নৌকা মানুষকে বঞ্চিত করে না

প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা গত ১২ নভেম্বর বৃহস্পতিবার বগুড়ায় বিশাল জনসমুদ্রে দাঁড়িয়ে বলেছেন, নির্বাচন বানচাল ও আন্দোলনের নামে শত শত মানুষকে পুড়িয়ে হত্যা করে খালেদা জিয়া ও তার কুলাঙ্গার পুত্র দেশের মানুষের কাছে ‘খুনি’ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছেন। দেশকে জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে ও মানুষকে হত্যার পর এখন উনি (খালেদা জিয়া) বিদেশে বসে বিদেশিদের হত্যা করে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণœ করছেন। মুচলেকা দিয়ে বিদেশে পালিয়ে থাকা পুত্রের সাথে বসে দেশে আবারও মানুষ হত্যা, জঙ্গি-সন্ত্রাসী, বাংলাভাই সৃষ্টি করে দেশকে সন্ত্রাসী রাষ্ট্র বানানোর ষড়যন্ত্র করছেন। কিন্তু দেশের মানুষ শান্তিতে বিশ্বাস করে। তাই তারা যতই চেষ্টা বা ষড়যন্ত্র করুক, দেশের বর্তমান অগ্রযাত্রাকে কেউ পেছনে টেনে রাখতে পারবে না। হত্যাকারী, খুনি, সন্ত্রাসী, জঙ্গিদের স্থান বাংলাদেশে হবে না। সন্ত্রাসী রাষ্ট্র নয়; বরং দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশ শান্তিময় দেশ হিসেবেই এগিয়ে যাবে।
দেশবাসীকে সজাগ ও সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, হত্যা, সন্ত্রাস আর দুর্নীতি ছাড়া খালেদা জিয়া দেশের মানুষকে কিছু দিতে পারেন নি। নির্বাচনে না এসে উনি পুড়িয়ে মানুষ খুন করেছেন। কেউ রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিতে ভুল করলে তার খেসারত তার দলকেই দিতে হয়। কিন্তু বিএনপি নেত্রী তার দায় জনগণের ওপরে চাপাতে চান। বগুড়াবাসীকে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, খালেদা জিয়া এসব সন্ত্রাসী কর্মকা- না করলে বাংলাদেশ ২০২১ সালের অনেক আগেই মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হবে। তাই আপনারা (বগুড়াবাসী) আপনাদের পুত্রবধূকে (খালেদা জিয়া) বলুনÑ উনি যেন আর মানুষকে পুড়িয়ে হত্যা না করেন। আর তার কুলাঙ্গার পুত্রকে (তারেক রহমান) বলবেনÑ বিদেশে পালিয়ে থেকে যেন আর মানুষ হত্যা না করান।
বগুড়ায় আলতাফুন্নেসা খেলার মাঠে জেলা আওয়ামী লীগ আয়োজিত লাখো মানুষের বিশাল জনসভায় প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। বগুড়ার সাম্প্রতিক ইতিহাসে বিশাল এই জনসমুদ্রে প্রধানমন্ত্রী জেলার মানুষের প্রাণের দাবি একটি বিশ্ববিদ্যালয় এবং সিরাজগঞ্জ-বগুড়া রেললাইন স্থাপনের ঘোষণা দিয়ে বলেন, নৌকা কখনও দেশের মানুষকে বঞ্চিত করে না; বরং দিতে আসে। এই নৌকাই বাংলাদেশকে স্বাধীনতা দিয়েছে। নৌকা সরকার গঠন করলে সমগ্র দেশের উন্নয়ন হয়। আর বিএনপি ক্ষমতায় এলে দুর্নীতি, মানুষ হত্যা ও লুটপাটে ব্যস্ত থাকে বলেই তাদের আমলে দেশের কোনো উন্নয়ন হয় না।
প্রায় ১১ বছর পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বগুড়ায় রাজনৈতিক জনসভায় উপস্থিত হন। তার আগমন উপলক্ষে পুরো বগুড়াকে সাজানো হয়েছিল বর্ণাঢ্য সাজে। তাকে একনজর দেখতে এবং প্রত্যাশা-প্রাপ্তির হিসাব মেলাতেই অকল্পনীয় মানুষের ঢল নেমেছিল বগুড়া শহরের আলতাফুন্নেসা খেলার বিশাল মাঠে। শুধু দলীয় নেতাকর্মীরাই নন, হাজার হাজার স্বতঃস্ফূর্ত সাধারণ মানুষের উপস্থিতিতে জনসভাস্থল ছাপিয়ে ২ বর্গকিলোমিটার এলাকার কোথাও তিলধারণের ঠাঁই ছিল না। মানুষের ¯্রােতে দুপুর ১২টার পর থেকে পুরো বগুড়া শহর রীতিমতো স্তব্ধ হয়ে যায়। পুরো শহরই পরিণত হয়েছিল মিছিলের নগরীতে।
স্থান সংকুলান না হওয়ায় জনসভাস্থলের প্রায় ৪ গুণ মানুষ বাইরে টানানো বড় বড় ডিজিটাল ব্যানার ও মাইকের সামনে দাঁড়িয়েই প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য শুনতে দেখা যায়। বিপুল মানুষের ¯্রােত সামলাতে নিরাপত্তা বাহিনীকে রীতিমতো হিমশিম খেতে হয়।
জনসভায় উপস্থিত লাখো মানুষকে হতাশ করেন নি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বিএনপির দুর্গে অবহেলা নয়; বরং উন্নয়নের ঝাঁপি খুলে দেন তিনি। বগুড়া জেলায় প্রায় ৯১৮ কোটি টাকা ব্যয়ে ১৯টি উন্নয়ন প্রকল্পের উদ্বোধন এবং ১৫টি নতুন প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। একই সাথে জেলার মানুষের প্রাণের দাবি অনুযায়ী বগুড়ায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন, বঙ্গবন্ধু যমুনা সেতু থেকে বগুড়া হয়ে রংপুর পর্যন্ত রেললাইন স্থাপনের ঘোষণা দেন প্রধানমন্ত্রী। প্রধানমন্ত্রীর এই ঘোষণার সময় কান ফাটানো স্লোগান এবং করতালির মাধ্যমে লাখো বগুড়াবাসী তাদের উচ্ছ্বাস ও আনন্দের বহিঃপ্রকাশ ঘটান।
সকালে হেলিকপ্টারযোগে ঢাকা থেকে রওনা হয়ে প্রধানমন্ত্রী প্রথমে আসেন বগুড়া সেনানিবাসে। শহীদ বদিউজ্জামান প্যারেড গ্রাউন্ডে ১২ ল্যান্সারকে ন্যাশনাল স্ট্যান্ডার্ড (জাতীয় পতাকা) প্রদান অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন। অনুষ্ঠান শেষে বিকেল পৌনে ৩টায় বগুড়া আলতাফুন্নেসা খেলার মাঠে জেলা আওয়ামী লীগ আয়োজিত জনসভায় যোগদান করেন। জনসভায় উপস্থিত হয়েই প্রধানমন্ত্রী ৯১৮ কোটি টাকা ব্যয়ে নবনির্মিত চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত ভবন, আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিস, বিদ্যুৎ উপকেন্দ্রসহ ১৯টি প্রকল্পের উদ্বোধন এবং ১৫টি নতুন প্রকল্পের ভিস্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন।
জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মমতাজ উদ্দীনের সভাপতিত্বে ও সাধারণ সম্পাদক মজিবুর রহমান মজনুর পরিচালনায় জনসভায় বক্তব্য রাখেনÑ আওয়ামী লীগের সভাপতিম-লীর সদস্য ও স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম এমপি, সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক ও বগুড়া-১ আসন থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য আবদুল মান্নান, সাংগঠনিক সম্পাদক আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপন এমপি, খালিদ মাহমুদ চৌধুরী এমপি, প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম এমপি, ইসমাত আরা সাদেক এমপি, রাজশাহীর সাবেক মেয়র এইচএম খায়রুজ্জামান লিটন, হাবিবুর রহমান এমপি, স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদক পংকজ দেবনাথ, কৃষক লীগের শামসুল হক রেজা, শ্রমিক লীগের সিরাজুল ইসলাম, যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ড. সিদ্দিকুর রহমান, যুবলীগের আবু আহম্মেদ নাসিম পাভেল, যুব মহিলা লীগের নাজমা আখতার, অধ্যাপিকা অপু উকিল, ছাত্রলীগ সভাপতি সাইফুর রহমান সোহাগ, সাবেক এমপি তানভীর শাকিল জয়, মাহমুদ হাসান রিপন, জেলা আওয়ামী লীগ নেতা রাগেবুল আহসান রিপু, টি জামান নিকেতা, মঞ্জুরুল আলম মোহন, আসাদুর রহমান দুলু, ডা. রেজাউল আলম জুয়েল, অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম, মঞ্জুরুল ইসলাম মঞ্জু, সাগর কুমার রায়, রফিনেওয়াজ খান রবিন, শুভাশীষ পোদ্দার লিটন, অসীম কুমার সাহা প্রমুখ।

‘সাহসী হলে সন্ত্রাসীরা পরাজিত হবেÑ এগিয়ে আসুন’
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়ার জাতীয় সংলাপের আহ্বান নাকচ করে দিয়ে বলেছেন, এত দৈন্যদশায় বাংলাদেশ পড়েনি, এত রাজনৈতিক সংকট পড়েনি যে, এ ধরনের একজন খুনির সাথে বসতে হবে। দয়া করে আমাকে ওই (খালেদা জিয়া) খুনির সাথে বসতে বলবেন না। উনার সাথে বসলেই পোড়া মানুষের গন্ধ পাব। যার হাতে মানুষ পোড়ে, তার সাথে সংলাপের ইচ্ছে আমার নেই। আর যারা ওই সংলাপের কথা বলছেন তাদের বলবÑ এ কথা বলার আগে বিএনপি নেত্রী বলুক যুদ্ধাপরাধীদের বিচার উনি সমর্থন করেন। উনি বলুকÑ একাত্তরে গণহত্যাকারী যুদ্ধাপরাধীদের যে বিচার হচ্ছে, তা সঠিক হচ্ছে। যুদ্ধাপরাধী ও জামায়াতের সঙ্গ ছাড়–ক, তারপরই সংলাপের বিষয়টি দেখা যাবে। প্রধানমন্ত্রী স্পষ্ট ভাষায় জানান, মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিতে সরকার কঠোর অবস্থানে। তিনি নিজের জীবনের হুমকিকে পরোয়া না করার কথা উল্লেখ করে বলেন, যে কোনো পরিস্থিতি সাহসের সাথে মোকাবিলা করতে হবে। জনগণকে সাহসের সাথে এগিয়ে আসতে বলেন তিনি। সাহসী হলে সন্ত্রাসীরা পরাজিত হবে।
বাংলাদেশকে ‘আফগানিস্তান, সিরিয়া বা পাকিস্তানের’ মতো ব্যবহার করার জন্য সম্প্রতি ঘটে যাওয়া হত্যা ও হামলার পেছনে আইএস বা জঙ্গিগোষ্ঠী জড়িত থাকার স্বীকারোক্তি দিতে ‘চাপ’ থাকার কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশকে যে কোনোভাবে অনিরাপদ প্রমাণে ‘আর্টিফিসিয়ালি’ এসব হত্যা-হামলা ঘটানো হচ্ছে। বাংলাদেশে আইএস আছে এটি প্রমাণ করতে চাইছে। বাংলাদেশকে সিরিয়া, মিসর, ইরাক, আফগানিস্তান ও পাকিস্তান বানানোর জন্য আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের পাশাপাশি দেশীয় ষড়যন্ত্রও আছে। গত ৮ নভেম্বর গণভবনে আয়োজিত জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশে আইএস-জঙ্গি আছে প্রমাণ করা গেলে বাংলাদেশে কী ঘটতে পারে, তা দেশবাসীকে অনুধাবন করার আহ্বান জানিয়ে বলেন, সিরিয়ায় কী হচ্ছে? লিবিয়া, ইরাক ও আফগানিস্তানে কী হচ্ছে? এসব দেশে যা হচ্ছে, তারা বাংলাদেশেও সেই অবস্থা সৃষ্টি করতে চায়। তিনি বলেন, বাংলাদেশে তেমন অবস্থা সৃষ্টি হোক, তা আমাদের সরকারের কাম্য নয়। প্রচ- চাপ আছে যে আমরা কেন স্বীকার করি না। আমরা দেখতে পাচ্ছি কে এবং কারা এসব করছে। আমাদের যে সমাজ, তাতে সবাই চেনা।
তিনি বলেন, যারা ধরা পড়ছে তারা একটি বিশেষ দলের সাথে সম্পৃক্ত। হয়তো ছাত্রজীবনে শিবির করেছে নয়তো ছাত্রদল করেছে। আর কাউকে তো দেখছি না। বাংলাদেশ যখন এগিয়ে যাচ্ছে তখনই ‘অনিরাপদ অনিরাপদ’ বলে চিৎকার করা হচ্ছে। তাদের আরও পরিকল্পনা আছে। তারা অনেকদূর এগোতে চায়। যারা বলছে বাংলাদেশ নিরাপদ নয়, তাদের সাথে সুর মিলিয়ে অনেকে বাংলাদেশকে অনিরাপদ করতে চায়। তিনি বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় একজন মুসলমান আরেকজন মুসলমানকে মারছে। সূত্রটা কার? ক্রীড়ানক কে? খেলছে কে? এটা সবাইকে উপলব্ধি করতে হবে। বাংলাদেশের মানুষ অসাম্প্রদায়িক। কিন্তু আশুরার আগের রাতের বোমা হামলার ঘটনাকে ‘শিয়া-সুন্নীর গোলমাল’ হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছে। অথচ যে দুজন মারা গেছেন তারা সবাই সুন্নী। এ সময় তিনি বলেন, আমি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে স্পষ্ট কথা বলছি। কারণ আমি দেশকে ভালোবাসি। আমি আমার বাবার সন্তান। বাবা-মা, ভাই সবাইকে হারিয়েছি। আমার চাওয়া-পাওয়ার কিছু নেই। তাই কোনো হুমকি-ধমকিকে পরোয়া করি না।
নেদারল্যান্ডস সফরের সফলতা, অর্জন ও অভিজ্ঞতা তুলে ধরতে এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হলেও দেশের সর্বশেষ রাজনৈতিক পরিস্থিতি, দুই বিদেশিসহ লেখক-প্রকাশক-পুলিশ হত্যা, বাংলাদেশকে জঙ্গি রাষ্ট্র বানাতে দেশি ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র এবং অ্যামনেস্টির বিবৃতিসহ নানা ইস্যুতে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন প্রধানমন্ত্রী। সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর সাথে মঞ্চে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও জনপ্রশাসনমন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম এমপি, পররাষ্ট্রমন্ত্রী এএইচ মাহমুদ আলী এমপি, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম এমপি ও পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নজরুল ইসলাম এমপি উপস্থিত ছিলেন।
ধর্ম নিয়ে বিকৃত লেখালেখি বন্ধের পরামর্শ : এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী ধর্ম নিয়ে বিকৃত রুচির লেখালেখি না করার পরামর্শ দিয়ে বলেন, কারও ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত লাগে এ ধরনের লেখা যেন লেখা না হয়। আমরা ধর্মনিরপেক্ষ। কিন্তু সেক্যুলারিজম মানে ধর্মহীনতা নয়। তাই কেউ ধর্ম মানবে কী মানবে না, সেটি তার ব্যাপার। কিন্তু অন্যের ধর্মে আঘাত দিতে পারবে না। বিকৃত লেখা মানবিক গুণ নয়। কারও অনুভূতিতে যেন আঘাতপ্রাপ্ত না হয় সে বিষয়ে লক্ষ্য রাখাই মানবিকতা।
জামাত নিষিদ্ধ সম্পর্কে অন্য প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এ বিষয়টি আদালতে প্রক্রিয়াধীন। আদালতের বিষয়। দেশের বিচার বিভাগ স্বাধীন। আদালতই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে। এ প্রসঙ্গে দুই শিশু হত্যা মামলার রায় দ্রুত প্রকাশ করায় বিচার বিভাগকে সাধুবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, আমরা আশা করব সব হত্যাকা-সহ যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়াও যেন দ্রুত শেষ হয়। এটা যত তাড়াতাড়ি শেষ হবে, ততই দেশের মঙ্গল।
যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিষয়ে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের সাম্প্রতিক বিবৃতির বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, অ্যামনেস্টি অত্যন্ত গর্হিত কাজ করেছে। তারা যুদ্ধাপরাধীদের বাঁচাতে গিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের আক্রমণ করেছে। আমরা এর কঠোর প্রতিবাদ করেছি, আবারও করব। তিনি বলেন, অ্যামনেস্টির স্মরণ করা উচিতÑ সাকা চৌধুরী ও মুজাহিদরা একাত্তরে কী অপরাধ করেছে। দুর্নীতি করে তারা (বিএনপি-জামাত) বিপুল অর্থের মালিক হয়েছে। অ্যামনেস্টি নিশ্চয়ই মোটা অঙ্কের কিছু পেয়েছে, এজন্য এসব মন্তব্য করেছে। তবে কে কী বলল তাতে কিছু যায় আসে না। তবে যত দ্রুত যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হবে, তত এই উৎপাত বন্ধ হবে।
লেখক-প্রকাশক-ব্লগার হত্যার বিচার প্রসঙ্গে আরেক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, লেখক-ব্লগার হত্যাকারীরা ধরা পড়ছে, অনেক মামলার বিচারও শুরু হয়েছে। অন্যগুলোর তদন্ত চলছে। খুনিদের কোনো তথ্য দিলে সাথে সাথে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। অবশ্যই সব খুনের বিচার করা হবে, কেউ রেহাই পাবে না।
দলে অনুপ্রবেশ প্রসঙ্গে : বিএনপি ও জামাত থেকে আওয়ামী লীগে কাউকে না নেওয়ার ঘোষণা দিয়ে দলীয় সভানেত্রী শেখ হাসিনা বলেন, বিএনপি-জামাত থেকে যারা আমার দলে আসতে চায়, তাদের আমরা নেব না। তিনি বলেন, আমি পরিষ্কারভাবে বলছি, গ্রুপিংয়ে দল ভারি করতে অনেকে ভিন্ন দল থেকে যোগদান করান। তারা (যোগদানকারী) আওয়ামী লীগে যোগ দিয়ে অন্তর্দ্বন্দ্বের সৃষ্টি করে এবং পরবর্তীতে দলের নেতাকর্মীদের হত্যা করে। তারা ভালো সেজে দলে ঢুকেই নেতা-কর্মীদের হত্যা করে। এসব লোক আমাদের দরকার নেই।
সম্প্রতি নেদারল্যান্ডস সফর প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, নেদারল্যান্ডসের প্রধানমন্ত্রীর সাথে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। তিনি বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের প্রশংসা করেছেন এবং এই খাতে সহযোগিতার কথা বলেছেন। তিনি বলেন, নেদারল্যান্ডসের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক আন্তরিক ও উষ্ণ এবং এই সম্পর্ক আরও গভীর, জোরদার ও বিস্তৃত হবে। ইতোমধ্যে চর উন্নয়ন ও সমুদ্র ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ-নেদারল্যান্ডস নিবিড়ভাবে কাজ করছে। ডেল্টা প্ল্যান বাস্তবায়ন, সমুদ্র ব্যবস্থাপনা ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সৃষ্ট পরিস্থিতি মোকাবিলায় বাংলাদেশ নেদারল্যান্ডসের সহযোগিতা পাবে বলেও জানান শেখ হাসিনা।

‘যুদ্ধাপরাধীদের বিচার সম্পন্ন করতে না পারলে দেশ অভিশাপমুক্ত হবে না’
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় নারী-শিশু ও বুদ্ধিজীবীদের হত্যাকা-ের কথা উল্লেখ করে বলেছেন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার সম্পন্ন করতে না পারলে দেশ অভিশাপমুক্ত হবে না। এদের বিচার এবং রায় কার্যকরের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ যে দীর্ঘদিন ধরে অভিশপ্ত ছিল, তা থেকে আস্তে আস্তে মুক্তি পাচ্ছে। আর মুক্তি পাচ্ছে বলেই দেশ অর্থনৈতিকভাবে এগিয়ে যাচ্ছে। গত ২৩ নভেম্বর দশম জাতীয় সংসদের অষ্টম অধিবেশনের সমাপনী বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। তিনি বলেন, একাত্তর সালে তারা যে অপরাধ করেছিল, তার সীমা নেই। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও রায় কার্যকরের মধ্য দিয়ে, এখনও যারা স্বজন হারানোর বেদনা নিয়ে বেঁচে আছেন, অন্তত তাদের মনটা শান্তি পাবে, তারা বিচার পাচ্ছেন। তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধু যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শুরু করলেও তার মৃত্যুর পর জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় এসে সামরিক অধ্যাদেশ দিয়ে সেই বিচার বন্ধ করে দেন এবং যারা বিভিন্ন কারাগারে বন্দী ছিলেন, তাদের মুক্ত করে দেন। শেখ হাসিনা বলেন, জেনারেল জিয়ার সময় তাদের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসীন করা হয়। স্বাধীনতাবিরোধী ও রাজাকার শাহ আজিজকে প্রধানমন্ত্রী এবং আবদুল আলীমকে মন্ত্রী বানানো হয়। লাখো শহীদের রক্তে রঞ্জিত পতাকা তাদের হাতে তুলে দেওয়া হয়। এর থেকে দুর্ভাগ্য আর কী হতে পারে। তিনি বলেন, পাশাপাশি পঁচাত্তরের আত্মস্বীকৃত খুনিদের বিভিন্ন দূতাবাসে চাকরি দিয়ে পুরস্কৃত করা হয়। জেনারেল এরশাদের সময় তাদের রাজনৈতিক দল করার সুযোগ দেওয়া হয়। খুনি ফারুককে রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচন করার সুযোগ দেওয়া হয়। তাকে সংসদ সদস্য বানানোর চেষ্টা ছিল। খালেদা জিয়া ১৫ ফেব্রুয়ারির প্রহসনমূলক নির্বাচনে রশীদ-হুদাকে জয়ী ঘোষণা করে সংসদে এনেছিলেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ৩ নভেম্বরের হত্যা মামলার আসামিকে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছিল। খুনিদের লালন-পালন, আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়া হয়েছিল। আমরা ১৫ আগস্টের খুনিদের বিচার করেছি, ৩ নভেম্বরের খুনিদের বিচার করেছি। আর যুদ্ধাপরাধীদের বিচার, যা জিয়াউর রহমান বন্ধ করে দিয়েছিলেন, সেই বিচার শুরু করেছি, রায়ও কার্যকর করা শুরু করেছি।
শেখ হাসিনা বলেন, ২০১০ সালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় হত্যা, গণহত্যা, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ, ধর্মান্তরিতকরণসহ বিভিন্ন মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার। ট্রাইব্যুনালে এ পর্যন্ত ২১টি রায় হয়েছে। চলতি বছর হয়েছে ৬টি। এখন পর্যন্ত ট্রাইব্যুনালে যে কটি মামলার রায় হয়েছে, তার মধ্যে ১৭টির বিরুদ্ধে আপিল হয়েছে। তিনি বলেন, যারা স্বাধীনতা মেনে নিতে পারেনি, যারা হানাদার বাহিনীকে সহায়তা করেছিল, তারা ও তাদের দেশি-বিদেশি শক্তির ষড়যন্ত্রে জাতির পিতাকে হত্যা করা হয়। বঙ্গবন্ধু হত্যাকা-ের পর মুক্তিযোদ্ধা অফিসারদের সুপরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয় বলে মন্তব্য করে শেখ হাসিনা বলেন, বিচারের নামে প্রহসন করা হয়। প্রধানমন্ত্রীর সমাপনী ভাষণ শেষে স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী অধিবেশন সমাপনী সংক্রান্ত রাষ্ট্রপতির আদেশ পড়ে শোনান।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *