বঙ্গবন্ধু, মুক্তিযুদ্ধ ও আজকের বাংলাদেশ

আজ জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৯৬তম শুভ জন্মদিন ও জাতীয় শিশু দিবস। ১৯২০ সালের এই দিনে জন্ম নিয়েছিলেন এই মহান ব্যক্তি। তিনি আজ আমাদের মাঝে নেই। কিন্তু স্বাধীন বাংলাদেশের পথিকৃত হিসেবে মানুষের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন সংগ্রাম করে বাংলার মাটি ও মানুষের সাথে আজো তিনি মিশে আছেন।

স্বাধীন বাংলাদেশ বঙ্গবন্ধুর অমর কীর্তি। তাই বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ এক অবিচ্ছেদ্য নাম। যতদিন বাংলার মানচিত্র থাকবে, যতদিন বাঙালির ইতিহাস থাকবে ততদিন বঙ্গবন্ধু থাকবেন অমর-অবিনশ্বর। বাংলার স্বাধীনতা, ভাষা, সমাজ, সংস্কৃতি ও সভ্যতার মধ্যে একজন শ্রেষ্ঠ বাঙালিরূপে বঙ্গবন্ধু থাকবেন চিরজাগ্রত। রাজনৈতিক গবেষণা সংস্থা ইউএসবি’র (USB) ভাষায় বঙ্গবন্ধু `World political poet’।

সভ্যতার শুরু থেকেই বারবার মানবতা হয়েছে ভূলুণ্ঠিত, শোষক ও শোষিতের ব্যবধান বেড়েছে, উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেয়েছে শোষণের মাত্রা—হোক তা প্রাচ্য কি তার বিপরীত গোলার্ধ। তাই কৃষ্ণাঙ্গ মানুষদের উপর অমানুষিক নির্যাতন বন্ধে, মানুষ হিসেবে তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে প্রয়োজন পড়েছিলো একজন মার্টিন লুথার কিং বা ম্যালকম ম্যাক্সের। ঠিক তেমনি বাঙালিদের অর্থাৎ তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি সীমাহীন বৈষম্য রোধ করতে দরকার হয়েছিলো একজন শেখ মুজিবুর রহমানের মতো এক মহানায়কের।

পাকিস্তান কেবল অর্থনৈতিকভাবে আমাদেরকে শোষণ করতে চায়নি, বরং তাদের আগ্রাসী হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলো আমাদের ভাষা, সংস্কৃতি, সম্প্রীতিপূর্ণ পরিবেশ, শিক্ষা ইত্যাদির উপর। সামরিক স্বৈরশাসনের শাসনের মাধ্যমে প্রচণ্ড চাপ, অনিশ্চয়তা ও ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে যখন বাঙালিদের এরা হাতে ধরা সুতোয় পুতুলের মতো নাচাতে চেয়েছিলো, ঠিক তখনই স্বমহিমায় উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিলেন নিষ্ঠা, ভালোবাসা, আন্তরিকতা, একাগ্রতা, সাহসিকতায় এবং সর্বোপরি দৃঢ়তায় এই বজ্রকণ্ঠস্বরধারী মানুষটি। বাঙালির স্বাধীনতার মূর্ত প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন সেই ঐকান্তিক প্রয়োজনের সময়ে।

বঙ্গবন্ধু বরাবরই অটল থেকেছেন তাঁর নীতিতে। শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত চেষ্টা করেছেন অহিংসপন্থায় বাঙালির অধিকার অর্জনের এ আন্দোলনে সফল হতে। তাই দেখা যায়, ’৭০ এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের পর ক্ষমতা তাদের না দেয়ার পরও তিনি সহিংসতায় না গিয়ে তিনি ভুট্টোর ক্ষমতাভাগের দাবির তীব্র সমালোচনা করেন।

যুক্তিসঙ্গত দাবি না মানার পর পিঠ দেয়ালে ঠেকে যাওয়াতেই ৭ মার্চ তাঁকে রচনা করতে হয় বাঙালির জীবনের এক অনন্য সাধারণ মানব মুক্তির কবিতা।

১৯৬৩ এর ২৮ আগষ্ট বর্ণবাদী আন্দোলনের নেতা মার্টিন লুথার কিং এর সেই ‘আই হ্যাভ অ্যা ড্রিম’ মহাকাব্যের পর আরো একটি মহাকাব্য রচিত হয় ১৯৭১ এর ৭ মার্চ রেসকোর্সের ময়দানে। সাড়ে ৭ কোটি মানুষের জন্য তাঁর ভাষণ সর্বশ্রেষ্ঠ মহাকাব্য রচনার মাহেন্দ্রক্ষণ যা দিয়েছে আমাদের লাল সবুজের পতাকার সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা।

বঙ্গবন্ধু জীবনব্যাপী একটিই সাধনা করে গেছেন, তা হলো- বাংলা ও বাঙালির মুক্তির জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করা। তার এই সাধনার শুরু ১৯৪৮ থেকে। তাই ‘৪৮-এর জানুয়ারির ৪ তারিখে গঠন করেছিলেন ছাত্রলীগ এবং ‘৪৯-এর জুনের ২৩ তারিখে আওয়ামী লীগ।

সেই থেকে বাঙালির জাতীয় মুক্তি-সংগ্রামের প্রতিটি আন্দোলনকে সুপরিকল্পিতভাবে নেতৃত্ব প্রদান করে ধাপে ধাপে এগিয়ে নিয়ে গেছেন। ভাষা আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন স্বয়ং বঙ্গবন্ধু। বাল্যকাল ও কৈশোর থেকেই যে সংগ্রামের শুরু, তা থেমে থাকেনি; বরং কালক্রমে তা বিস্তৃত ও প্রসারিত হয়ে সমগ্র বাঙালির মুক্তি-সংগ্রামের এক মহৎ প্রচ্ছদপট এঁকে স্বাধীন ও সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের রূপকার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব হয়ে ওঠেন ইতিহাসের মহামানব।

বঙ্গবন্ধু তার জীবনের প্রতিটি ধাপেই বাঙালির সার্বিক মুক্তির জয়গান গেয়েছেন। তিনি তো সব সময় বলতেন, এমনকি দু’দুবার মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েও তিনি বলেছেন, ‘ফাঁসির মঞ্চে যাওয়ার সময় আমি বলব, আমি বাঙালি, বাংলা আমার দেশ, বাংলা আমার ভাষা।’ যে বাংলার স্বপ্ন তিনি দেখেছিলেন, যে বাংলার জন্য তিনি যৌবনের অধিকাংশ সময় কারাগারে কাটিয়েছেন, ফাঁসির মঞ্চে গেয়েছেন বাঙালির জয়গান, সেই বাংলা ও বাঙালির জন্য তার ভালোবাসা ছিল অপরিসীম।

বিশাল হৃদয়ের মহৎ মনের মানুষ ছিলেন তিনি। নিজের সব কিছুই জনগণের জন্য উৎসর্গ করেছিলেন। অতি সাধারণ জীবন ছিল তার। রাষ্ট্র ক্ষমতায় আসীন হয়েও নিরাভরণ, ছিমছাম আর আটপৌরে ৩২ নম্বরের বাড়িটিতেই আমৃত্যু থেকেছেন।

একবার এক জনসভায় তিনি বলেছিলেন, ‘একজন মানুষ আর কী চাইতে পারে- আমি যখন ভাবি দূরে এক জনশূন্য পথের ধারে আধো আলো-ছায়ায় এক লোক লণ্ঠন হাতে দাঁড়িয়ে আছে শুধু আমাকে এক নজর দেখবে বলে, তখন মনে হয়, একজন মানুষের পক্ষে আর কী চাওয়া-পাওয়ার থাকতে পারে।’

নিরন্ন, হতদরিদ্র, মেহনতী মানুষের প্রতি বঙ্গবন্ধুর ছিল প্রগাঢ় ভালোবাসা। তা প্রতিফলিত হয়েছে তার প্রতিটি কর্মে ও চিন্তায়। ‘৭৩-এর ৯ সেপ্টেম্বর, আলজেরিয়ার রাজধানী আলজিয়ার্সে অনুষ্ঠিত জোটনিরপেক্ষ সম্মেলনে বক্তৃতায় বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘বিশ্ব আজ দুই ভাগে বিভক্ত শোষক আর শোষিত। আমি শেষিতের পক্ষে।’

কিন্তু আমরা কী দেখছি- যে মহান নেতা গণতন্ত্রের স্লোগানে আমাদেরকে শোষণ নিপীড়ন থেকে মুক্ত করে একটি স্বাধীন দেশ উপহার দিলেন। আজ আমরা সেই চেতনা থেকে অনেক দূরে, প্রাতিষ্ঠানিকভাবে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত করার পরিবর্তে আজ গণতন্ত্রকে হত্যায় মেতে উঠেছি। দেশের উন্নয়নের গতিকে নানা ষড়যন্ত্রের বেড়াজালে আবদ্ধ করে রেখে বিভিন্নভাবে বাধাগ্রস্ত করছি দেশের অগ্রযাত্রা।

আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনার মূল সারাংশ ছিল- শোষণ-নিপীড়ন থেকে মানুষের মুক্তি অর্থাৎ শোষণমুক্ত একটি গণতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠা। ৭ মার্চ ১৯ মিনিটের ঐতিহাসিক ভাষণে বঙ্গবন্ধু সেই স্বপ্নই দেখিয়েছিলেন ৭ কোটি বাঙালিকে। তিনি দেখিয়েছিলেন এদেশের নিপীড়িত-শোষিত মানুষের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মুক্তির স্বপ্ন। আর সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নেই বাঙালীর মনে জাগ্রত করেছিল অদম্য স্পৃহা। আর সেই ভিত্তিতেই দীর্ঘ ৯ মাস যুদ্ধে ৩০ লাখ বাঙালির রক্ত আর অগণিত মা বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে অর্জিত হয় সেই কাঙ্খিত মুক্তি।

কিন্তু দেশ স্বাধীনের ৪৪ বছর পর আজ ২০১৫ সালে দাঁড়িয়ে যদি মূল্যায়ন করি তাহলে কী সেই চেতনা মোতাবেক আমরা প্রকৃত অর্থে মুক্তি লাভ করতে পেরেছি? পেরেছি শোষণমুক্ত গণতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে? না আমাদের উপর শোষন-নিপীড়নের মাত্রা আরো বেড়েছে!

প্রসঙ্গত বলতেই হয়- দেশ স্বাধীনের আগে বাঙালীদের শোষণ নিপীড়ন করতো ভিন্ন ভূখন্ডের ভিন্ন ভাষাভাষি লোকেরা, আজ তা করছে রাজনীতির নামে নিজ দেশের স্বার্থবাজ লোকেরা। চলতি বছরের শুরু থেকে প্রতিদিন আমরা কী দেখছি? প্রতিদিন মানুষ মরছে পেট্রল বোমা হামলায় না হয় বন্দুকযুদ্ধে। না হয় মানুষ গুম হয়ে যাচ্ছে। এই মিছিল ক্রমেই দীর্ঘ হচ্ছে।

এর আগেও দেশে অনেক রাজনৈতিক সংকট ছিলো, এ জন্য আন্দোলন সংগ্রামও হয়েছে। তবে এভাবে পেট্রল বোমা ও বন্দুকযুদ্ধের নামে কখনো নৃংশসভাবে মানুষ হত্যা করা হয়নি। এভাবে মানুষ গুম হয়নি।

ফলে আসুন আজকের প্রেক্ষাপটে আমরা সবাই সেই মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় আবারো গর্জে উঠি এবং স্বার্থান্বেষী-সুবিধাভোগী রাজনীতির কবল থেকে দেশ ও জাতিকে মুক্ত করি। সত্যিকারের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করি। এই হোক ২০১৫ সালে বঙ্গবন্ধুর ৯৬তম জন্মদিনে আমাদের অঙ্গিকার।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *