বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে নারীর অবদান অবিস্মরণীয় !!

১৯৭১ এর স্বাধীনতা যুদ্ধে তরুনদের পাশাপাশি নারীদের অবদান অনেক। আমাদের দেশীয় আলোচনায় বেশীরভাগ সময়ই এই মহান মুক্তিযোদ্ধা নারীদের নাম উঠে আসে না কিংবা তাদের কৃতিত্ব বা অবধানের কথা প্রকাশ করা হয়না। কিন্তু যে সব মহান ও দেশপ্রেমিক মহান নারীরা তাদের জীবন বিপন্ন করে দেশকে ভালোবেসে পুরুষের পাশাপাশি নিজের জীবনকে বিপন্ন করে যুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়েছিলো তাদের অবদানের কথা বাংলাদেশের ইতিহাস কখনো ভূলে যাবে না।
স্বাধীনতা যুদ্ধে অস্ত্র হাতে যুদ্ধক্ষেত্রে ফাকিস্তানীদের সঙ্গে যুদ্ধ করেছেন অনেক নারী। কাঁকন বিবি, তারামন বিবি, শিরিন বানু মিতিল, আশালতা, রওশন আরার মতো অনেক নারী সরাসরি সম্মুখ যুদ্ধে অংশ নিয়েছেন, ফাকিস্তানী হানাদারদের গুলি করে মেরেছেন। ভারতের পশ্চিমবঙ্গের গোবরা ক্যাম্পে সশস্ত্র প্রশিক্ষণ নিয়েছেন অনেক নারী। ভারতে শরনার্থী শিবিরে ডাক্তার, নার্স এবং স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে অসংখ্য নারী যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা ও শরনার্থীদের সেবা করেছেন। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শিল্পী হিসেবে অংশ নিয়েছেন অনেক নারী শিল্পী। এরা ছিলেন যুদ্ধের প্রেরণা। আবার দেশের অভ্যন্তরে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী, শান্তিকমিটি, রাজাকারবাহিনীর রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে এদেশের গ্রামে, গঞ্জে ,শহরে, বন্দরে অসংখ্য নারী মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কাজ করেছেন। তারা মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয় দিয়েছেন। যুগিয়েছেন খাদ্য, অস্ত্র বহন করেছেন, লুকিয়ে রেখেছেন, গোপন সংবাদ আনা নেয়া করেছেন। অথচ এই নারীরা তাদের অবদানের স্বীকৃতি ভালোভাবে পাননি আজও। ফাকিস্তানী হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসর রাজাকার, আলবদরের হাতে নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়েছেন এদেশের প্রায় তিন লাখ নারী। তারা ধর্ষিত হয়েছেন, নৃশংস নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এদের মধ্যে অনেকেই শহীদ হয়েছেন, অনেকে মৃত্যুর অধিক যন্ত্রনা সহ্য করেও প্রাণে বেঁচে গেছেন। এরা নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়েও নৈতিকভাবে পরাজিত হননি। এরা আপোষ করেননি ফাকিস্তানীদের সাথে। মরনের মুখোমুখি দাঁড়িয়েও এরা তাদের স্বামী, পুত্র, ভাইকে ধরিয়ে দেয়নি শত্রুর হাতে। অথচ যুদ্ধের পর এই বীরনারীরা তাঁদের প্রাপ্য স্বীকৃতি ও মর্যাদা এখনো পাননি বরং তাদের করা হয়েছে সমাজচ্যূত। যেন ধর্ষিত আর নির্যাতিত হওয়াটা তাদেরই ‘অপরাধ’ ছিল। মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্য করার জন্য ভাগীরথীকে নির্মম নির্যাতনের মাধ্যমে হত্যা করেছিল পাকিস্তানী সৈন্যরা। অথচ শহীদ ভাগরথী স্বাধীন দেশে পাননি তাঁর প্রাপ্য স্বীকৃতি। প্রয়াত ড. নীলিমা ইব্রাহিমের ‘আমি বীরাঙ্গনা বলছি’ বইয়ের পাতায় রয়েছে এই বীরনারীদের সংগ্রামের ইতিবৃত্ত।

তাদের প্রাপ্য সন্মানটুকু পায়নি। আমি মুক্তিযুদ্ধ দেখিনি। কিন্তু ইতিহাস থেকে যা জেনেছি তাতেই ওই সময়ের সাহসী নারীদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধায় মাথা নিচু হয়ে আসে। ইতিহাস আস্তে আস্তে বিকৃত হয়ে যায় সময়ের আর কালো ক্ষমতার প্রভাবে। তাই ১৯৭১ এর মহান মুক্তিযুদ্ধে আমাদের দেশের নারীদের অবদান গুলো যদি সঠিক ভাবে তুলে ধরা না হয় তাহলে পরবর্তী প্রজন্ম জানতেও পারবে না সেই হব মহীয়সী নারীদের নাম যাদের জীবনের বিনিময়ে আমরা অর্জন করেছি একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র।

I could hardly contain my excitement when I first discovered, far away from Dhaka, in a little village in Sharupkathi, that a group of young girls had taken up arms to protect themselves and their village from the enemy during the war of liberation. Long before the Mukti Bahini entered the village, or even before Sector 9 was formed, Bastokathi had already built an organised resistance, led by Bithika and her brother Shamiron ~ সূত্র: Click This Link

“”ছোট্ট মেয়ে মিলি অষ্টম শ্রেণীর ছাত্রী। ছাত্র ইউনিয়নের সভা, মিছিল, শ্লোগানে যোগ দিতো। ছাত্রী দলে প্যারেড করে আসছিলো। বাসার বাধা পেলেও বাধা মানেনি। আমাকে সে বলতো এবারকার স্বাধীনতা সংগ্রামে শুধু ছেলেরা নয়, মেয়েরাও এগিয়ে যাবে। এ বাড়ির (ঢাকার নারিন্দার) আর কোনো মেয়ে এভাবে ভাবতেও পারে না। ভাবার মতো দুঃসাহস তাদের নেই। বারবার সে আমায় প্রশ্ন করতো- ‘দাদা, ওরা তো আক্রমণ করেছে, আমরা কি এখনো প্রতিরোধ করবো না? কেমন করে প্রতিরোধ করবো? আমাদের হাতে যে অস্ত্র নেই?’। স্বাধীনতা সংগ্রামের যুগে পুলিশের শ্যেন দৃষ্টি এড়িয়ে পলাতক অবস্থায় যে পরিবারে ছিলাম সেখানে বৌমার রক্ষণাবেক্ষণ ছাড়া বাঁচতেই পারতাম না। স্বাধীনতার পর নতুন অধ্যায়ে সে-ই বৌমাদের কথা ভুলেই বসেছিলাম। নেমকহারামী আর কাকে বলে?” ~ (রফিকুল ইসলাম সম্পাদিত ‘রক্তাক্ত বাংলা’, ঢাকা, মুক্তধারা, ১৯৭১-১৯৮৯। পৃষ্ঠা: ৫২, ১৭৮, ২১৩)

“”মুক্তিযুদ্ধে মেয়েদের অংশ গ্রহণ মানে মেয়েদের সাহস””~
(বাসন্তী গুহঠাকুরতা, একাত্তরের স্মৃতি, ঢাকা ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড, ১৯৯১)

ফটো সংগ্রহ ক্‌তজ্ঞতায় : Click This Link

মুক্তিযুদ্ধ শেষ হয়ে যাবার পর এই নারীদের অনেক গুরুত্তপুর্ন অর্থনৈতিক এবং সামাজিক ভুমিকা ছিলো দেশকে নতুন করে দাড় করানোর জন্য। নারীদের এই বিষয়টিও আজ আলোচনার বাইরে। যুদ্ধকালীন সময়ে আমাদের এই দেশের অনেক নারী হারিয়েছিলেন তার নিজের পরিবারের উপার্জনক্ষম পুরুষ সদস্য যেমন বাবা, ভাই, স্বামী, ছেলেকে।ফাকিস্তানি হানাদারদের বর্বরোচিত হামলায় কোন পুরুষ জীবিত না থাকায় আমাদের দেশের অনেক গ্রাম পরিচিতি পেয়েছিলো ‘বিধবার গ্রামে’। এই সময় দেশের অর্থনীতির অনেকাংশের হাল ধরেছিলো এই মহান এবং সাহসী নারীরাই। সংসারের পুরো দায়িত্ব ছিল তাদেরই কাঁধে। মুক্তিযুদ্ধের সময় বিদেশে বাংলাদেশের পক্ষে জনমত গঠনে কাজ করেছেন অনেক নারী। নূরজাহান মুর্শিদ, আতিয়া বাগমারের মতো উচ্চ শিক্ষিত নারীরা প্রবাসে বাংলাদেশের পক্ষে কূটনৈতিক তৎপরতা চালিয়েছেন, তহবিল সংগ্রহের কাজ করেছেন। মুক্তিযুদ্ধের একটি পোষ্টারের কথা এখানে প্রাসঙ্গিকভাবেই বলা চলে। পোস্টারটিতে লেখা ছিল বাংলার মায়েরা সকলেই মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছেন অস্ত্রহাতে, যারা সেবা করেছেন আহতদের, যারা বন্দীশিবিরে নির্যাতন সয়েছেন, মৃত্যুবরণ করেছেন তাঁরা সকলেই কি বীর মুক্তিযোদ্ধা নন? বাংলার মুক্তিযুদ্ধ ছিল এদেশের জনগণের যুদ্ধ যে জনগণের পঞ্চাশ শতাংশই নারী।

একাত্তরের স্বাধীনতা যুদ্ধ তার অমোঘ উচ্চারিত দাবি, ‘ইতিহাস কথা কয়’, ‘ইতিহাসকে কথা বলতে দাও’। কিন্তু সে দাবি পূরণে অনীহা ও অনিচ্ছা যেনো ক্রমান্বয়ে দূরতিক্রম্য হয়ে দাঁড়াচ্ছে। বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি লোকই কোনো না কোনোভাবে স্বাধীনতা যুদ্ধের সাথে জড়িত ছিলেন। গ্রামে গ্রামে, ব্যক্তিতে ব্যক্তিতে বহু ঘটনার উদ্ভব হয়েছে। বহু বীরত্ব গাঁথা বিশ্বাসঘাতকতা, ত্যাগ, অত্যাচার, নিপীড়ণের কাহিনী স্তরে স্তরে গড়ে উঠেছে। এর পরিমাণ অনুধাবন করা কঠিন। (সরদার ফজলুল করিম, রুমীর আম্মাও অন্যান্য প্রবন্ধ, ঢাকা, জাতীয় সাহিত্য প্রকাশনী, ১৯৮৯, পৃষ্ঠা ১৬৫-১৬৮)।

মুক্তিযুদ্ধ শেষ হয়ে যাবার পর এই নারীদের অনেক গুরুত্তপুর্ন অর্থনৈতিক এবং সামাজিক ভুমিকা ছিলো দেশকে নতুন করে দাড় করানোর জন্য। নারীদের এই বিষয়টিও আজ আলোচনার বাইরে। যুদ্ধকালীন সময়ে আমাদের এই দেশের অনেক নারী হারিয়েছিলেন তার নিজের পরিবারের উপার্জনক্ষম পুরুষ সদস্য যেমন বাবা, ভাই, স্বামী, ছেলেকে।ফাকিস্তানি হানাদারদের বর্বরোচিত হামলায় কোন পুরুষ জীবিত না থাকায় আমাদের দেশের অনেক গ্রাম পরিচিতি পেয়েছিলো ‘বিধবার গ্রামে’। এই সময় দেশের অর্থনীতির অনেকাংশের হাল ধরেছিলো এই মহান এবং সাহসী নারীরাই। সংসারের পুরো দায়িত্ব ছিল তাদেরই কাঁধে। মুক্তিযুদ্ধের সময় বিদেশে বাংলাদেশের পক্ষে জনমত গঠনে কাজ করেছেন অনেক নারী। নূরজাহান মুর্শিদ, আতিয়া বাগমারের মতো উচ্চ শিক্ষিত নারীরা প্রবাসে বাংলাদেশের পক্ষে কূটনৈতিক তৎপরতা চালিয়েছেন, তহবিল সংগ্রহের কাজ করেছেন। মুক্তিযুদ্ধের একটি পোষ্টারের কথা এখানে প্রাসঙ্গিকভাবেই বলা চলে। পোস্টারটিতে লেখা ছিল বাংলার মায়েরা সকলেই মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছেন অস্ত্রহাতে, যারা সেবা করেছেন আহতদের, যারা বন্দীশিবিরে নির্যাতন সয়েছেন, মৃত্যুবরণ করেছেন তাঁরা সকলেই কি বীর মুক্তিযোদ্ধা নন? বাংলার মুক্তিযুদ্ধ ছিল এদেশের জনগণের যুদ্ধ যে জনগণের পঞ্চাশ শতাংশই নারী।

রাজনৈতিক ছাত্র সঙগঠনের পাশাপশি মহিলা সমাবেশ মিছিলে যুক্ত হলো চট্টগ্রাম বান্ধবী সঙঘ, মহিলা পরিষদ, মহিলা আওয়ামী লীগ। জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারি, মার্চ’৭১-এ বড়ো বড়ো সমাবেশ হলো (আনিসুজ্জামান, আমার একাত্তর, ঢাকা সাহিত্য প্রকাশ, ২০০১। পৃষ্ঠা: ২৭)।

এটা অত্যন্ত দুঃথজনক যে ’৭১ এর মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের নারী সমাজের অবদানের মূল্যায়ন আজ পর্যন্ত হয়নি। অথচ বাস্তবে তাদেন সহযোগিতা অবিস্মরণীয় হয়ে রয়েছে। বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের গৃহবধূরা যেভাবে নিজেদের আহার পর্যন্ত মুক্তিযোদ্ধাদের দান করেছিলেন সে সব ঘটনা অন্তত মুক্তিযোদ্ধাদের স্মরণ থাকার কথা।.. ..(ফরিদা আখতার সম্পাদিত, মহিলা মুক্তিযোদ্ধা, ঢাকা, নারীগ্রন্থ, ১৯৯১। পৃষ্ঠা: ৪৪-৪৬)।

১৯৭১ সালে যুদ্ধের প্রথম দিকেই অনেকের সঙ্গে ভারতে পাড়ি জমান নিবেদিতা। কিন্তু দেশে যখন তুমুল যুদ্ধ চলছে, দেশের প্রতি মমত্ববোধ তাকে সেখানে নিশ্চুপ থাকতে দেয়নি। ভারতে বসেই চিন্তা করলেন কীভাবে নিজের মাতৃভূমিকে দখলদারদের হাত থেকে রক্ষা করা যায়। তাই দেশ ছেড়ে ভারতে আশ্রয় নেয়া অন্যান্য মহিলাদের যুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য উদ্বুদ্ধ করতে লাগলেন তিনি। ভারতের আশ্রয়গ্রহণকারী সিলেটের নারীদের নিয়ে গড়ে তুলেন মহিলা মুক্তি ফৌজ। প্রায় ৪২ জন মহিলা ছিলেন এই ফৌজের সদস্য।মুক্তি ফৌজের কাজ ছিল যুদ্ধে যাওয়ার জন্য তরুণ যুবকদের উৎসাহিত করা, আহত মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসাসেবা দেয়া, মুক্তিযুদ্ধে যেতে আগ্রহী যুবকদের থাকা ও খাওয়ার ব্যবস্থা করা, মহিলাদের কুটিরশিল্পে প্রশিক্ষণ দেয়া এবং প্রশিক্ষণার্থীদের তৈরি জিনিসপত্র বিক্রি করে তহবিল সংগ্রহ করা। নিবেদিতা দাশের নেতৃত্বে মহিলা যোদ্ধাদের সমন্বয়ে গঠিত এই ফৌজ পরবর্তীতে ৫নং চেলা সাব সেক্টরের অধীনে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করে। এই সব সেক্টরের অধীনে তারা সিলেট, ছাতক ও জগন্নাথপুরে বিভিন্ন এলাকায় মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কাজ করেন। সূত্র: Click This Link

কলকাতার গোবরা শিবিরে প্রথম দফায় প্রশিক্ষণ নিয়ে সিলেট সীমান্তে যান দুই গীতা আর ইরা৷ মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেবেন৷ কিন্তু সেখানে কোন পথ খুঁজে না পেয়ে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনার জন্য নারী নেত্রী সাজেদা চৌধুরীর কাছে টেলিগ্রাম করা হয়৷ টেলিগ্রামের উত্তর মেনে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিতে আগ্রহী ১৫ জন মেয়ের দলটিকে গাড়িতে করে আগরতলা পৌঁছনোর ব্যবস্থা করা হয়৷ সেখান থেকে তাদেরকে বিশ্রামগঞ্জ হাসপাতালে কাজে যোগ দিতে বলা হয়৷ বিশ্রামগঞ্জে কাজ শুরু করলেও অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করার দৃঢ় ইচ্ছা ছিল তাদের৷ সূত্র: Click This Link

এখানে সাত নারী মুক্তিযোদ্ধার ( নাজমা, হালিমা, ফাতেমা, রোকেয়া, জুলেখা, আমিরজান, শহরভানু ) পরিচয় এবং তাদের মুক্তিযুদ্ধে তাদের সরাসরি অংশগ্রহন এর বিবরন দেয়া আছে।

মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দেওয়া তথ্যানুযায়ী, মুক্তিযুদ্ধে আড়াই লাখ নারী ধর্ষিত হয়েছে। কিন্তু ওয়্যার ক্রাইমস ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটি তাদের গবেষণায় বলছে, এ সংখ্যা প্রায় চার লাখ ৬০ হাজার। এমনকি ৯ মাসে যে ৩০ লাখ বাঙালি গণহত্যার শিকার হয়েছে, তার ২০ শতাংশই নারী। নির্যাতনের ধরন ছিল বর্বরোচিত : একাত্তরে যে সাড়ে চার লাখ নারীর ওপর যৌন নির্যাতন চালানো হয়, তার ধরন ছিল অমানুষিক। ঘাতকরা কেবল নির্যাতন বা ধর্ষণ করেই ক্ষান্ত হয়নি, ৭০ শতাংশ ধর্ষিতার সামনে হত্যা বা নির্যাতন করা হয়েছে তাদের স্বামী বা নিকট আত্দীয়কে। নির্যাতিত নারীদের মধ্যে ৭০ শতাংশ নারীকে স্পট ধর্ষণ ও স্পট গণধর্ষণ, ১৮ শতাংশ নারীকে কারাগারে ও ক্যাম্পে নির্যাতন করা হয়েছে। ওয়্যার ক্রাইমস ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটির আহ্বায়ক ডা. এম এ হাসান গবেষণার উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, ধর্ষিত ও নির্যাতিত নারীদের ৫৬ দশমিক ৫০ শতাংশ মুসলমান, ৪১ দশমিক ৪৪ শতাংশ হিন্দু এবং ২ দশমিক ০৬ শতাংশ ছিলেন অন্যান্য ধর্মের। দেশের ৪২ জেলার ৮৫ থানায় নির্বাচিত ২৬৭ জনের সাক্ষ্যের ভিত্তিতে এই গবেষণা চালানো হয়।গবেষণায় আরো বলা হয়, নির্যাতিত নারীদের মধ্যে বিবাহিত ছিলেন ৬৬ দশমিক ৫০ শতাংশ এবং অবিবাহিত ৩৩ দশমিক ৫০ শতাংশ। ভারতে আশ্রয় নেওয়া নির্যাতিতা ও ধর্ষিতা হিন্দু নারীদের মধ্যে কুমারী বা অবিবাহিতা ছিলেন ৪৪ শতাংশ। এঁদের অধিকাংশই আর দেশে ফেরেননি। যন্ত্রণা নিয়ে বেঁচে থাকা : গবেষণায় দেখা যায়,নির্যাতন-পরবর্তী সময়ে নারীদের স্বাস্থ্য সমস্যা ছিল প্রকট। এসব নারী আক্রান্ত হয়েছে নানা যৌন রোগে। দীর্ঘদিন আক্রান্ত ছিলেন মানসিক রোগেও। ৮০ শতাংশ নারী বিষাদগ্রস্ততা এবং ৮০ শতাংশ অস্থিরতা, নৈরাশ্য ও মাথাব্যথায় ভুগেছেন দীর্ঘকাল। একইভাবে ৯০ শতাংশ নারী ভুগেছেন গ্লানিতে। আর ৭ শতাংশ নারীকে স্থায়ী ক্ষত নিয়েই বেঁচে থাকতে হয়েছে সারাজীবন। বেঁচে আছেন এখনো অনেকে।ডা. এম এ হাসান বলেন, সংস্থার নিজস্ব ল্যাবরেটরি ও নির্বাচিত হাসপাতালে বিশেষজ্ঞদের তত্ত্বাবধানে নির্যাতিত নারীদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হয়েছে। সে ফলাফলের ভিত্তিতেই উঠে এসেছে এই চিত্র।
সামাজিক লাঞ্ছনা : নির্যাতন-পরবর্তী সময়ে নারীদের সইতে হয়েছে নানা লাঞ্ছনা-গঞ্জনা। নির্যাতিত হওয়ায় স্বামী আর ঘরে তোলেনি ৭ শতাংশ নারীকে। ৯০ শতাংশ নারীকে লাঞ্ছিত হতে হয়েছে স্বজন বা পরিবারের অন্য সদস্যদের দ্বারা। গ্রামাঞ্চলে নির্যাতিত নারীদের বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই সবকিছু জানিয়ে বিয়ে দিতে হয়েছে। আর শরণার্থী হয়ে যাঁরা দেশত্যাগ করেছিলেন কিংবা যাঁরা শহরাঞ্চলে বাস করতেন তাঁদের বিয়ের ক্ষেত্রে গোপনীয়তা রক্ষা করা হয়েছে।
জন্ম নেয় যুদ্ধশিশু : ডা. এম এ হাসান বলেন, দেশ স্বাধীন হওয়ার পর প্রায় ৯০ হাজার নারীর গর্ভপাত ঘটানো হয়। জন্ম নেয় অসংখ্য যুদ্ধশিশু। তিনি আরো বলেন, তখন গর্ভপাতের জন্য উন্নত যন্ত্রপাতি ছিল না। যে যেভাবে পেরেছেন গর্ভপাত ঘটিয়েছেন। যেসব শিশু জন্ম নেয় তাদের অনেককে বিদেশে দত্তক দেওয়া হয়। অনেক শিশুকে ফেলে দেওয়া হয় ভাগাড়ে। সূত্রঃ Click This Link

আমরা যখন মুক্তিযুদ্ধের কথা বলি, তখন নারীমাত্রই বোঝাই বীরাঙ্গনাদের কথা। বলি, লাখো লাখো নারীর লাঞ্ছনার বিনিময়ে পেয়েছি স্বাধীন দেশ। কিন্তু সরাসরি যুদ্ধে যোগদান না করেও প্রতিমুহূর্তে আমাদের নারীরা নীরবে রেখে গেছেন অবদান। তাঁরা ঘরে থেকে ভাই-স্বামী-ছেলেদের যুদ্ধে যাওয়ার প্রেরণা জুগিয়েছেন। বিভিন্ন সময়, বিভিন্ন পরিস্থিতিতে তাঁরা রেখেছেন সাহসী ভূমিকা। কিন্তু তাঁদের নীরব এই অবদানের কথা, ঘটনা কখনো কারও তেমন জানা হয়নি। টুকরো টুকরো সাহসী জীবনের গল্পগুলো একত্রে আসেনি। (হামিদা হোসেন -সভাপতি আইন ও সালিশ কেন্দ্র) সূত্র : প্রথম আলো – তারিখ: ২৪-০৩-২০১০

নারীর ত্যাগের মর্যাদা ইতিহাস দেয়নি। দেখা যাচ্ছে, একই পরিবারে স্বামী-স্ত্রী শহীদ হয়েছেন। স্বামীকে ইতিহাস তুলে এনেছে। স্ত্রীকে কবর দিয়েছে। ইতিহাস কোনোদিন দুর্বল মানুষকে স্থান দেয় না। হয়তো সে ধারাবাহিকতা এখানেও বজায় রেখেছে। তবে আমরা অবাক হই, নারী লেখকরাও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে অনেক বই লিখেছেন, সেখানেও নারীর ত্যাগের কথা তেমনভাবে তুলে ধরা হয়নি। বাংলাদেশ সৃষ্টির ইতিহাসেই জেন্ডারভিত্তিক বৈষম্যের শুরু। এ মনোভাব থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। নারীর ত্যাগের কথা তুলে ধরতে হবে। তা না হলে একদিন নারীর ত্যাগের কথা পরবর্তী প্রজন্ম ভুলে যাবে। সেদিন ইতিহাস কলঙ্কিত হবে। তাই সঠিক অনুসন্ধান করে নারীর অবদানের কথা জাতির কাছে তুলে ধরতে হবে। ইতিহাসে নারীর সঠিক স্থান দিতে হবে। এ ত্যাগের কথা ভুলে গেলে চলবে না।

শুধু মুক্তিযুদ্ধ নয়, দেশের সব গণআন্দোলনে নারীর ভূমিকা ছিল। সব সময়ই নারী প্রেরণার উৎস হিসেবে কাজ করেছেন। সব সফলতার পেছনে নারী-পুরুষ সবার সমান অংশগ্রহণ থাকে। মুক্তিযুদ্ধেও ছিল। আমাদের সমাজ পুরুষতান্ত্রিক হওয়ায় নারীর কথা সেভাবে ওঠে আসেনি। মনে করা হয়েছে, তারা তো ছিল-ই। এটি আলাদা করে বলার কোনো দরকার নেই।( অধ্যাপক সালাহ্উদ্দিন আহমেদ, চেয়ারম্যান-মুক্তিযুদ্ধ গবেষণা ট্রাস্ট ) সূত্র : প্রথম আলো – তারিখ: ২৪-০৩-২০১০

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নারীর জীবন অধ্যয়নের একটি বড় দিক। এই যুদ্ধে নারীর ভূমিকা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, নারী তার সর্বাত্মক শক্তি নিয়োগ করেছিল স্বাধীনতার মতো একটি বড় অর্জনে। পুরুষের পাশাপাশি নারীর অংশগ্রহণ ছিল তার জীবনবাজি রাখার ঘটনা। অথচ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে নারীকে মূলধারায় স্থাপন না করার ফলে নারীর প্রকৃত ইতিহাস যথাযথ মূল্যায়ন করা হয়নি। নারী মুক্তিযুদ্ধে যে গৌরবগাথা রচনা করেছিল, তা ধর্ষিত এবং নির্যাতিত নারীর ভূমিকায় অদৃশ্য হয়ে আছে। প্রকৃত অবদান খুঁজে নারীকে মূলধারায় না আনার আরো একটি কারণ, নিম্নবর্গের নারীরাই ব্যাপকভাবে এই যুদ্ধে অংশ নিয়েছিল। নিম্নবর্গের নারীর ইতিহাস ক্ষমতাসীন সুশীল সমাজের কাছে ইতিহাসের উপাদান হিসেবে গৃহীত হতে শুরু করে স্বাধীনতার তিন দশক পরে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে নারীদের অংশগ্রহণ বিষয় গবেষণা পর্যায়ে খানিকটা কাজ হয়েছে। কিন্তু সাধারণ শিক্ষিতজন এবং নিরক্ষর অধিকাংশ মানুষের প্রচলিত ধারণায় মুক্তিযুদ্ধে নারীর অংশগ্রহণ ব্যাপকভাবে পরিচিতি লাভ করেনি ~ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও নারী- সেলিনা হোসেন। সূত্র : Click This Link

মহান মুক্তিযুদ্ধে নারীর অবদানের যথাযথ মূল্যায়নের সময় চলে গেছে অনেক আগেই। আমরা অনেক দেরী করে ফেলেছি এই সব সাহসী আর মহান নারীদের সন্মানিত করতে। আমাদের প্রিয় লাল সবুজ পতাকার পুরুষের রক্তের পাশাপাশি মিশে আছে নারীর রক্ত, নারীর আত্মততত্যাগ।সকল নারীদের এই মহান আত্মত্যাগের যথাযথ সন্মান জানাতে হবে। ৭১ এর সকল বীর নারীকে জানাই সশ্রদ্ধ অভিবাদন। অভিবাদন জানাই শহীদ সেলিনা পারভীন, শহীদ মেহেরুন্নেসা, শহীদ ভাগীরথী সহ অসংখ্য শহীদ নারীকে ,অসংখ্য নির্যাতিত নারীকে, অসংখ্য যোদ্ধানারীকে। বাংলার মায়েরা মেয়েরা সকলেই বীর, সকলেই মুক্তিযোদ্ধা।

এই আলোচনার পরেও কি মুক্তিযুদ্ধে নারীদের অবদান অস্বীকার করার কোন উপায় আছে ?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *