নাসিরনগর এখন স্বাভাবিক

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর উপজেলা এখন স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে এসেছে। হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকদের মধ্যে কোনো আতঙ্ক নেই। সরকার এবং প্রশাসন এলাকার জনসাধারণের আরও নিরাপত্তার স্বার্থে সবগুলো মন্দিরে রাস্তার বিভিন্ন পয়েন্টে মোট ৫০টি সিসি ক্যামেরা স্থাপন করেছে। হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত ১৫টি মন্দির ও ৩০টি পরিবারকে দেওয়া হয়েছে প্রয়োজনীয় আর্থিক সহায়তা। মোতায়েন করা রয়েছে পর্যাপ্ত পুলিশ ও বিজিবি সদস্য। বাড়িঘর মেরামতের জন্য উপজেলা প্রশাসন ৩০ বান্ডিল টিন প্রদান করেছে। এ ছাড়া নানা ধরনের ত্রাণসামগ্রী (শাড়ি, লুঙ্গি, ওষুধ) বিতরণ করা হয়েছে বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষ থেকে। তবে হামলায় জড়িতদের গ্রেফতার অব্যাহত রয়েছে। এ পর্যন্ত মোট ১০৪ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
গত ২৯ অক্টোবর বেলা ১১টায় নাসিরনগর উপজেলার হরিপুর ইউনিয়নের হরিণবেড় গ্রামের জগন্নাথ দাসের দ্বিতীয় পুত্র রসরাজ দাসের (৩০) ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে পবিত্র ইসলাম ধর্মের অবমাননাকর একটি ছবি পোস্ট করা হয়। এই খবর হরিণবেড় গ্রামে ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয় লোকজন রসরাজ দাসকে ধরে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়ে নিয়ে আসে। পুলিশ খবর পেয়ে তাকে উদ্ধার করে থানায় আনে এবং ২৯ অক্টোবর রাতেই নাসিরনগর থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) কাউছার হোসেন বাদী হয়ে তথ্য ও প্রযুক্তি আইনের ৫৭(২) ধারায় একটি মামলা দায়ের করেন। ওই মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে ৩০ অক্টোবর রসরাজ দাসকে আদালতে পাঠায় পুলিশ। এদিকে, এই ঘটনায় আতঙ্কিত হয়ে এবং তাদের বাড়িঘরে হামলা হবে জানতে পেরে হরিণবেড় গ্রামের (ধনী-দরিদ্র) অধিকাংশ পরিবার ২৯ অক্টোবর নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যায়। এই ঘটনায় রসরাজের বিচারের দাবিতে ৩০ অক্টোবর নাসিরনগর উপজেলা সদরে উত্তেজিত জনতা বিক্ষোভ মিছিল করে। এমন অবস্থায় আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াত এবং খাঁটি আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াত নামে পরস্পরবিরোধী ভিন্ন মতাদর্শের উগ্রপন্থি দুটি ধর্মীয় সংগঠনকে সমাবেশ করার অনুমতি দেয় নাসিরনগর উপজেলা প্রশাসন। সমাবেশে মুসলিম ধর্মের অবমাননার জন্য রসরাজের ফাঁসির দাবি করে বিক্ষোভ করে ওই দুটি সংগঠনের নেতারা। সমাবেশ শেষে সমাবেশস্থল থেকে একদল যুবক লাঠিসোটা নিয়ে হিন্দু সম্প্রদায়ের মন্দির ও বাড়িঘরে হামলা চালায়। নাসিরনগরের সবচেয়ে বড় মন্দির নাসিরনগর সদরের মহাকাল পাড়ার সার্বজনীন গৌরমন্দির, শিবমন্দির, দত্তপাড়ার দত্ত বাড়ি মন্দির, হরিণবেড় গ্রামের ঠাকুরপাড়ার ঠাকুর বাড়ি মন্দির, বাড়োয়ারী কালীমন্দির, হরিণবেড় গ্রামের মিলন বালার পারিবারিক মহাদেব মন্দির, গৌরাঙ্গ দাসের বাড়িতে অবস্থানরত দক্ষিণা কালীমন্দিরে হামলা চালায় এবং মন্দিরের প্রতিমা ভাঙচুর করে। সেই সাথে রসরাজ দাসের বাড়িতে হামলা চালিয়ে রসরাজ দাসের বসতঘরের আসবাবপত্র ভাঙচুর করে। গৌরমন্দিরের পুরোহিত শঙ্কর গোপাল দাসও হামলাকারীদের হামলায় আহত হন। খবর পেয়ে পুলিশ, বিজিবি ও র‌্যাব সদস্যরা ওইদিন বিকেল ৪টায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। এই ঘটনায় নাসিরনগর উপজেলা সদরের দত্ত বাড়ির মন্দিরে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনায় নাসিরনগর পূজা উদযাপন কমিটির সভাপতি কাজল জ্যোতি দত্ত বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা ১ হাজার ২০০ জনকে আসামি করে মামলা দায়ের করেন এবং গৌরমন্দিরে হামলা ও প্রতিমা ভাঙচুরের ঘটনায় উপজেলা মন্দির কমিটির সাধারণ সম্পাদক নির্মল চন্দ্র চৌধুরী বাদী হয়ে অনুরূপ ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ অজ্ঞাতনামাকে আসামি করে মামলা দায়ের করেন। এ দুটি মামলায় তাৎক্ষণিক আটজনকে গ্রেফতার করে নাসিরনগর থানা পুলিশ। সবশেষে উক্ত ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে গত ২৭ ডিসেম্বর সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক যুগ্ম সম্পাদক আবদুল আহাদকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।
১ নভেম্বর নাসিরনগরে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শনে আসেন কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দ। আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক একেএম এনামুল হক শামীমের নেতৃত্বে চার সদস্যের প্রতিনিধি দল নাসিরনগরের ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করে। প্রতিনিধি দলের অন্য তিন সদস্য হলেনÑ বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ত্রাণ ও সমাজকল্যাণ বিষয়ক সম্পাদক সুজিত রায় নন্দী, কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের সদস্য গোলাম রাব্বানী চিনু ও মারুফা আক্তার পপি। এনামুল হক সাংবাদিকদের বলেন, জড়িতদের কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।
এরপর ৬ নভেম্বর আওয়ামী লীগ সভাপতির ধানমন্ডির রাজনৈতিক কার্যালয়ে এক সভায় ১৪ দলের সমন্বয়ক ও স্বাস্থ্যমন্ত্রী মো. নাসিম এমপি নাসিরনগরে হামলা রোধে প্রশাসনের যারা ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছেন তাদের দ্রুত সরিয়ে দেওয়ার দাবি জানান। এরপর নাসিরনগর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা চৌধুরী মোয়াজ্জেম আহমদ এবং নাসিরনগর থানার ওসি আবদুল কাদেরকে প্রত্যাহার করা হয়। এদিকে ৭ নভেম্বর মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী অ্যাডভোকেট ছায়েদুল হক এমপির জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে জড়িয়ে মিথ্যা, বানোয়াট ও কুরুচিপূর্ণ বক্তব্যের তীব্র নিন্দা এবং তা অবিলম্বে প্রত্যাহারের দাবি জানিয়ে বিক্ষোভ মিছিল করে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা সদর এবং প্রেসক্লাবের সামনে বিক্ষোভ সমাবেশ করে জেলা আওয়ামী লীগের অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা।
জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে গত ৭ নভেম্বর নাসিরনগরে ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে নগদ অর্থ ও টিন বিতরণ করা হয়। নাসিরনগর সদরে কাশিপাড়ায় ক্ষতিগ্রস্ত ১২ পরিবারকে তিন বান্ডিল টিন এবং নগদ ৯ হাজার টাকা, হরিপুর ইউনিয়নের ১৬ পরিবারকে দুই বান্ডিল টিন ও নগদ ৬ হাজার টাকা এবং সদরের আরও ২৩ পরিবারকে দুই বান্ডিল টিন ও নগদ ৫ হাজার টাকা প্রদান করা হয়। ব্রাহ্মণবড়িয়া জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে ২৯ পরিবারকে নগদ ৫ হাজার টাকা এবং ১০টি মন্দিরে ১০ হাজার টাকা প্রদান করা হয়।
নাসিরনগরে যারা এই হামলা চালিয়েছে তাদের খুঁজে বের করে বিচারের আওতায় আনা ছাড়া কোনো বিকল্প নেই বলে ঘোষণা দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল এমপি। তিনি গত ৮ নভেম্বর নাসিরনগরের ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করেন। ৯ নভেম্বর পরিদর্শনে আসেন ১৪ দলের কেন্দ্রীয় কমিটির নেতৃবৃন্দ। ১৪ দলের মুখপাত্র ও আওয়ামী লীগের সভাপতিম-লীর সদস্য স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম এমপির নেতৃত্বে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী রাশেদ খান মেনন এমপি, তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু এমপি, সাম্যবাদী দলের সাধারণ সম্পাদক দিলীপ বড়–য়া, জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি র. আ. ম. উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরী এমপি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী অ্যাডভোকেট ছায়েদুল হক, অধ্যাপক ড. প্রাণ গোপাল দত্ত, অসীম কুমার উকিল প্রমুখ নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। ১১ নভেম্বর পরিদর্শন করেন বাংলাদেশ সুপ্রিমকোর্ট আইনজীবী সমিতির প্রতিনিধি দল। সুপ্রিমকোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট ইউসুফ হোসেন হুমায়ুন ঘোষণা করেন, ‘সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলাকারীদের কোনো আইনি সহায়তা দেওয়া হবে না।’
নিরাপত্তা আরও জোরদারের স্বার্থে দিনে রাতে পুলিশি প্রহরার পাশাপাশি বিজিবিও মোতায়েন করা হয় নাসিরনগরে। অতঃপর ১৩ নভেম্বর আইনশৃঙ্খলা কমিটির মাসিক সভায় জেলা প্রশাসক রেজুয়ানুর রহমান বলেন, নাসিরনগরে কোনো নিরপরাধ ব্যক্তিকে হয়রানি করা হবে না।
এদিকে পুলিশের নজরদারিতে থাকা অন্যতম সন্দেহভাজনদের মধ্যে ১৬ নভেম্বর ভোরে নাসিরনগর উপজেলা সদর থেকে গ্রেফতার করা হয়েছে নাসিরনগর সদর ইউনিয়নের বিএনপির সভাপতি আমিরুল হোসেন চৌকিদারকে এবং হরিপুর ইউনিয়নের হরিণবেড় বাজারের আল-আমিন সাইবার পয়েন্টের দিকে সন্দেহ হয় পুলিশের। পুলিশের ধারণা ছিল, আল-আমিন সাইবার ক্যাফের স্বত্বাধিকারী জাহাঙ্গীর আলমই রসরাজের ফেসবুক আইডি হ্যাক করে ধর্মীয় অবমাননার ছবিটি পোস্ট করেছিল; কিন্তু সাইবার ক্যাফের দুটি কম্পিউটারের হার্ডডিস্ক সফটওয়্যার জব্দ করে সেখান থেকে কাবা শরিফ অবমাননার পোস্ট দেওয়ার কোনো আলামত পাওয়া যায়নি। ২৭ নভেম্বর রাতে জেলার আশুগঞ্জ এলাকা থেকে গ্রেফতার করা হয় হরিপুর ইউনিয়ন যুবদলের সভাপতি হাজী মো. বিল্লাল হোসেনকে (৩৫) এবং ২৮ নভেম্বর রাতে ব্রাহ্মণবাড়িয়া পৌর শহরের কালাইশ্রীপাড়া থেকে গ্রেফতার করা হয় জাহাঙ্গীর আলমকে। সে নাসিরনগর উপজেলার হরিপুর ইউনিয়নের হরিণবেড় গ্রামের রেনু মিয়ার ছেলে। ২৭ নভেম্বর গ্রেফতারের পর হাজী মো. বিল্লাল মিয়া দুটি ট্রাক ভাড়া করে এবং নিজের একটি ট্রাক্টরে সমাবেশে লোকজন নিয়ে আসেন বলে আদালতে ১৬৪ ধারার জবানবন্দিতে এই স্বীকারোক্তি দেন। এদিকে রসরাজ এবং তার পরিবারের দাবি, কাবা শরিফ অবমাননার পোস্টটি রসরাজ করেনি। পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) ফরেনসিক বিভাগের রিপোর্ট অনুযায়ী জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ইকবাল হোসেন জানান, রসরাজের ব্যবহার করা মোবাইল ফোন থেকে এই ছবি পোস্ট করা হয়নি। তবে জাহাঙ্গীর এবং বিল্লাল বিজ্ঞ আদালতে পৃথক পৃথক জবানবন্দিতে চাঞ্চল্যকর তথ্য দেন। জাহাঙ্গীর ফেসবুকের পোস্টটি প্রিন্ট করে প্রচারপত্র আকারে বিলি করেন পুরো হরিণবেড় এলাকায়। অতিরিক্ত চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে বিল্লাল হোসেন ১৬৪ ধারার জবানবন্দিতে বলেন, ৩০ অক্টোবর সকালে হরিপুর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান দেওয়ান আতিকুর রহমান আঁখি আমাকে ট্রাক ভাড়া করতে বলেন। তিনি সহ সুজন ও রুবেল মিলে ট্রাক ভাড়া করেন ১৫ হাজার টাকার বিনিময়ে। এর মধ্যে ১০ হাজার টাকা দেন দেওয়ান আতিকুর রহমান আঁখি। বিল্লাল দেন ৩ হাজার এবং মিন্টু, মাহমুদ, নবী, রুবেল ও অন্যরা মিলে দেন বাকি ২ হাজার টাকা।
গত ৩ ডিসেম্বর নতুন তথ্য পেয়েছে বলে জানায় জেলা পুলিশ। নাসিরনগরে হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর হামলার কিছুদিন আগে ‘ওয়াসিম বিডি’ নামে একটা ফেসবুক থেকে পবিত্র কাবা শরিফের বিকৃত ছবি আপলোড করা হয়েছে বলে নিশ্চিত হয়েছে পুলিশ। এই পেজটির এডমিনের ব্যাপারে অনুসন্ধানে নেমেছে পুলিশ। ওই চিঠিতে ‘ওয়াসিম বিডি’র এডমিন কারা এবং কাদের মাধ্যমে এটি পরিচালিত হচ্ছে তা উদঘাটনের জন্য বলা হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *