‘নতুন প্রজন্ম-নয়া দিশা’ বাংলাদেশ ভারত ৬৫ দফা যৌথ ঘোষণা

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফর শেষে উভয় দেশ ‘নতুন প্রজন্ম-নয়া দিশা’ শিরোনামে ৬৫ দফা যৌথ ঘোষণা প্রকাশ করেছে।

৬৫ দফা যৌথ ঘোষণা
১.    প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আমন্ত্রণে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ৬ থেকে ৭ জুন বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় সফর করেন।
২.    সফরকালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের সাথে সাক্ষাৎ করেন।
৩.     বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধাদের স্মৃতি ও অবদানের প্রতি সম্মান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সাভারে জাতীয় স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। ঢাকায় বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানান তিনি।
৪.     পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও গত ৬ জুন ১৯৭৪ সালের স্থল সীমান্ত চুক্তি ও ২০১১ সালের প্রটোকল অনুসমর্থনের দলিল বিনিময়ের ঐতিহাসিক অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে যোগ দেন। ওই তিন নেতা যৌথভাবে পতাকা উড়িয়ে বাংলাদেশি ও ভারতীয় শহরগুলোর মধ্যে দুটি বাসসেবা উদ্বোধন করেন।
৫.     প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারি বাজপেয়ির পক্ষে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছ থেকে ‘বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ সম্মাননা’ গ্রহণ করেন।
৬.     প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ৭ জুন ঢাকেশ্বরী মন্দির ও রামকৃষ্ণ মিশন পরিদর্শন করেন এবং বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে সুধী সমাবেশে বক্তব্য দেন।
৭.     প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি গত ৬ জুন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে একান্ত ও প্রতিনিধি দল পর্যায়ে বৈঠক করেন। উভয় বৈঠকেই দুই দেশের চমৎকার ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের প্রতিফলন ঘটে।
৮.    আলোচনার সময় উভয় প্রধানমন্ত্রী অভিন্ন ইতিহাস, ঐতিহ্য ও প্রত্যাশিত বন্ধনের কথা স্মরণ করেন এবং সম্পর্ক নতুন মাত্রায় উন্নীত হয়েছে বলে উপলব্ধি করেন।
৯.     নরেন্দ্র মোদি বঙ্গবন্ধুর দূরদর্শী নেতৃত্ব এবং শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশে আর্থ-সামাজিক অগ্রগতির প্রশংসা করেন। কানেকটিভিটি (সংযোগ) ও উপ-আঞ্চলিক সহযোগিতা খাতে শেখ হাসিনার সমর্থনের জন্য তিনি ধন্যবাদ জানান।
১০.    শেখ হাসিনা বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশ ভারতে নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বের প্রশংসা করেন এবং মোদির নেতৃত্বে বাংলাদেশের সাথে সম্পর্ক আরও জোরদারের আশা করেন।
১১.     উভয় প্রধানমন্ত্রী মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহ্য ও স্মৃতি সংরক্ষণে গুরুত্বারোপ করেন। সফরের সময় মোদি ১৯৭২ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি কলকাতায় বঙ্গবন্ধুর ভাষণের অডিও সিডি শেখ হাসিনাকে হস্তান্তর করেন।
১২.     উভয় প্রধানমন্ত্রী স্থল সীমান্ত চুক্তি বাস্তবায়নে ভারতের সংবিধানের ১০০তম সংশোধনী পাস হওয়ায় সন্তোষ প্রকাশ করেন। দ্রুত ওই চুক্তি বাস্তবায়নে তারা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নির্দেশনা দেন।
১৩.     উভয় প্রধানমন্ত্রী ২০১১ সালের ‘উন্নয়নের জন্য সহযোগিতার কাঠামো চুক্তি’র আওতায় আগামী দিনগুলোর সহযোগিতার ওপর জোর দেন।
১৪.     উভয় প্রধানমন্ত্রী দুই দেশের মধ্যে উচ্চ পর্যায়ে চলমান সফর বিনিময়ে সন্তোষ প্রকাশ করেন।
১৫.     উভয় প্রধানমন্ত্রী গত সেপ্টেম্বর মাসে নয়াদিল্লিতে দুই দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ে যৌথ পরামর্শক কমিশনের তৃতীয় বৈঠকে সন্তোষ প্রকাশ করেন। চলতি বছর ঢাকায় চতুর্থ বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে।
১৬.     উভয় প্রধানমন্ত্রী দুই দেশের মধ্যে নিরাপত্তা খাতে অতুলনীয় সহযোগিতায় সন্তোষ প্রকাশ করেন এবং সব ধরনের সন্ত্রাস ও উগ্রবাদের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের ছাড় না দেওয়ার অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেন। সন্ত্রাসবাদে যুক্ত গোষ্ঠী ও ব্যক্তিদের সম্পর্কে তথ্য বিনিময়ের বিষয়েও তারা অঙ্গীকার করেন।
১৭.     উভয় প্রধানমন্ত্রী সীমান্তে অপরাধ মোকাবিলায় যৌথ সীমান্ত ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনার (সিবিএমপি) কার্যকর বাস্তবায়নের ওপর জোর দেন। সীমান্তকে অপরাধমুক্ত করার ব্যাপারে তারা সম্মত হন। সীমান্তে মৃত্যুর সংখ্যা অবশ্যই শূন্যে নামিয়ে আনার কথা পুনর্ব্যক্ত করে তারা এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশনা দেন। উভয় প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশ সীমান্তরক্ষী বাহিনীর চৌকি নির্মাণ ও ব্যবস্থাপনায় ভারতের সীমান্ত সড়ক ব্যবহার ও দুর্গম সীমান্ত এলাকাগুলোতে বাংলাদেশি সীমান্ত রক্ষীদের প্রয়োজনে ভারতে চিকিৎসাসেবা নেওয়ার ‘স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউরস (এসওইপি)’ চূড়ান্ত হওয়ায় সন্তোষ প্রকাশ করেন।
১৮.     পদ্মা নদীর ওপর যৌথভাবে গঙ্গা ব্যারাজ নির্মাণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতের সহযোগিতা চাইলে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সংশ্লিষ্ট ভারতীয় কর্তৃপক্ষগুলোর দ্বারা বিষয়টি পরীক্ষা-নিরীক্ষার আশ্বাস দেন।
১৯.     প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তিস্তা নদীর পানিবণ্টন চুক্তি অনতিবিলম্বে স্বাক্ষরের জন্য অনুরোধ জানালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী বলেন, তিস্তা ও ফেনী নদীর পানিবণ্টন চুক্তির লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট সবার সাথে আলোচনা চলছে। দ্রুত পানিবণ্টন চুক্তি স্বাক্ষরের জন্য মনু, মুহুরি, খোয়াই, গোমতী, ধরলা ও দুধকুমার নদীর পানিবণ্টন নিয়ে যৌথ নদী কমিশনের কারিগরি পর্যায়ে আলোচনা চলছেÑ এমনটি উভয় প্রধানমন্ত্রী আমলে নিয়েছেন।
২০.     অববাহিকা ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে অভিন্ন নদীর পানিবণ্টনসহ পানিসম্পদ ইস্যু সমাধানে উভয় প্রধানমন্ত্রী অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন।
২১.     হিমালয় অঞ্চলের আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্পের বিষয়ে বাংলাদেশের জন্য ক্ষতিকর কোনো সিদ্ধান্ত এককভাবে না নেওয়ার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ভারতের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন। ভারতে সাংবিধানিক কারণে টিপাইমুখ প্রকল্পের কাজ এখন এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না বলে তিনি জানান। মোদি বলেন, ভারত এককভাবে এমন কোনো সিদ্ধান্ত নেবে না যাতে বাংলাদেশে বিরূপ প্রভাব পড়ে।
২২.     দুই দেশের পারস্পরিক স্বার্থে পানিসম্পদ বিষয়ে সব ইস্যু দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য যৌথ নদী কমিশনের মন্ত্রিপর্যায়ের ৩৮তম বৈঠক অনুষ্ঠানের ওপর উভয় প্রধানমন্ত্রী জোর দেন।
২৩.    উভয় প্রধানমন্ত্রী বিদ্যুৎ খাতে সহযোগিতায় সন্তোষ প্রকাশ করেন এবং সহযোগিতা আরও জোরদারে সম্মত হন। ২০২১ সালের মধ্যে ২৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা অর্জনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার লক্ষ্যের প্রশংসা করেন নরেন্দ্র মোদি। এ লক্ষ্য পূরণে ভারত বৃহৎ অংশীদার হতে পারে বলে তিনি জানান। নরেন্দ্র মোদি বাংলাদেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন, সঞ্চালন ও বিতরণ খাতে ভারতীয় কোম্পানিগুলোর প্রবেশাধিকার দিতে শেখ হাসিনাকে অনুরোধ জানান।
উভয় প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশে ভারত থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহ দ্রুত ৩০ থেকে ৫০ মেগাওয়াট বাড়িয়ে ৫০০ মেগাওয়াটে উন্নীত করার উদ্যোগের প্রশংসা করেন। ভেড়ামারা-বহরমপুর বিদ্যুৎ গ্রিডের মাধ্যমে বিদ্যুৎ সরবরাহ ৫০০ মেগাওয়াট থেকে বাড়িয়ে ১০০০ মেগাওয়াটে উন্নীত করার উদ্যোগকে স্বাগত জানান তারা। ভারতের পালাটানা থেকে বাংলাদেশে ১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাঠানোর কাজ দ্রুত সম্পন্ন করার জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নির্দেশনা দেন।
২৪.    উভয় পক্ষ ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল থেকে বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে ভারতের মুজাফফরনগর পর্যন্ত ৭০০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ লাইন নির্মাণে ঐকমত্যকে স্বাগত জানায়। সেখান থেকে বাংলাদেশকে পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ সরবরাহের অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে মোদি নীতিগতভাবে সম্মতি জানান। বাগেরহাটের রামপালে ১৩২০ মেগাওয়াট কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনকেন্দ্র নির্মাণের অগ্রগতিতে উভয় পক্ষ সন্তোষ প্রকাশ করে।
২৫.     বাংলাদেশ, ভুটান, ভারত ও নেপাল (বিবিআইএন) কাঠামোর আওতায় বাংলাদেশের বিদ্যুৎ আমদানির    আগ্রহের বিষয়টি ভারত ইতিবাচকভাবে বিবেচনায় রাজি হয়েছে।
২৬.     নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ ও পারমাণবিক বিদ্যুৎ খাতে সহযোগিতা আরও জোরদারে উভয় প্রধানমন্ত্রী সম্মত হয়েছেন।
২৭.    উভয় প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশ-ভারত বার্ষিক জ্বালানি সংলাপ অনুষ্ঠানের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
২৮.     ভারতের শিলিগুড়ি থেকে বাংলাদেশের পার্বতীপুরে হাই স্পিড ডিজেল সরবরাহের বিষয়ে একটি সমঝোতা স্মারক ও ক্রয়-বিক্রয় চুক্তিকে উভয় প্রধানমন্ত্রী স্বাগত জানান।
২৯.     দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য চুক্তিকে উভয় প্রধানমন্ত্রী স্বাগত জানান। তারা উভয়েই বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর ওপর গুরুত্ব দেন।
৩০.     উভয় প্রধানমন্ত্রী দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য জোরদারে পণ্যের মান বিষয়ে চুক্তি ও সার্টিফিকেটের স্বীকৃতি দেওয়ার ওপর জোর দেন। দুই দেশের মাননিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সহযোগিতা চুক্তিকে তারা স্বাগত জানান।
৩১.     উভয় প্রধানমন্ত্রী স্থলসীমান্ত ও সমন্বিত চেকপোস্টগুলো দ্রুত আধুনিকায়নের ওপর জোর দেন। বাংলাবান্ধার ওপারে ফুলবাড়ীতে অভিবাসনসেবা চালুতে তারা সন্তোষ প্রকাশ করেন।
৩২.     তারা আরও সীমান্ত হাট খোলার ওপর জোর দেন।
৩৩.     মংলা ও ভেড়ামারায় ভারতের বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠাকে তারা স্বাগত জানান।
৩৪.     প্রটোকল অন ইনল্যান্ড ওয়াটার ট্রানজিট অ্যান্ড ট্রেড (পিআইডাব্লিউটিটি) নবায়ন, উপকূলীয় জাহাজ চলাচল চুক্তিকে তারা স্বাগত জানান।
৩৫.     সম্মিলিতভাবে জুট স্টাডি গ্রুপের উত্তরাধিকারী প্রতিষ্ঠান দ্রুত সৃষ্টির ব্যাপারে তারা সম্মত হন। সুতা আমদানিতে বাংলাদেশের কোনো সমস্যা হবে না বলে ভারত আশ্বাস দেয়।
৩৬.     মানুষে-মানুষে যোগাযোগ ও আঞ্চলিক অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিশ্চিত করতে বিভিন্ন ধরনের যোগাযোগের ওপর তারা জোর দেন।
৩৭.     ঢাকা-শিলং-গুয়াহাটি এবং কলকাতা-ঢাকা-আগরতলা বাসসেবা চালুকে উভয় প্রধানমন্ত্রী স্বাগত জানান। বাংলাদেশ খুলনা-কলকাতা এবং যশোর-কলকাতা বাসসেবা চালুর প্রস্তাব দিলে এ নিয়ে আলোচনা করে চালু করা যেতে পারে বলে ভারত সম্মতি দিয়েছে। ফেনী নদীর ওপর রামগর-সাবরুম সেতু নির্মাণ প্রস্তাবের অগ্রগতি তারা পর্যালোচনা করেন।
৩৮.     কলকাতা ও খুলনার মধ্যে দ্বিতীয় মৈত্রী এক্সপ্রেস ট্রেন চালু করতে বাংলাদেশের প্রস্তাব বিবেচনায় রাজি হয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। মৈত্রী এক্সপ্রেস ট্রেনের জন্য আরও যাত্রীবান্ধব কাস্টম ও অভিবাসন ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়টি পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য উভয় প্রধানমন্ত্রী সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নির্দেশনা দেন।
৩৯.     ৮০ কোটি মার্কিন ডলার ঋণ ও ২০ কোটি মার্কিন ডলার মঞ্জুরির অর্থ ব্যবহারে উভয় প্রধানমন্ত্রী সন্তোষ প্রকাশ করেছেন।
৪০.     প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রকল্পের জন্য ২০০ কোটি মার্কিন ডলার নতুন ঋণ দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন।
৪১.     উভয় প্রধানমন্ত্রী বিবিআইএনের আওতায় বিদ্যুৎ, পানিসম্পদ, বাণিজ্য, ট্রানজিট ও কানেক্টিভিটি খাতে সহযোগিতার সুযোগ কাজে লাগাতে সম্মত হয়েছেন।
৪২.     নতুন নতুন খাতে সহযোগিতার গুরুত্বের কথা উভয় প্রধানমন্ত্রী স্বীকার করেন।
৪৩.     প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতের উদ্যোগে সার্ক স্যাটেলাইট প্রকল্পের প্রশংসা করে ২০১৭ সাল নাগাদ প্রথম বাংলাদেশি স্যাটেলাইট ‘বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১’ উৎক্ষেপণের পরিকল্পনার কথা জানান।
৪৪.     সমুদ্রসীমার বন্ধুত্বপূর্ণ সমাধানে উভয় প্রধানমন্ত্রী সন্তোষ প্রকাশ করে বঙ্গোপসাগরে সাগরভিত্তিক অর্থনীতি ও সহযোগিতায় সম্মত হন।
৪৫.    উভয় প্রধানমন্ত্রী জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার বিষয়ে সম্মত হন।
৪৬.     ৫ কোটি রুপি মঞ্জুরি সহায়তায় ইন্ডিয়া এনডোমেন্ট ফর ক্লাইমেট চেঞ্জের আওতায় বাংলাদেশে ৭০ হাজার উন্নত কুক স্টোভ স্থাপনে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরকে উভয় প্রধানমন্ত্রী স্বাগত জানান।
৪৭.     বাংলাদেশের অফ গ্রিড গ্রামগুলোতে সৌরবিদ্যুৎ চালুর একটি প্রকল্প নেওয়ার ঘোষণা দেন প্রধানমন্ত্রী মোদি।
৪৮.    শিক্ষা খাতে পারস্পরিক সহযোগিতা জোরদারের অঙ্গীকার করেন উভয় প্রধানমন্ত্রী।
৪৯.     প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রাজশাহী, সিলেট, খুলনা ও নরসিংদী শহরের ক্ষুদ্র উন্নয়ন প্রকল্পে ভারতের সহযোগিতার প্রশংসা করেন।
৫০.     আইটেক কর্মসূচির মাধ্যমে বাংলাদেশিদের সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য প্রধানমন্ত্রী ভারতকে ধন্যবাদ জানান।
৫১.     সাংস্কৃতিক বিনিময় কর্মসূচিতে সন্তোষ প্রকাশ করে উভয় প্রধানমন্ত্রী একে আরও বৃদ্ধিতে সম্মত হয়েছেন।
৫২.     মানুষে-মানুষে যোগাযোগ বাড়াতে বিটিভি ও দূরদর্শনের মধ্যে চুক্তির বিষয়ে উভয় পক্ষ রাজি হয়েছে।
৫৩.    গুয়াহাটিতে বাংলাদেশের উপ-হাইকমিশন এবং আগরতলায় সহকারী হাইকমিশন খোলার অনুমতি দেওয়ায় শেখ হাসিনা ভারতের এবং ভারতকে খুলনা ও সিলেটে সহকারী হাইকমিশন খোলার অনুমতি দেওয়ায় মোদি বাংলাদেশের প্রশংসা করেন।
৫৪.     ত্রিপুরায় ২৫ হাজার টন খাদ্যশস্য বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে পরিবহনের অনুমতি দেওয়ার প্রশংসা করেছেন মোদি।
৫৫.     ইয়েমেন থেকে বাংলাদেশিদের ফিরিয়ে আনতে ভারতের সহযোগিতার প্রশংসা করেছেন শেখ হাসিনা।
৫৬.     উভয় প্রধানমন্ত্রী আঞ্চলিক সহযোগিতা জোরদারের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন।
৫৭.     উভয় প্রধানমন্ত্রী উপ-আঞ্চলিক/আঞ্চলিক সহযোগিতা জোরদারে নেওয়া উদ্যোগগুলো পর্যালোচনা করেছেন।
৫৮.     বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা, জাতিসংঘসহ বিভিন্ন ফোরামে উভয় দেশ একসাথে কাজ করবে। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ সংস্কার ও ভারতের স্থায়ী সদস্য হওয়ার প্রস্তাবকে সমর্থন করবে বাংলাদেশ।
৫৯.     বহুপক্ষীয় আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো সংস্কার, জোরদার এবং এক্ষেত্রে অংশগ্রহণ ও সোচ্চার হওয়ার বিষয়ে উভয় প্রধানমন্ত্রী গুরুত্বারোপ করেছেন।
৬০.     উভয় দেশ ২২টি চুক্তি, সমঝোতা স্মারক ও দলিল স্বাক্ষর এবং বিনিময় করেছে।
৬১.     উভয় প্রধানমন্ত্রী ৯টি প্রকল্প উদ্বোধন, ফলক উন্মোচন বা চালু করেছেন।
৬২.     প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি শেখ হাসিনাকে কলকাতায় ১৯৭২ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি বঙ্গবন্ধুর ভাষণের সিডিসহ মোট ৫টি স্মারক ও উপহার হস্তান্তর করেছেন।
৬৩.     প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের ছবিসহ ৩টি ছবি ও মানচিত্র উপহার দিয়েছেন।
৬৪.     উষ্ণ ও আন্তরিক আতিথেয়তার জন্য নরেন্দ্র মোদি শেখ হাসিনাকে ধন্যবাদ জানান।
৬৫.     প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ভারত সফরের আমন্ত্রণ জানান এবং শেখ হাসিনা তা গ্রহণ করেন।

১৯ চুক্তি, প্রটোকল ও সমঝোতা স্মারক সই
স্থল সীমান্ত চুক্তির দলিল বিনিময়
দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য, উপকূলীয় জাহাজ চলাচল ও দুই রুটে বাস চলাচলের বিষয়ে ৪টি চুক্তিসহ বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে মোট ১৯টি চুক্তি, প্রটোকল ও সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে। গত ৬ জুন সকালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ঢাকায় আসার পর বিকেলে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে শেখ হাসিনার উপস্থিতিতে এসব চুক্তি সই হয়। এ সময় পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও উপস্থিত ছিলেন। এর আগে সেখানে দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে ঐতিহাসিক স্থল সীমানা নির্ধারণ-সংক্রান্ত চুক্তির অনুসমর্থনের দলিল বিনিময় হয়।
দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে স্বাক্ষরিত চুক্তি, প্রটোকল ও সমঝোতা স্মারকের মধ্যে রয়েছেÑ দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য চুক্তি, অভ্যন্তরীণ নৌ-প্রটোকল, উপকূলীয় নৌ-চলাচল চুক্তি, পণ্যের মান স্ট্যান্ডার্ডাইজেশন সংক্রান্ত সহযোগিতা চুক্তি এবং সাংস্কৃতিক বিনিময় সহযোগিতা চুক্তি। এ ছাড়াও উভয় দেশের উপকূলীয় অঞ্চলের নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত বাহিনীর (কোস্টগার্ড) মধ্যে সহযোগিতা, মানবপাচার প্রতিরোধ, জালনোট পাচার প্রতিরোধ, সমুদ্রভিত্তিক ব্লু-ইকোনমির ক্ষেত্রে সহযোগিতা সংক্রান্ত সমঝোতা স্মারক, ২০০ কোটি ডলারের ঋণবিষয়ক সমঝোতা, বঙ্গোপসাগর ও ভারত মহাসাগরে সামুদ্রিক অর্থনীতির সহযোগিতা বিষয়ক সমঝোতা, চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দর ব্যবহার বিষয়ক সমঝোতা, আখাউড়ায় ইন্টারনেটের আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথ লিজ বিষয়ে বিএসএনএল ও বিএসসিসিএলের মধ্যে সমঝোতা চুক্তি, বাংলাদেশে লাইফ ইন্স্যুরেন্স করপোরেশনের (এলআইসি) কার্যক্রম শুরু নিয়ে সম্মতিপত্র। ভেড়ামারা ও মংলায় ভারতীয় বিনিয়োগকারীদের জন্য বিশেষ অঞ্চল প্রতিষ্ঠা বিষয়ক সমঝোতা চুক্তিও সই হয়।
এ ছাড়া দুই প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে কয়েকটি কার্যক্রমের উদ্বোধন করা হয়। এগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে কলকাতা-আগরতলা বাস সার্ভিস ও ঢাকা-শিলং-গৌহাটি বাস সার্ভিস। এ ছাড়া খুলনা-মংলা রেলওয়ে লাইন এবং কুলাউড়া-শাহবাজপুর রেল সংযোগ পুনর্বহাল, শিলাইদহের কুঠিবাড়িতে রবীন্দ্রভবন, সারদা পুলিশ একাডেমিতে একটি মৈত্রী ভবন, ফেনী নদীর ওপর সেতু নির্মাণ প্রকল্প, বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশনের একটি পরীক্ষাগার এবং একটি বর্ডার হাট উদ্বোধন করা হয়।
বিকেলে প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের শাপলা কক্ষে ভারতের পররাষ্ট্র সচিব সুব্রামানিয়াম জয়শঙ্কর, বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার পঙ্কজ শরণ এবং বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সচিবসহ দুই দেশের কর্মকর্তারা এসব চুক্তিতে সই করেন।
গত ৬ জুন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও নরেন্দ্র মোদির উপস্থিতিতে ছিটমহল বিনিময়ে স্থল সীমান্ত চুক্তির অনুসমর্থনের দলিল বিনিময় করে বাংলাদেশ ও ভারত।
ওইদিন বিকেলে প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের শাপলা কক্ষে এই দলিল বিনিময়ের সময় ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও উপস্থিত ছিলেন।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্র সচিব শহীদুল হক এবং ভারতের পররাষ্ট্র সচিব সুব্রামানিয়াম জয়শঙ্কর নিজ নিজ দেশের পক্ষে এসব দলিল হস্তান্তর করেন। এ সময় ওই চুক্তি বাস্তবায়নের কার্যপদ্ধতি সংবলিতপত্রও বিনিময় করা হয়।
গত মে মাসে পার্লামেন্টে সীমান্ত বিল নামে পরিচিতি পাওয়া সংবিধান সংশোধনের প্রস্তাব অনুমোদন পাওয়ার পর তাতে অনুসমর্থন জানায় ভারতের মন্ত্রিসভা, স্বাক্ষর করেন ভারতের রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি।
দীর্ঘদিন ঝুলে থাকা এ সমস্যার সমাধানের পরই বাংলাদেশ সফরের দিনক্ষণ ঘোষণা করেন মোদি।
উত্তরাধিকার সূত্রে ভারতের স্থল সীমান্ত নিয়ে এ সমস্যাটি পেয়েছিল বাংলাদেশ। অবিভক্ত ভারতের অংশ থেকে পাকিস্তান হয়ে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর এ সমস্যার অবসানে ১৯৭৪ সালে মুজিব-ইন্দিরা চুক্তি হয়।
এর আওতায় ছিটমহল বিনিময়ে বাংলাদেশের দিক থেকে সব প্রক্রিয়া সারা হলেও তা আটকে ছিল ভারতের দিকে। কারণ ভূমি ছাড়তে হলে ভারতের সংবিধান সংশোধনের প্রয়োজন।
এর মধ্যে ২০১১ সালে ভারতে তৎকালীন কংগ্রেস সরকারের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের ঢাকা সফরের সময় স্থল সীমান্ত সমস্যার সমাধানে দুই দেশের মধ্যে একটি প্রটোকল সই হয়।
এরপর কংগ্রেস সরকার সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগ নিলেও ক্ষমতার পালাবদল হয়ে যায়। ক্ষমতায় আসে বিজেপি, প্রধানমন্ত্রী হন নরেন্দ্র মোদি।
তবে কংগ্রেস সরকারের সেই উদ্যোগকে সফল করতে আরও সচেষ্ট ছিলেন নরেন্দ্র মোদি। ছিটমহল বিনিময়ে আপত্তি জানানো আঞ্চলিক দলগুলোকে মানান তিনি।
বর্তমানে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ভারতের ১১১টি ছিটমহল রয়েছে, এতে রয়েছে ৩৭ হাজার মানুষের বাস। অন্যদিকে ভারতের অভ্যন্তরে বাংলাদেশের ৫১টি ছিটমহলের বাসিন্দা ১৪ হাজার। ২০১১ সালে দুই দেশের যৌথ উদ্যোগে শুমারিতে এই তথ্য পাওয়া যায়।
ভারতের ভেতরে থাকা বাংলাদেশের ৫১টি ছিটমহলের আয়তন মোট ৭ হাজার ১১০ একর; অন্যদিকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ভারতের ১১১টি ছিটমহলের আয়তন ১৭ হাজার ১৬০ একর।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলে আসছেন, চুক্তি কার্যকর হলে বাংলাদেশের ৫১টি ছিটমহল (৭ হাজার ১১০ একর জমি) ভারতের অংশ হয়ে যাবে। ভারতের ১১১টি ছিটমহল (১৭ হাজার ১৬০ একর জমি) বাংলাদেশের অংশ হয়ে যাবে।
ছিটমহল বিনিময়ের ফলে ভারত যে প্রায় ১০ হাজার একর জমি বেশি হারাবে, সে জন্য কোনো ক্ষতিপূরণ পাবে না বলে প্রটোকলে উল্লেখ রয়েছে।
এগুলোর মধ্যে লালমনিরহাট জেলায় ৫৯টি, পঞ্চগড় জেলায় ৩৬টি, কুড়িগ্রাম জেলায় ১২টি, নীলফামারী জেলায় ৪টি ভারতীয় ছিটমহল রয়েছে।
প্রটোকলের আওতায় অপদখলীয় ভূমি নিয়ে বিরোধের অবসানও ঘটবে। এতে ভারত অপদখলীয় ২ হাজার ৭৭৭ একর জমির মালিকানা পাবে। আর ২ হাজার ২৬৭ একর জমির ওপর বাংলাদেশের মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হবে।
আর চুক্তি ও প্রটোকল অনুযায়ী ছিটমহলবাসী তাদের ইচ্ছে অনুযায়ী নাগরিকত্ব বেছে নিতে পারবেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *