নিভৃত এক মুক্তিযোদ্ধা আদিবাসীর গল্প

সালেক খোকন

১৪ ডিসেম্বর।সারাদেশ পালন করছে বুদ্ধিজীবি দিবস।চারদিকে নানা আয়োজনে উচ্চারিত হচ্ছে ১৯৭১ এ রাজাকার,আল বদর আর আল সামস বাহিনীর কুকিত্তির কাহিনী।দাবী উঠছে যুদ্ধাপরাধিদের বিচারের।এক দিন পরই বিজয় দিবস।ডিসেম্বর তাই শোকের মাস একই সাথে আনন্দের।ডিসেম্বর জাতির সূর্য সন্তানদের গর্জে ওঠার মাস।মুক্তিযোদ্ধাদের শ্রদ্ধা জানানোর মাস।দিনাজপুরের সীমান্তবর্তী উপজেলা বিরল। এখানে চলছে বিজয় উদ্যাপনের নানা আয়োজন।নানা স্লোগানের রঙ চোঙ্গা ব্যানার ঝুলছে সবখানে।ধান বোঝাই বড় লরি আর ছোট ভটভটি গুলোতে পত্ পত্ করে উড়ছে লাল সবুজের পতাকা। ডিসেম্বর তাই পতাকা ওড়ানোর স্বাধীনতার মাস। গ্রামের ছোট হোটেলগুলো যেখান থেকে হরহামেসাই ভেসে আসতো ‘তু চিজ বারী হে মাস্তে মাস্তে’ এর মতো হিন্দী গানের সূর, সেখানে অবিরতভাবে বাজছে ‘জয় বাংলা বাংলার জয়’ মতো মুক্তিযুদ্ধের গান। চা বানাতে বানাতে মাঝ বয়সি আরিফুল জানালো আজ ‘বিরল মুক্ত দিবস’।

এবারই এখানে সরকারীভাবে নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে।পাঁচদিন ব্যাপি বিজয় মেলার পাশাপাশি মুক্তিযোদ্ধাদের সংবর্ধনার জন্য তৈরী হয়েছে বিজয়মঞ্চ।স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের শ্রদ্ধা জানাবে সংসদ সদস্যসহ এখানকার সুধি সমাজ। মুক্তিযুদ্ধের নানা কাহিনী, মুক্তিযোদ্ধাদের নানা দাবীসহ মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে সরকারের নানা পরিকল্পনার কথা জানবে বিরলবাসী। চায়ে চুমুক দিয়ে সকল মুক্তিযোদ্ধারা উপস্থিত থাকবেন কিনা জানতে চাইলে। চা খেতে আসা এক ভদ্রলোক পাশ থেকে বলেন, ‘অনেক অমুক্তিযোদ্ধাও উপস্থিত থাকবেন’।আমি অবাক হলাম।লোকটির পরিচয় জানতেই মুচকি হেঁসে নিজেকে পরিচিত করলেন একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে। যুদ্ধ করেছেন ৭নং সেক্টরে। নাম রবাট আর এন দাস।পরিবারের পাঁচভাইয়ের মধ্যে সবাই মুক্তিযোদ্ধা। বড় ভাই জর্জ জে এম দাস শিব বাড়ী ইয়ুথ ক্যাম্পের দায়িত্বে ছিলেন। সকলের কাছে তিনি জর্জভাই নামে পরিচিত। রবাটের মতো একজন মুক্তিযোদ্ধার সাথে পরিচিত হয়ে নিজেকে বেশ ধন্য মনে হলো। তিনি জানালেন ‘বাঁচার পথ’ নামক একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তিনি এই অঞ্চলের আদিবাসীদের ভাগ্য উন্নয়নের জন্য কাজ করছেন।নানা কথার ফাঁকে রবাট বলতে থাকে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করা নিভৃত ও বঞ্চিত এক মুক্তিযোদ্ধা আদিবাসীর কথা।যিনি শিববাড়ী ইয়ুথ ক্যাম্পে জর্জ জে এম দাস এর কাছ থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে হিলিসহ রামসাগর এলাকায় যুদ্ধ করেছেন।স্বাধীনতার ৩৮ বছর পরেও যিনি পাননি মুক্তিযোদ্ধার কাগুঁজে সনদ। আদিবাসী এই মুক্তিযোদ্ধার নাম থোপান কড়া।রীতি অনুসারেই নিজ নাম থোপান এর শেষে স¤প্রদায়ের নাম ‘কড়া’।রবাটের মুখে অভিমানী এই মুক্তিযোদ্ধার কথা শুনে তার সাথে দেখা করতে রওনা হলাম সীমান্তবর্তী ঝিনাইকুড়ি গ্রামের উদ্দেশ্যে।

এ গ্রামটিতে মূলত নানা আদিবাসী স¤প্রদায়ের বাস।চলার পথেই নানা ভাষাভাষি আদিবাসীর দেখা মিলল। গ্রামটিতে সাঁওতালদের আধিক্য থাকলেও আছে ওরাওঁ,ভুনজার, মুন্ডা পাহানসহ অন্যান্য আদিবাসী স¤প্রদায়। সে হিসেবে গ্রামটিকে আদিবাসী গ্রাম বলাই শ্রেয়্। রবাট থেকে জানা যায় এক সময় এ গ্রামে কড়া স¤প্রদায়ের দু’শটি পরিবারের বসবাস ছিল।কিšত্ত এখন গোটা বাংলাদেশে টিকে আছে এ স¤প্রদায়ের মাত্র ১৯টি পরিবার।এর মধ্যে এ গ্রামেই আছে ১৬টি পরিবার।মূলত ভূমি সংক্রান্ত বিরোধের কারণেই স্বতন্ত্র ধর্ম ও ভাষাভাষির এ সম্প্রদায়ের অধিকাংশ লোকই চলে গেছে ভারতে। পাকা রাস্তা পার হয়ে আমরা নেমে পড়লাম গ্রাম্য পথে।এ রাস্তাটি বেশ অপ্রসস্থ এবং ভাঙ্গাচোড়া। রাস্তার দুদিকে তুতগাছের সারি শেষ হতেই পাড়া আকৃতির একটি ছোট গ্রাম। বিধস্ত কিছু বাড়ী চোখে পড়ল এখানে।এনজিওদের দেয়া একটি পাকা ল্যাট্রিন আর একটি টিউবওয়েলই গ্রামটিতে আধুনিকতার একমাত্র চিহ্ন।এটিই মুক্তিযোদ্ধা থোপানের ‘কড়া’ গ্রাম।

গোত্রের মাহাতো জগেন কড়ার সাথে আমার পৌছে যাই থোপানের বাড়ীতে।ভাঙ্গাচোড়া একটি মাটির ঘর থেকে বের হলো তার স্ত্রী তুলো কড়া আর তিন সন্তান রাকি কড়া,সুমন কড়া,মুক্তা কড়া।আমাদের দেখেই কড়া ভাষায় বলল ‘জোহার’(নমস্কার)। বসতে দেওয়ার মতো কিছু না পেয়ে লজ্জিত ভঙ্গিতে তুলো কড়া ঘরে চলে যায়। খানিকপর ধরে ধরে নিয়ে আসে মুক্তিযোদ্ধা থোপান কড়াকে।তুলো জানায় দুই দিন ধরে জ্বরের সাথে যুদ্ধ করছে সে। কারিতাস থেকে ৪০০০ টাকা ঋণ নিয়ে কেনা ভ্যান গাড়িটিই এ পরিবারটির আয়ের একমাত্র পথ।প্রতিদিন ৮০ থেকে ১০০ টাকা আয় করে তা দিয়েই চলে সংসার।জ্বরের কারণে দুই দিন ভ্যান চালাতে না পারায় কুিড়য়ে আনা কঁচু শাক দিয়েই চলছে তিন বেলা। মুক্তিযোদ্ধা থোপানের পরিবারের অন্যান্য ভাইবোনেরা ২০০১ সালে জমিজমার বিরোধে স্থানীয়দের হুমকির ভয়ে সীমান্তদিয়ে চলে যায় নিকটস্থ ভারতের কুসমন্ডি থানার জামবাড়ী গ্রামে।কিন্ত্ নানা হুমকিতেও মুক্তিযোদ্ধা থোপান দেশ ছাড়েন নি।একইভাবে নিজেকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে পরিচয় দিতে ততটা আগ্রহী নন তিনি।আমাদের অনুরোধের চাপে মলিন মুখে বলতে থাকেন মুক্তিযুদ্ধের নানা কাহিনী।

বাবা পোকুয়া কড়া আর মা ফকনি কড়ার ছয় সন্তানের মধ্যে থোপান কড়া ছিল দ্বিতীয়। রেডিওতে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ শুনে বড় ভাই গোপাল কড়ার সাথে তিনিও দেশ স্বাধীন করার জন্য উজ্জীবিত হয়ে ওঠেন। গোপাল ও গোত্রের আরেক যুবক সাতান কড়া গোপনে আদিবাসীদের যুদ্ধে যাওয়ার প্রচারণা চালাতে থাকে, কড়া ভাষায় সকলকে বলতে থাকে,‘ ‘চালা দেশ স্বাধীন কারোওয়ে, সবইন মিলকে দেশ স্বাধীন কারোওয়ে’।

যুদ্ধ শুরুর পর পরই বড় ভাই গোপাল কড়া যুদ্ধে চলে গেলেও পরিবারের চাপে তখন থোপান যেতে পরেনি।কিন্ত দেশের স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধে যাওয়ার জন্য তাঁর মন আনচান করতে থাকে।যুদ্ধের মাঝামাঝি সময়ে মার কাছে নানী বাড়ী বেড়াতে যাওয়ার নাম করে থোপান পালিয়ে চলে যান মুক্তিযুদ্ধে। শিববাড়ী ইয়ুথ ক্যাম্পে ট্রেনিং নিয়ে ৭নং সেক্টরের অধীনে কমান্ডার ইদ্রিস আলীর নেতৃতে তিনি হামজাপুর ক্যাম্প থেকে হিলিসহ নিকটবর্তী গ্রামগুলোকে শত্র“মুক্ত করার জন্য যুদ্ধ করেন।মুক্তিযুদ্ধের সময়ের নানা কাহিনী বলতে গিয়ে থোপানের চোখ বার বার ভিজে যাচ্ছিল।দেশের জন্য যুদ্ধ করতে গিয়ে কতদিন না খেয়ে কাটিয়েছেন, কতরাত কাটিয়েছেন ডোবার পানির মধ্যে,ঘুমিয়েছেন গোরস্থানে।যুদ্ধের সময়ে সহযোদ্ধাদের মৃত্যু যন্ত্রণা দেখেছেন কাছ থেকে।হানাদার আর রাজাকার বাহিনীর অত্যাচারের কথা শুনে থোপান নিজের পরিবারের কথা মনে করে কতইনা কষ্ট পেয়েছেন।সহযোদ্ধা খলিল,কবির,রফিক,নুয়ন,নুরু মিলে একটি গ্রামকে শত্র“মুক্ত করার কথা বলতে গিয়ে মুক্তিযোদ্ধা থোপান কড়া আবেগ তারিত হয়ে পরেন।১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর দিনাজপুর স্টেডিয়ামে অস্ত্র জমা দিয়ে থোপান কড়া ফিরে আসে নিজেদের কৃষিকাজে ।

মুক্তিযুদ্ধের সময় আদিবাসী-বাঙালি একসাথে যুদ্ধ করলেও স্বাধীনের পর সব কিছু বদলে যেতে থাকে।থোপান আক্ষেপ করে বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন হলো আর আমরা হয়ে গেলাম সংখ্যালঘু আদিবাসী স¤প্রদায়’।ভূমি নিয়ে চলে নানা ঘটনা। কিছুদিন আগেও গোত্রের অন্ত কড়াকে স্থানীয়দের হুমকির মুখে দেশ ছাড়তে হয়েছে।থোপান বলে স্বাধীনের পর এ দেশ মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে ‘হামে নাহি খোজেয়ে’। সনদপত্রের কথা জানতে চাইলে জানা যায়, যুদ্ধে অংশগ্রহণের যে কাগজপত্র তার ছিল তা দিয়ে পরবর্তীতে মুক্তিযোদ্ধা সনদ গ্রহণের নিয়ম,পদ্ধতি ও সুবিধা লাভের বিষয়টি ছিল তার কাছে বেশ অস্পষ্ট।সীমান্তবর্তী গ্রামের এই মুক্তিযোদ্ধার চিন্তায় ছিল, ‘কাগুঁজে এই সনদ দিয়ে কি ্হবে’। তাই অযতেœ পড়ে থাকা কাগজপত্রগুলো বন্যার পানিতে ভেসে যায়।শুধু মুক্তিযুদ্ধ আর বঙ্গবন্ধু বেঁচে থাকে থোপানের মনে।আজও এই স্বাধীন দেশে প্রতিটি দিনই তার কাটাতে হয় জীবযাপন আর গোত্র টিকিয়ে রাখার যুদ্ধে।নিজেকে পরিচয় দেন না মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে।মুক্তিযুদ্ধ করার বিপরীতে সুবিধা লাভে তিনি আগ্রহী নন। তিনি বলেন ‘যুদ্ধ করেছি দেশের জন্য, শুধু চাই স্বাধীন দেশে নিজের অধিকারটুকু নিয়ে বেঁচে থাকতে’।

মুক্তিযোদ্ধা এই আদিবাসীর সাথে যতই কথা বলছিলাম ততই তার প্রতি শ্রদ্ধায় আমাদের মাথা নত হচ্ছিল।কাগুঁজে সনদ না থাকায় কোন ডিসেম্বরেই থোপানের মতো মুক্তিযোদ্ধারা সম্মানিত হন না।এদেশে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা তৈরী হয়নি অদ্যাবধি।যার উদ্যোগ নেয়ার প্রয়োজন ছিল যুদ্ধের পর পরই। অথচ অবাক আর লজ্জিত হতে হয় যখন দেখা যায় অমুক্তিযোদ্ধা আর রাজাকারেরাও মুক্তিযোদ্ধা ভাতা নিচ্ছেন, পাচ্ছেন মুক্তিযোদ্ধার সন্মান।

এদেশে সরকার পরিবর্তনের পর পরই পরিবর্তীত হয় মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা। সে সুযোগে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সনদপত্র পায় অমুক্তিযোদ্ধা ও রাজাকারেরাও। ফলে স্বাধীনতার পর নানা দলে বিভক্ত হয়ে পড়ছে জাতির সূর্য সন্তানেরা।মুক্তিযুদ্ধের ৩৮ বছর পরেও এদেশে থোপান কড়ার মতো নিভৃত, বঞ্চিত,ত্যাগী ও অভিমানী মুক্তিযোদ্ধাদের খুঁজে পাওয়া যায়।যাদের কোন কাগুজে সনদ নেই।আছে দেশের জন্য বুকভরা ভালবাসা।তাই দেশের স্বার্থে, জাতির স্বার্থে থোপান কড়াদের মতো মুক্তিযোদ্ধা, আদিবাসী মুক্তিযোদ্ধাদের খুঁজে বের করা প্রয়োজন।শোনা যাচ্ছে এ সরকার প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা তৈরীর উদ্যোগ নিবে।সে তালিকায় থোপান কড়াদের মতো মুক্তিযোদ্ধা আদিবাসীদের কি ঠাঁই হবে। মুক্তিযোদ্ধার কাঁগুজে সনদ পাওয়া না পাওয়ার দোলায় এভাবেই হয়তো একদিন নিভে যাবে একজন সূর্য সন্তানের জীবন প্রদীপ|

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *