তিনটি ঐতিহাসিক সাক্ষাৎকার

ভাষা সংগ্রাম বাঙালির আত্মপরিচয় এবং জাতি-রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রথম সোপান। ১৯৪৮ সালেই প্রথম রাষ্ট্রভাষার দাবিতে আন্দোলনের সূচনা। এই সূচনার অন্যতম প্রধান উদ্যোক্তা ও পথিকৃৎ ছিলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং তার সুযোগ্য সহকর্মী সৈয়দ নজরুল ইসলাম ও তাজউদ্দিন আহমদ। ভাষা আন্দোলন সম্পর্কে এই তিন নেতার সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেছিলেন ভাষা আন্দোলন নিয়ে বিশিষ্ট গবেষক বদরুদ্দিন উমর ১৯৬৯ সালে। সাক্ষাৎকারে এই তিন নেতার ছাত্রাবস্থায় ভাষা আন্দোলনকালে তাদের অভিজ্ঞতা, ভূমিকা ও স্মৃতিকথা লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। বর্তমান প্রজন্ম এবং পাঠকদের জানার জন্য এই ঐতিহাসিক সাক্ষাৎকার তিনটি আমরা হুবহু পুনঃমুদ্রণ করলাম।

25cশেখ মুজিবর রহমান
[পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্র লীগের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা এবং আওয়ামী মুসলিম লীগের যুগ্ম সম্পাদক]
সাক্ষাৎকার : ১৯.৯.১৯৬৯
দেশ ভাগের পর মুসলিম লীগের মধ্যে আমাদের তখন অত্যন্ত অসহায় অবস্থা। শহীদ সাহেব যে পার্লামেন্টারী পার্টির নির্বাচনে হেরে গেলেন তার পেছনে কেন্দ্রীয় হস্তক্ষেপ ছিলো। পাঞ্জাবে নোতুন নেতা নির্বাচনের কোন প্রয়োজন হয় নি। মামদোতই সেখানে নির্বাচন ছাড়া প্রধানমন্ত্রী থেকে গেলেন কিন্তু পূর্ব বাঙলার জন্য নোতুন নির্বাচন দেওয়া হলো। এর কারণ কেন্দ্র থেকে শহীদ সাহেবকে বাদ দেওয়ার ষড়যন্ত্র।
১৯৪৮ সালেই আমরা আর মুসলিম লীগ না করা স্থির করেছিলাম। কিন্তু সে চেষ্টা আমরা প্রথম পর্যায়ে মুসলিম লীগের মধ্যে থেকেই করতে চেয়েছিলাম। এর জন্যে ১৯৪৮ সালে ১১০/১২ জন পুরাতন কাউন্সিলারদের সই নিয়ে আকরাম খানের বিরুদ্ধে আমরা একটা রিকুইজিশন মিটিং আহ্বান করেছিলাম আকরাম খাঁন তখন কলতা বাজারে থাকতেন। আমি নিজে তাঁর বাড়ীতে গিয়ে সই শুদ্ধ মিটিং এর দরখাস্ত দিলাম এবং দরখাস্ত প্রাপ্তির একটা রশিদ তাঁর থেকে চাইলাম। তিনি যথারীতি আমাকে একটা রশিদ দিলেন।
এর পর দিনের আজাদে দেখলাম যে তিনি মুসলিম লীগ কাউন্সিলকেই সম্পূর্ণ বাতিল করে দিয়েছেন এবং আমরা যে ১১০/১২ জনের সই দিয়েছিলাম তাদের নাম কাগজে ছাপিয়ে তিনি ঘোষণা করেছেন যে আমরা কেউ আর মুসলিম লীগ কাউন্সিলের সদস্য নই।
এর পর নারায়ণগঞ্জে মুসলিম লীগ কর্মীদের সভা হয়। সেখানে রশিদ বই ইত্যাদি নিয়ে আলোচনা হয়।
১৯৪৮ এর ফেব্রুয়ারী (?) ৪ তারিখে আমরা পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্র লীগের অর্গানাইজিং কমিটি গঠন করি। তাতে নঈমুদ্দীন আহমদকে আহ্বায়ক মনোনীত করা হয়।
আমি ১১ই মার্চ সেক্রেটারিয়েটে আবদুল গনি রোডস্থ গেটের সামনে গ্রেফতার হই। তার পর আমরা ছাড়া পাই ১৫ই মার্চ সন্ধ্যায়। ছাড়া পাওয়ার পূর্বে জেল গেটে একটা গ-গোল হয়। শওকত প্রভৃতি দুই এক জনকে ছাড়তে জেল গেটের লোকে অসম্মত হয়। পরে আমরা তাদেরকে ছাড়া বের হবো না এ কথা বলায় সকলের জন্যেই রিলিজ অর্ডার আসে। রিলিজ অর্ডার মাত্র একটাই এসেছিলো। আমরা ছাড়া পাওয়ার পূর্বে জেল গেটে সেদিনই কমরুদ্দীন, আবুল কাসেম, নুরুল ইমলাম প্রভৃতি গিয়েছিলো আমাদের সাথে চুক্তির সর্তগুলো নিয়ে আলোচনা করতে। আমরা অনুমোদন করেছিলাম।
জেল থেকে আমাদেরকে ট্রাকের উপর শহরের বিভিন্ন এলাকা ঘুরিয়ে ফজলুল হক হলে নিয়ে যাওয়া হয় এবং সেখানে একটা সম্বর্ধনা সভাও অনুষ্ঠিত হয়।
১৬ তারিখে বিশ্ববিদ্যালয়ে সভার সময় কে সভাপতিত্ব করবে তাই নিয়ে একটা বিতর্ক হয়। কেউ আমার নাম, কেউ শামসুল হকের নাম কেউ বা আবার কমিটি অব অ্যাকশনের কারো কারো নাম প্রস্তাব করলো। কিন্তু সভা আরম্ভ করার পর নঈমুদ্দীন আমার নাম প্রস্তাব করে এবং তখন সেখানে কোন আপত্তি ওঠে না।
আমাদের সেখানে আলোচ্য বিষয় একটাই ছিলো। নাজিমুদ্দীন আট দফা চুক্তি অনুসারে বলেছিলেন নিজে তদন্ত করে দেখবেন। আমরা বললাম যে না সমস্ত ঘটনা public enquiry হতে হবে।
১৬ তারিখে মিটিং এর পর একটা মিছিল অ্যাসেম্বলীর দিকে যায়। কিন্তু কিছুক্ষণ শ্লোগান ইত্যাদি দেওয়ার পর সেখানে খুব বেশী ছাত্র আর উপস্থিত থাকে না। সন্ধ্যের দিকে যখন টিয়ার গ্যাস ছোঁড়ে তখন সেখানে ৪০/৫০ জনের বেশী ছাত্র উপস্থিত ছিলো না। বাকী যারা ছিলো তাদের অধিকাংশই অফিসের লোক।
MLA দের বিরুদ্ধেই মোটামুটিভাবে বিক্ষোভ হয়। তাদেরকে গালাগালি এবং অনেক ক্ষেত্রে মারধোর করা হয়। মোয়াজ্জেম ডাক্তার নামে বাগেরহাটের এক M. L. A. কে ধরে নিয়ে মুসলিম হলে ছাত্রেরা আটক করেছিলো। সেখানে গিয়ে আমি তাঁকে ছাড়াই। শওকত সেদিন সন্ধ্যা বেলায় বেশ আঘাত পায় পুলিশের হাতে। ১৬ তারিখের এই ঘটনার পর প্রথমে ফজলুল হক হলে এবং পরে বলিয়াদী হাউসে মিটিং হয়। দ্বিতীয় মিটিংটিতে কায়দে আজমের ঢাকা আসা উপলক্ষ্যে আন্দোলন স্থগিত রাখার ব্যবস্থা হয়। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে anti repression day করা হয়। আমি তার আহ্বায়ক ছিলাম। সে সময় স্ট্রাইক হয় এবং পরে ইউনিভারসিটি গ্রাউ-ে মিটিং হয়। এর পর বিশ্ববিদ্যালয় মিনিয়াল স্ট্রাইক শুরু হলো। ছাত্রেরাওsympathetic ধর্মঘট করলো। আমরা এ ব্যাপারে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের সাথে আলোচনা শুরু করলাম। তারা আমাদেরকে শেষ পর্যন্ত bluff দিলো। তারা বললো যে কর্মচারীরা ১১টার মধ্যে যোগদান করলে ধর্মঘট বন্ধ হবে এবং তাদের দাবী দাওয়া বিবেচনা করা হবে। অনেক ১১টার মধ্যে যোগ দিয়েছিলো, কিন্তু সকলের সাথে সময়মতো যোগাযোগ করতে না পারার জন্যে তারা তাদের যোগ দিতে দিলো না। কাজেই বস্তুতঃপক্ষে তারা সর্তের খেলাফ করলো। আমরা তখন ধর্মঘট অব্যাহত রাখার সিদ্ধান্ত নিলাম। এর পূর্বে অবশ্য আমরা কর্তৃপক্ষের সর্তের উপর বিশ্বাস করে ধর্মঘট প্রত্যাহার করেছিলেন। আমরা আবার ধর্মঘটের সিদ্ধান্ত নেওয়ায় কর্তৃপক্ষ বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করে দেন, সকলকে হোস্টেল ত্যাগ করতে নির্দেশ দেন। আমরা কিন্তু সেই নির্দেশ অমান্য করে হোস্টেল ত্যাগ না করার সিদ্ধান্ত নিই। এর পর দেখা গেলো যে রাত্রির অন্ধকারে ৬০% ছাত্র হল ত্যাগ করে চলে গেছে। সেই অবস্থায় আর হলে থাকার সিদ্ধান্ত রাখা গেলো না এবং আমরা সকলে হল ত্যাগ করলাম।
এর পর মোগলটুলীকে কেন্দ্র করে কর্মচারীদের জন্যে আমরা রিলিফ সংগঠন করতে থাকলাম। মুষ্টি ভিক্ষার মাধ্যমেই আমরা সেই কাজে নামলাম। কিন্তু অল্পকাল পরেই কর্মচারীরা অবশ্য একেবারে demoralised হয়ে গেলো। তাদের মধ্যে কেবলমাত্র একজন ছাড়া বাকী সকলে মাফ চেয়ে কাজে যোগ দিলো। একজনই শুধু চাকরী ছেড়ে অন্যত্র চলো গেলো।
১৭ই এপ্রিল ছিলো বিশ্ববিদ্যালয় খোলার তারিখ। সেই দিনের মধ্যেই ছাত্র নেতাদেরকেও মাফ চেয়ে নিতে বলা হলো। অন্যথায় তাদেরকে বহিষ্কার করা হবে বলে জানানো হলো। ছাত্র নেতাদের মধ্যে আবদুর রহমান চৌধুরী, নঈমুদ্দীন আহমদ, দেওয়ান মাহবুব আলী, আবদুল মতিন চৌধুরী প্রভৃতি ১৫/১৬ জন ব- দিয়ে দিলো। ছাত্র লীগের আহ্বায়ক নঈমুদ্দীন ব- দেওয়ায় আমরা খুব মুস্কিলে পড়লাম। সাধারণ কর্মীরা অবশ্য এদিক দিয়ে অটল ছিলো। আমরা এর পরই আবদুর রহমান চৌধুরী এবং নঈমুদ্দীনকে ছাত্র লীগ থেকে বহিষ্কার করে দিই। এই আন্দোলনের সময় জগন্নাথ কলেজ, মেডিকেল কলেজ, ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ থেকে ছাত্রেরা সক্রিয়ভাবে এগিয়ে এসেছিলো।
১৮ই এপ্রিল আমরা ভাইস-চ্যান্সেলারের বাড়ীতে অবস্থান ধর্মঘট শুরু করলাম। পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র লীগের একটা নোতুন কমিটি গঠন করা হলো। সেই কমিটির লোকজন নিয়ে আমরা V. C এর বাড়ীতে বসে থাকলাম। পুলিশ অফিসার পরে এক সময় দলবল নিয়ে আমাদেরকে ঘেরাও করে সেই স্থান ত্যাগের নির্দেশ দিলো কিছুক্ষণের মধ্যে। অনেকে চলে গেলেও আমরা ৮/১০ জন থাকলাম। তাজউদ্দীন সেই সময় প্রেস প্রতিনিধি সেজে অভিনয় করায় গ্রেফতার থেকে অব্যাহতি পায় কিন্তু আমরা কয়েকজন গ্রেফতার হয়ে যাই। যারা গ্রেফতার হই তাদের মধ্যে আমি ছাড়া ছিলো বরকত, হাসনাত, খোন্দকার গোলাম মোস্তফা, আজিজ আহমদ, খালেক নওয়াজ, কাজী গোলাম মাহবুব, বাহাউদ্দীন চৌধুরী, অলি আহাদ প্রভৃতি। এই ঘটনার ৫/৭ দিন পর আন্দোলন থেমে যায়। একুশ তারিখ আমার টাঙ্গাইল যাওয়ার কথা ছিলো কিন্তু গ্রেফতার হওয়ার জন্যে যেতে পারি নি। (শওকত ঃ- মুজিবকে আমি এই সময় বলেছিলাম টাঙ্গাইল যেতে। কিন্তু সে বললো বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে সেই সময় বাইরে যাওয়া তার পক্ষে সম্ভব নয়। সে ভাইস-চ্যান্সেলারের বাড়ী থেকেই গ্রেফতার হতে চায়।) এর পর আমি জুন মাসের শেষের দিকে ৎবষবধংবফ হই। আমি আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক হওয়ার পর দবিরুল ইসলামকে (তখনো জেলে) সভাপতি এবং খালেক নওয়াজ খানকে সম্পাদক করে ছাত্র লীগ আবার নোতুনভাবে গঠিত হয়।
অক্টোবর মাসে লিয়াকত আলীর বিরুদ্ধে বিক্ষোভের সময়….*

* শেখ মুজিবর রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎকার রিপোর্টের পরের অংশ শেষ পৃষ্ঠাটি হারিয়ে গেছে।Ñ ব. উ.

সৈয়দ নজরুল ইসলাম
[ছাত্র, সেলিমুল্লাহ মুসলিম হল]

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *