বঙ্গবন্ধু ও অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ

সমাজের মধ্যে এই অপশক্তি নানা ধরনের অপতৎপরতায় লিপ্ত রয়েছে। তাই বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের ‘সোনার বাংলা’ বিনির্মাণের জন্য বাংলাদেশ থেকে সকল প্রকার সাম্প্রদায়িক শক্তিকে নির্মূল করার বিষয়টি অন্যতম প্রধান পূর্বশর্ত। সেই বিবেচনায় বঙ্গবন্ধুকন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার জন্য দৃঢ়ভাবে যথোপযুক্ত পদক্ষেপসমূহ গ্রহণ করবেন বলে বিবেকবান মানুষরা আশা করেন।

১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে ধর্মীয় গোঁড়ামিযুক্ত সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র পাকিস্তান সৃষ্টি হওয়ার পর থেকেই এর শাসকগোষ্ঠীর বিজাতীয় ও সাম্প্রদায়িক শোষণ এবং নিপীড়নের বিরুদ্ধে একটি কর্মপন্থা নির্ধারণের ব্যাপারে বঙ্গবন্ধু চিন্তা-ভাবনা শুরু করেছিলেন। বঙ্গবন্ধুর অসাম্প্রদায়িক চেতনার পরিচিতি পাওয়া যায় এমনকি পাকিস্তান সৃষ্টি হওয়ারও আগে থেকে। ১৯৪৬ সালে সংঘটিত কলকাতা সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা থামাতে মহাত্মা গান্ধী এবং হোসেন শহীদ সোহ্রাওয়ার্দীর সঙ্গে মিলে বয়সে তরুণ শেখ মুজিব যে ভূমিকা রেখেছিলেন তা থেকেই তার অসাম্প্রদায়িক চেতনা উপলব্ধি করা যায়। বঙ্গবন্ধু তার ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে’ বলছেন, ‘এই সময় শহীদ সাহেবের সঙ্গে কয়েক জায়গায় আমার যাওয়ার সৌভাগ্য হয়েছিল। মহাত্মা গান্ধীর সঙ্গে শহীদ সাহেব হিন্দু-মুসলমান শান্তি কায়েম করার জন্য কাজ করেছিলেন।’ পরে সদ্য সৃষ্ট পাকিস্তান থেকে সাম্প্রদায়িক সমস্যার কারণে ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর লোকেরা যখন দেশত্যাগ শুরু করে তখন বঙ্গবন্ধুর চেষ্টা ছিল যাতে তারা দেশত্যাগ না করে। এজন্য বঙ্গবন্ধু ‘গণতান্ত্রিক যুবলীগ’ নামে একটি সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। তার ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে’ বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘আমি বললাম, এর (গণতান্ত্রিক যুবলীগের) কর্মসূচি হবে সাম্প্রদায়িক মিলনের চেষ্টা করা, যাতে কোনো দাঙ্গাহাঙ্গামা না হয়, হিন্দুরা দেশ ত্যাগ না করে- যাকে ইংরেজিতে বলে ‘কমিউনাল হারমনি’, তার জন্য চেষ্টা করা। অনেকেই এই মত সমর্থন করল…।'(পৃ. ৮৫)
সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী কর্তৃক বাঙালিদের বিরুদ্ধে ঔপনিবেশিক মনোভাবাপন্ন হীনসাম্প্রদায়িক ষড়যন্ত্রমূলক কর্মকা-ের ব্যাপারে বঙ্গবন্ধুর ক্ষোভ সম্পর্কে জানা যায় তার বক্তব্যে। বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘১৯৪৭ সালে পাকিস্তান হওয়ার পরই আমার সন্দেহ হয়েছিল। কলকাতায় আমি বলেছিলাম, এ স্বাধীনতা মিথ্যা। এ স্বাধীনতা বাংলাদেশকে উপনিবেশ করেছিল।’ তবে, দৃশ্যত ভাষা আন্দোলনই ছিল বাঙালিদের স্বাধীনতা ও মুক্তি সম্পর্কিত চিন্তার প্রথম বহিঃপ্রকাশ। ১৯৪৮ ও ১৯৫২’র ভাষা আন্দোলন, ১৯৫৪ সালের নির্বাচন, ১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলন, ১৯৬৬ সালের ৬-দফা আন্দোলন, ১৯৬৯-এর ১১-দফাভিত্তিক গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭০-এর নির্বাচন এবং ১৯৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত সকল আন্দোল-সংগ্রাম বঙ্গবন্ধুর চেতনা ও আদর্শ দ্বারা এদেশের মানুষ উদ্বুদ্ধ হয়েছে। এমনকি ১৯৬২ সালে গোপালগঞ্জে যে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়েছিল বঙ্গবন্ধুর চেষ্টায় তা বন্ধ হয়েছিল। প্রসঙ্গক্রমে, বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বাঙালিত্বের চেতনা এবং বাঙালির মুক্তি চেতনার বাহ্যিক প্রকাশ হিসেবে কতকগুলো ঐতিহাসিক ও অসাম্প্রদায়িক সস্নোগানের শব্দমালা এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে। যেগুলোর মধ্য দিয়ে বাঙালির মননে অসাম্প্রদায়িক স্বদেশ এবং বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ‘সোনার বাংলা’ বিনির্মাণের প্রত্যয় প্রচ্ছন্নভাবে বাঙ্ময় হয়ে উঠেছিল। এই সস্নোগানগুলো হচ্ছে, ‘তুমি কে, আমি কে, বাঙালি বাঙালি;’ ‘তোমার আমার ঠিকানা, পদ্মা মেঘনা যমুনা;’ এবং বাংলার হিন্দু, ‘বাংলার খ্রিস্টান, বাংলার বৌদ্ধ, বাংলার মুসলমান, আমরা সবাই বাঙালি।’ পাশাপাশি, বাঙালিত্বের চেতনাবাহী ‘জয় বাংলা’ ছিল মহান মুক্তিযুদ্ধের মূলমন্ত্র! আর সবশেষে যখন স্বাধীন বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে বিশ্বকবির ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি…’ নির্বাচিত করার সিদ্ধান্ত বঙ্গবন্ধু নিয়েছিলেন তখন অসাম্প্রদায়িক স্বদেশ ‘সোনার বাংলা’ প্রতিষ্ঠার প্রত্যয়টির দৃঢ়তা ও গভীরতা সম্পর্কে সব সন্দেহ দূরীভূত হয়ে গিয়েছিল, যদিও তখন ছিল ঘোর অন্ধকারময় ধর্মীয় উপনিবেশ পাকিস্তানের জালিম শাহীর শাসন! বিশ্বে বাঙালিদের একমাত্র স্বাধীন রাষ্ট্র ‘বাংলাদেশ’ প্রতিষ্ঠার লক্ষে এইসব ঐতিহাসিক সস্নোগানে যারা কণ্ঠ মিলিয়েছিলেন এবং বঙ্গবন্ধুর চেতনা ধারণ করে বিশ্বকবির লেখা সঙ্গীত মুক্তিযুদ্ধের সময় যাদেরকে উজ্জীবিত করেছিল তাদের প্রতিপক্ষ ছিল ‘পাকিস্তান’ প্রেমী সাম্প্রদায়িকগোষ্ঠী! তাদের লক্ষ্য ছিল, ‘পাকিস্তানি সৈন্যদের সক্রিয় সহায়তায় স্বাধীনতা ও মুক্তির মন্ত্রে উজ্জীবিত বাঙালিদের পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন’ করে ‘রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা’ দখলে রাখা! মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ-বিপক্ষ বিন্যাস এভাবে করা যেতে পারে, এক পক্ষ ধর্মের গোঁড়ামিমুক্ত অসাম্প্রদায়িক স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করতে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে সুসংগঠিত, আর এর বিপক্ষ ধর্মের নামে সাম্প্রদায়িক শাসন-শোষণ অব্যাহত রাখার জন্য ‘ক্ষমতা’ দখলে রাখতে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত! অর্থাৎ ‘ধর্মীয় উপনিবেশ পাকিস্তান’ রাষ্ট্রের মধ্যে থেকে যেন বাঙালিরা নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় সেই ব্যবস্থা পাকাপোক্ত করতে চেয়েছিল মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষ সাম্প্রদয়িক অপশক্তি!

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সাংস্কৃতিক পরিচিতি, ভাষা ও ঐতিহ্যের ভিত্তিতে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করেন। ফলে, বাঙালিদের সাধারণ স্বাথর্, সংকীর্ণ সাম্প্রদায়িক স্বার্থকে বিতাড়িত করে। ‘বাঙালি’ শব্দটি বঙ্গবন্ধু প্রায়ই ব্যবহার করতেন। পরে সংবিধানে অসাম্প্রদায়িক-জাতীয়তাবাদ বুঝাতে ‘বাঙালি’ শব্দটি ব্যবহৃত হত। অন্য কথায়, ‘বাঙালি’ শব্দটি তিনি সাম্প্রদায়িকতা-বিরোধী তথা অসাম্প্রদায়িকতা বুঝাতে ব্যবহার করেছেন। বঙ্গবন্ধু ধর্মনিরপেক্ষতা বলতে সব ধর্মের অনুশীলনের সংযুক্ততা বুঝিয়েছেন এবং সব ধর্মীয় সম্প্রদায়ের ঐক্যবদ্ধতা বুঝিয়েছেন। হৃদয়ের এই সুগভীর অনুভূতিই তাকে বাংলা ও বাঙালির বন্ধু ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করেছে। বাঙালি জাতির রাজনৈতিক ভাগ্য নির্ধারণের চূড়ান্ত সন্ধিক্ষণে ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের মহাজনসমুদ্রে ‘হিন্দু-মুসলমান-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান, বাঙালি-অবাঙালি’ নির্বিশেষে বাংলাদেশের সবার উদ্দেশ্যে উদাত্ত আহ্বান জানিয়ে বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে সাড়া দিয়ে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র-জনতা মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে। চূড়ান্ত ফলাফলে মুক্তিকামী বাঙালির বিজয় সূচিত হয়! কিন্তু এর জন্য যে-মূল্য দিতে হয় তার নজির বিশ্ব ইতিহাসে বিরল! ত্রিশ লক্ষ তাজাপ্রাণ, দুই লক্ষাধিক মা-বোনের সম্ভ্রম হানির পাশাপাশি বন্ধুরাষ্ট্র ভারতের কয়েক সহস্র প্রশিক্ষিত সৈন্যের আত্মাহুতি- এসবের বিনিময়ে ‘স্বাধীন বাংলাদেশের বিজয়’ অর্জিত হয়েছিল! বিজয়ের পরে মুক্তিযুদ্ধকালীন স্বপ্ন পূরণের লক্ষ্যে বঙ্গবন্ধু এবং তার সরকার পূর্ণোদ্যমে কাজ শুরু করেছিলেন। ‘বাংলাদেশ সরকার ১৯৭১-১৯৭৫’ শীর্ষক গ্রন্থে সংখ্যাগত ও গুণগত তথ্য-উপাত্তসহ বঙ্গবন্ধু সরকারের কর্মকা-ের বিবরণ উপস্থাপন করা হয়েছে এভাবে- “যুদ্ধপরবর্তী সরকারের অসংখ্য ইতিবাচক পদক্ষেপ আর্থ-সামাজিক জীবনে মৌলিক পবির্তনের সূচনা করেছিল। এতদসত্ত্বেও বাঙালি জনগণের বিরুদ্ধে বহু আগে থেকে পরিচালিত সেই চিরন্তন ষড়যন্ত্রই প্রকাশ পেল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যা করে। তিনি যে বলেছিলেন, ‘ষড়যন্ত্র এখনো চলছে’- তা-ই যথার্থ প্রমাণিত হলো।” ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্টের পর থেকে প্রায় দুই দশক দেশে প্রকাশিত সংবাদপত্রগুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, সেখানে বঙ্গবন্ধুর অবদান বা আওয়ামী লীগের সম্পৃক্ততা নিয়ে কোনো আলোচনা নেই। ‘১৫ আগস্ট ১৯৭৫’ শীর্ষক গ্রন্থে পঁচাত্তরপরবর্তী অবৈধ সরকারের শাসনামলে তৎকালীন পরিস্থিতির বর্ণনা করে বলা হয়েছে ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্টের পর ‘ঢাকা রেডিও’ থেকে শুধু বঙ্গবন্ধু বিরোধী কথা ও গান প্রচার করা হতো। এইসব গানের রচয়িতা ও সঙ্গীত পরিচালক ছিল পাকিস্তানের দোসর একটি সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী। তখন বঙ্গবন্ধুকে এ দেশের মানুষের হৃদয় থেকে মুছে দেয়ার জন্য শুধু তথাকথিত ‘কাজ’ করার কথা বলা হতো। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে- সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর শত অপচেষ্টা সত্ত্বেও এদেশের মানুষের মন থেকে বঙ্গবন্ধুকে বিন্দুমাত্র মুছে ফেলা যায়নি।
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জীবন, কর্ম এবং বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন স্থানে প্রদত্ত বক্তব্যের মধ্যে তার আদর্শের কথা জানা যায়। তার অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে বঙ্গবন্ধু লিখেছেন, ‘আমি মানুষকে মানুষ হিসেবেই দেখি। রাজনীতিতে আমার কাছে মুসলমান, হিন্দু ও খ্রিস্টান বলে কিছু নাই। সকলেই মানুষ।’ তিনি ফরিদপুর কারাগারে বন্দি থাকাকালে গোপালগঞ্জের চন্দ্রনাথ বোসের উদ্দেশ্যে এই কথাগুলো বলেছিলেন। এর দীর্ঘকাল পরে ১৯৭২ সালে পাকিস্তানের জল্লাদশাহীর কারাগার থেকে স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করার পথে দিলি্লতে এবং একই দিন স্বদেশে ফিরে ঢাকার ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে লাখো জনতার সমাবেশে বঙ্গবন্ধুর প্রদত্ত ভাষণের মধ্যেও তার মহান আদর্শের বিষয়ে জানা যায়। ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি পাকিস্তানের কারাগার থেকে স্বদেশ প্রত্যবর্তনের পথে দিলি্লর পালাম বিমান বন্দরে ও দিলি্ল ক্যান্টনমেন্টের প্যারেড গ্রাউন্ডের জন সমাবেশে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীও এই সমাবেশগুলোতে উপস্থিত ছিলেন। বঙ্গবন্ধু বলেন তিনি ধর্মনিরপেক্ষতা, গণতন্ত্র, মানুষের স্বাধীনতা এবং বিশ্ব শান্তির আদর্শে বিশ্বাসী। এরপর ওই দিনই (অর্থাৎ ১০ জানুয়ারি, ১৯৭২) বিকাল ৩টার দিকে বঙ্গবন্ধুকে বহনকারী ব্রিটিশ কমেট বিমানটি স্বাধীন বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার মাটি স্পর্শ করে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে ঘিরে কিছু ঘটনা ও বাংলাদেশ শীর্ষক গ্রন্থে প্রকাশিত বিবরণ থেকে জানা যায় স্বাধীন দেশের মাটিতে ফিরে আসার পর ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে লক্ষ লক্ষ মানুষের সামনে প্রদত্ত বক্তৃতার মধ্যে বঙ্গবন্ধু তার আদর্শ সম্পর্কে বলেন, বাংলাদেশ একটি আদর্শ রাষ্ট্র হবে। আর তার ভিত্তি বিশেষ কোনো ধর্মীয় ভিত্তিক হবে না। রাষ্ট্রের ভিত্তি হবে গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা। এরই ধারাবাহিকতায় পরবর্তীকালে ১৯৭২ সালে প্রণীত স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধানে তিনি রাষ্ট্রীয় চার মূলনীতি হিসেবে ‘গণতন’্ত্র, ‘সমাজতন্ত্র’, ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ ও ‘জাতীয়তাবাদ’ সংযোজিত করেন।
১৯৭৫এর ১৫ আগস্ট সপরিবারে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং ওই বছরেরই ৩ নভেম্বর তার সুযোগ্য সহকর্মী জাতীয় চার নেতাকে হত্যা করা হয়। এরপর অবৈধভাবে ক্ষমতা দখলকারী খুনি খন্দকার মোশতাক এবং জেনারেল জিয়াউর রহমান গং ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্র নীতি দুটিকে সংবিধান থেকে বাদ দিয়ে বাংলাদেশকে একটি সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রে রূপ দেয়ার কাজ শুরু করে। ফলে, দৃশ্যত রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতার প্রচার ও প্রসার শুরু হয়। সংবিধানে ধর্মীয় লেবাস এটে দেয়ার কারণে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে দেশে সাম্প্রদায়িক অপশক্তি উৎসাহিত হতে থাকে। বাংলাদেশ ভূখ-ে অসাম্প্রদায়িকতার মূল ধারক ও বাহক বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতির কারণেই সাম্প্রদায়িক অপশক্তির এই আস্ফালনের সুযোগ সৃষ্টি হয়।
‘বঙ্গবন্ধু সরকারের সংক্ষিপ্ত শাসনামলের দিকে দৃষ্টি দিলে দেখা যাবে ১৯৭২ সাল থেকে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট নিহত হওয়ার দিন পর্যন্ত যেসব কর্মসূচি এবং সিদ্ধান্ত তিনি গ্রহণ করেছিলেন তার সবই ছিল শোষণমুক্ত সমাজতান্ত্রিক তথা অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র গঠনের প্রত্যয়ে ভাস্বর। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস বাঙালি জাতির অবিস্মরণীয় নেতা বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে গঠিত সমাজতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গিসম্পন্ন অসাম্প্রদায়িক চিন্তাভাবনার অনুসারী সরকারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র সাময়িকভাবে হলেও বিজয় হয়। তবে আশার কথা হচ্ছে_ এই ষড়যন্ত্র প্রতিহত করার অবিরাম সংগ্রামে লিপ্ত রয়েছে ‘সোনার বাংলা’ গড়ার স্বপ্নদ্রষ্টা বঙ্গবন্ধুর আদর্শে উদ্দীপ্ত তারই উত্তরসূরি ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে বাংলাদেশের বাঙালি তরুণ-তরুণী, যুবা-বৃদ্ধ প্রত্যেকে।
সাম্প্রদায়িকতার আগ্রাসী ধারাবাহিকতায় নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের পর ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের জনগোষ্ঠীসহ তােেদর উপাসনালয় এবং অন্যান্য স্থাপনায় ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ শুরু; ২০০১-এর অক্টোবরের নির্বাচনের আগে ও পরে সমগ্র বাংলাদেশব্যাপী জামায়াত-বিএনপি জোটের সহিংসতায় বিশেষ করে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর নারকীয় হত্যাযজ্ঞ, ধর্ষণ, লুটপাট; ২০০১-২০০৬ মেয়াদে পাকিস্তানপন্থী স্বাধীনতাবিরোধী নিজামী-মোজাহিদদের দোসর সরকারের আমলে সমগ্র বাংলাদেশ ছিল জঙ্গিবাদ ও দুর্নীতির অভয়ারণ্য। ২০০৪ সালের ১৭ আগস্ট সমগ্র বাংলাদেশের ৫০০ স্থানে গ্রেনেড হামলা, রমনা বটমূলে ছায়ানটের অনুষ্ঠানে বোমা হামলা, যশোরে উদীচীর অনুষ্ঠানে হামলা এবং ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট বঙ্গবন্ধু এভিনিউস্থ আওয়ামী লীগ কার্যালয়ের সামনে প্রকাশ্য জনসভায় দেশরত্ন শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশ্যে গ্রেনেড হামলা পরিচালিত হয়। দলীয় প্রধান শেখ হাসিনাক কোনো রকমে প্রাণে বেঁচে গেলেও বর্বরোচিত এই হামলায় আইভি রহমানসহ ২৩ জন আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী নিহত এবং অসংখ্য আহত হন।
সপরিবারে বঙ্গবন্ধুর ঘাতকদের রাষ্ট্রীয়ভাবে পুরস্কৃত ও পুনর্বাসিত করার পাশাপাশি জিয়া ও তার অনুসারীরা এবং স্বৈরাচার এরশাদ কর্তৃক সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র পাকিস্তানি স্টাইলের পদক্ষেপ গ্রহণ করার কারণে শোকাহত বাঙালির জাতীয়তাবাদ, অসাম্প্রদায়িক চেতনা, সংস্কৃতি, মূল্যবোধ, মুক্তিযুদ্ধের বীরত্ব গাথার উপর একে একে আঘাত করা হয়। পাকিস্তানে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের প্রায় বিলুপ্ত পর্যায়ে চলে এসেছে, ঠিক একই উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য বাংলাদেশেও উলি্লখিত শাসকশ্রেণি কর্তৃক রাষ্ট্রীয়ভাবে সাম্প্রদায়িকতাকে উৎসাহিত করার কারণে ‘ধর্মীয় সংখ্যাগরিষ্ঠভুক্ত’ এক শ্রেণির মানুষ ‘ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের’ উপর নিপীড়ন, নির্যাতন, হামলা, ধর্ষণ, লুটপাট, অপপ্রচার প্রভৃতি অপকর্মে লিপ্ত রয়েছে। আর এইসব সাম্প্রদায়িকতা ও ধর্মীয় গোঁড়ামিযুক্ত বিষবাষ্পের কারণেই আজ দেশে জঙ্গিবাদের উত্থান পরিলক্ষিত হচ্ছে।
উল্লেখ্য, বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতির কারণে বঙ্গবন্ধু ও আওয়ামী লীগকে সমর্থন করার অপরাধে এদেশের জাতিগত ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদেরকে নানামুখী নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে, এমনকি জন্মভূমি ছাড়তে হয়েছে। পঁচাত্তর সালে বঙ্গবন্ধুর নির্মম হত্যাকা-পরবর্তী প্রায় প্রতি বছরই ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের লোকেরা সাম্প্রদায়িক হামলার শিকার হয়েছে। তবে আশার কথা, বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে তার রক্ত এবং আদর্শের উত্তরাধিকারী জননেত্রী শেখ হাসিনা, জাতির পিতার নির্দেশিত পথ অনুসরণ করে দেশে অসাম্প্রদায়িকতার চেতনা এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। আর বঙ্গবন্ধুর আদর্শের প্রতি এদেশের ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের আস্থা চিরকাল। তাই পর্যবেক্ষকদের অভিমত হচ্ছে, বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য উত্তরাধিকারী দেশরত্ন শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগের গৃহীত অসাম্প্রদায়িক নীতি-আদর্শ ও অবস্থান সংখ্যালঘুদের কাছে গ্রহণযোগ্য- যা এখনো এই দলের প্রতি তাদের সমর্থনের মূল কারণ। ফলে লক্ষণীয় যে, বর্তমান সরকার কর্তৃক ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের জন্য ইতিবাচক কোনো পদেক্ষপ গ্রহণ করা হলেই সাম্প্রদায়িকগোষ্ঠী সমস্বরে শোরগোল শুরু করে দেয়।
সমাজের মধ্যে এই অপশক্তি নানা ধরনের অপতৎপরতায় লিপ্ত রয়েছে। তাই বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের ‘সোনার বাংলা’ বিনির্মাণের জন্য বাংলাদেশ থেকে সকল প্রকার সাম্প্রদায়িক শক্তিকে নির্মূল করার বিষয়টি অন্যতম প্রধান পূর্বশর্ত। সেই বিবেচনায় বঙ্গবন্ধুকন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার জন্য দৃঢ়ভাবে যথোপযুক্ত পদক্ষেপসমূহ গ্রহণ করবেন বলে বিবেকবান মানুষরা আশা করেন।

ড. অরুণ কুমার গোস্বামী: চেয়ারম্যান, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ এবং পরিচালক, সাউথ এশিয়ান স্টাডি সার্কেল, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *