বাংলাদেশ-ভারত ছিটমহল হস্তান্তর

বাংলাদেশের কাছে সম্মতিসূচক নথি হস্তান্তরের পর ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র বিকাশ স্বরূপ তার টুইট বার্তায় লিখেছেনÑ ‘এই মাহেন্দ্র ক্ষণটিকে শুধু ঐতিহাসিক বললেও কম বলা হয়।’ ৩১ জুলাই রাত ১২টা ১ মিনিট মানচিত্র বদলে যাওয়ার মুহূর্ত। ৬৮ বছরের ছিটমহল যুগের অবসানে উড়ল মুক্তির পতাকা। জ্বালানো হলো ৬৮টি মোমবাতি, গাওয়া হলো জাতীয় সংগীত। ছিটমহলবাসীর হাতে তুলে দেওয়া হলো জাতীয় পতাকা। মোট ১৬২টি ছিটমহল বিনিময় হলো দুদেশের মধ্যে। এর মধ্যে ১১১টি ছিটমহল পেল বাংলাদেশ, ভারত পেলো ৫১টি। বাংলাদেশের ভূ-খ-ের সাথে যুক্ত হলো ১৭ হাজার ১৬০ একর, ভারতে সংযুক্ত হচ্ছে ৭ হাজার ১১০ একর জমি। সেই সাথে বদলে গেল বাংলাদেশ এবং ভারতের মানচিত্র। ১৯৭৪ সালে ছিটমহল বিনিময়ে ইন্দিরা-মুজিব চুক্তি বাস্তবায়নের দাবিতে উভয় দেশের ছিটবাসীরা দীর্ঘদিন ধরে অভিন্ন কর্মসূচি পালন করে। এর ধারাবাহিকতায় ২০১১ সালে ঢাকায় হাসিনা-মনমোহন প্রটোকল স্বাক্ষরিত হয়। ২০১৩ সালে ভারতের কংগ্রেস সরকার ল্যান্ড বাউন্ডারি চুক্তির বিলটি পার্লামেন্টে উত্থাপনের চেষ্টা করলে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জীর আপত্তির মুখে বিলটি আলোর মুখ দেখেনি। নরেন্দ্র মোদি সরকার ক্ষমতায় আসার পর দুদেশের সম্পর্ক উন্নয়নে ছিটমহল বিনিময়ের কথা ওঠে, এতে মমতা ব্যানার্জী রাজি হলে ২০১৪ সালের ৪ ডিসেম্বর পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের এক জনসভায় ছিটমহলবাসীদের দুঃখ-দুর্দশা লাঘবে ছিটবিনিময়ে সম্মতি জানান। তাই মাসজুড়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো সরগরম ছিল ছিটমহল নিয়ে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় পরিবার, রংপুর তাদের ফেজবুক পেজে সজীব হোসাইন লিখেছেনÑ ‘বাংলাদেশের মানচিত্র বদলে যাওয়ার মুহূর্ত ৩১ জুলাই রাত ১২টা ১ মিনিট। ৬৮ বছরের ছিটমহল যুগের অবসানে উড়ল মুক্তির পতাকা।’
আনিসুর রহমান দেশকালডটবিডিতে লিখেছেনÑ ‘উভয় দেশের মধ্যে ঐতিহাসিক স্থল সীমান্ত বিল চুক্তি অনুমোদন হওয়ায় আস্থার সম্পর্ক ফিরে এসেছে। এই আস্থা চিরকাল অটুট থাকুক। সীমান্ত সুরক্ষিত হলে উভয় দেশের নিরাপত্তার জন্যই মঙ্গলজনক। ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে সীমানা বিতর্কের চির অবসান উভয় দেশের জন্য নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হলো।’
খুলনার সাংবাদিক বিএম সজীব তার ফেজবুক পেজে লিখেছেনÑ ‘ছিটবাসীরা নাগরিকত্ব পেয়ে মুক্ত বিহঙ্গের মতো ঘুরতে-ফিরতে পারবে। শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ সকল নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠিত হবে।’
ছিটমহলের বাসিন্দা মো. বেলাল হোসেন তার ওয়ালে লিখেছেনÑ ‘এতদিন আমরা নাগরিকত্ব পাওয়ার জন্য লড়েছি, এখন আমরা নাগরিক অধিকার আদায়ের জন্য লড়ব। আমরা সবাই একসাথে ছিলাম থাকব। আমরা সারাজীবন সত্যের পক্ষে আর মিথ্যার বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাব।’
অবনী ভূষণ জোরদার টুইট করেছেনÑ ‘দেশে আর রাজা-মহারাজাদের জুয়ার ফসল ছিটমহল হতে দেব না।’
সংবাদ মন্থন ব্লগে লিখেছেÑ ‘জীবনের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে ১০৬ বছরের আজগর আলী আবেগে আপ্লুত হয়ে যান এবং সন্তোষ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ‘সাতচল্লিশের স্বাধীনতা দেখেছি, এরপর একাত্তরের স্বাধীনতা দেখেছি, কিন্তু নিজে প্রকৃত স্বাধীনতা ভোগ করতে পারিনি। এবারে সেই অপেক্ষার অবসান হলো।’
ফুলবাড়ী উপজেলার কালিরহাট ছিটের বাসিন্দা মোজাফফর হোসেন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লিখেছেনÑ ‘দীর্ঘ বঞ্চনার পর মৌলিক অধিকারসহ নাগরিকত্বের পরিচয় নিয়ে বেঁচে থাকার আশায় আমরা ছিটবাসীরা উচ্ছ্বসিত। আশা করছি দ্রুত ছিটমহল বিনিময় করে ছিটবাসীর অবরুদ্ধ জীবনের অবসান ঘটেছে।’
বাংলামেইল২৪ডটকমের জেলা প্রতিনিধি সিরাজ-উদ্দৌলা ম-ল লিখেছেনÑ ‘মুক্তির আশায় উদ্বেলিত ছিটবাসী। ছিটবাসীরা নাগরিকত্ব পেয়ে মুক্ত বিহঙ্গের মতো ঘুরতে-ফিরতে পারবে। শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ সকল নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠিত হবে।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র মুনসুর হক টুইট করেছেনÑ ‘সুমতি হয়েছে মমতার।’
বিশ্বনিউজ ব্লগে লিখেছেÑ ‘বহুল আলোচিত ও দীর্ঘদিনের প্রতীক্ষিত স্থল সীমান্ত বিলটি পাস হওয়ায় মুক্ত জীবনের আশায় আনন্দে ভাসছে ছিটমহলবাসী। তাদের এ আনন্দ যেন ঈদের আনন্দ। একে আরেকের সঙ্গে ভাগাভাগি করে নিচ্ছেন আনন্দ-উল্লাস। সন্তানদের পড়ালেখা এবং নিজেদের পরিচয় দিতে আর কোনো সমস্যা নেই বলে ছিটমহলের বাসিন্দারা নতুন করে ভাবতে শুরু করেছেন।’
ইরান বাংলা রেডিও তাদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লিখেছেÑ ‘তারা একটি রাষ্ট্রীয় পরিচয় ও নাগরিকত্ব পাবে, স্বাধীনভাবে ঘুরতে-ফিরতে পারবে, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ সকল নাগরিক অধিকার ভোগ করতে পারবে। সীমান্তে আর মানুষ হত্যা হবে না, কাঁটাতারে আর কোনো ফেলানীর লাশ ঝুলবে না,  সীমান্ত এলাকার মানুষ নির্বিঘেœ ও নির্ভয়ে জীবনযাপন করতে পারবে।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *