প্যারিসে নৃশংসতা ও আইএস প্রসঙ্গ

ফরিদ হোসেন: আলো-আনন্দের শহর প্যারিস ক্ষতবিক্ষত সন্ত্রাসী বোমার আঘাতে। মধ্য নভেম্বরে ২ হাজার বছর পুরনো এই শহরে উপর্যুপরি বোমা হামলা (কোথাও গোলাগুলি) স্তম্ভিত করে প্যারিসবাসীদের। সারাবিশ্বের বুকে দরদ জমে প্যারিসীয়দের জন্য। প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া ওঁলাদে জারি করেন জরুরি অবস্থা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এত বড় হামলা এটাই প্রথম। হামলা হয়েছে প্যারিসের প্রধান স্টেডিয়ামের বাইরে, ভেতরে চলছিল ফ্রান্স ও জার্মানির জাতীয় দলের মধ্যে প্রীতি ফুটবল। অন্যত্র চলছিল একটি জনপ্রিয় মার্কিন ব্যান্ড দলের কনসার্ট। কয়েক ঘণ্টার জন্য থমকে গেল আলোর মিছিলের এই শহর। মারা গেলেন ১৩০ জন, আহত আরও অনেকে। রক্তাক্ত প্যারিসে দাঁড়িয়ে ফরাসি প্রেসিডেন্ট ঘোষণা করলেন, রক্তের বদলা হবে রক্ত। জিহাদি সংগঠন ইসলামি স্টেট বা আইএস-কে বললেন, তোমরা ফ্রান্সের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছ। ফ্রান্সও তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করল। ইতোমধ্যেই প্যারিসে হামলার দায় স্বীকার করেছে, আইএস যাদের মধ্যযুগীয় বর্বরতা দুনিয়ার শুভবুদ্ধির মানুষের রক্ত হিম করে দিচ্ছে। বিশেষ করে পশ্চিমা বিশ্বকে। কারা এই আইএস?
ফিরে যাই গত বছরের মাঝামাঝি সময়ে। এই সময়টাতে আইএস নামের স্বল্প পরিচিত সন্ত্রাসী সংগঠনটি ইরাকে ও সিরিয়ায় দুর্বল সরকারি বাহিনীকে হটিয়ে দখল করে নিয়েছে বিস্তীর্ণ এলাকা। আন্তর্জাতিক বোদ্ধাদের মতে, সেই সময়ে শুধু ইরাকেই আইএসের দখলে ছিল ২ লাখ ১০ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকাÑ প্রায় যুক্তরাষ্ট্রের সমান। একটি রাষ্ট্র গঠনের জন্য যথেষ্ট এলাকা। আইএস নেতা আবু বকর আল-বাগদাদি কালবিলম্ব না করে আইএস খেলাফত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দিলেন। দুনিয়ার মুসলিমদের আহ্বান জানালেন শুধুই তার রাষ্ট্র ও সরকারের প্রতি আনুগত্য মেনে নিতে।
ঘোষণা করলেন, যারা তার আহ্বানে সাড়া দেবেন না তারা শয়তান ও আল্লাহর শত্রু। তাদের যেখানে পাওয়া যাবে হত্যা করা হবে। বললেন, তার রাষ্ট্রের কঠোর ইসলামি শরিয়া আইন ছাড়া অন্য কোনো আইন চলবে না। বিধর্মীদের তিনি সহ্য করবেন না। ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের উদ্দেশে বললেন, তোমাদের বিশেষ কর দিতে হবে। নয়তো ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করতে হবে। ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের, বিশেষ করে, পশ্চিমা পর্যটকদের জিম্মি হিসেবে বন্দী করে অথবা অপহরণ করে বিরাট অঙ্কের মুক্তিপণ আদায় করতে শুরু করল আইএস। তাদের দখলে চলে এলো কয়েক ডজন শহর ও তৈলখনি। সমৃদ্ধ এলাকা। অন্য জিহাদি গ্রুপগুলোকে নির্দেশ দিলেন আইএসের সাথে যোগদান করার জন্য। অনেকে যোগ দিল। যারা তার আহ্বান প্রত্যাখ্যান করল তাদের বিরুদ্ধে বাগদাদি যুদ্ধ ঘোষণা করল।

আইএস কেমন করে জন্ম নিল?
এই ভয়াবহ সন্ত্রাসী সংগঠনটির আদি পিতা একজন জর্ডানীয়। তার নাম আবু মুসাব আল-জারকোয়ারি। তিনি ২০০৪ সালে আরেক দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী সংগঠন আল-কায়দার প্রতিষ্ঠাতা ওসামা-বিন-লাদেনের সাথে হাত মিলান। প্রতিষ্ঠা করেন আল-কায়দার ইরাকি শাখা, যার নামকরণ করলে অছও অর্থাৎ, আল-কায়দা ইরাক। জর্জ বুশ শাসিত আমেরিকার নেতৃত্বে পশ্চিমা জোট যখন ইরাক আক্রমণ করল ঠিক তখনই জারকোয়ারি লাদেনের আনুগত্য গ্রহণ করল। জারাকোয়ারি ২০০৬ সালে মার্কিন হামলায় নিহত হন। তবে মৃত্যু পূর্বে তিনি ইসলামিক স্টেট অব ইরাক বা আইএসআই (ওঝও) নামের একটি ছাতা সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন। পশ্চিমা জোটের আক্রমণে আইএসআই ক্রমান্বয়ে দুর্বল হতে থাকে। এ ছাড়া ইরাকের মধ্যপন্থি সুন্নি নেতারা আইএসআই-র বর্বরতাকে মেনে নিতে পারেনি, যদি এটাও একটি সুন্নি সংগঠন। এমনই একটি সময়ে বাগদাদি আইএসআইয়ের হাল ধরেন। বাগদাদি একসময় মার্কিনীদের হাতে বন্দী ছিলেন। ২০১০ সালে তিনি আইএসআই-কে পুনর্গঠন করার কাজে হাত দেন। এর তিন বছরের মধ্যেই অর্থাৎ ২০১৩ সালে তার নেতৃত্বে সংগঠনটি শুধু ইরাকেই প্রতিমাসে ১০-১২টি সন্ত্রাসী হামলা চালাতে থাকে।
বাগদাদি শুধু ইরাকেই হামলা সীমাবদ্ধ রাখেন না। তিনি যোগ দেন সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের বিরুদ্ধে সংগ্রামরত বিদ্রোহীদের সাথে। সেখানে তিনি আল-নুসরাত নামের একটি ফ্রন্ট গড়ে তোলেন। ২০১৩ সালের এপ্রিলে বাগদাদি আইএসআই ইরাককে সিরিয়ার আসাদ-বিরোধী বিদ্রোহীদের সাথে একীভূত করেন। নতুন এম হয় ওংষধসরপ ঝঃধঃব ড়ভ ওৎধয় ধহফ খবাধহঃপ, যা ওঝওখ নামে পরিচিতি পায়। এই একীভূতকণে বাধ সাধল আল-নুসরাত ফ্রন্টের একটি অংশ, সাথে যোগ দিল আল-কায়দার আরেকটি দলছুট গ্রুপ।
বাগদাদি এই প্রত্যাখ্যানকে তোয়াক্কা না করে সংগঠনকে আরও মজবুত করার কাজে মনোনিবেশ করলেন। ২০১৩ সালের ডিসেম্বরে ওংষধসরপ ঝঃধঃব বা আইএস প্রতিষ্ঠা করলেন। ২০১৪ সালের জুন মাসে দুর্বল ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ইরাকি সৈন্যদের একের পর এক আক্রমণে পরাজিত করে ইরাকের উত্তরের শহর মসূল দখল করে দক্ষিণ-পশ্চিমের রাজধানী শহর বাগদাদের দিকে অগ্রসর হতে থাকে আইএস বাহিনী। তখন মনে হচ্ছিল বাগদাদের পতন আসন্ন। তবে মার্কিনীরা একে ইরাক সরকারকে শেষ পর্যন্ত রক্ষা করতে সক্ষম হয়। তবে এর মধ্যেই আইএস দখল করে নেয় ২৪টির বেশি ইরাকি শহর, বেশ কয়েকটি তেলক্ষেত্র। চালু করে তাদের মধ্যযুগীয় শাসন ব্যবস্থা। রেডক্রসের আন্তর্জাতিক কমিটির এক হিসাবে বলা হয়েছিল তখন আইএস খেলাফতের অধীনে কমপক্ষে ১০ মিলিয়ন মানুষ। আইএস তাদের সন্ত্রাসী আক্রমণ ইরাক ও সিরিয়ার বাইরে ফ্রান্স, বৈরুত, সৌদি আরবসহ বেশ কয়েকটি দেশে ছড়িয়ে দেয়। ইতোমধ্যে ২২ যাত্রীসহ একটি রুশ বিমান বোমার মাধ্যমে বিধ্বস্ত করে। প্যারিস আক্রমণের পর হুমকি দেয় হোয়াইট হাউসে হামলা চালাবে। পশ্চিমা দুনিয়া ভয়ে কম্পমান। আইএসের জঙ্গি সদস্য সংখ্যা কত? কেউ কোনো সঠিক সংখ্যা দিতে পারে না। তবে, আমেরিকানদের মতে, সংগঠনটিতে কমপক্ষে ২৮ হাজার বিদেশি জঙ্গি আছে, যার মধ্যে ৫ হাজার পশ্চিমা দেশের নাগরিক। অন্তত ২৫০ মার্কিন নাগরিক। এরা অধিকাংশই মুসলমান।
মার্কিন ট্রেজারি বিভাগের মতে, আইএস বিশ্বের সর্বোচ্চ ধনী সংগঠন। দখলকৃত এলাকার তেল বিক্রি করে এ পর্যন্ত আয় করেছে ১০০ মিলিয়ন ডলার। তুরস্ক এই তেলের একটি বড় ক্রেতা। বিদেশি পর্যটকদের জিম্মি করে মুক্তিপণ আদায় করেছে কমপক্ষে ২০ মিলিয়ন ডলার। এ ছাড়া, মধ্যপ্রাচ্যের অনেক ধনাঢ্য পরিবার ও ব্যক্তি এই চরমপন্থি সুন্নি সংগঠনটিকে আর্থিক সহায়তা করে আসছে। মার্কিন নেতৃত্বাধীন ন্যাটো হামলা ও সম্প্রতি রাশিয়ার আইএস-বিরোধী আক্রমণ সংগঠনটিকে কিছুটা দমন করতে পেরেছে। তবে, সম্প্রতি প্যারিস ও বৈরুত হামলার পর মনে হচ্ছে আইএস এখনও দুর্দান্ত দুর্ধর্ষ এক সন্ত্রাসী দল।

বাংলাদেশে কি আইএস আছে?
প্রশ্নটি উঠেছে সম্প্রতি দুই বিদেশিকে (একজন ইটালিয়ান ও একজন জাপানি) গুলি করে হত্যা, শিয়াদের তাজিয়া মিছিলের প্রস্তুতি পর্বে হোসেনি দালানে বোমা হামলা (একজন নিহত) দুজন খ্রিস্টান পাদ্রির ওপর হামলা, বগুড়ায় এক শিয়া মসজিদে গুলি করে মুয়াজ্জিনকে হত্যাÑ এই দুঃখজনক ঘটনার পর কোনো কোনো মহল থেকে রব উঠেছে, এগুলো আইএসের কা-। এই হামলা ও বিদেশি হত্যা এমন একসময়ে ঘটছে যখন ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চলছে, বিএনপি নেতা সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী ও জামাত নেতা আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের ফাঁসির প্রক্রিয়া চলছিল। শেষ পর্যন্ত এ দুজনের ফাঁসি কার্যকর হয়েছে। জামাতের আমীর মতিউর রহমান নিজামীসহ বেশ কয়েকজন জামাত নেতার ফাঁসির আদেশের বিরুদ্ধে রিভিউ আবেদনের শুনানি চলছে। আইএস সংগঠনটির উত্থান ও এর কর্মকা-ের ধরন বাংলাদেশে যে সন্ত্রাস ঘটেছে তার সাথে মিল খায় না। বাংলাদেশে আইএস সংক্রান্ত বিভ্রান্তি ছড়ানো যে আন্তর্জাতিক সংগঠনটির হাত আছে সেটি হলো SITE Intelligence group। এটা একটি মার্কিনী সংস্থা, যার প্রধান দফতর মেরিল্যান্ডের বেহেশদায়। SITE হলো Search for International Terrorist Entities। এটার প্রধান গবেষক ও বিশ্লেষক হলো রীতা কার্টজ, যিনি একজন ইসরাইলি ইহুদি। রীতা একজন বিতর্কিত ইহুদি। তার পরিচালিত একটি সংগঠনের দাবি কতটা বিশ্বাসযোগ্য সেই প্রশ্ন আজ শুধু বাংলাদেশে নয়, অন্যত্রও উঠেছে। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক সন্ত্রাস, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও বিএনপি-জামাতের সরকার-বিরোধী কর্মকা-ের (এর অনেকটাই নাশকতা বলে বিবেচিত) প্রেক্ষাপটে SITE-এর দাবি বিচার ও বিশ্লেষণ খুব জরুরি। বাংলাদেশের গণমাধ্যমকেও এই সংস্থাটির ব্যাপারে সজাগ থাকতে হবে।

লেখক : সাংবাদিক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *