার্মা। যুদ্ধে তখন চীনের যোগ দেওয়ার সম্ভাবনা প্রবলভাবেই অনুমিত ছিলো।

ঘটনাক্রম ও কিছু বিভ্রান্তি :

প্রথমেই বলে নেওয়া যাক, যুদ্ধের সেই ক্রান্তিকালে পূর্ব রণাঙ্গনে আকাশে ওড়ানোর মতো কিছুই ছিলো না বলতে গেলে পাকিদের। রানওয়ে অনুপযোগী থাকায় ব্যবহার করা যাচ্ছিলো না কোনো যুদ্ধবিমান। একমাত্র ব্যতিক্রম ফোর এভিয়েশন। সোভিয়েত নির্মিত এম-এইট ও ফরাসি এল্যুট-থ্রি কপ্টার নিয়ে রাতের অন্ধকারে তারা চেষ্টা করে গেছে সাপ্লাই ও ইভ্যাকুয়েশনের মতো জরুরী কাজগুলো সারতে। বৈরী প্রতিবেশে এমনটা করতে আসলেই সাহস লাগে। আগেই বলেছি সংশ্লিষ্টদের বিবৃতিতে ঘটনার সংঘটন নিয়ে পরষ্পরবিরোধিতা আছে। কাহিনীটা হচ্ছে ১৫ ডিসেম্বর গভীর রাতে (১৬ ডিসেম্বরের শুরুতে) ঢাকা সেনানিবাসের গলফ কোর্স থেকে বেশ কিছু হেলিকপ্টার দুঃসাহসী উড়াল দেয় বার্মার আকিয়াবের উদ্দেশ্যে। এরপর ১৬ ডিসেম্বর দুপুরে আরো দুটি। যে ব্যাপারগুলো নিয়ে বিভ্রান্তি হয়েছে তার মধ্যে সবচেয়ে বেশী হচ্ছে হেলিকপ্টারের সঠিক সংখ্যা নিয়ে। এছাড়া অর্ডারটা সদর দফতরই দিয়েছে না ফোর এভিয়েশনের কমান্ডার বুঝিয়েসুজিয়ে আদায় করেছেন তা নিয়েও পরস্পর বিরোধিতা আছে। বার্মা পৌছার পর সেখানে তাদের স্বাগত জানানোর ধরণ নিয়েও একেকজনের একেক কথা।

এ ব্যাপারে আমরা সিদ্দিক সালিকের ব্ক্তব্য দিয়ে শুরু করতে পারি। উইটনেস ট্যু সারেন্ডার বইয়ের এই লেখক একমাত্র পাকিস্তানী সেনা কর্মকর্তা যার বক্তব্যের খানিকটা হলেও গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে বাংলাদেশ মহলে। তার বক্তব্য মাঝরাতে ফোর এভিয়েশন স্কোয়াড্রনের কমান্ডিং অফিসার লিয়াকত বোখারিকে ডেকে নির্দেশ দেয়া হয় ২৮টি পাকিস্তানী পরিবার ও ৮ জন নার্সকে নিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের উপর দিয়ে আকিয়াবে (বার্মা) চলে যেতে। It was already midnight (15/16 December) when the signal was sent out. About the same time, Lieutenant-Colonel Liaquat Bokhari, Officer Commanding, 4 Aviation Squadron, was summoned for his last briefing. He was told to fly out eight West Pakistani nurses and twenty-eight families, the same night, to Akyab (Burma) across the Chittagong Hill Tracts. Lieutenant-Colonel Liaquat received the orders with his usual calm, so often seen during the war. His helicopters, throughout the twelve days of all-out war, were the only means available to Eastern Command for the transport of men, ammunition and weapons to the worst hit areas. Their odyssey of valour is so inspiring that it cannot be summed up here. Two helicopters left in the small hours of 16 December while the third flew in broad daylight. They carried Major-General Rahim Khan and a few others, but the nurses were left behind because they ‘could not be collected in time’ from their hostel. All the helicopters landed safely in Burma and the passengers eventually reached Karachi.

সালিকের লেখায় আমরা মাত্র তিনটি হেলিকপ্টারের কথা জানতে পারি, যা আসলে সত্যি নয়। এর তিনগুনেরও বেশী আমরা শুনি লে. জেনারেল আলী কুলী খানের মুখে। তার গোটা সাক্ষাতকারটি হাস্যকর বাগাড়ম্বরে ভরপুর। গোটা মুক্তিযুদ্ধে কোথাও মুক্তিবাহিনী বা মিত্র বাহিনী পাকিস্তানী কোনো ডিফেন্স পেরোতে পারেনি এই দাবি করে তিনি অহেতুক আত্মসমর্পনের দায় চাপিয়েছেন নিয়াজীর কাঁধে। ভারতীয় বাহিনীর হাতে সব যুদ্ধাস্ত্র ও বিমান ধ্বংসের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে বার্মা অভিযানে অধিনায়ককে রাজী করার কথা জানিয়েছেন কুলী। তার মতে দ্বিতীয় হেলিকপ্টারে আকিয়াবে তিনি প্রথম পৌছেছেন। সেখানে বার্মিজ নিরাপত্তারক্ষীরা তাকেই প্রথম জেরা করে। নিরাপত্তারক্ষী তাকে উর্দূতেই জিজ্ঞেস করে পরিচয়! তিনি মুসলমান তা জানার পর নিজের পরিচয় দেয় মুস্তফা কামাল বলে। এরপর তাদের বার্মা অয়েলের রেস্টহাউজে রাখা হয়-ইত্যাদি ইত্যাদি যা এ বিষয়ে মুখ খোলা কারো বক্তব্যের সঙ্গে মেলেনি। হেলিকপ্টারের সংখ্যা তার হিসেবে ১০টি। তার সঙ্গে আরো ৭টি এবং পরে দুটো। কুলী খান বলেছেন : My helicopter was the second to take off but for some reason the first to arrive at Akyab Burma. We had planned to arrive at Akyab by “first light” and once we identified Akyab we flew over the sea to drop our weapons and other belongings by which we could have been identified as military personnel. I was also the first person to encounter the Burmese military guard of Akyab. Quite surprisingly, he spoke Urdu and asked me if I was a Pakistani, and whether I was armed or not? He then asked me if I was a Muslim and upon getting a reply in the affirmative said “Assalam O Alaikum, I am also a Muslim and my name is Mustafa Kamal” In a short while seven other helicopters also arrived and soon there were approximately 170 Pakistan women and children and Army Aviators milling around the Akyab Terminal which usually received only one aircraft a day! Our Burmese hosts were most understanding and they lodged us in a Burma Oil Company Rest House. The women and children2 were flown out to Rangoon within three days and then to Pakistan within 7-10 days.

আত্মসমর্পনের ঘণ্টাকয়েক আগে (দুপুর একটা) যে দুটো হেলিকপ্টার ঢাকা ছেড়েছে তার একটির পাইলট ছিলেন মেজর মাসুদ আনোয়ার । তার হিসেবে হেলিকপ্টার ৬টি। মাসুদের ভাষ্য : Out of total of six helicopters three MI8 Russian made helicopters and three Alloutte-III French helicopters stationed in Dacca, two Alloutte helicopters remained in Dacca on the morning of December 16. Other had flown across to Akyab in neighbouring Burma in the quiet hours of night 15/16 December 1971. We were fortunate that besides helicopters pilots and engineers, many women and children who could not leave Dacca earlier, were rescued from what could have been long drawn suffering for them.

বার্মায় তাদের আতিথেয়তার শুরুটা যে খুব দারুণ কিছু ছিলো না এটাও জানিয়েছেন তিনি : We thought we had destroyed everything possible that could have revealed our identity but once at Akyab in the custody of the Burmese Authorities we could not fully convince them …After a brief session of questioning, we were driven to where our colleagues had been housed. These were WWII vintage barracks located in a deserted corner of the town. We were made comfortable with two bed sheets and a wooden bed. It took some time to be acclimatized and adjusted to sleeping on wooden bed without mattress and pillow. Food was not to our taste. Although a few local Muslim families sent specially cooked food for us, but it did not help. The interesting part was the rotis which were cooked alongwith dozens of red ants (Soondis). We had to pick each one by one before eating.

একই সময় আরেকটি এল্যুট-থ্রি হেলিকপ্টারের পাইলট মেজর জারিফ বাঙ্গাশের হিসাবে সংখ্যাটা ৭! শুধু তাকে আর তৌহিদুল হককে একটি এল্যুটসহ নিয়াজীর প্রয়োজনে ঢাকায় রেখে দেওয়া হয়েছিল দাবি তার। আগের রাতে যে ৬টি হেলিকপ্টার বার্মার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেওয়ার কথা, তার মধ্যে মাসুদের এল্যুটটি স্টার্ট না দেওয়ায় রয়ে যায় বলে জানিয়েছেন তিনি : On 15 December, the Squadron Commander, Lt Col Liaqat Asrar Bukhari held a conference, and told the officers that he had been permitted/ordered by Eastern Command to evacuate all the serviceable aircraft that night to Akyab in Burma, along with the maximum number of women and children. However, one Allouette and its crew were to stay back at the disposal of General Niazi should he need it for any reason. Tauhid ul Haq and I, both of us bachelors, had been selected. …. there was no time to be wasted by delaying the departure so as to exit East Pakistani air space before dawn, so at about 3 a.m. on 16 December four Mi 8s and two Alouettes got airborne and were on their way south, of which I was informed by the ‘Killer’ radar still operating at Dacca. The PAF personnel manning the radar then destroyed it, and the F-86 jets at the airfield to avoid their falling into enemy hands. Next morning, to my surprise Major Saghir and Masood Anwar, who were supposed to have escaped with the other aircraft, came to the squadron command post, which I had been manning, and said that they had been unable to go because their Allouette would not start. রিফুয়েলিংয়ের সময় তার অভিজ্ঞতাটাও বেশ চমকপ্রদ। ফিল্টারবিহীন ফুয়েল ভরা হয়েছে। এমন সময় কিছু অদ্ভুত পোষাক পড়া উপজাতি তাদের ব্যাপারে আগ্রহী হয়ে ওঠে। তাদের দিকে সাবমেশিন গান তাক করে ফুয়েলিংয়ের কাজ চলতে থাকে। এরপর আর এল্যুট স্টার্ট হয় না। অনেকক্ষণ পরে সফল হন তারা। টারমাকের সব বিমান পাকিস্তানীরা ধ্বংস করে ফেলে এই দাবিও ঠিক নয়। নীচের ছবিটি তার প্রমাণ যা আত্মসমর্পণের পর মিত্র বাহিনীর হাতে পরে।

খোদ কমান্ডার লিয়াকত বোখারীর হিসেবটা আবার মাসুদ আনোয়ারের সঙ্গে মিলে যায়। তিনি জানিয়েছেন : At 0320 hours on 16 December, ‘71, I and Major Riaz ul Haq, along with Major Ali Khan took off in the first MI-8 Helicopter, followed by Major M. Akram and Major Jawahar in the second helicopter at 0325 hours. The cargo helicopters carried about 30 passengers each, against the 16 authorised with full internal fuel tanks. To take off from the Golf Course, surrounded by tall trees, in pitch dark without any lights, with a heavily loaded helicopter was very risky and hazardous. It was only the proficiency and determination of the 4 Aviation Squadron pilots that made it a success. Major Naoman Mahmood and Major P. C. Tierney took off at 0330 and 0335 hours respectively in their Alouette helicopter. Flying time from Dacca to Akyab in an Alouette helicopter was over three and half hours, whereas their safe endurance was much less. They had to carry extra fuel in jerry cans for their en route self-fuelling at some unknown place in the hostile area.
Major Tauhid ul Haq, Major Masud Anwar and Major Zareef took off from Dacca under the nose of the enemy at 1300 hours, when advance Indian elements had already entered Dacca Cantt. They had to fly at tree top level to avoid detection by the enemy fighters. Their landing in hostile area during daytime for refueling was very demanding. They landed safely at Akyab at 1630 hours, and joined the rest of the unit.

পাকিস্তানীদের এই বীরত্ব দেখানোর কাজটার অনুমোদন নিয়েও মতবিরোধ আছে। এয়ার কমোডর ইনামুল হক এই ব্যাপারে আপত্তি জানিয়েছিলেন বলে মত দিয়েছেন জেনারেল মতিনউদ্দিন : On 15 December Niazi sent a signal to Manekshaw accepting a conditional ceasefire in East Pakistan. Major Liaqat Asrar Bukhari, commanding 4 Army Aviation Squadron in East Pakistan to the General on that day that he was prepared to fly his team out in the hours of darkness to Burma if permitted to do so. Air Commodore Inamul Haq felt that on view of total air superiority enjoyed by the IAF that it would not be possible. Rear Admiral Sharif opined that Liaqat should be allowed to give it a try, as several helicopters would be prevented from falling into enemy hands. General Niazi agreed and ordered Liaqat to take Major General Rahim with him as he was wounded and that he had to send some important documents through him to Islamabad. He also informed Liaqat that some nurses would also be sent with him. অন্যদিকে মাসুদ এবং জারিফ দুজনই বলেছেন ইনামুল হক এ ব্যাপারে অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছেন। ১৬ ডিসেম্বরের দুঃসাহসী উড়ানে তিনিই তাদের উৎসাহ দিয়েছেন বলে মত দিয়েছেন তারা।

তবে এই দুঃসাহসী কীর্তি জানানোর সময় তারা উল্লেখ করেননি এই দীর্ঘ যাত্রায় (সর্বোচ্চ সাড়ে চার ঘণ্টা) আকাশপথে একটিও ভারতীয় বিমান কেনো তাদের চোখে পড়েনি। কারণটা জানিয়েছি আগেই। যুদ্ধবিরতি উপলক্ষ্যে এয়ার স্ট্রাইকের দায়িত্ব থেকে সব বিমান প্রত্যাহার করে নিয়েছিল ভারত। যদিও সমুদ্রে যুদ্ধজাহাজ আইএস বিক্রান্তের টহলের কথা বলেছেন তারা। কিন্তু নীচু দিয়ে উড়ে সেটার রাডার ডিটেকশন এড়ানোর চেয়ে শত্রু বিমানের মুখোমুখি হওয়ার সম্ভাবনাটাই বেশী স্নায়ুক্ষয়ী হওয়ার কথা ছিলো। সেই সম্ভাবনা একবারও উচ্চারিত হয়নি কারো মুখেই।

‘ভাগোরা’ রহিম :

আটজন নার্সের কথা এসেছে সবার বক্তব্যে যাদের নিয়ে যেতে নির্দেশ দিয়েছিলেন নিয়াজী। একদল বলেছেন তারা এমবুলেন্সে বসে ছিলেন, একদল বলেছেন তাদের হোস্টেল থেকে নিয়ে আসার সময় পাওয়া যায়নি। রাও ফরমান আলী জানাচ্ছেন এই নার্সদের বিনিময়েই উড়ানপাখীতে নিজের জায়গা করে নিয়েছিলেন কুখ্যাত জেনারেল এম রহিম খান। মিত্রবাহিনীর প্রবল আক্রমণের তোড়ে চাঁদপুরের ঘাটি ছেড়ে পালানোর সময় ভারতীয় বিমান আক্রমণে আহত হয়েছিলেন ৩৯তম ডিভিশনের এই কমান্ডার। গোটা পলায়ন অভিযানে তিনিই ছিলেন জেনারেল পদবীধারী- একজন শীর্ষ কর্মকর্তা। ১২ ডিসেম্বর রাতে আত্মসমর্পনের জন্য নিয়াজী এবং ফরমানকে জোরাজুরি করেন বলে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলা হয়। দেশে ফিরে কমান্ড ছেড়ে পালানোর ব্যাপারটি বেমালুম চেপে যান তিনি। ভুট্টো তাকে চীফ অব জেনারেল স্টাফ বানিয়ে দেন। হামুদুর রহমান তদন্ত কমিশনে এসব ঘটনা বেরিয়ে এলে তাকে অবসর দেওয়া হয়। আর সেনামহলে একইনামের অন্যদের থেকে আলাদা চেনাতে তার নাম হয় ‘ভাগোরা’ রহিম, মানে যে রহিম নিজের প্রাণ বাঁচাতে বাকিদের রেখে ভেগে গিয়েছিল।

টাকা পাচার!

প্রাণ বাঁচানোর এই অভিযাত্রায় একটু জায়গা পেতে কি পরিমান ধাক্কাধাক্কি হয়েছিল তার বর্ণনা আমরা জেনেছি। স্বাভাবিক ধারণক্ষমতার দ্বিগুন যাত্রী নিয়ে উড়েছিলো প্রতিটি হেলিকপ্টার। সাগরে গিয়ে অনেক কিছু ফেলে দেওয়া হয়েছে যার কথা বলেছেন পাইলটরা। এর বেশীরভাগই অস্ত্রশস্ত্র। রহিম খানকে দিয়ে ইসলামাবাদে কিছু জরুরী ডকুমেন্ট পাঠানোর কথা বলেছিলেন একজন। বেশ কিছু ডকুমেন্ট সাগরে ফেলা হয়েছে বলেছেন অন্যরা। বিচারপতি হামুদুর রহমানের তদন্ত কমিশনেস্বাক্ষীরা কয়েকজনের বিরুদ্ধে টাকা পাচারের অভিযোগ এনেছেন। ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের ৩৬ (এ) ডিভিশনের সাবেক জিওসি ও ইস্ট পাকিস্তান সিভিল আর্মড ফোর্সেসের কমান্ডার মেজর জেনারেল মোহাম্মদ জামশেদ খানের স্ত্রী ১৫ ডিসেম্বর রাতে হেলিকপ্টার যাত্রীদের একজন ছিলেন। ছিলেন তার কল. স্টাফ কর্ণেল রশীদ। দুজনের বিরুদ্ধেই মোটা অংকের টাকা বহনের অভিযোগ আনেন কর্নেল বশীর আহমেদ (স্বাক্ষী নং ২১৩)। লে জেনারেল নিয়াজী রাও ফরমান আলীর বিরুদ্ধে একই অভিযোগ আনেন। তিনি জানান হেলিকপ্টারের পাইলটদের একজন ফরমানের ভাগিনা যার মাধ্যমে তিনি ৬০ হাজার রুপি পাচার করেছেন। উল্লেখ্য জামশেদ, রশীদ ও ফরমান তিনজনই ডিসেম্বরের বুদ্ধিজীবি হত্যার পরিকল্পনার সঙ্গে জড়িত। দুজনে জবাবদিহিতায় এটাকা স্থানীয় ইনফরমারদের (আলবদর!) পেমেন্টের পর বেচেছিলো বলে জানিয়েছেন।

রিপোর্টে জামশেদের বিরুদ্ধে সম্পর্কে বলা হয় : Col. Bashir Ahmad Khan (Witness No. 263) who was posted as DDML, Eastern Command, stated before the Commission that the wife of Maj Gen Jamshed Khan had brought some currency with her while being evacuated from Dacca on the morning of 16th of December 1971. He further alleged that Lt. Col Rashid, Col. Staff o the East Pakistan Civil Armed Forces, commanded by Maj Gen Jamshed Khan, was also reported to have been involved in the mis-appropriation of currency. It further came to our notice that the General had distributed some money among persons who left East Pakistan by helicopters on the morning of 15th or 16th of December 1971.

An inquiry was made from Maj Gen Jamshed Khan in this behalf, and his reply is as under. : The total sum involved was Rs. 50,000 which I had ordered to be drawn from the currency that was being destroyed under Government instructions and the total amount was distributed by the officers detailed by me and strictly according to the instruction/rules and regulations to the Binaries and Bengalis, informers, and to the needy on night 15/16th December 1971. A secret fund was placed at my disposal by the Government of East Pakistan for the purpose of payment of rewards and purchase of information and in this case the expenditure was from the secret fund at my disposal. This fund was non-auditable. The money given to the needy families who were dispatched by helicopters on night 15th/16th December, 1971 was from the EPCAF Director General’s Fund. I was the sole authority to sanction from this fund and considering the circumstances under which this expenditure was made I had no intention to recommend recovery from persons concerned. From the above clarification it will be appreciated that there was no requirement to furnish details of the above expenditure to any accounts department.”

We regret we cannot regard the reply given by Maj. Gen Jasmhed as satisfactory. Even though the funds disbursed by him may not be auditable in ordinary circumstances, it would have been appropriate and advisable for him to supply such information as was possible for him to do in the circumstances once the question of the disposal of these funds had arisen on the basis of information supplied to the Commission by officers who heard of these transactions in East Pakistan and later in the prisoners of warcamps. We suggest, therefore, without necessarily implying any dereliction on the part of the general, that the matter should be enquired into further so that the suspicion surrounding the same is cleared in the General’s own interest.

ফরমান আলীর বিরুদ্ধে অভিযোগ ও তার জবাব সম্পর্কে রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে : 1An allegation was made before the Commission by Lt Gen Niazi that Maj Gen Farman Ali had sent out of East Pakistan a large sum of money, approximately Rs 60,000, through his nephew who was a Helicopter Pilot in the Army and left Dacca in the early hours of the 16th of December, 1971. We reported Major General Farman Ali to seek his explanation regarding this allegation and some other matters. He has explained that a sum of Rs 60,000/- had been given by the President of Pakistan to the Governor of East Pakistan for expenditure at his discretion. After the Governor of East Pakistan resigned on or about the 14th December 1971, Maj Gen Farman Ali, as Advisor to the Governor, became responsible for this amount. He paid Rs 4000 to Islamia Press, Dacca, and this payment was within the knowledge of the Military Secretary to the Governor, who has also been repatriated to Pakistan. Out of the remaining amount of Rs 56,000/-, Maj Gen Farman Ali paid Rs 5000/- to Maj Gen Rahim Khan at the time of his evacuation from Dacca on the morning of the 16th of December 1971 to meet the expenses en-route which may be required not only by Maj Gen Rahim Khan but also by the other persons who were being evacuated with him. It was stated Maj Gen Farman Ali that Maj Gen Rahim Khan had rendered the necessary account of the sum of Rs. 5000/- given to him.
After deducting payments made to the Islamia Press, Dacca, and to Maj Gen Rahim Khan an amount of rS 51,000/- WAS left with Maj Gen Farman Ali which he physically handed over to his nephew Major Ali Jawaher at the time of his departure from Dacca onj the 16th of December 1971. Since his arrival in Pakistan, Maj Gen Farman Ali has deposited Rs 46,000/- in the Government Treasury and handed over the treasury receipt to Brig. Qazi, Director Pay and Accounts, GHQ. He has claimed the remaining amount of Rs 5000/- on account of house rent allowance sanctioned by the Government of East Pakistan for the residence of his wife and family in West Pakistan. He has stated the sanctioned allowance was Rs 1400/- PM and the period involved was twelve months, so that he could claim Rs 15000/- but he has claimed only Rs 5000/-.

শেষকথা :

১৯৭২ সালের জানুয়ারির শুরুতে বার্মার আমন্ত্রণে পাকিস্তান বিমানবাহিনীর একদল পাইলট রেঙ্গুন যায়। সেখান থেকে ব্যাংকক হয়ে করাচিতে হেলিকপ্টারগুলো ফিরিয়ে আনা হয়। কপ্টারের সঠিক সংখ্যা জানা যায়নি। এর আগে যাত্রীরা সব অক্ষত দেহেই ফেরত যান দেশে। ফোর এভিয়েশনের সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব তারা পূর্ব পাকিস্তানের একমাত্র সেনা ইউনিট যারা আত্মসমর্পণ এড়িয়ে পালাতে পেরেছিল।

কৃতজ্ঞতা : জন্মযুদ্ধ ‘৭১ (পান্ডুলিপি)


তথ্যসূত্র :
 পাকিস্তান ডিফেন্স জার্নাল, পাকি ও ভারতীয় বিভিন্ন সামরিক ফোরাম

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *