নবাব সিরাজ-উদ-দৌলা ইতিহাসের ট্র্যাজেডির নায়ক

নূহ-উল-আলম লেনিন:  সম্রাট আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর (১৭০৭) পর মুঘল সা¤্রাজ্য কার্যত দ্রুত ভাঙনের মুখে পড়ে। পিতার মতোই আওরঙ্গজেবের তিন পুত্র সিংহাসন দখলের ভ্রাতৃঘাতী যুদ্ধে লিপ্ত হয়। দুই ভাইকে হত্যা করে শাহ আলম দিল্লির মসনদ অধিকার করে। দিল্লিতে একের পর এক হত্যা-খুনোখুনি এবং শাসক বদলের প্রেক্ষিতে ভারতের সুবাহ বা প্রদেশগুলোর ওপর কেন্দ্রের নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হয়ে পড়ে। সেই সুযোগে বিভিন্ন প্রদেশের সুবেদার বা গভর্নরগণ দিল্লির স¤্রাটকে বার্ষিক নামমাত্র রাজস্ব দিয়ে প্রদেশ শাসনের সর্বময় কর্তৃত্ব (দেওয়ানি) লাভ করে। যারা ছিল দিল্লির নিয়োজিত বেতনভুক রাজকর্মচারী তারাই কার্যত স্বাধীন নৃপতি বা নবাবে পরিণত হন। ঢাকা ছিল বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার রাজধানী। ঢাকার নায়েব নিজাম মুর্শিদকুলী খাঁ দিল্লির স¤্রাটের অনুমতি নিয়ে নিজ নামে শহর পত্তন করে মুর্শিদাবাদে সুবাহ বাংলার রাজধানী স্থানান্তর করেন। ১৭১৭ খ্রিস্টাব্দে মুর্শিদকুলী স্বাধীন নবাব হিসেবে দেওয়ানি লাভ করেন। বাংলার এই স্বাধীন সত্তা মাত্র ৪০ বছর অক্ষুণœ ছিল। ক্ষমতা দখলের হিংসাত্মক ষড়যন্ত্র, প্রতারণা, বিশ্বাসঘাতকতা এবং হত্যা, পাল্টা হত্যা ইত্যাদি ঘটনায় এই ৪০টি বছরের ইতিহাস সমাকীর্ণ ছিল। প্রতারণামূলকভাবে ক্ষমতাদখলকারী নবাব আলীবর্দী খাঁ ছিলেন দক্ষ সমর নায়ক, প্রশাসক এবং কূটকৌশলী। তার কোনো পুত্রসন্তান না থাকায় প্রিয় দৌহিত্র ২৮ বছর বয়স্ক সিরাজ-উদ-দৌলাকে তিনি তার উত্তরাধিকারী নিযুক্ত করেন। ৯১ বছর বয়সে আলীবর্দী মৃত্যুবরণ করলে ১৭৫৬ সালের ১০ এপ্রিল সিরাজ-উদ-দৌলা সিংহাসনে আরোহণ করেন।
কিন্তু আলীবর্দীর আত্মীয়-পরিজনের অধিকাংশই সিরাজের নবাবী মেনে নিতে পারেনি। সিরাজকে অপসারণ করে নিজে অথবা নিজের পছন্দের আত্মীয়কে সিংহাসনে বসানোর ষড়যন্ত্রের প্রধান নায়ক ছিলেন ইরাক থেকে আসা ভাগ্যান্বেষী মীরজাফর, আলীবর্দীর জ্যেষ্ঠ কন্যা ঘষেটি বেগম এবং পূর্ণিয়ার শাসক শওকত জং প্রমুখ। শেষোক্তরা ব্যর্থ হলেও মীরজাফর সফল হয়। মীরজাফরকে নবাবের সেনাবাহিনীর একজন সৈনিক হিসেবে নিয়োগ করেন আলীবর্দী। অতঃপর আলীবর্দীর আশীর্বাদে দ্রুত তার পদোন্নতি ঘটে, নিয়োজিত হন প্রধান সেনাপতি রূপে। নিজ ভগ্নিকে মীরজাফরের কাছে বিয়ে দেন।
নবাব সিরাজ-উদ-দৌলা প্রথম যৌবনে কিছুটা উচ্ছৃঙ্খল জীবনযাপন করলেও নবাব হওয়ার পর একজন দেশপ্রেমিক ন্যায়পরায়ণ শাসক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। নবাবের অনুমতি ছাড়া ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি কর্তৃক কলকাতায় দুর্গ স্থাপন (ফোর্ট উইলিয়াম), বিভিন্ন জায়গায় কুঠি স্থাপন এবং রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে অবাধে ব্যবসা-বাণিজ্য চালাতে চাইলে তরুণ নবাব ইংরেজদের এই কর্মকা- বন্ধ করার জন্য চাপ প্রয়োগ করেন। তাতে কাজ না হলে ১৭৫৬ খ্রিস্টাব্দে কলকাতা আক্রমণ করে ফোর্ট উইলিয়াম গুঁড়িয়ে দেন। নবাবের জাতীয় স্বার্থে গৃহীত এসব পদক্ষেপ মীরজাফর, অর্থমন্ত্রী জগৎশেঠ, প্রভাবশালী রাজন্য রাজা রায় দুর্লভ, রায় বল্লভ, উমিচাঁদ কেউই মেনি নিতে পারেনি। মীরজাফর এর সুযোগ নেয়। গোপনে ইংরেজ গভর্নর কর্নেল ক্লাইভের সঙ্গে গোপন চুক্তি সম্পাদন করে এবং সিরাজকে উৎখাতের ষড়যন্ত্র করে।
নবাব অনেক ছাড় দিয়েও ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ হন। অনিবার্য হয়ে ওঠে পলাশীর যুদ্ধ।
নবাব মীরজাফরের বিশ্বাসঘাতকতা ও অন্যদের ষড়যন্ত্র টের পান। তিনি মোহনলালকে তার প্রধানমন্ত্রী এবং মীরমর্দনকে সেনাপতি নিয়োগ করেন। বিপুল সৈন্য, কামান, বন্দুক থাকা সত্ত্বেও ১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দের ২৩ জুন পলাশীর যুদ্ধে পরাজিত হন। মাত্র দেড়-দু হাজার ইংরেজ শ্বেতাঙ্গ সৈন্য এবং কর্মক্ষম ৪টি কামান নিয়ে লর্ড ক্লাইভ প্রকৃতপক্ষে সাজানো নাটকের যুদ্ধে জয়লাভ করেন। প্রধান সেনাপতি মীরজাফর, রাজা রায় দুর্লভ, রাজ বল্লভÑ কেউই নবাবের সাহায্য না করে ইংরেজদের পক্ষাবলম্বন করেন।
ভীতসন্ত্রস্ত নবাব স্ত্রী লুৎফুন্নেসাকে নিয়ে ২৩ জুন রাতেই রাজধানীতে ফিরে আসেন। মনসুরাবাদ প্রাসাদের রাজভা-ার খুলে দিয়ে কোটি কোটি টাকা সৈনিক ও জনগণের মধ্যে বিতরণ করেন। ২৫ জুন তিনি লুৎফুন্নেসা ও শিশুসন্তানকে নিয়ে রাজধানী ত্যাগ করেন। রাজমহলে পালাবার উদ্দেশ্যে নৌকাযোগে রওনা করেও শেষ পর্যন্ত মীরজাফরের জামাতা মীর কাশেমের সৈনিকদের হাতে বন্দী হন। ১৭৫৭ সালের ৩ জুলাই সিরাজকে মুর্শিদাবাদে আনা হয়। তাকে মীরজাফরের পুত্র মিরনের বাড়িতে একটি কক্ষে বন্দী করা হয়। মীরজাফর তখন ভাং-এর নেশায় চুর হয়ে দিবানিদ্রা যাচ্ছিলেন। মিরন পিতাকে বা অন্য কাউকে জিজ্ঞেস না করেই সিরাজকে ঘাতক মোহম্মদিবেগকে দিয়ে পাশবিক নির্যাতনের পর হত্যা করা হয়। পরে সিরাজের লাশ হাতির পিঠে চড়িয়ে মুর্শিদাবাদের রাজপথ প্রদক্ষিণ করা হয়।
সিরাজের মৃত্যুতে ইংরেজরা উল্লসিত হয়। মাতাল, অদক্ষ, দুর্নীতিপরায়ণ এবং মেরুদ-হীন মীরজাফরকে বাংলার মসনদে বসানো হয়। কার্যত বাংলা তথা ভারতের স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত হয়। ক্রমান্বয়ে ইংরেজরা বাণিজ্যিক সুবিধার দাবি বাদ দিয়ে বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার শাসক রূপে আবির্ভূত হয়। পলাশীযুদ্ধের দুই দশকের মধ্যেই ইংরেজরা বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার বৈধ ‘দেওয়ানি’ লাভ করে সর্বময় কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে। মুর্শিদাবাদের তথাকথিত নবাবরা অর্থাৎ, মীরজাফরের বংশধরগণ প্রথমে ইংরেজদের দেওয়া ভাতা এবং ভারতের স্বাধীনতার পরও এক যুগ ধরে রাজন্যভাতার ওপর নির্ভরশীল ছিল।
ভারতের ইতিহাসে সিরাজ-উদ-দৌলাকে লম্পট, মদ্যপ, স্বেচ্ছাচারী, দুর্বিনীত, নৃশংস খুনি, বহুগামী, নারী নির্যাতনকারী এবং অব্যবস্থিত চিত্ত, অনভিজ্ঞ-অদক্ষ শাসক হিসেবে চিত্রিত করে। যেভাবে তার চরিত্রে কলঙ্ক লেপন করা হয়েছে, সম্ভবত আর কারও বিরুদ্ধে এই মাত্রায় ইতিহাস বিকৃত করা হয়নি। এখনও পশ্চিমবঙ্গের বুদ্ধিজীবীদের একাংশ এবং মুর্শিদাবাদ-বহরমপুরের সাধারণ মানুষের একাংশ এই অপপ্রচারে বিশ্বাস করে বলে জেনে স্তম্ভিত হলাম।
প্রকৃতপক্ষে সিরাজ নিহত হওয়ার প্রায় দেড়শ বছর পর্যন্ত তার সম্পর্কে ইতিহাস বিকৃতির বিরুদ্ধে বলার কেউ ছিল না। সিরাজের চরিত্র হনন করা হয়েছে পরিকল্পিতভাবে। অষ্টাদশ ও উনিশ শতকে মুর্শিদাবাদ, কলকাতা এবং লন্ডনভিত্তিক যেসব ফারসি, ইংরেজি এবং বাংলা গ্রন্থ রচিত হয়েছে তার প্রায় সবগুলোই ছিল হয় মীরজাফরের বা তার বংশধরদের এবং ইংরেজদের অনুগ্রহভোগী ফারসিভাষী ইতিহাস রচয়িতা ও ইংরেজ লেখকদের রচিত ইতিহাস গ্রন্থ। এসব গ্রন্থের উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হলোÑ ফারসি ভাষায় রচিত ১. মুনশি সলিমুল্লাহ রচিত তারিখ-ই-বাঙ্গালা (১৭৬৩) ২. তারিখ-ই-বাঙ্গালা-ই-মহব্বত জঙিÑ ইউসুফ আলী খান (১৭৬৩-৬৪) ৩. মোজাফ্ফরনামাÑ করম আলী খান (১৭৭২-৭৩) ৪. সিয়ার-উল-মুতাখখিরিনÑ সৈয়দ গোলাম হোসেন খান তাবাতায়ি (১৭৮০-৮১) ৫. রিয়াজ-উস-সালাতেনÑ গোলাম হোসেন সলিম জইদপুরি (১৭৬৬-৬৮) ৬. তারিখ-ই-মনসুরিÑ সাঈদ আলী প্রমুখ।
এই গ্রন্থগুলোর অধিকাংশেই মুঘল বা বাংলায় নবাবী শাসনকাল নিয়ে বস্তুনিষ্ঠ তথ্য পরিবেশন করেছে। কিন্তু একমাত্র সিরাজের প্রসঙ্গেই লেখকগণ অযৌক্তিক ও প্রমাণ ছাড়াই তার চরিত্রকে কলুষিত করেছেন। কারণ এই লেখকদের সবাই-ই মীরজাফর ও ইংরেজদের দ্বারা নিয়োজিত ছিলেন।
ইংরেজ লেখকদের মধ্যে রবার্ট ওরমি, আইভ, থর্নটন, স্ক্রাফটস, ফাদার লং, হলওয়েল, ম্যাকলেজ, কর্নেল সোমসন এবং মঁসিয়ে লার প্রমুখ সমসাময়িককালে যেসব গ্রন্থ লিখেছেন তাতেও উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে সিরাজের চরিত্র হনন করা হয়েছে।
বাঙালিদের মধ্যে পলাশীযুদ্ধের ৫০ বছর পর কার্যত রাজিব লোচন মুখোপাধ্যায় ‘মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায়স্য চরিত্রং’ এবং আরও পরে ৫০ বছর পর নবীনচন্দ্র সেন পলাশীর যুদ্ধ কাব্যেÑ সিরাজের যে ভয়ঙ্কর চরিত্র আঁকেন তা মানব-কল্পনাকেও হার মানায়।
সিরাজ-উদ-দৌলাকে ইংরেজরা ইচ্ছেকৃতভাবে হেয় প্রতিপন্ন করেছে তাদের দখলদারিত্ব ও দুঃশাসনকে লেজিটিমেসি প্রদান করার উদ্দেশ্যে।
সিরাজের চরিত্র হননের বিরুদ্ধে সর্বপ্রথম কলম ধরেন প্রখ্যাত ঐতিহাসিক অক্ষয় কুমার মৈত্রেয়। তার রচিত ‘সিরাজ-উদ-দৌলা’ (১৮৯৬-৯৭) গ্রন্থটি বিভিন্ন ঐতিহাসিক প্রামাণ্য দলিলপত্র ও গ্রন্থ ইত্যাদি ঘেঁটে নির্মোহ সত্য উদ্ঘাটনের প্রথম সার্থক প্রচেষ্টা। পরবর্তীকালে বিশেষত বিগত প্রায় অর্ধশতকে বাংলাদেশ ও ভারতের গবেষকগণ ব্রিটিশ মিউজিয়াম, ইন্ডিয়ান আর্কাইভস এবং ফারসি ভাষার মূলানুগ অনুবাদ গ্রন্থ ইত্যাদি অবলম্বন করে যেসব গ্রন্থ রচনা করেছেন তাতে প্রমাণিত হয়েছে, সিরাজ-উদ-দৌলার বিরুদ্ধে যেসব অপপ্রচার করা হয়েছে তা কেবল ভিত্তিহীন নয়, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত কল্পকাহিনি। সিরাজ-উদ-দৌলা নবাব হওয়ার পর মদ ছেড়ে দিয়েছিলেন (লর্ড ক্লাইভের সাক্ষ্য), তার অন্ধকূপ হত্যার কাহিনি মিথ্যা ও ভিত্তিহীন এবং তিনি রাষ্ট্রব্যবস্থা ঢেলে সাজাতে গিয়ে মুর্শিদাবাদ নবাব দরবারকেন্দ্রিক বিদেশি প্রভুদের কাছে আত্মবিক্রয়কারী সিন্ডিকেট বা কায়েমি স্বার্থের গ্রুপটিকে ভেঙে/দুর্বল করতে চেয়েছিলেন। বাংলার স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব ছিল তার অগ্রাধিকারের বিষয়। অষ্টাদশ শতকের মানদ-েই নয়, আজকের মানদ-েও নবাব সিরাজ-উদ-দৌলা ছিলেন একজন মহান দেশপ্রেমিক ও সাহসী যোদ্ধা। উপনিবেশবাদ-বিরোধী সংগ্রামে সিরাজ-উদ-দৌলা প্রথম ‘শহীদ’।

*

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *