বঙ্গবন্ধুর ফেরা এবং স্বপ্নের স্বদেশ

আজ ১০ জানুয়ারি। বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস। বাঙালি জাতির জীবনে একটি স্মরণীয় দিন। কারণ এই দিন পাকিস্তানি বন্দিশিবির থেকে মুক্ত হয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের মাটিতে ফিরে আসেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। এসেই দেশ গড়ার সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েন তিনি। কিন্তু ঘাতকের দল পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট সপরিবারে হত্যা করে জাতির জনককে। অসমাপ্ত থেকে যায় স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ার বঙ্গবন্ধুর সেই অভিযাত্রা।

বঙ্গবন্ধু বেঁচে থাকলে বিশ্বসভায় আজ বাংলাদেশের অবস্থান কোথায় থাকত? বঙ্গবন্ধু বেঁচে থাকলে তিনি তাঁর স্বপ্নের সোনার বাংলাকে কোথায় নিয়ে যেতেন, তা নিয়ে অর্থনীতিবিদরা গবেষণা করছেন। বঙ্গবন্ধু সারা জীবন দেশের মানুষের জীবনমান উন্নয়নে নিজেকে উৎসর্গ করেছেন। তিনি সব সময়ই চেয়েছিলেন এদেশের খেটে খাওয়া ও মেহনতি মানুষ যেন সুখে থাকে। তাদের জীবন যেন হাসিখুশিতে ভরপুর থাকে। পেটে অন্ন থাকে। হাতে পয়সা থাকে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বঙ্গবন্ধু বেঁচে থাকলে বাংলাদেশ আজ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে উন্নয়নের অগ্রভাগে থাকত। দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশ তার নিজস্ব অবস্থান থেকে অর্জন করত সাফল্য, যার স্বপ্ননায়ক থাকতেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বঙ্গবন্ধু মনেপ্রাণে চাইতেন বাংলাদেশ তার নিজস্ব অর্থ ও সম্পদ দিয়ে পৃথিবীর বুকে নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করুক। উন্নয়নের সফল অগ্রযাত্রা থাকুক।
কেমন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিলেন বঙ্গবন্ধু? কেমন করে গড়তে চেয়েছিলেন বাংলাদেশ? এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ও প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ ড. আতিউর রহমান তার এক গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, “১৯৭২ সালের ২৬ মার্চ প্রথম স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে বেতার ও টিভি ভাষণে ‘কেমন বাংলাদেশ চাই?’ প্রসঙ্গে বঙ্গবন্ধু বলেছেন, ‘আমার সরকার অভ্যন্তরীণ সমাজ বিপ্লবে বিশ্বাস করে। এটা কোনো

অগণতান্ত্রিক কথা নয়। আমার সরকার ও পার্টি বৈজ্ঞানিক সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি প্রতিষ্ঠা করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। একটি নতুন ব্যবস্থার ভিত রচনার জন্য পুরাতন সমাজব্যবস্থা উপড়ে ফেলতে হবে। আমরা শোষণমুক্ত সমাজ গড়বো।’ বঙ্গবন্ধু তাঁরই উদ্ভাবিত উন্নয়ন-দর্শন বাস্তবে রূপ দিতে অন্যতম মৌল-উপাদান হিসেবে সমবায়ের অন্তর্নিহিত শক্তি পুরো মাত্রায় ব্যবহার করতে চেয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধু স্বপ্ন দেখতেন গ্রামীণ সমাজে সমাজতন্ত্র ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় দেশের প্রতিটি গ্রামে গণমুখী সমবায় সমিতি গঠন করা হবে, যেখানে গরিব মানুষ যৌথভাবে উৎপাদনযন্ত্রের মালিক হবেন; যেখানে সমবায়ের সংহত শক্তি গরিব মানুষকে জোতদার-ধনী কৃষকের শোষণ থেকে মুক্তি দেবে; যেখানে মধ্যবর্তী ব্যবসায়ীরা গরিবের শ্রমের ফসল আর লুট করতে পারবে না। যেখানে শোষণ ও কোটারি স্বার্থ চিরতরে উচ্ছেদ হয়ে যাবে।”
ড. আতিউর রহমান তার গ্রন্থে আরও উল্লেখ করেছেন, “খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ এই মৌলিক অধিকারগুলো পূরণের মাধ্যমে বাংলার মানুষ উন্নত জীবন পাবে, দারিদ্র্যের অভিশাপ থেকে মুক্তি পাবে, বেকারত্ব দূর হবে, সেই ভাবনাই ছিল প্রতিনিয়ত তাঁর মনে। এজন্য দেশ স্বাধীন হওয়ার পরে তিনি বলেন, ‘এ স্বাধীনতা আমার ব্যর্থ হয়ে যাবে যদি আমার বাংলার মানুষ পেট ভরে ভাত না খায়। এ স্বাধীনতা আমার পূর্ণ হবে না যদি বাংলার মা-বোনেরা কাপড় না পায়। এ স্বাধীনতা আমার পূর্ণ হবে না যদি এদেশের মানুষ যারা আমার যুবক শ্রেণি আছে তারা চাকরি না পায় বা কাজ না পায়।” (শেখ মুজিব বাংলাদেশের আরেক নাম/ড. আতিউর রহমান)।

দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে জাতির পিতার অবদান সম্পর্কে বলতে গিয়ে এ অর্থনীতিবিদ আরও উল্লেখ করেছেন, ‘জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর জীবনের শুরু থেকেই রাজনৈতিক মুক্তির পাশাপাশি অর্থনৈতিক মুক্তির লক্ষ্যে সংগ্রাম করেছেন।

তিনিই প্রথম গ্রাম ও শহরের মধ্যে অর্থনৈতিক বৈষম্য রোধে বিশেষ ভূমিকা পালন করেছিলেন। বঙ্গবন্ধু গ্রামের কৃষি ও কৃষকের উন্নয়নের জন্য একটি আধুনিক কৃষিব্যবস্থার রূপকল্প তৈরি করেছিলেন। তারই রূপকল্প বাস্তবায়িত করছে বর্তমানে ক্ষমতায় থাকা তারই গড়ে তোলা দল আওয়ামী লীগ সরকার। ফলে দেশের কৃষকরা এখন অধিক ফসল উৎপন্ন করছেন। এতে তারা নিজেরা স্বয়ংসম্পূর্ণ হচ্ছেন। সেই সঙ্গে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নেও ব্যাপক অবদান রাখছেন।’

উন্নয়ন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বঙ্গবন্ধু গড়তে চেয়েছিলেন ‘সুস্থ-সবল-জ্ঞান-চেতনাসমৃদ্ধ-ভেদ-বৈষম্যহীন দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ মানুষের উন্নত এক বাংলাদেশ।’ বঙ্গবন্ধু চেয়েছিলেন তাঁরই উদ্ভাবিত দেশের মাটি থেকে উত্থিত অথবা স্বদেশজাত উন্নয়নের দর্শনের ওপর ভিত্তি করে এমন এক বাংলাদেশ বিনির্মাণ করতে, যে বাংলাদেশ হবে সোনার বাংলা, যে বাংলাদেশে দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফুটবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *