নিউক্লিয়াস, বঙ্গবন্ধু ও স্বাধীনতা

একটি কথা সবাইকেই স্বীকার করতে হবে যে বাংলাদেশ সৃষ্টির মূল উদ্দেশ্য ছিল- অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক ও বৈষম্যহীন রাষ্ট্র ব্যবস্থা তৈরি করা। এক কথায় বলা যায়, স্বাধীনতা যুদ্ধে জামায়াত-শিবির ব্যতীত সর্বদলীয় মানুষের অংশগ্রহণ ও সেই কারণেই ৩০ লক্ষ শহীদের রক্তের বিনিময়ে দীর্ঘ ৯ মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জন ছিল একটি বাস্তবতা ।

স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ আওয়ামীলীগ সরকার গঠন করার পর মূলত মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সকল দলের সমন্বয়ে জাতীয় সরকার গঠনের মতপার্থ্যকের কারণেই ধীরে ধীরে জাসদের সৃষ্টি সেই লক্ষ্যে বাংলাদেশের ছাত্রলীগের অভ্যন্তরে সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসী ছাত্র নেতারাই বঙ্গবন্ধুর কাছে এই দাবি জানায় অতঃপর বাংলাদেশ ছাত্র লীগের কেন্দ্রীয় সম্মেলনকে কেন্দ্র করে ছাত্রদের একটি দল তদানীন্তন ডাকসুর ভিপি ও ছাত্রনেতা আ.স.ম আব্দুর রবকে সাধারণ সম্পাদক ও মুক্তিযুদ্ধের ১ সেক্টরের সেক্টর কমান্ডার মেজর(অব:) এম এ জলিল-কে সভাপতি করে ১৯৭২ সালের ৩১শে অক্টোবর জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জাসদ আত্মপ্রকাশ করে ।

তারপরের ইতিহাস বলতে গেলে দীর্ঘ আলোচনার সূত্রপাত ঘটবে, মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্স এর ভূমিকা ও পরবর্তীতে এই ফোর্সের একজন জনাব সিরাজুল আলম খানের ভূমিকা নিয়ে অনেকেই অনেক প্রশ্ন উত্থাপন করে থাকেন, সিরাজুল আলম খান ও তার তৈরি করা সংগঠন নিউক্লিয়াসই বাংলাদেশ রাষ্ট্রের বা বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ১৯৬২ থেকে ছিল মূল চালিকা শক্তি ।

দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে ১৯৪৭ সালে পাক ভারত ভাগাভাগির পর ১৯৪৮ সালে রাষ্ট্র ভাষাকে উর্দু ভাষা ঘোষণা দেবার পরপরই বাঙালী জাতি হাড়ে হাড়ে বুঝতে পারে তারা নিদারুণ ভাবে প্রতারিত ও নির্যাতিত, পূর্ব পাকিস্তানের অর্জিত সম্পদ দিয়ে তৈরি হচ্ছে পশ্চিম পাকিস্তানে কলকারখানা, উন্নয়ন কার্যক্রমে পূর্ব পাকিস্তান ধীরে ধীরে পিছিয়ে পরে । আমাদের সংস্কৃতি ও ভাষাকে অবজ্ঞা করে, পূর্ব পাকিস্তানের উন্নয়নকে প্রতারিত করার মাধ্যমে তৈরি করা হয় বৈষম্য । অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক উন্নয়নে আমরা পিছিয়ে পড়তে থাকি, দিনে দিনে বাঙালিরা বুঝতে পারে পশ্চিম পাকিস্তানের শাসক গোষ্ঠীর সাথে পূর্ব পাকিস্তানের দূরত্ব কতটুকু । পশ্চিম পাকিস্তান থেকে পূর্ব পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করাই হচ্ছে এক মাত্র উপায় । বিভিন্ন তথ্য পথ্য থেকে যে সব উপাদান সংগ্রহ করা গেছে তা থেকে জানা যায় যে তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র লীগের কিছু মেধাবী ছাত্র, যথা পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক সিরাজুল আলম খান, ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় ও ঢাকা মহানগর নেতা কাজী আরেফ আহমেদ ও ছাত্রলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রাজ্জাক সর্ব প্রথম নিউক্লিয়াস নাম একটি গোপন সংগঠন তৈরি করেন যা বাংলাদেশে পরবর্তীতে স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী পরিষদ নামে পরিচিতি লাভ করে । নিউক্লিয়াসই সর্বপ্রথম একটি স্বাধীন দেশের স্বপ্ন দেখা শুরু করেন আর তার কারণ ছিল একটাই, যা ছিল নিষ্পেষিত, প্রতারিত ও শোষিত বাঙালী সমাজকে পশ্চিম পাকিস্তানের কবল থেকে মুক্ত করা । ১৯৬৪ সালে নিউক্লিয়াসের তিনজন হাইকমান্ড যথাক্রমে সিরাজুল আলম খান, আব্দুর রাজ্জাক ও কাজী আরেফ গঠন করেন স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী পরিষদ । আওয়ামী লীগ ও বঙ্গবন্ধুকে নিউক্লিয়াসের কার্যক্রম সম্পর্কে অবহিত করার দায়িত্বভার অর্পিত হয় জনাব আব্দুর রাজ্জাকের উপর । আজকের নতুন প্রজন্মের অনেকেরই হয়তো নিউক্লিয়াস সম্পর্কে বিশদ ভাবে জানা আছে আবার অনেকেরই এ বিষয় জানা নাই কিন্তু বর্তমানে আওয়ামী লীগের অনেকেই নিউক্লিয়াস ও তার ইতিহাস নিয়ে আলোচনা করতে শোনা যায় না । স্বাধীন বাংলাদেশের উপর নিউক্লিয়াসের সকল কার্যক্রম পরিচালিত খুবই গোপন বৈঠকের মাধ্যমে কাজেই পরিকল্পনা মাফিক নিউক্লিয়াসের কার্যক্রম সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত হওয়া ছিল কল্পনাতীত বা রাষ্ট্রদ্রোহিতার সামিল । পরবর্তীতে ১৯৬৩ সালে ছাত্রলীগ নেতা আবুল কালাম আজাদ ও ১৯৬৫ চট্টগ্রামের ছাত্র লীগ নেতা জনাব এম এ মান্নানকে নিউক্লিয়াসে অন্তর্ভুক্ত করা হয় । তখন খুবই কঠোর নিয়ম শৃঙ্খলার মধ্যে সংগঠনের কার্যক্রম পরিচালিত হতো, দলীয় নিয়ম শৃঙ্খলা ভঙ্গের কারণ মৃত্যুদণ্ডের বিধান করা হয়েছিল এই সংগঠনে কাজেই শুধুমাত্র সৎ, কর্মঠ, চরিত্রবান, দেশপ্রেমিক ও বিপ্লবী কর্মীদেরই এই সংগঠনে অন্তর্ভুক্ত করার নিয়ম প্রচলিত ছিল । সিরাজুল আলম খান ছিলেন স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী পরিষদ এর যাবতীয় কর্মকাণ্ডের মূল কেন্দ্র বিন্দু বা প্রধান তত্ত্বাবধায়ক । প্রধানত ছাত্র লীগ থকেই এই সংগঠনের সদস্যদের সংগ্রহ করার হতো, ছাত্র লীগের নিবেদিত বিপ্লবী কর্মীরাই ছিল এই সংগঠনের ভরসা । স্বাধীনতার লক্ষ্য অর্জনই ছিল এই সংগঠনের মূল উদ্দেশ্য তাই গোপনীয়তা ছিল একটি অপরিহার্য বিষয় আর বিশ্বাস ঘাতকতার শাস্তি ছিল মৃত্যুদণ্ড । বঙ্গবন্ধু তার দীর্ঘ জীবনের দীর্ঘ সময় কারাগারে কাটিয়েছিলেন বটে কিন্তু নিউক্লিয়াসের সকল কার্যক্রম সম্পর্কে তাকে নিয়মিত খবরা খবর দেবার দায়িত্ব ছিল জনাব আব্দুর রাজ্জাকের উপর কাজেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের নেতৃত্বেই স্বাধীনতার স্বপ্নকে বাস্তবায়িত করার সংকল্পে নিউক্লিয়াস তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যেতে থাকে এবং তারই উপদেশে পরবর্তীতে শেখ ফজলুল হক মনি ও তোফায়েল আহমদকে নিউক্লিয়াসে অন্তর্ভুক্ত করা হয় ।

পাক ভারত উপমহাদেশে যখন ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন তুঙ্গে তখন দুটি বিপ্লবী সংগঠন নাম যথাক্রমে যুগান্তর ও অনুশীলনের কথা আমাদের স্বাধীনতার ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা আছে, নিউক্লিয়াসের সাংগঠনিক কার্যক্রমে এই দুই সংগঠনের নিয়ম কানুন বিশেষ ভাবেই প্রভাব বিস্তার করে কাজেই সংগঠনের কার্যক্রমে খুবই গোপনীয়তা রক্ষা করে হতো আর দেশের সর্বস্তরে সংগঠনের কার্যক্রম খুবই গোপনীয়তার মাধ্যমেই পরিচালিত হতো । সুপ্রিয় পাঠক সমাজ আমি খুবই সংক্ষিপ্ত আকারে নিউক্লিয়াসের একটি চিত্র আপনাদের মাঝে তুলে ধরার চেষ্টা করেছি জানিনা কতটুকু সফল হতে পেরেছি তবে একটা কথা বলতেই হয় যে নিউক্লিয়াসের অবদান আমাদের স্বাধীনতার ইতিহাস থেকে কখনই মুছে ফেলা যাবে না ।

নিউক্লিয়াসের কার্যক্রম এতটাই গোপনীয় ছিল যে স্বয়ং আওয়ামী লীগ, ছাত্র লীগ, শ্রমিক লীগের সদস্যরা দলের সভা, আলোচনা বা কার্যক্রমে যোগদান করলেও বুঝতে পারতো না যে এটা একটা নিউক্লিয়াসের কর্মশালার কার্যক্রম, সমাজের সকল শ্রেণীর মানুষের নিউক্লিয়াসের প্রতি সহানুভূতি ছিল, এডভোকেট কমরুদ্দিন আহমেদ, ডক্টর আহমেদ শরীফ, প্রফেসর আব্দুর রাজ্জাক ও প্রফেসর নূর মোহাম্মদ মিয়া, বঙ্গবন্ধুর সহধর্মিণী মরহুম বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব এই সংগঠনের অন্যতম শুভাকাঙ্ক্ষী ছিলেন । নিউক্লিয়াসের কার্যক্রম সম্পর্কে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান না যতটুকু অবগত ছিলেন তার চাইতে বেশি ছিলেন বঙ্গবন্ধু পত্নী মরহুম বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব কারণ ছিল একটাই বঙ্গবন্ধুর জীবনের বেশির ভাগ সময়টাই কেটেছে কারাগারে ।
তথ্যসংগ্রহ : সিরাজুল আলম খান পাঠ চক্র , ফেইসবুক গ্রূপ ।

‘৬৯ সালে জেল থেকে বেরিয়ে গোল টেবিল বৈঠকে প্যরোলে মুক্তির কঠিন সিদ্ধান্তটি শেখ ফজিলাতুন্নেসার দৃঢ়টার জন্যই ফলপ্রসূ হয়নি। এছাড়াও ‘৭১ সালে মুজিব-ভুট্টো, মুজিব-এহিয়ার আলোচনার সময় বেগম মুজিবের দৃঢ় ও আপোষহীন ভূমিকার কথা ইতিহাসের পাতায় লেখা থাকবে।

অপরদিকে ছাত্রলীগকে গতিশীল ও সুশৃঙ্খল সংগঠনরূপে গড়ে তুলতে ‘নিউক্লিয়াস’ দ্রুত গতিতে এগিয়ে যায় ১৯৬৪ সাল থেকে। এভাবেই ১৯৬৮ সাল নাগাদ গোটা বাংলাদেশে (পূর্ব পাকিস্তান) স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে বিপ্লবী পরিষদ বা নিউক্লিয়াসের ৩০০ ইউনিট গঠন করা হয়। প্রতি ইউনিটে ৯ জন করে সদস্য ছিলেন। প্রতি মহকুমায় চার-পাঁচজন সদস্য থাকতেন। মহকুমার অধীনে বড় বড় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঁচজন সদস্য নিয়ে গোপন কমিটি গঠিত হতো। ১৯৬৮-‘৭০ সালে ‘নিউক্লিয়াস’-এর সদস্য বৃদ্ধি পেয়ে সাত হাজারে দাঁড়ায়। ১১ দফা আন্দোলনকে বেগবান করে শেখ মুজিবের মুক্তি ও এক দফার অর্থাৎ স্বাধীনতার আন্দোলনকে এগিয়ে নেয়া হয় নিউক্লিয়াসের মাধ্যমেই। এক কথায় তখন ছাত্রলীগের উপরে পুরো কর্তৃত্ব ছিল নিউক্লিয়াসের। পরবর্তীতে শ্রমিক লীগ গঠিত হয় নিউক্লিয়াসের কর্ম পরিকল্পনা অনুসারে এবং বলাই বাহুল্য শ্রমিক লীগও পরিচালিত হতো বিপ্লবী পরিষদ বা নিউক্লিয়াসের নেতৃবৃন্দের দ্বারা।

বিপ্লবী পরিষদের জেলা ফোরাম গঠন করা হয় একজন নেতার নেতৃতে । যেমন – চট্টগ্রাম ফোরামের নেতৃত্বে ছিলেন আবুল কালাম আজাদ (অ্যাডভোকেট), কুমিল্লায় হাবিবুল্লাহ চৌধুরী (অ্যাডভোকেট), সিলেট এ আক্তার আহমেদ(ক্যান্সার এ ‘৮৪ এ মারা যান), ফরিদপুরে মনোরঞ্জন, মাদারীপুরে আমির হোসেন (সাপ্তাহিক এই সময়ের সম্পাদক), বরিশালে জেড আই খান পান্না (অ্যাডভোকেট), খুলনায় মনোরঞ্জন দাস, যশোরে আলী হোসেন মনি, কুষ্টিয়ায় আব্দুল মোমিন, পাবনায় আহমেদ রফিক (৭০’র নির্বাচিত এমপি), বগুড়ায় মোস্তাফিজুর রহমান পটল (৭৩’র নির্বাচিত এমপি), দিনাজপুরে মাহতাব হোসেন, রংপুরে হারেশ সরকার (পরবর্তীতে বীর প্রতীক খেতাবপ্রাপ্ত এবং এমপি, প্রয়াত)। ০৪ থেকে ০৭ জন সদস্য নিয়ে এ সমস্ত জেলা ফোরাম গঠিত হয় ।

এর বাইরে ছাত্রলীগ পরিচালনার জন্য একটি ছায়া ফোরাম গঠন করা হয়। এই ছায়া ফোরামের দায়িত্ব ছিল কাজী আরেফ আহমেদের উপর। এই ছায়া ফোরামের সদস্য ছিলেন মনিরুল ইসলাম (মার্শাল মণি), আসম আব্দুর রব, শাহজাহান সিরাজ, স্বপন কুমার চৌধুরী। ১৯৬৯ সালে কারামুক্তির পরে ‘বঙ্গবন্ধুকে ‘নিউক্লিয়াস’ ও বিএলএফ-এর কর্মপদ্ধতি, সংগঠন ও কার্যাবলী সম্পর্কে অবহিত করা হলে তিনি উজ্জীবিত হন এবং তখন থেকেই বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রশ্নে আপোষহীন হন। বঙ্গবন্ধু বিএলএফ-এর হাই কম্যান্ডে শেখ ফজলুল হক মণি ও তোফায়েল আহমদকে অন্তর্ভুক্ত করতে বলেন। তিনি সিরাজুল আলম খান, আব্দুর রাজ্জাক, শেখ ফজলুল হক মণি ও তোফায়েল আহমদ এই চার যুব নেতাকে স্বাধীনতার প্রশ্নে প্রয়োজনে ভারতের সহযোগিতা নেয়ার কথাও উল্লেখ করেন। এবং যে কোন পরিস্থিতিতে যোগাযোগের জন্য কোলকাতার ভবানী রোডের একটা ঠিকানা প্রদান করেন। উল্লেখ্য, এই ঠিকানাটা ছিল চিত্ত রঞ্জন সুতারের। এবং ২৫ মার্চের পরে এই চার যুব নেতা ওই ঠিকানাতেই মিলিত হন এবং গড়ে তুলেন মুজিব বাহিনী যার উপরে মুজিবনগর সরকারের কোন কর্তৃত্ব ছিল না। একই বছরে ফোরামে যুক্ত হন শরীফ নুরুল আম্বিয়া, হাসানুল হক ইনু, মোস্তাফিজুর রহমান এমপি, মাসুদ আহমেদ রুমী (দৈনিক বাংলা), আফম মাহবুবুল হক।

ঢাকা শহরে আরও একটি ফোরাম কাজ করতো যার নেতৃত্বে ছিলেন মফিজুর রহমান খান(সাপ্তাহিক রুপম কাগজ এর প্রকাশক)। সদস্য ছিলেন মফিজুর রহমান, শহীদ নজরুল ইসলাম, জাহিদ হোসেন, মনিরুল হক, বদিউল আলম কাউসার। এর বাইরে সিরাজুল আলম খানের দায়িত্বে আমিনুল হক বাদশা, চিত্তরঞ্জন গুহ এবং বোরহান উদ্দিন পুনম বিপ্লবী পরিষদের অন্তর্ভুক্ত হন। আরও যারা বিপ্লবী পরিষদের সাথে জড়িত ছিলেন তাঁরা হচ্ছেন – কামরুল আলম খান খসরু (ওরা এগার জন সিনেমার নায়ক), চিশতী শাহ্‌ হেলালুর রহমান (শহীদ, প্রথম জয় বাংলা উচ্চারণকারী), আফতাব আহমেদ, রায়হান ফেরদৌস মধু, রেজাউল হক মোস্তাক, গোলাম ফারুক প্রমুখ। ১৯৬২ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত সংগঠিত সবকটি আন্দোলনের কৌশল নির্ধারণ ও পরিকল্পনা প্রণয়ন করে এই গোপন সংগঠনটি। স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী পরিষদের ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ প্রধান প্রধান কর্মকাণ্ডগুলো সংক্ষেপে নিম্নে উল্লেখ করা হলো:

১) ষাটের দশকের মাঝামাঝি সময়ে গাড়িসহ বিভিন্ন যানবাহনের নাম্বার ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও দোকানপাটের নাম ফলক ইংরেজির পরিবর্তে বাংলায় লেখার আন্দোলন সংঘটিত হয়। নিউক্লিয়াসের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বাংলায় লেখার এই মৌলিক কাজটি সুচারুরূপে সম্পন্ন করে ছাত্রলীগ।

২) একই সময়ে প্রথম দেয়াল লিখন (চিকা) ব্যবস্থা চালু হয় ‘নিউক্লিয়াস’-এর সিদ্ধান্তে। যা বাস্তবায়নের জন্য যৌথভাবে দায়িত্ব পালন করে ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়ন।

৩) ১৯৬৬ সালে বঙ্গবন্ধু লাহোরে ছয় দফা ঘোষণা করলে বাঙ্গালীর স্বাধিকার বিষয়টা সামনে চলে আসে এটাই ছিল স্বাধীনতার আন্দোলনের প্রাথমিক ধাপ।বঙ্গবন্ধু যখন ছয় দফা ঘোষণা করেন তখন তার পক্ষে বিপক্ষে বিতর্ক শুরু হয়। আর এই বিতর্ককে পাস কাটিয়ে সে সময়ের ছাত্রলীগের মহানগর সভাপতি কাজী আরেফ আহমেদ সর্বপ্রথম বিবৃতি দিয়ে ছয়দফার প্রতি সমর্থন জানান এবং তার নেতৃতে ঢাকার রাজপথে মিছিল বের করেন। এরপর পরই ছয় দফার প্রতি সমর্থন জানানো শুরু হয় দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে।

৪) শেখ সাহেবকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধি প্রদানের সিদ্ধান্ত গ্রহণ, যা তখনকার ছাত্রলীগের সভাপতি (তোফায়েল আহমদ) কর্তৃক ১৯৬৯ সালে পল্টন ময়দানে ঘোষণা করা হয়।

৫) বাঙ্গালীর জাতীয় রাষ্ট্র হিসেবে ‘বাংলাদেশ’ নামকরণের সমর্থন, যা ১৯৭০ সালে সর্বপ্রথম বঙ্গবন্ধু উত্থাপন করেন।

৬) স্বাধীন বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি’ নির্ধারণ করে নিউক্লিয়াস।

৭) স্বাধীন বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা তৈরী ও প্রদর্শন। ১৯৭০ সনের ৬ই জুন রাতে ইকবাল হলের ১১৬ নম্বর রুমে পতকা প্রস্তুত করা হয় যা পরের দিন পল্টনে বঙ্গবন্ধুর হাতে তুলে দেয়া হয়। এই পতাকাই ১৯৭১ সালের ২রা মার্চ ঢাবি’র কলাভবনের পশ্চিম পাশের ছোট গাড়ি-বারান্দার ছাদের সভা মঞ্চ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে উত্তোলন করেন ডাকসুর তৎকালীন ভিপি আসম আব্দুর রব।

৮) ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সভায় ‘স্বাধীন সমাজতান্ত্রিক বাংলাদেশ’ প্রস্তাব পাস করানো ছিল নিউক্লিয়াসের সিদ্ধান্ত। আর সিদ্ধান্ত মোতাবেক ১৯৭০ সনের ২১শে জুন বলাকা ভবনে ছাত্রলীগের সভায় নিউক্লিয়াসের সদস্য ও ছাত্রলীগের প্রচার সম্পাদক স্বপন কুমার চৌধুরী এই প্রস্তাবক উত্থাপন করেন এবং ৩৬ : ৯ ভোটে প্রস্তাবটি পাস হয়।

৯) ১৯৭১ সালের ৩রা মার্চ পল্টন ময়দানে ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক শাহজাহান সিরাজ কর্তৃক স্বাধীনতার ইশতেহার পাঠ।

১০) সম্ভাব্য মুক্তিযুদ্ধে মুক্তিবাহিনীর সর্বাধিনায়ক হিসেবে আতাউল গনি ওসমানীর নাম বঙ্গবন্ধুকে সুপারিশ করে নিউক্লিয়াস।

১১) ১৯৭০ সালে শ্রমিক শ্রেণীর সংগঠন ‘শ্রমিক লীগ’ গড়ে তোলা।

১২) মরহুম মমতাজ বেগমের নেতৃত্বে ছাত্রীদের নিয়ে ‘প্রীতিলতা ছাত্রী জঙ্গিবাহিনী’ গড়ে তোলা হয়।

১৩) ‘বিপ্লবী বাংলা’ নামে গোপন ও ‘জয় বাংলা’ নামে প্রকাশ্য পত্রিকা এবং বুকলেট, লিফলেট ও পুস্তিকা প্রকাশ।

১৪) প্রবাসী সরকারের ‘জাতীয় উপদেষ্টা পরিষদ’ গঠন।

১৫) ১৯৭১ সালে তৎকালীন রেসকোর্স মাঠে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণে বঙ্গবন্ধুর মুখে উচ্চারিত ‘এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম’ বাক্য সংযোজন করেন নিউক্লিয়াসের নেতৃবৃন্দের সিদ্ধান্তে।

১৬) স্বাধীনতার যাবতীয় প্রচার কর্মকাণ্ড ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নামে’ পরিচালিত হওয়ার সিদ্ধান্ত প্রদান।

১৭) ১১ দফা আন্দোলন পরিকল্পনা এবং এর সাংগঠনিক বিস্তারে ‘নিউক্লিয়াস’-এর নেতৃত্ব ও সংগঠকরা নেপথ্যে মূল ভূমিকা পালন করেছিলেন। ১১ দফা কর্মসূচি প্রণয়ন এবং এ আন্দোলন পরিচালনার জন্য সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের রূপ প্রদানে ‘নিউক্লিয়াস’ নেতাদের ভূমিকাই প্রধান ছিল। ১১ দফায় স্বাক্ষরকারী ছাত্র সংগঠনসমূহ হলো ছাত্রলীগ, ছাত্র ইউনিয়ন (উভয় গ্রুপ), ছাত্র ফেডারেশন (দোলন গ্রুপ) ও ডাকসু। ১১ দফা আন্দোলন চলাকালে গণ-অভ্যুত্থান অনুষ্ঠিত হওয়ার ফলে পূর্ব পাকিস্তানে অবাঙালি অধ্যুষিত প্রশাসনিক ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে। ‘নিউক্লিয়াস’ সংগ্রাম পরিষদের মাধ্যমে বিকল্প সামাজিক শক্তি হিসেবে বিভিন্ন ধরনের ব্রিগেড সারা দেশে গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছিল। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শিল্প প্রতিষ্ঠান, শহর-পাড়া-মহল্লাসহ প্রত্যেক অঞ্চলে এবং থানা পর্যায় পর্যন্ত এর ব্যাপ্তি ছিল। নৈশ প্রহরী, ট্রাফিক ব্যবস্থা, মেইল ট্রেন চালু, লঞ্চ, স্টিমার, নৌবন্দর পরিচালনা, এমসিসি-পাকিস্তান ক্রিকেট খেলা পরিচালনা করা, থানা পর্যায়ে পুলিশ প্রশাসনকে সহায়তা করা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করা, শিল্প কল-কারখানায় উৎপাদন অব্যাহত রাখা ইত্যাদি কার্যক্রম পরিচালনায়ও ব্রিগেডগুলোর ভূমিকা ছিল প্রত্যক্ষ। ছাত্রনেতা আসাদ, কিশোর ছাত্র মতিউর পুলিশের গুলিতে নিহত হলে তীব্র গণ-আন্দোলন গড়ে তোলার পরিকল্পনা প্রণয়ন ও কৌশল নির্ধারণ করে ‘নিউক্লিয়াস’ এবং তা কার্যকর করে ‘ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ’। গণ-আন্দোলন ক্রমেই তীব্র হতে থাকে এবং গণ-অভ্যুত্থানে পরিণত হয়। প্রশাসনিক ব্যবস্থা বিকল হয়ে পড়ে। ফলে আইয়ুব খান পদত্যাগ করে ইয়াহিয়া খানের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে বাধ্য হন।

১৮) ৬ দফা, ১১ দফা এবং আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার আন্দোলনকে এক দফায় রূপান্তর করে স্বাধীনতার বিষয়কে সামনে নিয়ে আসা। এছাড়াও ‘জয় বাংলা’, ‘তুমি কে আমি কে বাঙ্গালী বাঙ্গালী’, ‘তোমার আমার ঠিকানা পদ্মা মেঘনা যমুনা’, ‘পিণ্ডি না ঢাকা?ঢাকা ঢাকা’, ‘ছয় দফা না এক দফা! এক দফা এক দফা’, ‘বীর বাঙ্গালী অস্ত্র ধরো বাংলাদেশ স্বাধীন করো’! ‘স্বাধীন করো স্বাধীন করো বাংলাদেশ স্বাধীন করো’ এই শ্লোগান গুলো নিউক্লিয়াস থেকেই সৃষ্টি যা জনপ্রিয় করা হয় ছাত্রলীগ, শ্রমিক লীগের মাধ্যমে। উপরের আলোচনা থেকে খুব সহজেই এই সিদ্ধান্তে আসা যায় যে, ১৯৬২ সালে গঠিত গোপন সংগঠন স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী পরিষদ বা নিউক্লিয়াসই ধারাবাহিকভাবে স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কাজ করে এসেছে। তাই বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস লিখতে গেলে কোনভাবেই এই নিউক্লিয়াসের ভূমিকা এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। অথচ, বর্তমান আওয়ামীলীগের অনেক নেতাই নিউক্লিয়াসের অস্তিত্ব স্বীকার করতে চান না। এমনকি নিজে বিএলএফ এর সদস্য হয়েও তোফায়েল আহমেদ অস্বীকার করেন স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী পরিষদের কথা। অথচ তিনি ছিলেন মুজিব বাহিনীর চার শীর্ষ নেতার অন্যতম। আসলে স্বাধীনতার পরে আওয়ামীলীগকে স্বাধীনতার একমাত্র দাবীদার হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টাই নিউক্লিয়াসকে আড়াল করার প্রধান কারণ। এছাড়াও এই নিউক্লিয়াস সদস্যদের একটা বড় অংশ স্বাধীনতার পরে একটা জাতীয় সরকার গঠনের আহ্বান জানালে তা প্রত্যাখ্যাত হয় আওয়ামীলীগ ও বঙ্গবন্ধু কর্তৃক। মুজিব বাহিনী ও নিউক্লিয়াসের এই র‍্যাডিকাল অংশটাই পরবর্তীতে জাসদ গঠন করে ব্যাপক জন সমর্থন আদায় করতে সক্ষম হয়। তাই নিউক্লিয়াসের ইতিহাস স্বীকার করলে স্বীকার করে নিতে হবে স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় নবগঠিত রাজনৈতিক দলের জাসদের নেতা কর্মীদের ভূমিকার কথা। এই সব কারণেই মূলত পাদপ্রদীপের আলোয় আসতে পারেনি এই গোপন সংগঠনের নাম। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস যদি ধারাবাহিক ভাবে আলোচনা করতে হয় তাহলে এই সংগঠনের নাম আসবেই। যেমন ছাত্রলীগকে বাদ দিয়ে স্বাধীনতার ইতিহাস লেখা সম্ভব নয়, তেমনি ছাত্রলীগকে পরিচালনার জন্য নিউক্লিয়াসের নামও চলে আসবে, এটাকে অস্বীকার করে স্বাধীনতার ইতিহাস লিখতে গেলে সেটা হবে মিথ্যার বেসাতি সাজানোর মতোই। (চলবে, পরবর্তী পোস্টে সমাপ্ত) কৃতজ্ঞতা : কাজী সালমা সুলতানা (কাজী আরেফ আহমেদের ডায়েরী থেকে তিনিই প্রথম ফেসবুক নোট লিখেন ‘স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী পরিষদ’ শিরোনামে।)

তথ্যসূত্র : ১) শহীদ কাজী আরেফ আহমেদের অপ্রকাশিত ডায়েরী (প্রকাশিতব্য) ২) জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান ও সমাজতন্ত্র : মনিরুল ইসলাম ৩) স্বাধীনতা যুদ্ধে ‘র’ এবং ‘সিআইএ’ : মাসুদুল হক ৪) বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত আসম আব্দুর রব ও প্রয়াত আব্দুর রাজ্জাকের মৃত্যুর পরে স্কোয়াড্রন লিডার এবিএম আহসান উল্লাহ সাহেবের প্রবন্ধ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *