পানি ব্যবহারে বৃহত্তর সহযোগিতা চাই : প্রধানমন্ত্রী

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অর্থনৈতিক উন্নয়নে বৃহত্তর সহযোগিতা এবং আন্তঃদেশীয় বিশুদ্ধ পানি সম্পদের ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন। তিনি গত ১৮ জানুয়ারি সুইজারল্যান্ড ডাভোসে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) সাইড লাইনে ওয়ার্ল্ড আন্ডার ওয়াটারের ওপর এক আলোচনায় ভাষণদানকালে বলেন, পানি হচ্ছে সম্পদ। আমাদের জন্য শহর, গ্রাম এবং সারাজীবন প্রত্যেকের জন্য বেঁচে থাকার লড়াই। তাই পানির মূল্য আমাদের জানা দরকার।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, উন্নয়ন অথবা উৎপাদনের জন্য পানির অবাধ জোগান এবং অসীম সম্পদ হতে পারে না। তিনি বলেন, টেকসই উন্নয়নের পথে পানি একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক বিষয়। শেখ হাসিনা বলেন, অসমতা থেকে সমতায় আনতে বিশুদ্ধ পানি ও সমুদ্রসম্পদ খাতে এই সহযোগিতা ভূমিকা রাখতে পারে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর এবং বিভিন্ন উপকূলীয় ও দ্বীপ রাষ্ট্রসমূহের অস্তিত্ব নির্ভর করছে বিশুদ্ধ পানি ও সমুদ্রসম্পদ ব্যবহারের সক্ষমতার ওপর। তিনি পানিসম্পদ খাতে বেসরকারি খাতের ভূমিকা বৃদ্ধির প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, যে কোনো সমাধান আমাদের বিপুল সংখ্যক গরিব ও প্রান্তিক জনগণের জন্য লাভজনক ও টেকসই হবে। বাংলাদেশ বৈশ্বিক পুঁজি ও জ্ঞান প্রদানকারীদের মধ্যে যে কোনো ধরনের অংশীদারিত্বের কথা বিবেচনা করতে প্রস্তুত রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, পানির চাহিদার ওপর যে কোনো সহযোগিতা জনগণ, রাষ্ট্র ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে আস্থা ও শ্রদ্ধার ভিত্তিতে হতে হবে। তিনি ভারত ও মিয়ানমারের সাথে বঙ্গোপসাগরের নৌ-সীমানার শান্তিপূর্ণ সমাধানের কথাও উল্লেখ করেন।
প্রযুক্তিকে ওয়াটার কনভারসেশনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমাদের অর্থনীতি দ্রুত পরিবর্তন ও কৃষির ভার্টিকেল ট্রান্সফর্মেশন বিশুদ্ধ পানির উৎস বৃদ্ধি এবং ভূগর্ভস্থ পানির চাহিদা পূরণ খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
নব্বইয়ের দশকে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে গঙ্গার পানিবণ্টন সমস্যা সমাধানের কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আন্তঃদেশীয় চুক্তি বাস্তবায়নে আরও প্রচেষ্টা চালানো দরকার।
রামপালে এসে দেখে যান আলগোর
ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) বার্ষিক সভায় এক আলোচনায় বাংলাদেশের সুন্দরবনের কাছে বাগেরহাটে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র্র নির্মাণের প্রসঙ্গ উঠে এসেছে, যেখানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, সুন্দরবন ও আশপাশের এলাকার পরিবেশ রক্ষা করেই এই কেন্দ্র করা হচ্ছে। গত ১৮ জানুয়ারি সুইজারল্যান্ডের ডাভোসের কংগ্রেস সেন্টারে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের ‘লিডিং দ্য ফাইট এগেইনস্ট ক্লাইমেট চেঞ্জ’ শীর্ষক প্ল্যানারি সেশনে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়ে প্রশ্ন তোলেন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট পরিবেশ অ্যাক্টিভিস্ট আল গোর। প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেস সচিব নজরুল ইসলাম বলেন, রামপাল নিয়ে আলোচনা ওঠার সাথে সাথে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সুন্দরবনের প্রান্তসীমা থেকে ১৪ কিলোমিটার দূরে এবং বিশ্ব ঐতিহ্য থেকে প্রায় ৭০ কিলোমিটার দূরে ক্লিন কোল ও আধুনিক প্রযুক্তির বিদ্যুৎকেন্দ্র করছি আমরা। সুন্দরবন ও আশপাশের ওই এলাকার পরিবেশ সংরক্ষণে আমরা সব ধরনের ব্যবস্থা নিয়েছি। প্রধানমন্ত্রী যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্টকে বাংলাদেশ সফর করে রামপালে কি হচ্ছে তা ‘নিজ চোখে’ দেখার প্রস্তাব দেন বলে জানান উপ-প্রেস সচিব। বাংলাদেশ ও ভারতের যৌথ উদ্যোগে বাগেরহাটের রামপাল উপজেলায় ১৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতার একটি কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্রের নির্মাণকাজ চলছে। ডাভোসের আলোচনায় প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, একটি গোষ্ঠী রামপাল নিয়ে অপ্রয়োজনীয় ইস্যু তৈরি করছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, কেন ও কী ক্ষতি করবেÑ এ ধরনের যুক্তিসংগত তথ্য তারা উপস্থাপন করতে পারেনি। তাদের ওখানে পরিদর্শন করার আমন্ত্রণ জানিয়েছিলাম। তাতেও তারা সাড়া দেয়নি। তাদের মনে হয়তো অন্য কোনো অভিপ্রায় আছে। শেখ হাসিনা আশ্বস্ত করে বলেন, কোনো ধরনের ক্ষতির যদি আশঙ্কা থাকে, তা হলে আমি নিজেই সে ধরনের কোনো প্রকল্পের অনুমতি দেব না। আলোচনার একপর্যায়ে দিনাজপুরের বড়পুকুরিয়ায় ‘জনবসতিপূর্ণ ও কৃষিজমি’ এলাকায় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র্র থাকার কথা উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। প্রায় দেড় দশকে ওখানে কৃষিরও কোনো ক্ষতি হয়নি। পরিবেশেরও কোনো ক্ষতি হয়নি, ওখানকার মানুষেরও ক্ষতি হয়নি।
শেখ হাসিনা বলেন, বড়পুকুরিয়া সাব-ক্রিটিক্যাল। আর রামপালে আলট্রা সুপার ক্রিটিক্যাল প্রযুক্তির। এ সময় তিনি দুই প্রযুক্তির মধ্যে পার্থক্যও তুলে ধরেন। শেখ হাসিনা বলেন, ১৯৯৬ সালে তারা যখন সরকারে আসেন তখন দেশে বনভূমি ছিল মাত্র ৭ শতাংশ। সেটা এখন বেড়ে ১৭ শতাংশ করা হয়েছে। লক্ষ্য রয়েছে ২৫ শতাংশ করার। এই সেশনে নরওয়ের প্রধানমন্ত্রী ইরনা সোলবার্গ, এইচএসবিসি গ্রুপের প্রধান নির্বাহী স্টুয়ার্ট গালিভার, কফকো এগ্রির প্রধান নির্বাহী জিঙতাও চি প্রমুখ অংশ নেন।
সার্কের কার্যকারিতা এখনও শেষ হয়ে যায়নি
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সাউথ এশিয়ান অ্যাসোসিয়েশন ফর রিজিওনাল কো-অপারেশনের (সার্ক) কার্যকারিতা হারানোর অভিযোগকে উড়িয়ে দিয়ে বলেছেন, এই আঞ্চলিক জোট ‘খুব ভালোভাবেই সক্রিয় আছে’।
তিনি বলেন, সার্কের কার্যকারিতা এখনও শেষ হয়ে যায়নি, আট জাতির এই আঞ্চলিক সংস্থাটি খুব ভালোভাবে সক্রিয় আছে এবং আমি মনে করি দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য এর মাধ্যমে আরও অনেক কাজ করার সুযোগ রয়েছে। তিনি আরও বলেন, এই অঞ্চলের জনগণের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের জন্য আঞ্চলিক সহযোগিতার প্রয়োজন রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত ১৭ জানুয়ারি সন্ধ্যায় সুইজারল্যান্ডের ডাভোস কংগ্রেস সেন্টারে অনুষ্ঠিত ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) ৪৭তম বার্ষিক সম্মেলনে ‘হারনেসিং রিজিওনাল কো-অপারেশন ইন সাউথ এশিয়া’ শীর্ষক একটি ইন্টারেক্টিভ সেশনে মতবিনিময়কালে এসব কথা বলেন।
এই ইন্টারেক্টিভ সেশনে শ্রীলংকার প্রধানমন্ত্রী রনিল বিক্রমাসিংহে, ভারতের বাণিজ্যমন্ত্রী ও শিল্পমন্ত্রী নির্মলা সীতারমন ও সার্কভুক্ত বিভিন্ন দেশের জনপ্রতিনিধি এবং সুশীল সমাজের সদস্যগণ যোগদান করেন।
প্রধানমন্ত্রী, এই অঞ্চলের প্রধান শত্রু হিসেবে দারিদ্র্যকে আবারও চিহ্নিত করে বলেন, আমরা কীভাবে দারিদ্র্য নির্মূল করতে পারি সেদিকেই আমাদের সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া উচিত। তিনি বলেন, দারিদ্র্য বিমোচনে সার্কভুক্ত দেশগুলোকে ব্যবসা-বাণিজ্য জোরদার করতে হবে এবং মানুষের সাথে মানুষের যোগাযোগ বাড়াতে হবে।
আমরা দারিদ্র্য নির্মূল করতে কাজ করে যাচ্ছি উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ জন্য বিবিআইএন, বিসিআইএম-ইসি ও বিমসটেক ফোরাম প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ গ্রহণ করেছি।
তিনি বলেন, ব্যবসা-বাণিজ্য গতিশীল করতে সাফটা শক্তিশালী হচ্ছে। বৃহত্তর পরিসরে দক্ষিণ এশিয়ার সাথে চীনকে একীভূত করার জন্য বিসিআইএম-ইসি ফোরাম গঠন করা হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, এ অঞ্চলে টেলিযোগাযোগ উন্নয়নের জন্য কক্ষপথে একটি সার্ক স্যাটেলাইট চালু করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *