বাংলাদেশে প্রকাশনার স্বাধীনতা নিরঙ্কুশ

বাংলাদেশে চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা যেমন সাংবিধানিক অধিকার। তেমনি প্রকাশনার স্বাধীনতাও বাধাহীন। তবে এখানে কয়েক বছরে বেশ কয়েকজন মুক্তচিন্তার লেখক, প্রকাশক ও ব্লগারকে হত্যা করা হয়েছে। ধর্মীয় মৌলবাদ ও উগ্রপন্থিরা মুক্তচিন্তাকে রুখে দিতে হত্যাকেই একমাত্র অবলম্বন হিসেবে নিয়েছে। গত ২৪ জুন রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীন জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র এবং বাংলাদেশ জ্ঞান ও সৃজনশীল প্রকাশক সমিতির যৌথ আয়োজনে দুদিনের ‘ফ্রিডম টু পাবলিশ’ শীর্ষক আন্তর্জাতিক সেমিনারের উদ্বোধনী আলোচনায় বক্তারা এ কথা বলেন।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা এইচ টি ইমাম। ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সেমিনারে সম্মানিত অতিথি ছিলেন সংস্কৃতি সচিব আক্তারী মমতাজ। বিশেষ অতিথি ছিলেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান, ইন্টারন্যাশনাল পাবলিশার্স অ্যাসোসিয়েশনের (আইপিএ) সভাপতি রিচার্ড চার্কিন ও আইপিএ’র পরিচালক বেন স্টুয়ার্ড। স্বাগত বক্তব্য রাখেন গ্রন্থকেন্দ্রের পরিচালক আখতারুজ্জামান এবং জ্ঞান ও সৃজনশীল প্রকাশক সমিতির সভাপতি ওসমান গণি। সঞ্চালনা করেন সমিতির সহ-সভাপতি মাজহারুল ইসলাম।
এইচ টি ইমাম বলেন, এদেশের লেখকদের লেখার ক্ষেত্রে ও গণমাধ্যমে স্বাধীনতা রয়েছে। তবে স্বাধীনতার মানে স্বেচ্ছাচারিতা নয়। কোনো কিছুর বৈধতা দেওয়া মানে অনিয়ন্ত্রিত ক্ষমতা দেওয়া নয়। আপনি এমন কিছু বলতে পারেন না, যা অন্যের স্বাধীনতায় আঘাত করে। আপনার কোনো অধিকার নেই অন্যের ধর্মবিশ্বাসকে গালমন্দ করার।
অধ্যাপক আনিসুজ্জামান বলেন, প্রকাশনাকালের শুরু থেকেই এর ওপর নিয়ন্ত্রণ, সেন্সরশিপ আরোপিত হয়েছে। এর সাথে প্রকাশনার স্বাধীনতার দ্বন্দ্ব চলে আসছে। কয়েক বছরে মুক্তচিন্তার লেখক, ব্লগার ও প্রকাশকদের হত্যা করা হয়েছে। উগ্রপন্থিরা নির্ধারণ করেছে হত্যাই একমাত্র সমাধান। তবে দেশের অধিকাংশ মানুষ এসব সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে।
শামসুজ্জামান খান বলেন, এদেশে সব লেখকই সব কিছু নিয়ে লিখতে পারেন, লেখকদের চিন্তার স্বাধীনতা রয়েছে। তবে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) এবং ধর্মীয় বিষয়ে কোনো বাজে মন্তব্য বা লেখা হলে সেটা বরদাশত করা হয়নি এবং ভবিষ্যতেও করা হবে না। লেখার নামে ধর্মীয় উসকানিকে আমরা স্বাগত জানাই না।
আক্তারী মমতাজ বলেন, দেশের প্রকাশনা শিল্পে নানা সমস্যা রয়েছে। কিন্তু সরকার এসব ব্যাপারে সচেতন। বেআইনি প্রকাশনাকে কোনোভাবেই অনুমোদন দেওয়া যায় না।
উদ্বোধনী পর্ব শেষে সেমিনারের প্রথম অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। ‘প্রকাশনার ক্ষেত্রে স্বাধীনতা’ শিরোনামে এই সেশনের সভাপতিত্ব করেন প্রাবন্ধিক ও মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি মফিদুল হক।
আলোচনায় অংশ নেন রিচার্ড চার্কিন, বিশিষ্ট গবেষক-লেখক এবং আওয়ামী লীগের সভাপতিম-লীর সদস্য নূহ-উল-আলম লেনিন, বেন স্টুয়ার্ড, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব হেদায়েতুল্লাহ আল মামুন, কথাসাহিত্যিক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম। স্বাগত বক্তব্য রাখেন জ্ঞান ও সৃজনশীল প্রকাশক সমিতির নির্বাহী পরিচালক কামরুল হাসান শায়ক।
নূহ-উল-আলম লেনিন তার লিখিত বক্তব্যে বাংলা মুদ্রণ শিল্পের এবং প্রকাশনার সংক্ষিপ্ত ইতিহাস তুলে ধরেন। তিনি ঔপনিবেশিক আমলে চিন্তা, বাক-ব্যক্তি স্বাধীনতার ওপর শাসকগোষ্ঠীর আক্রমণ ও নির্যাতনের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে বলেন, ভাষা আন্দোলনের ভেতর দিয়ে সূচিত রেনেসাঁর অনিবার্য পরিণতি বাংলাদেশের স্বাধীনতা। বাংলাদেশের অভ্যুদয় চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতাকে সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদে নিশ্চিত করেছে। এদেশে প্রকাশনার স্বাধীনতা প্রায় নিরঙ্কুশ।
গত ২৫ জুন ছিল সেমিনারের শেষ দিন। এদিন ৩টি অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। এগুলো হলোÑ ‘দেশীয় প্রকাশনার আন্তর্জাতিকীকরণ’, ‘প্রকাশনায় নারী’ ও ‘প্রকাশনার ক্ষেত্রে আঞ্চলিক সহযোগিতা’। এতে বিদেশি প্রকাশকদের মধ্যে অংশ নেন ভারতের মন্দিরা সেন ও ইমানুল হক, শ্রীলংকার দীনেশ কুলাতাঙ্গা এবং নেপালের লিখাত পান্ডে। ৩টি অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা, অধ্যাপক নিয়াজ জামান ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরী। এরপর সমাপনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন তথ্য-প্রযুক্তিবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক এমপি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *