ফিরে দেখুন একাত্তর, ঘুরে দাঁড়াক বাংলাদেশ…

ওই সকল ব্যক্তিকে খতম করতে হবে, যারা সশস্ত্র অবস্থায় পাকিস্তান ও ইসলামের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত রয়েছে–মতিউর রহমান নিজামী, রাজাকার সদর দফতর, যশোর; দৈনিক সংগ্রাম, ১৫ সেপ্টম্বর, ১৯৭১। 

নব্বইয়ের ছাত্রগণআন্দোলনের উত্তাল দিনগুলোতে পড়েছিলাম নিউজপ্রিন্টের একটি পেপারব্যাক বই একাত্তরের ঘাতক ও দালালরা কে কোথায়? এই বইটি সে সময় সদ্য কৈশোর পেরিয়ে আসা তরুণমনে দোলা দিয়েছিলো দারুনভাবে। একাত্তরের ঘাতকদের চিনিয়ে দিতে এটিই সম্ভবত ছিলো একটি প্রথম সম্যক প্রয়াস।

আর সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে সাংবাদিক আজাদুর রহমান চন্দনের মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক গবেষণাগ্রন্থ ‘একাত্তরের ঘাতক ও দালালরা’। এটি হচ্ছে একই সঙ্গে ১৯৭১-এর একটি অসামান্য প্রামাণ্য দলিল।

ক্রমানুসারে এতে যে সব বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, সেগুলো হচ্ছে:

শান্তি কমিটি : অশান্তির আগুনে পুড়িয়েছে বাংলাদেশকে, বাংলার যম গোলাম আযম, বদরবাহিনী গঠনের নির্দেশদাতা নিজামী, বদরবাহিনী গঠনের আরেক হোতা মুজাহিদ, রাজাকার বাহিনীর প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন মওলানা ইউসুফ, ঘাতকের ভূমিকায় ছিলো রাজাকার-আলবদররা (তালিকাসহ), জামায়াতি নৃশংসতায় সায় ছিলো না অন্য দালালদেরও এবং পাকিস্তানি যুদ্ধাপরাধীরা।

‘শান্তি কমিটি : অশান্তির আগুনে পুড়িয়েছে বাংলাদেশকে’ বিষয়টিতে তুলে ধরা হয়েছে কেন্দ্রীয় ও জেলা শান্তি কমিটির একটি দীর্ঘ তালিকা, যা লেখকের নিজস্ব গবেষণার ফসল। এই তালিকার সমর্থণে লেখক একই সঙ্গে উপস্থাপন করেছেন ‘৭১ এ প্রকাশিত বিভিন্ন পেপার-ক্লিপিং।

প্রতিটি বিষয় উপস্থাপনায় লেখক ঘাতকদের যুদ্ধাপরাধ ও নৃশংসতার প্রমাণ হিসেবে হাজির করেছেন মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক বিভিন্ন গ্রন্থের উদ্ধৃতি, ১৯৭১-এ প্রকাশিত দেশি-বিদেশি সংবাদপত্রের ক্লিপিং, ‘৭১ এ পূর্ব পাকিস্তান স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে পিন্ডিতে পাঠানো গোপন প্রতিবেদন, ঢাকা গেজেট ইত্যাদি।

‘ঘাতকের ভূমিকায় ছিলো রাজাকার-আলবদররা’ — বিষয়ে লেখক যে তালিকাটি হাজির করেছেন, সেটিতে আমরা পাই রাজাকার হাই কমান্ড এবং জেলা ভিত্তিক রাজাকারদের একটি দীর্ঘ তালিকা। ‘ পাকিস্তানি যুদ্ধাপরাধীরা’ শিরোনামের বিষয়ে লেখক যুক্ত করেছেন ২৫১ জন পাক-সামরিক কর্মকর্তার আরেকটি তালিকা– যা আরো সমৃদ্ধ করেছে, এই বইকে।

‘জামায়াতি নৃশংসতায় সায় ছিলো না অন্য দালালদেরও’ বিষয়টিতে লেখক তুলে ধরেছেন একটি দুর্লভ প্রামাণ্য দলিল। ‘৭১ এ পূর্ব পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের রাজনৈতিক শাখা প্রদেশের তখনকার পরিস্থিতি নিয়ে ইয়াহিয়ার সামরিক সরকারের কাছে পাক্ষিক গোপন প্রতিবেদন পাঠাতো। এ সব প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিলো ‘ফোর্টনাইটলি সিক্রেট রিপোর্ট অন দ্য সিচুয়েশন ইন ইস্ট পাকিস্তান’।

এরই একটিতে [৬৮৬ (১৭২) পল/এস (আই)] বলা হয়, An extended meeting (50) of Executive Committee of East Pakistan Regional PDP was held on 3-10-71 at the Dacca residence of Mr. Nurul Amin with himself in the chair. The meeting discuss the present political situation and deteriorating economic condition of the country and favoured participation in the ensuing by-elections. Some of the speakers mentioned about the atrocities committed by the enemies as well as by the Jamat-e-Islami workers and Razakars on innocent people in the rural areas. (পৃ. ১০৯)।

আরেকটি গোপন প্রতিবেদনে [নম্বর ৫৪৯ (১৫৯)পল/এস আই)] উল্লেখ আছে আগষ্ট মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে কুষ্টিয়া জেলা জামায়াতের সম্মেলনে গোলাম আযম বলেন, ‘হিন্দুরা মুসলমানদের শত্রু। তারা সবসময় পাকিস্তানকে ধ্বংসের চেষ্টা করছে।’ ওই সম্মেলনে গোলাম আযম প্রতি গ্রামে শান্তি কমিটি গঠনের নির্দেশ দেন। মুক্তিযোদ্ধাদের দুস্কৃতকারী আখ্যা দিয়ে তাদের নির্মূল করার নির্দেশও দেন তিনি। গোলাম আযম বলেন, খুব শিগগিরই রাজাকার, মুজাহিদ ও পুলিশ মিলে দুস্কৃতকারীদের মোকাবেলা করতে সক্ষম হবে।

সেপ্টেম্বরের প্রথমার্ধের প্রতিবেদনে [নম্বর ৬০৯ (১৬৯) পল/ এস (আই)] বলা হয়েছে, ৩ সেপ্টেম্বর ঢাকায় জামায়াতের এক সভা অনুষ্ঠিত হয়, যাতে গোলাম আযমসহ অন্যরা বক্তব্য রাখেন। সভায় মুক্তিযোদ্ধাদের বিদ্রোহী আখ্যা দিয়ে তাদের নির্মূল করার ওপর জোর দেওয়া হয়। …A discussion meeting of the JI workers was held on 3-9-71 in Dacca and was addressed, among others, by Prof. Ghulam Azam. The meeting emphasised the need for restoration of normalcy by eliminating the rebels and antisocial elements. (বাংলার যম গোলাম আযম, পৃ. ৩০)।

‘একাত্তরের ঘাতক ও দালালরা’ নামের বইটি এমনই সব তথ্যবহুল দালিলিক প্রমানপত্রে ঠাসা।

কিন্তু বার বার এই বইটি পাঠ করতে গিয়ে যে সব বিষয়ের ঘাটতি অনুভূত হয়েছে, তা হচ্ছে: মুক্তিযুদ্ধের একটি সংক্ষিপ্ত ইতিহাস ও ঘাতক-রাজাকারদের ঘৃণ্য যুদ্ধাপরাধের দিনপঞ্জির অভাব। এছাড়া কয়েকটি পেপার-ক্লিপিং ও আলোকচিত্রের দিনক্ষণ উল্লেখ করা হয়নি। তথ্যসূত্রের পূর্ণাঙ্গ তালিকা না থাকায় কোনো গবেষক বইটি ধরে যদি আরো গবেষণা চালাতে চান, তবে তাকে খানিকটা ঝামেলায় পড়তে হবে। আশা করা যায় লেখক এ সব ঘাটতি বইয়ের দ্বিতীয় সংস্করণে দূর করবেন।

বই: একাত্তরের ঘাতক ও দালালরা
লেখক: আজাদুর রহমান চন্দন
প্রচ্ছদ: সুমন
প্রকাশক: জাতীয় সাহিত্য প্রকাশ
দাম: ১৪০ টাকা
প্রাপ্তিস্থান: কনকর্ড এম্পোরিয়াম, কাঁটাবন, ঢাকা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *