নির্মাণ কাজের উদ্বোধন : মেট্রোরেলের শুভ­­যাত্রা

উত্তরা থেকে মাত্র ৩৮ মিনিটে যাত্রীদের মতিঝিল পৌঁছে দেওয়ার স্বপ্ন নিয়ে শুরু হয়েছে মেট্রোরেলের অবকাঠামো নির্মাণকাজ। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত ২৬ জুন বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে এক অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে এই কাজের উদ্বোধন করেন। একই সাথে বাস র‌্যাপিড ট্রানজিটের (বিআরটি) নামে আরেকটি প্রকল্পের কাজও তিনি উদ্বোধন করেন। গাজীপুরের জয়দেবপুর থেকে বিমানবন্দর পর্যন্ত ২০ কিলোমিটার পথ ৪০ মিনিটে পৌঁছানোর স্বপ্ন নিয়ে শুরু হয় বিআরটি প্রকল্প।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের দীর্ঘদিনের একটি স্বপ্ন পূরণ হতে চলেছে। তিনি বলেন, ঢাকা শহরে যে রাস্তা থাকার কথা, তা নেই। অন্যদিকে মানুষের আর্থ-সামাজিক উন্নতি হওয়ায় গাড়ি কেনার ক্ষমতাও বাড়ছে। আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থার মাধ্যমে অনেক মানুষের যাতায়াত সহজ করার জন্য কাজ করতে হবে। ঢাকা শহরের যোগাযোগ ব্যবস্থাকে উন্নত ও সহজ করতে সরকার কাজ করে যাচ্ছে।
জাপানের আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (জাইকা) অর্থায়নে রাজধানীর উত্তরা ফেজ-৩ থেকে মতিঝিলের শাপলা চত্বর পর্যন্ত ২০ দশমিক ১ কিলোমিটার দীর্ঘ মেট্রোরেল (এমআরটি-৬ প্রকল্প) নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। ২০১৩ সালের ১০ নভেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রকল্পটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন। প্রায় আড়াই বছর পর শুরু হলো নির্মাণকাজ। প্রকল্প পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০১৯ সালে উত্তরা থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত যাত্রী পরিবহন শুরু হবে। ২০২০ সালে মতিঝিল পর্যন্ত কাজ শেষ হবে।
শেখ হাসিনা জানান, রাজধানীর যানজট পরিস্থিতি বিবেচনা করে ঢাকা ম্যাস র‌্যাপিড ট্রানজিট (এমআরটি) প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। ২০২০ সালের মধ্যে উত্তরা থেকে বাংলাদেশ ব্যাংক পর্যন্ত মেট্রোরেল চলবে। প্রধানমন্ত্রী সড়ক ও সেতুমন্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে বলেন, ২০১৯ সালেই যেন উত্তরা থেকে আগারগাঁও নয়, ফার্মগেট পর্যন্ত মেট্রোরেল চলাচল করে।
মেট্রোরেল নির্মাণে ব্যয় হবে ২১ হাজার ৯৮৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা) দেবে ১৬ হাজার ৫৯৪ কোটি টাকা। ৪০ বছরে পরিশোধযোগ্য এই ঋণের সার্ভিস চার্জ দশমিক শূন্য ১ শতাংশ। এর মধ্যে রেয়াতকাল থাকছে ১০ বছর। বাকি টাকা জোগান দেবে সরকার। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে প্রকল্পটির জন্য ২ হাজার ২২৭ কোটি টাকা বরাদ্দ রেখেছে সরকার।
মেট্রোরেলের ২০ কিলোমিটারের পুরোটা হবে উড়াল সেতুর ওপর (এলিভেটেড)। উত্তরার ফেজ-৩ থেকে মতিঝিল পর্যন্ত ১৬টি স্টেশন থাকবে। এর নকশা চূড়ান্ত হয়েছে। দিল্লির মেট্রোরেল আনন্দ হাবের নকশাকারী যুক্তরাজ্যের জন ম্যাকআসলান পার্টনারস আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার মাধ্যমে কাজ পেয়েছে। মুসলিম স্থাপত্য রীতিতে চাঁদোয়ার মতো শামিয়ানা ওপর থেকে নিচে নেমে আসবে প্ল্যাটফর্মের ওপর। যা স্টেশনে সূর্যের আলো আসতে সহায়তা করবে। রাস্তার ওপর হবে এসব স্টেশন। স্টেশনগুলো ঢাকার নতুন পরিচয় সৃষ্টি করবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, মেট্রোরেল প্রতি ঘণ্টায় উভয় দিকে ৬০ হাজার যাত্রী পরিবহন করবে। উত্তরা থেকে বাংলাদেশ ব্যাংক পর্যন্ত মাত্র ৩৮ মিনিটেই পৌঁছাতে পারবে।
প্রধানমন্ত্রী আশা প্রকাশ করেন, এই প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে ঢাকার গণপরিবহনের চিত্র পাল্টে যাবে। তিনি ঢাকার চারদিকে বৃত্তাকার সড়ক, রেলপথ ও নৌপথ গড়ে তোলারও ঘোষণা দেন। তিনি জানান, আরও দুটি মেট্রোরেল নির্মাণের সম্ভাব্যতা যাচাই করছে জাইকা।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, গাজীপুর থেকে কেরানীগঞ্জের ঝিলমিল পর্যন্ত ৪২ কিলোমিটার দীর্ঘ এমআরটি-১ নির্মাণ করা হবে। প্রথম পর্যায়ে বিমানবন্দর থেকে কমলাপুর এবং খিলক্ষেত থেকে পূর্বাচল পর্যন্ত প্রায় ২৭ কিলোমিটার কাজ হবে। এর মধ্যে ১০ কিলোমিটার হবে পাতাল রেল। এমআরটি-৫ হবে নারায়ণগঞ্জের ভুলতা থেকে গাবতলী পর্যন্ত। এর দৈর্ঘ্য হবে ৩৫ কিলোমিটার। ভাটারা থেকে গাবতলী-হেমায়েতপুর পর্যন্ত ১৭ কিলোমিটারের কাজ হবে প্রথম পর্যায়ে। এর মধ্যে ৬ কিলোমিটার হবে পাতাল রেল।
একই অনুষ্ঠানে বাসের জন্য পৃথক লেন নির্মাণে বিআরটির নির্মাণ কাজেরও উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, গাজীপুর থেকে শাহজালাল বিমানবন্দর পর্যন্ত বিআরটি রুট চালু হলে টঙ্গী ও উত্তরার সাথে ঢাকা মহানগরীর যাতায়াত সহজতর হবে। দ্রুত ও সাশ্রয়ীভাবে যাত্রী পারাপারের পাশাপাশি আরামদায়ক সেবা নিশ্চিত করা যাবে। রাজধানী ঢাকাকে যানজটমুক্ত করাও অনেকাংশে সহজ হবে বলেও আশা প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী।
২০ কিলোমিটার দীর্ঘ বিআরটিতে ২৫টি বাস স্টেশন থাকবে। বাস চলাচল নির্বিঘœ করতে ৬টি ফ্লাইওভার নির্মাণ করা হবে। বিদ্যমান সড়কেই বিআরটির লেন নির্মাণ করা হবে। তবে উত্তরা থেকে টঙ্গীর চেরাগআলী পর্যন্ত সড়ক সরু হওয়ায় সাড়ে ৪ কিলোমিটার এলিভেটেড (উড়াল পথ) বিআরটি লেন থাকবে। বিআরটি লেনে চলাচল করবে ১৮ মিটার দৈর্ঘ্যরে ১০০টি আর্টিকুলেটেড বাস। প্রতি ঘণ্টায় ২৫ হাজার যাত্রী পারাপার সম্ভব হবে বিআরটিতে। এই প্রকল্পে ব্যয় হবে ২ হাজার ৪০ কোটি টাকা। ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে বিআরটি চালু করা সম্ভব হবে বলে সরকারের পক্ষ থেকে আশা করা হচ্ছে।
ঢাকা-চট্টগ্রামের মতো ঢাকা-সিলেট মহাসড়কও চার লেনে উন্নীত করার ঘোষণা দেন প্রধানমন্ত্রী। ঢাকা থেকে উত্তরবঙ্গ মহাসড়কও (হাটিকুমরুল-রংপুর) চার লেনে উন্নীত করার কাজ শিগ্গির শুরু হবে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী। শেখ হাসিনা বলেন, গত সাত বছরে তার সরকারের সময় ১৪টি বড় সেতুসহ ৫ হাজার মাঝারি ও ছোট সেতু হয়েছে। নতুন সড়ক নির্মিত হয়েছে ২১ হাজার কিলোমিটার।
শুধু অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ নয়, প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথেও যোগাযোগে গুরুত্ব আরোপ করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, বাংলাদেশ, ভুটান, ভারত ও নেপালের (বিবিআইএন) মধ্যে মোটর ভেহিক্যাল চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছে। বাংলাদেশ, চীন, ভারত ও মিয়ানমারের (বিসিআইএম) মধ্যে অর্থনৈতিক করিডোরের চুক্তি স্বাক্ষরের বিষয়টিও তুলে ধরেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী জানান, কর্ণফুলী টানেল ও নারায়ণগঞ্জের তৃতীয় শীতলক্ষ্যা সেতুর নির্মাণকাজ বাস্তবায়নাধীন। ঈদের আগেই উদ্বোধন করা হবে ঢাকা-ময়মনসিংহ এবং ঢাকা-চট্টগ্রাম চার লেন।
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, সড়ক সচিব এমএনএন ছিদ্দিক, বাংলাদেশে নিযুক্ত জাপানের রাষ্ট্রদূত মাসাতো ওয়াতানাবে প্রমুখ। উপস্থিত ছিলেন মন্ত্রিপরিষদের সদস্য, এমপি, রাজনীতিক ও কূটনীতিকরা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *