বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ

পৃথিবীর দেশে দেশে, যুগে যুগে মানুষের স্বপ্ন, মানুষের আর্থিক, সামাজিক রাজনৈতিক মুক্তির প্রয়োজনে, সময়ের প্রয়োজনে ক্ষণজন্মা পুরুষ জন্ম নেন। ঠিক তেমনি হাজার বছরের গোলামি ও পরাধীনতার শৃংখলে বন্দি বাঙালিকে মুক্তি দিতে গোপালগঞ্জের টুঙ্গীপাড়ায় জন্ম নিলেন এক ক্ষণজন্মা মহান পুরুষ- শেখ মুজিবুর রহমান। ১৭৫৭ সালের বাংলার স্বাধীনতা যেখানে অস্তমিত হয়েছিল বাংলার শেষ নবাব সিরাজদ্দৌলার পতনের মধ্য দিয়ে। সে থেকে বারবার চেষ্টা করা হয়েছিল অস্তমিত স্বাধীনতার সেই সূর্য ফিরিয়ে আনতে। কালপরিক্রমায় ১৭৫৭ সালের পর দীর্ঘ ২১৪ বছর অপেক্ষা করতে হয়েছিল আমাদের। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা অর্জনের আগ পর্যন্ত দীর্ঘ পথ অতিক্রম করতে হয়েছে। পৃথিবীর ইতিহাসে এত অল্প সময়ে, এত রক্তপাত, ত্রিশ লাখ শহীদের আত্মত্যাগ, দু’লক্ষ মা-বোনের সম্ভ্রমহানি আর বিপুল সম্পদের ক্ষতির বিনিময়ে পেলাম স্বাধীনতা। বঙ্গবন্ধু শুধু বাংলাদেশের স্থপতিই ছিলেন না, ছিলেন জাতির জনক, মুক্তিযুদ্ধের একমাত্র পথনির্দেশক। তার জীবনাদর্শ, দর্শন অনুপ্রেরণা জোগাবে সকল অন্যায়, অনিয়ম, ও বঞ্চনা থেকে মুক্তির সংগ্রামে অবতীর্ণ হতে। এ বিবেচনায় জীবিত বঙ্গবন্ধুর চেয়ে মৃত বঙ্গবন্ধু অনেক বেশি শক্তিমান। এ ক্ষেত্রে তার জীবন ইতিহাস, স্মৃতিচারণমূলক লেখা ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’, ‘কারাগারের রোজনামচা’ রাজনৈতিক জীবনে বিভিন্ন সভা সমাবেশে প্রদত্ত ভাষণ, বিশেষ করে ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে দেওয়া তার কালজয়ী ভাষণ, বাঙালির মুক্তিসদন ঐতিহাসিক ৬ দফা, পরবর্তীকালে ১১ দফা, স্বাধীনতা ঘোষণা, ক্ষমতায় থাকাকালে প্রদত্ত ভাষণ, বক্তব্য পাঠে, পর্যালোচনায় এই সত্যের প্রতিফলন পাওয়া যাবে। বঙ্গবন্ধুর জীবনাদর্শকে সামনে রেখে এবং হৃদয়ে লালন করে দেশের অগ্রগতিতে তার আদর্শকে ধারণ করেই আমাদের সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার বিকল্প নেই।
তিনিই জাগ্রত করেছেন অধিকারবোধ, স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন মুক্তির। বাঙালির অধিকার আদায়, স্বাধিকার থেকে স্বাধীনতা, মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতা অর্জনের পথে তিনি বারবার কারাবরণ করেছেন। কিন্তু কোনো লোভ-লালসার কাছে কখনো মাথা নত করেননি।
যেসব মহান নেতা পৃথিবীর কোনো জাতির মুক্তির জন্য নেতৃত্ব দিয়েছেন, তারা কোনো না কোনো রাজনৈতিক দলের অন্তর্ভুক্ত থেকেই সেই কাজটি করেছেন; সে জন্য তারা পরবর্তী সময়ে শুধু সেই নির্দিষ্ট দলের সংকীর্ণ পরিচয়ের গণ্ডিতে আবদ্ধ থাকেননি, সামগ্রিকভাবে সেই জাতি তাকে স্থান দিয়েছে সব ধরনের দলীয় সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে সর্বজনীনভাবেই সবার শীর্ষে। বঙ্গবন্ধুকেও আজ আর কোনো বিশেষ দলীয় পরিচয়ের গণ্ডিতে আবদ্ধ রাখা যায় না- বঙ্গবন্ধু সবার, শুধু এই বাঙালি জাতি কিংবা বাংলাদেশ নয়, বিশ্বের ইতিহাসে অক্ষয় নাম। তার মতো তেজোদীপ্ত নেতা বিশ্বের ইতিহাসে বিরল।
বঙ্গবন্ধু একজন খাঁটি মানবতাবাদী, মানবদরদি এবং দেশপ্রেমিক। এ দেশের মানুষকে স্বাধীনতা স্বপ্ন দেখিয়েছেন এবং স্বাধীনতা অর্জনে বাঙালিকে আন্দোলিত করেছিলেন। স্বপ্নের স্বাধীনতা তিনি উপহার দিয়েছেন। বাংলাদেশের আজ বিশ্বে অগ্রগতির অনন্য রোল মডেল। বরং উন্নত বিশ্বের বহু দেশের কোনো কোনো ইস্যুতে বা বিষয়ভিত্তিক অর্জন বা সাফল্যের চেয়ে বাংলাদেশ অনেক এগিয়ে। এটা সম্ভব হয়েছে স্বাধীনতা অর্জনের মধ্য দিয়ে। এ দেশের নাগরিক হিসেবে বিশ্বব্যাপী আমাদের যে অবাধ বিচরণ, তা বঙ্গবন্ধুর কল্যাণেই সম্ভব হচ্ছে। নানা প্রতিকূলতা ডিঙিয়ে আমাদের আজ যে দৃপ্ত পদচারণা, তা বঙ্গবন্ধুর অবদান। বর্তমানে তারই সুযোগ্য কন্যা শেখ হাসিনার হাত ধরেই জাতির অর্থনৈতিক মুক্তির রোডম্যাপ বাস্তবায়ন হচ্ছে। সমাজ ও অর্থনীতির বিভিন্ন সূচকে আমাদের সাফল্য বিশ্ববাসীর মনোযোগ আকর্ষণ করছে। এ সবই সম্ভব হয়েছে স্বাধীনতার কল্যাণে। স্বাধীনতার মহান স্থপতি হিসেবে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শুধু যে সম্ভাবনার এ দিগন্ত উন্মোচন করেছেন তাই নয়, একইসঙ্গে হতাশাগ্রস্ত জাতিকে উদ্বুদ্ধ করেছেন ভয়কে জয় করার জন্য। মৃত্যুঞ্জয়ী মন্ত্রে দীক্ষিত করেছেন জাতিকে। বঙ্গবন্ধুকে হারানোর এ শোক ইতিহাস কীভাবে সহ্য করবে। কারণ ‘একজন মুজিবের শোক, যেন আমাদের শত শত সিরাজদ্দৌলার জন্য শোক ’।
আজও স্মৃতিতে ভেসে ওঠে ছোট্ট রাসেলের আকুতি- ‘আমি মায়ের কাছে যাবো’। কিন্তু তার এই আকুতিতে খুনিদের মনকে নাড়া দিতে পারেনি। নিষ্ঠুর সেনা সদস্যের কাছে, তাকে মায়ের কাছে নিয়ে যাওয়ার পরিবর্তে বুলেটের আঘাতে তাকে বিদায় জানানো হয়েছিল। খুনিচক্র মূলত বঙ্গবন্ধুকেই নয়, পুরো পরিবারকে হত্যার মধ্য দিয়ে পাকিস্তানের পরাজয়ের প্রতিশোধে মত্ত হয়েছিল। এ কারণে জান্তারা একে একে বঙ্গমাতা মানে বঙ্গবন্ধুর স্ত্রী বেগম মুজিব, শেখ কামাল, সুলতানা কামাল, শেখ জামাল, রোজী জামালের মতো তরুণ-তরুণীদের হত্যা করা হয়েছে। রোজী জামাল এবং সুলতানা কামালের হাতের মেহেদির রং তখনো মুছে যায়নি। যাদের চোখে ছিল দেশ গড়ার স্বপ্ন; শিল্পে, সঙ্গীতে, খেলাধুলায় দেশকে সমৃদ্ধ করার লক্ষ্যে ছিল নিরন্তর প্রচেষ্টা। কিন্তু ’৭৫-এর ১৫ অগাস্ট কালরাতে সব শেষ করে দিলো হায়নার দল। আজ পরিবর্তিত সময়ের বাস্তবতায় দিন যতই অতিবাহিত হচ্ছে ততই বঙ্গবন্ধুর প্রয়োজনীয়তা, অপরিহার্যতা, প্রাসঙ্গিকতা বেশি মাত্রায় অনুভব হচ্ছে। তার শূন্যতায়, তার অনুপস্থিতিতে আমাদের রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজনীতি, সংস্কৃতি, লৌকিকতা, মানবিকতা হোঁচট খাচ্ছে বারবার। জাতির উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ বিনির্মাণের পথে বারবার তার কাছেই আমাদের ফিরে যেতে হবে। কারণ জাতির অর্থনৈতিক মুক্তি অর্জনের প্রয়োজনেই মুজিবের আদর্শের কাছে, দর্শনের কাছে ফিরে যাওয়া আর তার দেখানো পথেই সম্ভব সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণ। জাতির অর্থনৈতিক মুক্তি অর্জন সম্ভব তার অসমাপ্ত স্বপ্ন বাস্তবায়নের মাধ্যমেই। ভারতের বিখ্যাত কবি অন্নদাশঙ্কর রায় বঙ্গবন্ধুকে নিবেদিত পঙ্ক্তিমালায় লিখেছেন- ‘যতোকাল র’বে পদ্মা-মেঘনা/ গৌরী-যমুনা-বহমান/ ততোকাল র’বে কীর্তি তোমার/ শেখ মুজিবুর রহমান’। তার এই প্রত্যাশার সঙ্গে সহমত পোষণ করে বলা সঙ্গত যে, যতদিন বাংলাদেশ থাকবে, স্বাধীনতা থাকবে, দেশের নদনদীর স্রোত বহমান থাকবে, পাখ-পাখালির কলতান থাকবে, সবুজ শ্যামল বাংলার প্রকৃতি, আকাশ বাতাস থাকবে ততদিন আমাদের মাঝে চিরভাস্বর, চির অমর, অজেয়, অক্ষয় হয়ে থাকবেন তিনি। তার ও তার পরিবারের শহীদ সকল সদস্যের আত্মার শান্তি কামনায় দিবানিশি প্রার্থনা আমাদের।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *