বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইশতেহার ঘোষণা

৩ মার্চ প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া ঢাকায় পার্লামেন্টারী পার্টিসমূহের নেতৃবৃন্দের এক গোল টেবিল বৈঠক আহ্বান করেন । আওয়ামী লীগ, পিপলস পার্টি, মুসলিম লীগ, ন্যাপ, জামায়াতে ওলামায়ে পাকিস্তান, জামায়াতে ইসলামী ও পিডিপির নেতাদের বৈঠকে আহ্বান করা হলে বঙ্গবন্ধু এ বৈঠককে ‘নিষ্ঠুর তামাশা’ বলে আখ্যায়িত করে তা প্রত্যাখ্যান করেন।

এই দিন বিকেলে ছাত্রলীগ সভাপতি নুরে আলম সিদ্দিকীর সভাপতিত্বে পলটন ময়দানে অনুষ্ঠিত হয় বিশাল ছাত্র জনসভা। সভায় ছাত্রনেতা তোফায়েল আহমেদ, সিরাজুল আলম খান, শ্রমিক নেতা আবদুল মান্নান প্রমুখ বক্তৃতা করেন। সভায় ঘোষণাপত্র ও প্রস্তাব পাঠ করেন ছাত্রলীগ নেতা এমএ রশীদ । ছাত্রলীগ সাধারণ সম্পাদক শাজাহান সিরাজ পাঠ করেন বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইশতেহার । ঘোষণা আকারে প্রস্তাব পাঠ করা হয়েছিল -‘৫৪ হাজার ৫০৬ বর্গ মাইল বিস্তৃত ভৌগলিক এলাকার সাত কোটি মানুষের জন্য আবাসভুমি হিসেবে স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের নাম বাংলাদেশ । এই দেশ গঠন করে নিম্নলিখিত তিনটি লক্ষ্য অর্জন করতে হবে-

১) স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশ গঠন করে পৃথিবীর বুকে একটি বলিষ্ট বাঙালি জাতি সৃষ্টি ও বাঙালির ভাষা, সাহিত্য , কৃষ্টি, সংস্কৃতির বিকাশের ব্যবস্থা করতে হবে ।

২) স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশ গঠন করে অঞ্চলে অঞ্চলে , ব্যক্তিতে ব্যক্তিতে বৈষম্য নিরসন কল্পে সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি চালু করে কৃষক শ্রমিক রাজনীতি কায়েম করতে হবে ।

৩) স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশ গঠন করে ব্যক্তি , বাক ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা সহ নির্ভেজাল গণতন্ত্র কায়েম করতে হবে ।

একই সাথে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘আমার সোনার বাংলা , আমি তোমায় ভালবাসি ’ গানটিকে জাতীয় সংগীত হিসেবে ব্যবহার করার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা হয় সেই সভায় ।

প্রচন্ড করতালির মধ্যে প্রস্তাব গৃহীত হলে ‘জয় বাংলা’ স্লোগানে মুখরিত হয়ে উঠে পলটন ও পার্শ্ববর্তী এলাকা ।

একই সভায় শেখ মুজিব ডাক দেন অসহযোগ আন্দোলনের এবং অবিলম্বে সেনাবাহিনীকে ব্যারাকে ফিরিয়ে নিয়ে জনপ্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের জন্য আহ্বান জানান ইয়াহিয়া সরকারের প্রতি । অসহযোগের প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে খাজনা ট্যাক্স বন্ধ করে দিতে তিনি আহ্বান জানান । বললেন, তাতেও পাকিস্তানী শাসক চক্রের মনোভাব পরিবর্তন না হলে ৭ মার্চ রেসকোর্সের ( বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান ) জনসভায় পরবর্তী কর্মসুচি দেয়া হবে ।

অবস্থা আয়ত্বে আনার জন্য সরকার জারি করে সান্ধ্য আইন( ১১০ নম্বর সামরিক আদেশ )। কিন্তু তা উপেক্ষা করেই অব্যাহত থাকে জনতার বিক্ষোভ ও মিছিল । এদিন মৌচাক মোড়ে পুলিশের গুলিতে শাহাদত বরন করেন ফারুক ইকবাল (সম্ভবত মুক্তিযুদ্ধের প্রথম শহীদ )।

স্বাধীনতার ইশতেহার পাঠক, মুক্তিযুদ্ধের সময়কার চার ছাত্রনেতার একজন শাজাহান সিরাজ বলেছেন, ইশতেহার পাঠ করা আমার জীবনে ও বাংলাদেশের ইতিহাসে বড় একটা ঘটনা। সেদিন ১৯৭১-এর ৩ মার্চ ঢাকায় সামরিক শাসক ইয়াহিয়া খান বিভিন্ন দলের পার্লামেন্টারি পার্টির নেতাদের এক গোলটেবিল বৈঠক ডাকেন। কিন্তু বঙ্গবন্ধু তা প্রত্যাখ্যান করেন। এদিন বিকালে ছাত্রলীগ সভাপতি নূরে আলম সিদ্দিকীর সভাপতিত্বে পল্টন ময়দানে এক বিশাল ছাত্র-জনসভার আয়োজন করা হয়। সভায় বঙ্গবন্ধুর সামনে আমার বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইশতেহার পাঠ করার কথা। কিন্তু সেদিন পল্টন ময়দানে ছিল লাখ লাখ লোকের সমাগম। আমি যখন ইশতেহার পড়া শুরু করি, তখন ছিল সাংঘাতিক রকম উত্তেজনা। মানুষ পাগলের মতো বলছিল ইশতেহার পড়া শুরু করুন। আমি বাধ্য হয়েই ইশতেহার পড়া শুরু করলাম। ইশতেহার পড়ার শেষ মুহূর্তে মঞ্চে এলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তখন আমার মাথায় বুদ্ধি এলো আমি ইশতেহার পড়া শেষ করে ফেললাম। আমি তো বঙ্গবন্ধুর সামনে ইশতেহার পড়তে পাড়লাম না। তখন আবার পড়া শুরু করলাম। লাইন বাই লাইন পড়ে গেলাম। ইশতেহারের ঘোষণায় ৫৪ হাজার ৫০৬ বর্গমাইলের সাত কোটি মানুষের আবাসভূমি হিসেবে স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের নাম ‘বাংলাদেশ’ উল্লেখ করি। একই সঙ্গে কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি গানটি জাতীয় সংগীত হিসেবে ব্যবহারের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করি। ইশতেহারে জাতীয় পতাকা কেমন হবে। বঙ্গবন্ধু হবেন স্বাধীন বাংলার প্রথম রাষ্ট্রপতি। এ সব উল্লেখ ছিল। বঙ্গবন্ধু সব সময় গুন গুন করে গান গাইতেন ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’। আমরা তাই এই গানটি বেশি পছন্দ করতাম। প্রচণ্ড করতালির মধ্য দিয়ে প্রস্তাব গৃহীত হলে ‘জয় বাংলা’ স্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে পল্টন ও আশপাশের এলাকা। বঙ্গবন্ধু তখনো এ ধরনের ঘোষণা দেননি। সভায় বঙ্গবন্ধু অহিংস অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দেন। তিনি সরকারের প্রতি অবিলম্বে সেনাবাহিনীকে ব্যারাকে ফিরিয়ে নিয়ে জনপ্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের আহ্বান জানান। অসহযোগের প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে খাজনা, ট্যাঙ্ বন্ধ করে দিতে বলেন। তাতেও পাকিস্তানি শাসক চক্রের মনোভাব পরিবর্তন না হলে ৭ মার্চ রেসকোর্সের (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) জনসভায় পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে বলে উল্লেখ করেন।

আগের দিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলায় লাখ লাখ ছাত্র-জনতার সম্মুখে তৎকালীন ডাকসু ভিপি আ স ম আবদুর রব স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন করে বাঙালির স্বাধীন আবাসভূমি অর্থাৎ বাংলাদেশ নামক নতুন রাষ্ট্রের অভ্যুদয় অনিবার্য করে তোলেন। ২ মার্চ পতাকা উত্তোলন ছিল উপনিবেশিক পাকিস্তান রাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক মৃত্যুপরোয়ানা। আ স ম আবদুর রব বলেন, স্বাধীনতার ইশতেহারে স্বাধীন বাংলা সরকারের কাঠামো, স্বাধীনতা আন্দোলন পরিচালনার জন্য বিভিন্ন কর্মপন্থা ও স্বাধীনতা আন্দোলনের কর্মকৌশল ও পদ্ধতির দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়। বঙ্গবন্ধুর সামনেই স্বাধীনতার ইশতেহার পাঠ করা হয়। অনুষ্ঠানে স্বাধীনতার পক্ষে চার ছাত্রনেতা—নূরে আলম সিদ্দিকী, আ স ম আবদুর রব, শাজাহান সিরাজ ও আবদুল কুদ্দুস মাখন স্বাধীনতা ও মুক্তিসংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ার শপথবাক্য পাঠ করেন। শপথ শেষে ‘জয় বাংলা’ বাহিনীর ডিপুটি চিফ কামরুল আলম খান খসরু আনুষ্ঠানিকভাবে গান ফায়ার ও হাসানুল হক ইনু পতাকা উত্তোলন করেন এবং জাতীয় সংগীত পরিবেশিত হয়। মার্চের ৩ তারিখ রাতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব বিএলএফের চার নেতার সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠকে স্বাধীনতা আন্দোলন বিষয়ে আলোচনা হয়। মার্চের ৪ তারিখে বঙ্গবন্ধু বিএলএফের চার নেতা সিরাজুল আলম খান, শেখ ফজলুল হক মনি, আবদুর রাজ্জাক ও তোফায়েল আহমেদকে ডেকে ৭ মার্চের ভাষণ নিয়ে গঠিত আওয়ামী লীগের হাইকমান্ড সম্পর্কে অবহিত করেন। বঙ্গবন্ধু জানান, তাঁর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের হাইকমান্ড গঠিত হয়েছে। ৫ মার্চ ৭ মার্চের ভাষণের বিষয় নিয়ে প্রথমে বিএলএফের হাইকমান্ড সিরাজুল আলম খানসহ চার নেতার সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর আলোচনা হয়। ৬ মার্চ রাত ১২টায় বিএলএফ ‘হাইকমান্ড’-এর সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর আবার আলোচনা হয়। সেদিন গভীর রাতে ৭ মার্চের ভাষণ বিষয়ে একটি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *