বর্তমান প্রজন্মের পাঠাভ্যাস গড়ে উঠুক

ভাষা আন্দোলনের স্মৃতি বিজড়িত মাস ফেব্রুয়ারির প্রথম দিন থেকে শুরু হলো অমর একুশে গ্রন্থমেলা-২০১৭। ১ ফেব্রুয়ারি বিকেলে বাংলা একাডেমিতে মেলার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন চীনের প্রখ্যাত গবেষক ও রবীন্দ্র-অনুবাদক ডং ইউ চেন, অস্ট্রিয়ার মেনফ্রেড কোবো, পুয়ের্তোরিকোর লুস মারিয়া লোপেজ, ভারতের চিন্ময় গুহ প্রমুখ। প্রকাশক-প্রতিনিধি হিসেবে বক্তব্য রাখেন মফিদুল হক। সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর এমপির সভাপতিত্বে শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন মন্ত্রণালয়ের সচিব বেগম আক্তারী মমতাজ। স্বাগত ভাষণ দেন একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক শামসুজ্জামান খান। সকলকে বই পড়ার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমার বাসার প্রায় সবারই বই পাঠের অভ্যাস আছে। এখন ডিজিটাল মাধ্যমে বই পড়ার অনেক সুযোগ হয়েছে। তার পরেও বইয়ের পাতা উল্টে বই পড়ার মজাই আলাদা। এ কারণেই আমি চাই প্রতিবছর আরও নতুন নতুন বই ছাপা হোক। বর্তমান প্রজন্মের পাঠাভ্যাস গড়ে উঠুক। প্রধানমন্ত্রী দুঃখ করে বলেন, সরকারে আসার পর থেকে অনেক কিছুই আর করতে পারি না। ওয়ান ইলেভেনের সময় কারাবাসের স্মৃতি উল্লেখ করে তিনি বলেন, সেটা ছিল ছোট কারাগার। এখন যেন বড় কারাগারে আছি। অনেক কাজ। প্রচুর ব্যস্ত থাকতে হয়। তাই ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও বইমেলায় আসতে পারি না। অনুবাদ সাহিত্যের ওপর জোর দিয়ে তিনি বলেন, অনুবাদ যত বেশি হবে ততই আমাদের সাহিত্যের সাথে অন্য দেশের সাহিত্যের মেলবন্ধন ঘটবে। আদান-প্রদান হবে। এটা খুব জরুরি।
ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস স্মরণ করিয়ে দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার, শফিউরের মতো বাংলার দামাল-দায়বদ্ধ তারুণ্য নিজেদের বুকের তাজা রক্তে রাজপথ রঞ্জিত করে উচ্চারণ করেছে মাতৃভাষা বাংলার অধিকার ও মর্যাদার কথা। স্বৈরাচারী পাকিস্তানি শাসকদের প্রবল পরাক্রমকে চ্যালেঞ্জ করে সেদিনের বাঙালি তরুণরা সংগ্রামী শপথে ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল, মাতৃভাষার জন্য বেছে নিয়েছিল শাহাদাতের পবিত্র পথ। তাদের চরম আত্মত্যাগের ভিত্তিতে দাঁড়িয়ে বাংলা পেয়েছিল রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা। বস্তুত ভাষা আন্দোলন শুরু হয় সাতচল্লিশে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পরপরইÑ ১৯৪৮ থেকে, যার প্রাথমিক পর্ব থেকেই নিবিড়ভাবে যুক্ত 09ছিলেন আমাদের মহান নেতা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। একুশের পথ বেয়েই আমরা পেয়েছি স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্র। স্বাধীন বাংলাদেশের বাংলা একাডেমি মাসব্যাপী গ্রন্থমেলার আয়োজনের মধ্যে দিয়ে যেমন ভাষাশহীদদের স্মৃতির প্রতি সম্মান জানায় তেমনি সারা বিশ্বের জ্ঞানপিপাসু মানুষের কাছে গ্রন্থপ্রেমের বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমান গণতান্ত্রিক আওয়ামী লীগ সরকার এ দেশের মানুষের জীবনমান উন্নয়নের জন্য আন্তরিকভাবে কাজ করে যাচ্ছে। দেশ থেকে দারিদ্র্য, অশিক্ষা, অপুষ্টি ইত্যাদি দূরীকরণে আমরা অনেকটাই সফলতা অর্জন করেছি। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার অংশ হিসেবে একাত্তরের ঘৃণ্য যুদ্ধাপরাধীদের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারকাজ সম্পন্নের পাশাপাশি বঙ্গবন্ধু হত্যাকা-সহ রাজনৈতিক হত্যাকা-সমূহের সুষ্ঠু বিচার বাস্তবায়ন করেছি। এখন আমাদের লক্ষ্য ২০২১ সালের মধ্যে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠা।
এদিন গ্রন্থমেলার উদ্বোধন অনুষ্ঠানে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার ২০১৬ প্রদান করা হয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কবি-সাহিত্যিকদের হাতে পুরস্কার তুলে দেন। অনুষ্ঠান মঞ্চে প্রধানমন্ত্রীর হাতে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বই তুলে দেওয়া হয়।
একই দিন তিনি ৪ দিনব্যাপী ‘আন্তর্জাতিক সাহিত্য সম্মেলন-২০১৭’ উদ্বোধন করেন। উদ্বোধনী আনুষ্ঠানিকতা শেষে মেলার বিভিন্ন স্টল ঘুরে দেখেন প্রধানমন্ত্রী।
বিদেশি সাহিত্যিকরা অভিভূত
অমর একুশে গ্রন্থমেলার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে এবারও উপস্থিত ছিলেন বেশ কয়েকজন বিদেশি অতিথি। বিভিন্ন ভাষার কবি- সাহিত্যিকরা বাংলাদেশ ও মাসব্যাপী বইমেলা নিয়ে নিজেদের ভালোলাগার কথা জানান। বিপুল উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন। তাদের বাংলা বলার চেষ্টা প্রধানমন্ত্রীসহ উপস্থিত সুধীজনরা দারুণ উপভোগ করেন। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে এবার বক্তব্য রাখেন চীনের প্রখ্যাত গবেষক ও রবীন্দ্র অনুবাদক ডং ইউ চেন, অস্ট্রিয়ার মেনফ্রেড কোবো, পুয়ের্তোরিকোর লুস মারিয়া লোপেজ, ভারতের চিন্ময় গুহ।
চীনের প্রখ্যাত গবেষক ও রবীন্দ্র অনুবাদক ডং ইউ চেন বাংলায় বক্তৃতা করেন। চীনা উচ্চারণে তার বাংলা বলা উপভোগ করেন শ্রোতারা। এই অনুবাদক বলেন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিভিন্ন রচনা চীনা ভাষায় অনুবাদ করা হয়েছে। সাত বছর আগে তার সম্পূর্ণ রচনা অনুবাদের সিদ্ধান্ত নেই আমরা। আমি এর প্রধান অনুবাদক ও সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছি। ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে ৪৩ খ-ে এটি প্রকাশিত হয়। খুব বড় বড় বই। এর ফলে চীন দেশের পাঠক ভালোভাবে বিশ্বকবিকে জানার সুযোগ পেয়েছেন। বাঙালি জীবন ও চিন্তাধারা সম্পর্কে আরও গভীরভাবে জানতে পারছেন তারা। এ ধরনের উদ্যোগের মাধ্যমে চীন ও বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে বন্ধুত্ব আরও দৃঢ় হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি। পরে বাংলা একাডেমিকে রবীন্দ্র রচনাবলী উপহার দেন তিনি।
অস্ট্রিয়ার কবি মেনফ্রেড কোবো বাংলায় শুরু করেন। বলেন, অনুষ্ঠানে আসতে পেরে আমি ভীষণ আনন্দিত। পরে ইংরেজিতে তিনি বলেন, বহু বহু বছর আগে আমি ‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’ শিরোনামের বিখ্যাত কনসার্টটি শুনেছিলাম। এরপর বাংলাদেশ সম্পর্কে আরও জানার সুযোগ হয়েছে। বইমেলার মাসব্যাপী আয়োজন নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করে তিনি বলেন, অস্ট্রিয়ায় তিন থেকে চার দিনের মেলা হয়। এখানে এক মাসের আয়োজন। এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
পুয়ের্তোরিকোর কবি লুস মারিয়া লোপেজ বলেন, শিক্ষা-সাহিত্য ও সংস্কৃতিই পারে সভ্যতাকে এগিয়ে নিতে, নারী-পুরুষ সমতার সমাজ নিশ্চিত করতে যে সমাজের দৃষ্টান্ত শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ বিশ্বের বুকে স্থাপন করেছে।
জার্মানির কবি টোবিয়াস বুরঘার্ট বলেন, অনুবাদ ও সংলাপের মধ্য  দিয়ে পৃথিবীর জাতিতে জাতিতে বন্ধুত্ব সৃষ্টি হতে পারে। অমর একুশে অনুষ্ঠানে খুব সুন্দর বলেন ভারতের কবি চিন্ময় গুহ। তার বক্তৃতায় প্রধান হয়ে ওঠে বই। আবৃত্তির মতো করে তিনি বলেন, ভাষাকে ভালোবেসে যে আশ্চর্য দেশের জন্ম হয়েছে, যে ভাষার ইতিহাস প্রতিরোধ সংগ্রামে রক্তদ্বীপময়, সেখানে অমর একুশে গ্রন্থমেলায় আমন্ত্রিত হয়ে আমি শিহরিত হয়েছি। আমার পূর্বপুরুষ বরিশাল এবং পাবনা থেকে এসেছিলেন। মুক্তিযুদ্ধ আজও ভুলিনি। বঙ্গবন্ধু-কন্যার পাশে বসেছি। এই সোনালি দুপুরে যে স্বপ্নস্মৃতি আমাকে তানপুরার মতো বাজিয়ে দিচ্ছে। যখন পৃথিবীজুড়ে গোধূলি সন্ধের নৃত্য, যখন ভয়ে আমাদের কান বধির হয়ে আছে, অন্ধ হয়ে আছে চোখ তখন ইতিহাসকে শরীরে ধারণ করে আপনারা এই গ্রন্থমেলায় যে প্রদীপ জ্বালাচ্ছেন তা পৃথিবীতে আমাদের দ্বীপিত করুক। ওপার বাংলায় আমরা তো আপনাদের রক্তের দোসর। আপনারা যে লড়াই করছেন সে লড়াই আসলে অন্ধকার ও শূন্যতার বিরুদ্ধে। আর প্রতিরোধের প্রধানতম অস্ত্র হচ্ছে বই। বই নামের ম্যাজিক লণ্ঠন। এই যাদু লণ্ঠন মানব ভাবনা আর তথ্যের সেই আধার যা অধিকাংশ চোখ ধাঁধানো বৈজ্ঞানিক প্রযুক্তির চেয়ে আরও অনেক স্থায়ী ও গভীরভাবে মানব সভ্যতাকে বদলে দিয়েছে। বই আমাদের দিয়েছে আলোর দিশা। এর চেয়ে অগ্নিবীণা আর কী হতে পারে? সে জন্য সারা পৃথিবীতে বারবার বই নিষিদ্ধ করেছে। অথবা পুড়িয়ে দিয়েছে। মনিষী বাণী থেকে নিয়ে তিনি বলেন, পৃথিবীতে বই পুড়ানোর চেয়েও বড় অপরাধ আছে। সেটি হচ্ছে বই না পড়া। ফরাসি ওপন্যাসিকের উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি বলেন, শিশুদের মতো শুধু আনন্দ পাওয়ার জন্য অথবা শিক্ষিত হওয়ার জন্য পড়বেন না। বাঁচার জন্য পড়–ন। তিনি বলেন, যখন সন্ধ্যে নেমে আসবে, বুদ্ধদেব বসুর তিথিডোর উপন্যাসের মতো বইয়ের পাতাগুলো খসখস করে বলবে, এসো এসো। কালো অক্ষরগুলো গুনগুন করে বলবে, শুনো শুনো। তখন সুখের ঢেউ ছলছল করে উঠবে বুকের ওপর। বইয়ের চেয়ে সুখ আর শুশ্রƒষা কে দিতে পারত আমাদের। বই জলে স্থলে অন্তরিক্ষে নৌকোয় জাহাজে বাসে ট্রেনে পড়া যায়। শুয়ে আধশুয়ে বসে দাঁড়িয়ে পড়া যায়। বই কখনও আপত্তি করে না। এমন বন্ধু কি আর আছে?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *