‘নির্যাতিত বলে অস্পৃশ্য মনে করে সবাই’ : বীরাঙ্গনা বেলা রানী

গত ২০১৫ সালের ১৬ ডিসেম্বর কুমিল্লা জেলা প্রশাসন ও জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড ১৫ জন নির্যাতিত মাকে খুঁজে বের করেন। তাদের দেয়া হয়েছে মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি।

জীবনের বেশিরভাগ সময়ই এদের কেটেছে দুর্বিষহভাবে। না রাষ্ট্র, না সমাজ কেউ খোঁজ রাখেনি এ দেশ, এদেশের পতাকা অর্জনের পেছনের এই আত্মত্যাগকারীদের। তাদেরই একজন মুরাদনগর উপজেলার নগরপাড় গ্রামের মৃত নরেন্দ্র চন্দ্র দাসের স্ত্রী বেলা রানী দাস।

একত্তরের অপমান আর বঞ্চনার কথা বলতে গিয়ে এই মা জানান, ৪৪ বছর ধরে অভাব-অনটন, রোগ-শোকে ভুগছেন তিনি। মুক্তিযুদ্ধে হারিয়েছেন ইজ্জত, স্বামী এবং সাজানো সংসারও।

২০১৫ সালে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি মিলেছে তার। পেয়েছেন সরকারি জমিও। কিন্তু জায়গা দিয়ে কি লাভ। দুই বেলা খেয়েপড়ে বেঁচে থাকতে তার দরকার অর্থের। তাই মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে মাসিক সম্মানী ভাতা চান বেলা রানী দাস (৬৫)।

বেলা রানী স্বামীর মৃত্যুর পর আর বিয়েও করেননি। নিঃসন্তান এই মুক্তিযোদ্ধা বাবা-মার সংসারেই রয়ে গেছেন সারা জীবন। ৪-৫ বছর আগে বাবা-মা মারা যান। বর্তমানে ভাইয়ের সংসারে থাকছেন তিনি। স্বাধীনতার ৪৪ বছরে এসে ৭ মাস আগে তিনি মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছেন। বেলা রানী জানান, বিয়ের এক বছর যেতে না যেতেই শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ। যুদ্ধের ডামাডোলের সময় দেশ ছিল উত্তাল। তখন কোনো একদিন পাকিস্তানি সেনারা তার স্বামীকে বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে হত্যা করে। তাকে হত্যার পর বেলার ওপর নেমে আসে অমানবিক নির্যাতন। যে নির্যাতনের কথা মনে পড়লে এখনো বেলার দুচোখ জলে ভিজে ওঠে। তারপর শুরু হয় বঞ্চনার গল্প। যে বঞ্চনা আজ অবধি চলছে। দেশ স্বাধীন হলেও ভালো নেই তিনি। নানা রোগে ভুগছেন, কিন্তু সামর্থ্যরে অভাবে চিকিৎসা করাতেও পারছেন না।

তিনি আরো জানান, ৪৪ বছর কেটে গেছে এতদিন তার খোঁজ নেয়নি কেউ। গত বছর মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি পাওয়ার পর সরকার তাকে ৪ শতক জমি বরাদ্দ দিয়েছে। যেখানে একটি ঘরও নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছিল। কিন্তু কাজ অর্ধেক শেষ না হতেই ঠিকাদার চলে গেছে। ফলে ঘরটির নির্মাণাধীন অবস্থায় পড়ে আছে। তা ভেবে দিশাহারা লাগছে বেলার। কারণ যেখানে তার দুবেলা খাবারই জোটে না। সেখানে বাড়ি নির্মাণের কাজ শেষ করবেন কি করে?

তিনি জানান, একাত্তরে নির্যাতিত হয়েছি বলে, সমাজের লোকজন খারাপ দৃষ্টিতে দেখে, নোংরা ভাষায় গালি দেয়। কখনো গোপনে কখনো প্রকাশ্যে ধিক্কার দেয়। নির্যাতিত নারী বলে অচ্যুত মনে করে দূরে ঠেলে রাখে তাকে সবাই।

৪৪ বছর আগে তার জীবনে ঘটে যাওয়া অপমানের জন্য ঘৃণা-ক্ষোভ কম নেই এই মায়ের। এর পর রাজাকারদের বিচার হচ্ছে জেনে খুশি হয়েছেন বলে জানালেন তিনি। তবে সব রাজাকারের ফাঁসি হলে শান্তি পাবেন। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ঘাপটি মেরে থাকা ছোট রাজাকার বড় রাজাকার সবার শাস্তি হোক। কারণ ওই রাজাকাররাই তো তার মতো নারীদের জীবন থেকে সুখ-শান্তি-সংসার কেড়ে নিয়েছিল। তছনছ করে দিয়েছিল সব আশা-ভরসা। ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি আরো বলেন, দীর্ঘ সময় পর হলেও যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শুরু হওয়ায় তিনি তাই আশায় বুক বেঁধে আছেন। তাদের কাউকে যেন রেহাই দেয়া না হয়।

স্বামীর মৃত্যুর পর থেকে সারাজীবন নিঃসঙ্গ বেলা অনাহারে অর্ধাহারে থাকতে থাকতে শরীরে নানা রোগ বাসা বেঁধেছে। শরীর দুর্বল হয়ে পড়েছে। ঠিকমতো হাঁটাচলা করতে পারেন না। কাজ করতে পারেন না। টাকার অভাবে ডাক্তারও দেখাতে পারেন না।

স্বাধীন বাংলাদেশের তথাকথিত সমাজের চোখে অস্পৃশ্য! এই অবস্থার দায় কার তা সরকারের কাছে জানতে চান বেলা রানী দাস। বেলার চাওয়া তাদের ইজ্জতের বিনিময়ে পাওয়া এই স্বাধীন দেশে মানুষের কাছে একটু ভালো ব্যবহার আশা করা কি খুব অন্যায় হবে?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *