দুঃসহ সেই ভোরবেলা

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ভোরবেলার ঘটনাটি আজও আমার মানসপটে এক দুর্বিষহ ও ভয়ানক স্মৃতি হিসাবেই থেকে গেল । আমার জীবদ্দশায় এই দুঃসহ স্মৃতি আজীবন বহন করেই যেতে হবে।

২০০০ সালে আমার মা রওশন হাসিনা হাসি ফেব্রুয়ারি মাসের তিন তারিখ এই সুন্দর পৃথিবী থেকে বিদায় নেন। মা যতদিন বেঁচে ছিলেন ততদিন তাঁকে দেখেছি আগস্ট মাসটি এলেই তাঁর মাঝে এক অস্বাভাবিক অস্থিরতা বিরাজ করতো। এক অব্যক্ত যন্ত্রণা থেকে এই অস্বাভাবিক আচরণ দেখা দিত। না বলা এক রাশ কষ্ট। খুব কাছের কারো দুঃখে দুঃখিত এমন কিছু। আমার মা যদি আজ বেঁচে থাকতেন তবে ১৫ আগস্ট হত্যাকারীদের বিচার হয়েছে এটি দেখে যেতে পারলে তাঁর আত্মা যে কত শান্তিতে ঘুমাতে পারতো সেটি আর কেউ না জানলেও আমরা জানি।

আমার মা আওয়ামী লীগের জন্মলগ্ন থেকেই বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক সহচর। যশোরের মতো একটি মফস্বল শহরে তিনি দেশ ভাগের পর থেকেই বঙ্গবন্ধুর ডাকে যে কোন আন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকা পালনকারী। ১৯৪৮-এ দানা বেঁধে ওঠা ‘রাষ্ট্র ভাষা বাংলা চাই’ ১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলন, ১৯৬৬-এর ছয় দফা আন্দোলন, ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭১-এ মহান মুক্তিযুদ্ধ–দেখার বা অংশগ্রহণ করার সৌভাগ্য আমার হয়নি। কিন্তু ছেলে বেলা থেকেই মা’র কার্যক্রম দেখে ও তাঁর লেখা অসংখ্য চিরকুট ও ডাইরি পড়ে জেনেছি সেই সব অগ্নি ঝরা দিনের কিছু কিছু কথা, টুকরো টুকরো ইতিহাস ।

আজ সেই সব কিছুই নাই। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে স্বপরিবারে নৃশংসভাবে হত্যা করার পর তৎকালীন স্বৈরশাসকের (অবশ্যই স্বৈরশাসক, আজ তাঁর দল যতই গণতন্ত্রের ধব্জাধারী হোক না কেন ) পঙ্গপাল যখন আমার মা, ভাইদেরকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যায়, আমাদের বাড়ির সব আসবাবপত্র, বই খাতা পত্রসহ মহান মুক্তিযুদ্ধের সময়কালীন সব জরুরি কাগজপত্র তছনছ ধবংস করে দিয়ে যায়। সেই সময় আমরা বিশ্বের মহান নেতা কে ও তাঁর নিকট জনদের হারাবার পাশাপাশি অনেক কিছুই হারিয়ে ফেলি। মূল্যবান রাজনৈতিক দলিল। ঐতিহাসিক কাগজপত্র। আফসোস!

সেদিন সেই দানবদের মনে নারী – শিশু বা বৃদ্ধা বলে বিশেষ কোন সম্মান বা স্নেহ বোধ ছিল না । নইলে ‘শেখ মুজিবকে হত্যা করার নামে কেন বেগম মুজিবকে হত্যা করলো? কেন শেখ রাসেল কে হত্যা করলো? বাকিদের কথা, নাম সকলেরই জানা আছে । তাদের কেও বাদ দেয়া যায় না । সেই সব মানুষদের কথা বলতে গেলে যে কোন সাধারণ মানুষের চোখ স্বাভাবিক ভাবেই ঝাপসা হয়ে আসবেই ।

সেই সব দানবদের তান্ডব আচরণের আঁচ যে আমাদের কারো শরীরে এসে লাগেনি সেটি নয়। লেগেছিল বঙ্গবন্ধু ভক্ত ও অনুরাগী প্রতিটি বাঙালির শরীরে। সেই উত্তাপে আমার মা, ভাইদের যশোর ক্যান্টনমেন্টে বহু নির্যাতন সহ্য করতে হয়েছে। আমার এক ভাই মুক্তিযুদ্ধে গেরিলা যোদ্ধা ছিল এই অপরাধে তাঁকে এমন কোন নির্যাতন নাই যা সহ্য করতে হয়নি। এমনকি তাঁকে বাসায় এসে না পেয়ে আমার মতো একজন সাধারণ কন্যাশিশুকে (তখন আমার বয়স মাত্র সাত বছর) এই স্বৈরশাসকের দল চুলের মুঠি ধরে এত জোরে ঝাঁকুনি দেয় যে আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেলি । অজ্ঞান একটি কন্যা শিশুকে এত জোড়ে ছুঁড়ে ফেলে দেয় যে আমি আমাদের বাড়ির সীমানা পেরিয়ে পাশের জঙ্গলের ঝোপঝাড়ে গিয়ে পড়ি। রাতের অন্ধকারেই তো এই সব দানবদের তাণ্ডব শুরু হয়। একটি রাত আমরা নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পেরেছি বলে মনে পড়ে না ।

সেদিন সেই স্বৈরশাসকের মোসাহেব্দের মুখের উপরে আমার মা নাকি বলেছিল, তোমরা যারা বঙ্গবন্ধুর বুকে গুলি চালাও, যারা বেগম মুজিবের হাতের রান্না না খেলে তৃপ্তি পেতে না তাঁকে হত্যা কর, যারা রাসেলের মতো বাচ্চাকে হত্যা করতে দ্বিধা করো না তাদের কাছ থেকে আর যাই হোক ‘মানুষের আচরণ’ আশা করি না। যার খেসারত মাকে অনেক দিতে হয়েছিল। আমার দুই ভাই ছিল সরকারি চাকুরীজীবী। সুতরাং যত প্রকার পাশবিকতা করা যায় তৎকালীন স্বৈরশাসক সেটি করেছিল ।

বঙ্গবন্ধুর আদর্শের সাথে একমত ছিলেন বলেই আমার মা সরকারি চাকরি ছেড়ে সরাসরি রাজনীতি, সমাজকর্ম, সাংস্কৃতিক অঙ্গনে মন প্রান ঢেলে দিয়ে কাজ শুরু করেন। মায়ের সঙ্গ খুব বেশি আমরা পাইনি। মা সব সময় খুব ব্যস্তই থাকতেন । কিন্তু যেটুকুই পেতাম সেই সময় তাঁর মুখে কেবলই দেশের কথা, জাতির ভবিষ্যত, বঙ্গবন্ধুর কথা, তাঁর সাদামাটা পরিবারের সদস্যদের কথা শুনেই আমাদের সময় চলে যেত । মা সব সময় বলতেন, ভাবীর ( বেগম মুজিবের কথা ) মতো স্ত্রী না থাকলে বঙ্গবন্ধু এইভাবে রাজনীতি করতে পারতেন না । আমরা বিশেষত আমি খুব বিস্মিত হতাম – কেন ?

আজ বুঝি কেন সেদিনের ঘাতকরা বেগম মুজিবকে বাঁচিয়ে রাখেনি । শিশু রাসেলকে ছাড় দেয়নি। অন্যদের কথা বলাই বাহুল্য ।

আমার মায়ের চিরাচরিত অভ্যাস ভোর বেলা উঠেই রেডিও ছেড়ে দিয়ে চা বানানো আর তারপর আমাদেরকে ডেকে তোলা । আমরা অনেক ভাই বোন । কিন্তু সেইদিন ভোর বেলা আমাদের কাউকেই ডাকতে হয়নি । মায়ের এক আর্তচিৎকার আমাদের কানে এসেছিল । আমাদের বাড়ির ডিজাইনটা ছিল অনেকটা ইংলিশ লেটার ‘আই’ প্যাটার্নের ঘরগুলো জুড়ে টানা বারান্দা আর মাঝে সেমিপাকা উঠানের পরে চমৎকার বড় কক্ষের রান্না ঘর তার পাশেই ভাঁড়ার ঘর যাকে আমরা এখন বলি স্টোর রুম। মার চিৎকারে ঘুম ভাংলেও আমরা ছোট তিন ভাই বোন বুঝে উঠতে পারছিলাম না মা কেন এমন চিৎকার করলো বা কেন মা আর কথা বলছে না। আসলে আমরা ছোট তিনভাই বোন তখনো বুঝতে পারিনি দেশ আজ এক ঘোরতর অমানিশায় ডুবে গেল!

একদিকে আমার অন্য ভাই বোনেরা মার জ্ঞান ফেরাতে ব্যস্ত অন্যদিকে রেডিওর নব ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে সেই ভয়াবহ সংবাদ যা আমাদের সবার কাছে ছিল অবিশ্বাস্য সেই সংবাদটি শুনতে ব্যস্ত। আসলে কেউই আমরা বিশ্বাস করতে পারছিলাম না, বর্বর পাকিস্তানি বাহিনী যার কিছুই করতে পারেনি তাকেই তাঁর সোনার বাংলার কোন মানুষ নৃশংসভাবে হত্যা করতে পারে! তবে আমার দুঃখ বোধ একটিই, আমার মা দেখে যেতে পারলেন না বঙ্গবন্ধু ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের হত্যাকারীদের ফাঁসির রায় কার্যকর হয়েছে। তবে আমি নিশ্চিত তাঁর বিদেহী আত্মা জেনেছে সবই। ১৯৯৬ সালে আমার প্যারালাইজড মা তাঁর ছোট মেয়ের জামাইর কোলে চড়ে শেখ হাসিনাকে ভোট দেবার সময় দৃঢ় উচ্চারণ করেছিলেন, শেখ হাসিনাকে ক্ষমতায় আনতেই হবে নইলে এই দেশে বঙ্গবন্ধু হত্যা সহ জাতীয় চার নেতা হত্যা মামলার বিচার হবে না। বিচার হবে না কর্নেল তাহের, সাফায়াত জামিল, খালেদ মোশারফসহ অসংখ্য মুক্তিযোদ্ধা হত্যার, বুদ্ধিজীবী হত্যার। মা দেখে গিয়েছেন ‘বঙ্গবন্ধু কন্যা ক্ষমতায়’। আত্মার তৃপ্তি এখানেই।

আমরা জানলাম, আমরা শুনলাম-একজন কাপুরুষ মেজর ডালিম অনর্গল ইতিহাসের সবচেয়ে নৃশংস, ভয়াবহ এবং অমানবিক সংবাদটি একটি বিকৃত কণ্ঠস্বরে বারংবার পাঠ করে যাচ্ছে ।

১৯৭৫-এর ১৫ আগস্টে এর সেই বিকৃত কণ্ঠস্বর আমি আজো ভুলিনি। আজো প্রতিটি বাঙালি, প্রতিটি মানুষ বঙ্গবন্ধু ও তাঁর পরিবারের খুনীদেরকে আত্মীয় পরিচয় দিতেও সামাজিকভাবে লজ্জা পায়, দ্বিধাবোধ করে–এর চাইতে বড় সাজা আর কী হতে পারে?

বাংলাদেশের প্রচলিত আইনে সাজা হয়েছে বঙ্গবন্ধু ও তাঁর পরিবারের খুনীদের। এখানেই গণতান্ত্রিক মানসিকতার পরিচয় দিয়েছেন শেখ হাসিনা। তবে এই সব জানোয়ারদেরকে প্রকাশ্যে বধ করার নির্দেশ দিলেও খুবই কম হয়ে যেত সেই সাজা। আমি এই নৃশংস হত্যা মামলা চলাকালীন সময় এ বহুবার বলেছি, লিখেছি এই সব খুনীদের কেবল বঙ্গবন্ধু ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের হত্যা মামলায় বিচার হবে না এদের বিচার করতে হবে প্রতি পদে পদে । বয়ষ্ক নারী হত্যা, গর্ভবতী নারী হত্যা, নববধু হত্যা, শিশু হত্যা, রাষ্ট্র নায়ক হত্যা, সরকারি কর্মচারী হত্যা, সেনা সদস্য হত্যা সর্বোপরি জাতির জনককে হত্যা। এইভাবে এক একজন খুনীকে শতবার ফাঁসি দেয়া দরকার। ইতিহাসের পাতায় যেন লেখা হয়ে থাকে এই সব কুলাঙ্গারদের ঘৃণিত নাম অতি ঘৃণা ভরে ।

এই বিশ্ব যতদিন ধ্বংস না হচ্ছে আর বাংলাদেশ যতদিন আবার সমুদ্র গর্ভে বিলিন না হচ্ছে ততদিন প্রতিটি বাঙালি অতীব ঘৃণার সাথে উচ্চারণ করবে ১৫ আগস্টের খুনীদের নাম। এই নৃশংস খুনের সাথে যে বা যারাই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত ছিল তাদের ও নাম পরিচয়। দিনে দিনে এই খুনীদের প্রতি বাঙালির ঘৃণা তীব্র বেগে ছুটে যাচ্ছে এবং আরো যাবে। এই দুর্দমনীয় ঘৃণা ছুটে যাচ্ছে সেখানে-যেখানে এই খুনীদের বিকৃত শব শায়িত আছে। ইতিহাস কাউকে ক্ষমা করে না। দেহত্যাগ মানে অন্তর থেকে মুছে ফেলা নয়।

লেখক দিলরুবা সরমিন: আইনজীবী ও মানবাধিকার কর্মী।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *