বাংলাদেশ-ভারত স্থল সীমানা নিষ্পত্তি স্মৃতিচারণ ও আগামী দিনের ভাবনা

মসিউর রহমানঃ

ঔপনিবেশিক অভিশাপ মোচন
ভারত পার্লামেন্টের উভয় কক্ষÑ লোকসভা ও রাজ্যসভাÑ সীমান্ত নির্ধারণ প্রটোকল বাস্তবায়নের জন্য সংবিধান সংশোধন করেছে; সংশোধনী বিলের কেউ বিরোধিতা করেনি (মে ২০১৫)। উপমহাদেশ বিভাগের সময় সাইরিল র‌্যাডক্লিফ মানচিত্রে দাগ দিয়ে ভারত-পাকিস্তানের ভূ-খ- নির্ধারণ ও ভাগ করে। ভূ-বাস্তবতার সাথে (গ্রাউন্ড রিয়ালিটি) তার পরিচয় ছিল না। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পরে উপমহাদেশ থেকে ঔপনিবেশিক ক্ষমতা দ্রুত তুলে নেওয়ার তাগাদা ছিল। সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে ভারত সরকার ঔপনিবেশিক শাসনকর্তাদের রেখে যাওয়া ৬৮ বছরের সমস্যার সমাধান করল।
নুন-নেহেরু চুক্তিতে (সেপ্টেম্বর ১৯৫৮) এই সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করা হয়। পাকিস্তান ও ভারতে বৈরী সম্পর্ক সমাধানের অনুকূল ছিল না। সমস্যাটি ছিল মূলত তৎকালীন পূর্ব বাংলা বা পূর্ব পাকিস্তান এবং সংলগ্ন ভারতের অঙ্গরাজ্যসমূহের (পশ্চিমবঙ্গ ও আসাম; পরবর্তীতে আসাম অনেক অঙ্গরাজ্যে বিভক্ত হয়েছে)। পূর্ব বাংলার সমস্যা সমাধানে পাকিস্তান কেন্দ্রীয় সরকারের আন্তরিকতার ঘাটতি ছিল।
স্বাধীনতার (১৯৭১) পর বাংলাদেশ সরকার বিষয়টি ভারত সরকারের সাথে উত্থাপন করে। ১৯৭৪ সালে অনুষ্ঠিত ইন্দিরা-মুজিব শীর্ষ বৈঠকে সীমান্ত নির্ধারণ চুক্তি সাক্ষরিত হয় (১৬ মে ১৯৭৪)। বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ চুক্তিটি অনুসমর্থন (ratification) করে। ভারতের সুপ্রিমকোর্ট জানান যে, চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য সংবিধান সংশোধন দরকার, কারণ ভারতের অন্তর্ভুক্ত বা অপদখলভুক্ত স্থান বাংলাদেশকে দিয়ে দেওয়া হবে। তারপর থেকেই বিষয়টি অমীমাংসিত থেকে যায়।
বঙ্গবন্ধুর সফরসঙ্গী
বঙ্গবন্ধুর বিদেশ সফরে রেহানা সঙ্গী হতো। জাপানে রেহানা সফরসঙ্গী ছিল, আর ছিল রাসেল। বঙ্গবন্ধুর পরিবারের সাথে আমাদের সম্পর্কের মধ্যে কখনও আনুষ্ঠানিকতা বা প্রটোকলের বাধা অনুভব করিনি। আমরা যেন পরিবারের সদস্য! বঙ্গবন্ধুর পরিবারের আচরণই ছিল বড় গৃহস্থ পরিবারের মতো। আত্মীয় কাছের-দূরের যাই হোক, ঘরে এলে একই সমাদর।
১৯৭৪ সালে বঙ্গবন্ধুর সাথে যারা দিল্লিতে যান তাদের অনেকেই আজ বেঁচে নেই। মন্ত্রীগণ বর্ষীয়ান রাজনৈতিক নেতা ছিলেন, তারা আজ জীবিত নেই। প্রবীণ কর্মকর্তাদের মধ্যেও অনেকে জীবিত নেই। প্রধানমন্ত্রীর সচিব রফিক উল্লা চৌধুরীÑ রফিক ভাইয়ের কথা মনে পড়ে। স্বাধীন বাংলাদেশে রফিক উল্লা চৌধুরী প্রথম এই পদে নিযুক্ত হন। আসাফুদ্দৌলাÑ কলি ভাইÑ জীবিত; সংগীত ও নানাবিধ জ্ঞানচর্চায় নিবেদিত। অন্যান্য যারা বেঁচে আছেন, জীবন-জীবিকার তাগিদে এবং অনেক ক্ষেত্রে আত্ম-প্রতিষ্ঠা বা অহংবোধের প্রমাদে বৃন্তচ্যুতÑ বৃত্তত্যাগীÑ ব্রাত্য।
বঙ্গবন্ধুর সাথে অন্যদের মধ্যে ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব তোয়াব খানÑ তোয়াব ভাইÑ জনকণ্ঠ সম্পাদনা করছেন। পত্রিকাটি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে নিবেদিত। বঙ্গবন্ধুর একান্ত সচিব হিসেবে আমি সফরসঙ্গী ছিলাম। বঙ্গবন্ধুর মেয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে কাজ করছি। ১৯৭৪ সালে বঙ্গবন্ধুর একান্ত সচিব হিসেবে তার সাথে দিল্লি যাই। ২০১০ সালে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা হিসেবে শেখ হাসিনার সাথে দিল্লিতে যাই এবং যৌথ ইশতেহার প্রণয়নে অংশ নেই। পিতা-পুত্রীর সাথে মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষে কাজ করার সৌভাগ্য বিরল!

ইন্দিরা-মুজিব শীর্ষ বৈঠক ১৯৭৪
১৯৭৪ সালে ইন্দিরা-মুজিব শীর্ষ বৈঠকের সময় বঙ্গবন্ধুর সফর সঙ্গীদের সবার মনে ইন্দিরা গান্ধীকে দেখার ও তার সাথে পরিচিত হওয়ার ইচ্ছে ছিল প্রবল। আনুষ্ঠানিক বৈঠকের দিন আমরা কয়েকজন বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিগত কর্মকর্তা হিসেবে তার সাথে আলোচনার জন্য নির্ধারিত কক্ষে যাই। তার সাথে যাওয়া এবং কাগজপত্র গুছিয়ে দিয়ে আসা সাধারণ আচারের অংশ। বঙ্গবন্ধু কক্ষে ঢুকলে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী তাকে অভিনন্দন জানান। প্রধানমন্ত্রী সংক্ষেপে আমাদের তার সাথে পরিচিত করান। আমরা সম্মান জানাই; শ্রীমতি গান্ধী নমস্কারের জোড়া হাত খোলার ফুরসৎ হয়নি। আনুষ্ঠানিক আলোচনায় যারা অংশগ্রহণ করবেন তারা নির্ধারিত আসন গ্রহণ করেন।
সাংবাদিক-ফটোগ্রাফার উপস্থিত ছিলেন। ৪-৫ মিনিট পর ইন্দিরা গান্ধী তাদের আর থাকার প্রয়োজন আছে কি-না জানতে চান। প্রশ্নটি আলঙ্কারিক অর্থাৎ, তাদের যাওয়ার সময় হয়ে গেছে, এবার মূল আলোচনা শুরু হবে। সাংবাদিকদের সাথে আমরাও চলে আসি, থাকলেন শুধু যারা আনুষ্ঠানিক আলোচনায় অংশ নেবেন। মিসেস গান্ধীর কণ্ঠে গাম্ভীর্য ও কর্তৃত্ব ধ্বনিত।
মূল আলোচনার সময় আনুমানিক আড়াই ঘণ্টা। বঙ্গবন্ধুর কয়েকজন ব্যক্তিগত কর্মকর্তা, আমি এবং আরও দু-একজন সফরসঙ্গী আলোচনা শেষ হওয়ার সময় আন্দাজ করে দরজার বাইরে হাজির ছিলাম। বঙ্গবন্ধুকে সাথে নিয়ে আমরা তার কামরায় যাই। কয়েক মিনিট পরে অন্য সবাই চলে যায়। প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব তোয়াব খান এবং আমি বঙ্গবন্ধুর সাথে থেকে যাই। তোয়াব ভাই সাংবাদিক সম্মেলন এবং পরবর্তী দু-একটি অনুষ্ঠান সম্পর্কে আলাপ করেন; যতদূর মনে পড়ে, তিনিও কক্ষ ত্যাগ করেন। বঙ্গবন্ধুর যদি আর কোনো নির্দেশ থাকে, তা  জানার জন্য আমি অপেক্ষা করি। বঙ্গবন্ধুর একান্ত সচিব হিসেবে এই দুর্লভ সুযোগের অধিকারী হয়েছিলাম!
বঙ্গবন্ধুর অভিব্যক্তি এত সময় ছিল গাম্ভীর্য ও হাসিখুশি মিলানো। সবাই কক্ষ ত্যাগ করার পরে আমার মনে হয় গাম্ভীর্যটাই স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
“মিসেস গান্ধীকে কি বলেছি জানো? ছিটমহল আর অপদখলের সব জায়গা ছেড়ে দিতে হবে। ভারত অনেক বড় দেশ, আর কত জায়গা দরকার? কারো সাথে বিলি-বন্দোবস্তের জন্য আমি বাংলাদেশ স্বাধীন করিনি।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা ছিল আমার মৃত্যুপণ।”
কথাগুলো ছিল বঙ্গবন্ধুর স্বগতোক্তি। আমি উপস্থিত ছিলাম, তাই শব্দগুলোর লক্ষ্য, না হলে তার নিজের মনেই অনুরণন করত।
“মিসেস গান্ধী কি বলল জানো? Sheikh Saheb, you are immortal.”
শেখ সাহেব অমর!
মিসেস গান্ধীর উত্তরে বঙ্গবন্ধুর প্রতি তার শ্রদ্ধা এবং স্বাধীন বাংলাদেশে তার নেতৃত্বের আবশ্যকতা স্পষ্ট। পাকিস্তানের মৃত্যুকূপ থেকে বঙ্গবন্ধু ফিরে এসেছেন, তিনি তো অমর! বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংহত রাখতে এবং বিরোধী ক্ষমতা বা বালখিল্য বিরোধিতা মোকাবিলার জন্য বঙ্গবন্ধুর বলিষ্ঠ ও সর্বজনগ্রাহ্য নেতৃত্বের একান্ত প্রয়োজন ছিল।
বঙ্গবন্ধু ভারতের বিদেশমন্ত্রী শরণ শিং-এর প্রশংসা করেন। বাংলাদেশ সম্পর্কে তার জ্ঞান এ দেশের অভিজ্ঞ-দেশপ্রেমিক রাজনীতিকদের সাথে তুলনীয়। শরণ শিং দীর্ঘদিন বিদেশমন্ত্রী ছিলেন, মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে বাংলাদেশ ঘিরে আবর্তিত হয়েছে ভারতের পররাষ্ট্রনীতি। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রতি নিষ্ঠা ও তাদের জ্ঞানের প্রসারতা ও গভীরতা বাড়িয়েছিল। শরণ শিং ও অন্যান্য সবার দৃষ্টিভঙ্গি ছিল ইতিবাচক : কোনো সমস্যাকে অনিষ্পন্ন রেখে অথবা অনিষ্পন্ন সমস্যার ব্যবহার করে সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশকে যেন অসুবিধায় ফেলা না হয়।
মূল আলোচনার পর মন্ত্রীগণ এবং কর্মকর্তারা চুক্তির খুঁটিনাটি এবং খসড়া চূড়ান্ত করেন। উভয় পক্ষই চূড়ান্ত খসড়া তাদের প্রধানমন্ত্রীকে দেখান, অমীমাংসিত বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করেন। আমার যতদূর মনে পড়ে, প্রধানমন্ত্রীদ্বয় এই খসড়ার খুঁটিনাটি বিষয়গুলো মন্ত্রী ও কর্মকর্তাদের ওপর ছেড়ে দিয়েছিলেন। যে দু-একটি জটিল বিষয় অমীমাংসিত ছিল, প্রধানমন্ত্রী পর্যায়ে তা নিষ্পত্তি হয়। তারা অপরাহ্নে বেশ কিছু সময় একান্তে আলাপ করেছিলেন। নিজের দেশ এবং বিদেশের সাথে কি সম্পর্ক হবেÑ তা নিয়ে বঙ্গবন্ধুর ধারণা ছিল প্রাঞ্জল।
দিল্লি থেকে ফেরার দু-তিন দিন পরে শ্রীমতি গান্ধী বঙ্গবন্ধুকে টেলিফোন করেন। সাধারণ টেলিফোনে সংযোগ পাওয়া দুষ্কর ছিল। উচ্চপর্যায়ে কথা বলার জন্য সরাসরি টেলিফোন যোগাযোগ ব্যবস্থা ছিল। দুই প্রধানমন্ত্রীর টেলিফোন সংযোগের রাষ্ট্রাচার ছিল জটিল। দুজনের কেউ আগে টেলিফোনে আসবেন না, দুজনই একসাথে কথা বলবেন। আমি বঙ্গবন্ধুর সাথে ছিলাম, এই জটিল দায়িত্বটি আমার ওপর বর্তায়। বঙ্গবন্ধুর কাছে রিসিভার এনে অন্য প্রান্তের ব্যক্তিকে মিসেস গান্ধীকে রিসিভার দেওয়ার অনুরোধ জানাই। সে এবং আমি একই সময় প্রধান কুশীলবের হাতে রিসিভার দেই। আমি দূরে সরে যাই। দুই প্রধানমন্ত্রীর গুরুত্বপূর্ণ কথায় আঁড়িপাতা নীতির পরিপন্থী, সহকর্মী আমলাদের জন্য অমার্জনীয়।
দূরে দাঁড়িয়ে থাকলাম, কথা শোনা যায় না এমন দূরত্ব রেখে। কথা শেষে ফিরে আসার জন্য বঙ্গবন্ধু ইশারা করেন। ফিরে এলে তার স্বগতোক্তিÑ
“মিসেস গান্ধী কি বলল জানো?”
আমি নিশ্চুপ। বঙ্গবন্ধুর স্বগতোক্তিÑ
“সেদিন দুপুরে খাবার না খেয়েই আপনি চলে গেছেন। আমাদের আতিথেয়তার ঘাটতি হয়েছে। উচিত ছিল দুপুরে খাবার পরে আপনাদের যেতে দেয়া।”
কথাগুলো শুনতে মামুলি; কিন্তু সৌজন্য ও শ্রদ্ধায় ভরপুর। দুপুরের আগে দিল্লি ছাড়ার কারণ ছিল সন্ধ্যার আগে ঢাকায় পৌঁছতে হবে। দিল্লি যাতায়াতের জন্য ব্যবহার করা হয়েছিল ‘বলাকা’ নামে একটি ছোট উড়োজাহাজ। রাশিয়া ফেডারেশনের উপহার। দিল্লি-ঢাকা পথ পাড়ি দিতে লাগে সাড়ে ৪-৫ ঘণ্টা। অনিশ্চিত আবহাওয়া এড়াতে এবং সন্ধ্যার আগে পৌঁছানোর জন্য তাড়াহুড়া।

বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক : সিভিল লিয়াজোঁ
অফিসার ও সৈন্য প্রত্যাহার
মিসেস গান্ধীর আচরণে সব সময় বঙ্গবন্ধুর প্রতি শ্রদ্ধা ও তার নেতৃত্বের প্রতি আস্থা প্রকাশ পেয়েছে। তার দুটি দৃষ্টান্ত আমি উল্লেখ করছি। দৃষ্টান্ত দুটি আমার প্রধানমন্ত্রীর একান্ত সচিব পদে যোগদানের আগের।
স্বাধীনতার অব্যবহিত পর বাংলাদেশের প্রশাসন ব্যবস্থা অবিন্যস্ত। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে প্রশাসন বড় ধরনের আঘাত পেয়েছে; যে সকল কর্মকর্তা পূর্ব পাকিস্তানে কাজ করেছেন তাদের সকলের বিশ্বস্ততা বা আনুগত্য নিঃসংশয় ছিল না। ভারত কিছুদিনের জন্য সিভিল লিয়াজোঁ অফিসার নিয়োগ করে; কিন্তু তা অচিরেই বন্ধ হয়ে যায়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষার জন্য প্রয়োজন হতে পারে বিবেচনা করে সীমিত সংখ্যক সেনা এ দেশে থেকে যায়। বঙ্গবন্ধু তাদের অচিরে প্রত্যাহারের জন্য অনুরোধ জানান। ইন্দিরা গান্ধী এই অনুরোধ নিয়ে কোনো প্রশ্ন ওঠাননি। বঙ্গবন্ধুর চাহিদামতো অতি দ্রুত ভারতীয় সৈন্য প্রত্যাহার করেন।

বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক : সীমান্ত বাণিজ্য
শুরু না হতেই নাকচ
স্বাধীনতার পর ভারতের সাথে ২৫ বছর মেয়াদি বাণিজ্য চুক্তি হয়। ভারতীয় রুপিতে লেনদেনের ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত ছিল। বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা ও ডলারের অভাব এবং আন্তর্জাতিক বাজারে ডলারের অস্থিরতা ছিল এই বাণিজ্য চুক্তির যৌক্তিকতা। শিল্প-বাণিজ্যে রাষ্ট্র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবেÑ এই নীতি তখন ছিল স্বাভাবিক। সীমান্ত বাণিজ্যের জন্যও চুক্তি ছিল। আমি তখন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের উপ-সচিব; ভারতের সাথে (ও অন্যান্য দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য চুক্তি) আমার দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত।
সীমান্ত বাণিজ্য চুক্তির শর্তাদি ছিল ঋজু ও সংকীর্ণ। সীমান্তের ১৬ কিলোমিটারের মধ্যে সীমান্ত বাণিজ্য সীমিত থাকবে; স্থানীয় পণ্য এবং মাথায় যে পরিমাণ বোঝা নেওয়া যায় (খোলা টুকরিতে)Ñ মূলত কৃষি পণ্যÑ বেচাকেনা হবে; সীমান্ত ব্যবসায়ীদের বিশেষ সনদ দেওয়া হবে যেখানে তাদের পরিচয় ও বাণিজ্যিক তথ্যাদি লিপিবদ্ধ থাকবে। চুক্তির শর্ত অনুসারে সীমান্ত বাণিজ্য শুরু হয়নি। স্বাধীনতাবিরোধী ও অতিবাম বা শিশুবাম গোষ্ঠী (infantile left) এবং জনতোষণকারী (populist) রাজনীতিবিদগণ সীমান্ত বাণিজ্যকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অপপ্রচার শুরু করে।
বাণিজ্য চুক্তির শর্তানুসারে চুক্তি কার্যকর হওয়ার ছয় মাস পর প্রথম পর্যালোচনা হয়। আলোচনার প্রধান উদ্দেশ্য চুক্তি বাস্তবায়নের অন্তরায় চিহ্নিত করা এবং তা দূর করার উদ্যোগ নেওয়া। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ব্রিফে সীমান্ত বাণিজ্য কীভাবে কার্যকর করা যায় তার উল্লেখ ছিল। মন্ত্রণালয়ের ব্রিফ বাণিজ্য সচিব এসএ খায়ের অনুমোদন করেছিলেন। বাণিজ্যমন্ত্রী এমআর সিদ্দিকী অসুস্থ ছিলেন, তার সাথে আলাপের সুযোগ হয়নি। বাণিজ্য সচিব এসএ খায়ের প্রধানমন্ত্রীকে টেলিফোন করলেন, রাত তখন প্রায় ১১টা। প্রধানমন্ত্রী জানালেন আর একটু দেরি হলে তার সাথে কথা বলা যেত না, তার শোয়ার সময় হয়েছে। সচিব মূল বিষয়গুলো সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রীকে অবহিত করলেন। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ : সীমান্ত চুক্তি অবলুপ্ত হবে।
আমরা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে আমাদের ব্যাখ্যা জানালাম। মুক্তিযুদ্ধের সময় দুই দেশের সীমান্ত কার্যত অবলুপ্ত হয়ে গেছে, পুলিশ বা সীমান্ত গার্ডের পাহারা দিয়ে তখনও সীমান্ত পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা যায়নি বা অচিরে তা সম্ভব হবে না। মুক্তিযোদ্ধারা এই সীমান্ত দিয়ে সহজে পারাপার করেছেন, দেশের অভ্যন্তরে ঢুকে দেশ মুক্ত করেছেন। সমালোচনাকারীগণ মুক্ত সীমান্ত দিয়ে পণ্য পরিবহনকে চোরাচালানের সাথে গুলিয়ে ফেলছে। বঙ্গবন্ধু ধৈর্যের সাথে শুনলেন। তিনি আমাদের ব্যাখ্যা প্রত্যাখ্যান করলেন না; কিন্তু সীমান্ত বাণিজ্য অবলোকনের নির্দেশ পুনর্বহাল করলেন; অন্যান্য সকল বিষয়ে কর্মকর্তাদের বিচার বিবেচনা মেনে নেওয়ার নিশ্চয়তা দিলেন।
তখন প্রশাসনিক ব্যবস্থা এরকমই ছিল। সচিব এবং উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাগণ (যুগ্ম সচিব, বিভাগীয় প্রধান ইত্যাদি) অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতেন। মন্ত্রী ও রাজনৈতিক নেতারা তাদের ওপর আস্থা রাখতেন; তাদের বিচার-বুদ্ধি মেনে নিতেন; মতপার্থক্য থাকলে আলাপ-আলোচনা করে নিষ্পত্তি করতেন; রাজনৈতিক বিষয়ে সচিব-আমলাদের পরামর্শ-নির্দেশ দিতেন। প্রশাসনের নৈমিত্তিক ও পদ্ধতিগত বিষয়ে তারা খুব বেশি সময় ব্যয় করতেন না। সবার ওপরে ছিলেন বঙ্গবন্ধু। তিনি প্রধানমন্ত্রী ও বঙ্গবন্ধু : সরকারি কর্মকর্তাগণ সহজেই তার কাছে পৌঁছতে পারত, তাদের সুবিধা-অসুবিধা জানাতে পারত। রাজনীতি ও প্রশাসন ছিল বঙ্গবন্ধুর সুদৃঢ় ও ¯েœহবৎসল নেতৃত্বে সুসমন্বিত।

সুবিমল দত্তের শুভমতি
পরের দিন আলোচনার শুরুতে বাংলাদেশের দলনেতা বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব মোর্শেদ সীমান্ত চুক্তির বিষয়টি উত্থাপন করলেন। ভারতীয় দলের নেতা বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব রঘুপতি উত্তর দেন যে, বিষয়টি তার ব্রিফের অন্তর্ভুক্ত নয়, তিনি আলোচনা করতে অক্ষম। আলোচনা সেখানে থেমে যায়। বঙ্গবন্ধুকে বিষয়টি জানানো হয়; তিনি পূর্ব সিদ্ধান্তে অটল থাকেন।
যতদূর জেনেছিলাম অথবা এখন মনে করতে পারি, রঘুপতি রেলওয়ের ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন। ভারত সরকারে তখন একটা ব্যবস্থা চালু ছিল : ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিস (আইএএস) ক্যাডারের বাইরের অন্যান্য ক্যাডার বা বিভাগের সীমিত সংখ্যক কর্মকর্তা নির্ধারিত সময়ের জন্য ইউনিয়ন (ফেডারেল) সরকারের পদে কাজ করতে পারতেন। বাংলাদেশ-ভারত বাণিজ্য চুক্তি বাস্তবায়নের সাথে কৃষি মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব মি. রোজ সংযুক্ত ছিলেন। যতদূর মনে পড়ে, তিনি ইংরেজি সাহিত্যে এমএ, রেলওয়ে অ্যাকাউন্টস বা অডিট অ্যাকাউন্টস ক্যাডারের কর্মকর্তা, কেরালার অধিবাসী। ভারতের পক্ষে তিনি মাছ রপ্তানি-তদারকি করতেন।
ভারতের একটি করপোরেশন মাছ আমদানির দায়িত্বে ছিল। করপোরেশন প্রধান মৃণাল করগুপ্ত। (প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে পদার্থবিদ্যায় এমএসসি পাস করেছেন, আইএমএস অফিসারে। প্রথম পরিচয়ে করগুপ্ত ‘ঘটি বাংলায়’ কথা বললেন; আনুষ্ঠানিকতা কাটনোর পর ‘বাঙ্গাল-বাংলায়’। তার উচ্চারণে আঞ্চলিকতা আমার কানে বাধে। আদি বাড়ি ফরিদপুর।
আলোচনার অবসরে আমাদের একজন সহকর্মী (পরে বিশ্বব্যাংকের কর্মকর্তা) তার ক্যামব্রিজের স্মৃতি, অর্থনীতিবিদ জোয়ান রবিনসনের সাথে আলাপচারিতা, ইত্যাদি রঘুপতিকে শোনাচ্ছিলেন। রঘুপতি মনোযোগ দিয়ে শুনছিলেন এবং মাঝে মাঝে আরও কিছু জানতে চাচ্ছিলেন। নস্টালজিয়া তাকে প্রভাবিত করেছিল। একসময় মন্তব্য করলেনÑ ক্যামব্রিজের অনেক পরিবর্তন হয়েছে, চল্লিশ-পঞ্চাশ দশকে এর অনেক কিছুই ছিল না। তিনি তখনকার ক্যামব্রিজের সাথে পরিচিত (হয়তো পড়েছেন)। আলোচনা শুরু হওয়ার সময় চলে এসেছে। তাদের নস্টালজিয়া রোমন্থন সেখানেই শেষ।
ভারতের হাইকমিশনার সুবিমল দত্ত উভয় দেশের প্রতিনিধিদের সম্মানে নৈশভোজের আয়োজন করেছিলেন। প্রতিনিধি দলের বাইরেও অনেকে আমন্ত্রিত ছিলেন। অতিথিদের সাথে কিছু সময় আলাপের পরে তিনি উধাও, ফিরে এলেন ৩০-৪০ মিনিট পর। রঘুপতিও কিছু সময়ের জন্য অদৃশ্য ছিলেন। দত্ত ফিরে এসে বললেন, সীমান্ত বাণিজ্য চুক্তি বাংলাদেশ সরকারের চাহিদা অনুসারে নাকচ হবে। অতিথিদের চোখের আড়ালে থাকার সময় ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সাথে তিনি আলোচনা করেছিলেন। মিসেস গান্ধীর নির্দেশ ছিল, শেখ সাহেবের ইচ্ছা যেন মেনে নেওয়া হয়, তার নেতৃত্ব ও বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক নিয়ে কোনো রকম প্রশ্ন বা বিতর্ক সৃষ্টি হয় এমন কিছু করা হবে না।
সুবিমল দত্তের পরিচয় নিয়ে আমার কৌতূহল ছিল। তিনিও তার বাঙ্গাল-জীবনকথা সহাস্যে বলতেন। মূল বাড়ি চট্টগ্রামে; আইসিএস (আইএএস) অফিসার; ১৯৪৭ সালের আগে যশোরের জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন; সোহরাওয়ার্দী যখন বাংলার প্রধানমন্ত্রী, তখন কৃষি বিভাগের সচিব; তার মন্ত্রী গোফরান সাহেব, নোয়াখালী থেকে নির্বাচিত বাংলার সংসদ সদস্য। উপমহাদেশ বিভাগের সময় সুবিমল দত্ত ও ইকরামউল্লাহ নথিপত্র ভাগাভাগি নিয়ে কাজ করেছেন।

স্থল সীমানা প্রটোকল
২০১১ সালের সেপ্টেম্বরে ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং ঢাকায় আসেন এবং তখন সীমান্ত প্রটোকল স্বাক্ষরিত হয় (৬ সেপ্টেম্বর ২০১১)। প্রটোকলটি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় না স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় স্বাক্ষর করবে তা নিয়ে মতপার্থক্য ছিল। বিদেশে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা বাংলাদেশের সকল মন্ত্রণালয়ের পক্ষে স্বাক্ষর করতে পারেন, বিশেষত, যদি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কোনো কর্মকর্তা উপস্থিত না থাকেন। দেশের ভিতরে স্বাক্ষরিত হলে, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা স্বাক্ষর করেন। উভয় দেশের মন্ত্রী উপস্থিত থাকলে তারাও স্বাক্ষর করতে পারেন। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় না পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় স্বাক্ষর করবে, তা নিয়ে মতভেদ ছিল। এই মতপার্থক্যের জন্য শেষ পাতার দুটি পাঠ (ঃবীঃ) তৈরি করা হয়Ñ একটিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের স্বাক্ষরের ব্যবস্থা, অন্যটিতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের স্বাক্ষরের ব্যবস্থা। উভয় পাঠ পররাষ্ট্র সচিবের হাতে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী দলিলটি স্বাক্ষর করেন।
প্রধানমন্ত্রীর আন্তর্জাতিক উপদেষ্টা ড. গওহর রিজভী ও দিল্লিতে নিযুক্ত হাইকমিশনার তারেক করিম সীমান্ত নির্ধারণ বিষয়ে মনোযোগী ছিলেন। বিশদ কাজ করেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব ড. কামাল আহমদ (বর্তমানে পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের সচিব)। কামাল অনেক সময় জানিয়েছে, তার অনেক সহকর্মী ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাকে নিরুৎসাহিত করেছে; মাঠপর্যায়ের ভারতের কর্মকর্তাদের কাছ থেকেও অনেক সময় সহযোগিতার অভাব অনুভব করেছে। আমরা তাকে উৎসাহ ও সাহস জোগান দিয়েছি। কামাল অত্যন্ত প্রশংসনীয় দক্ষতা ও নিষ্ঠার সাথে তার দায়িত্ব পালন করে, যা স্বীকৃতি পাওয়ার উপযুক্ত।
কামালকে যারা নিরুৎসাহ করে, তাদের ধারণা সকল শ্রম বৃথা যাবে; ভারতের ওপর আস্থা রাখা যায় না। বঙ্গবন্ধু নিহত হওয়ার পর, জিয়াউর রহমান-বিএনপি-জামাত আমলে এরকম একটা ধারণার প্রচার ও প্রসার হয়। তারা দ্বি-জাতিতত্ত্বের ভূত থেকে মুক্ত হতে পারেনি। বাংলাদেশের ভূ-খ-কেও ভারতের নাশকতাবাদীদের ব্যবহার করতে দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দিল্লি যাওয়ার আগে পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মনির নেতৃত্বে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা হয়, সেখানেও অনেকে এরকম ভাবনা প্রকাশ করেন। তাদের ভাষা ও কণ্ঠস্বরে অবশ্য ফরেনসিক দক্ষতা ছিল লক্ষণীয়। তাদের উদ্দেশে আমি একসময় বলিÑ “পুরনো নথি দেখে কথা বলবেন না, সময় ও নেতৃত্ব বদলেছে, সম্পর্কও বদলাবে।” সভা পরিচালনায় দীপু মনির নৈপুণ্যের পরিচয় ছিল।
আমার প্রধান দায়িত্ব ছিল বাংলাদেশ-ভারত ও উপ-আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সহযোগিতা। সীমান্ত নির্ধারণ প্রটোকল বিষয়ে আমি আমার ব্যক্তিগত ভূমিকা সীমিত রাখি; সংকট মুহূর্তে ও জটিল বিষয় গহর, করিম ও কামালের পরামর্শ শুনে মীমাংসায় অংশ নিয়েছি, প্রয়োজন অনুসারে সিদ্ধান্তের দায়িত্ব নিয়েছি। কাজ করতে করতে কখন আমরা বন্ধুত্বের সম্পর্কে জড়িয়ে গেছি খেয়াল করিনি। ওরা আমার আপেক্ষিক বার্ধক্য সহজে মনে নেয়, আমি মানি ওদের তারুণ্য!
আমার সীমিত দায়িত্বের কারণÑ সম্ভবত, অধিক গুরুত্বপূর্ণ কারণ ছিল সরকারি দায়িত্ব বিভাজন সম্পর্কে আমার দীর্ঘ লালিত ধারণা। এক কাজÑ দুই বা একাধিক কর্মকর্তা পালন করেন দুটি কারণে : প্রয়োজনের তুলনায় অধিক সংখ্যক লোক নিযুক্ত হয়েছে; ঊর্ধ্বতন বা নতুন পদের দায়িত্ব পালনের জন্য কর্মকর্তা যোগ্যতা অর্জন করেন না। তাই আগের কাজগুলোই কাটছাঁট, জোড়াতালি দিয়ে করে যান। সরকারের ব্যয় বাড়ে; কিন্তু সামগ্রিক কর্মক্ষমতা বাড়ে না। আমার দীর্ঘদিনের অভ্যাসÑ যে কাজ আরেকজন করছে, তা আমি করলে অন্তত একজন প্রচ্ছন্ন কর্মহীনÑ সে অথবা আমি। (অধিকাংশ সময় হয়তো আমি!)
ছিটমহল ও অপদখল জায়গায় শুমারির জন্য বেশ জটিল ও দীর্ঘ প্রশ্নপত্র তৈরি করা হয়। পূর্ব পুরুষের ভিটেমাটি ছেড়ে যেতে হবে, আমি যেখানে বাস করি সে দেশ আমার নয়Ñ এই বোধ অত্যন্ত বেদনাদায়ক। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর মহাপরিচালকের দায়িত্ব পালন করে আমি শুমারি এবং জরিপের কিছু অভিজ্ঞতা অর্জন করেছিলাম, যা কাজে লাগিয়ে প্রশ্নপত্র অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত করা হয়। কর্মকর্তা পর্যায়ের দ্বিমত ছিল; কিন্তু ভারতের উচ্চপর্যায়ে বিনা দ্বিধায় সংক্ষিপ্ত প্রশ্নপত্র গৃহীত হয়। (স্ট্রাটেজিক দিক-নির্দেশনা ও সমন্বয়ের জন্য একটি ব্যবস্থা কার্যকর ছিল।)
মাতা মুহুরী সীমানা নির্ধারণ নিয়ে কিছু সমস্যা ছিল। প্রচলিত আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুসারে নদী মাঝামাঝি সীমানা নির্ধারণ করা হয়। ১৯৪৭ বা ১৯৭১ সালের পর মুহুরী নদী পূর্ব পাকিস্তান এবং বাংলাদেশের ভিতরে সরে এসেছে, ফলে এই ভূ-খ-ের ওপর ভারতের দাবি প্রতিষ্ঠিত হয়েছেÑ অন্ততপক্ষে যুক্তি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। উপমহাদেশ বিভাগ অথবা বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার সময় নদী কোথায় ছিল তা নিশ্চিত করার জন্য অনন্ত সময় ব্যয় করা যেত, মীমাংসা হতো না, বন্ধুত্বসুলভ সহযোগিতা মরুভূমির মরীচিকা হয়ে অর্থহীন বিতর্কের বাসি-পচা খোরাক জোগাত। ভারতীয় পক্ষ তাদের দাবি ছেড়ে দেয়। আমরা একমত হই যে, নদীর পূর্ববর্তী অবস্থা অনুসারেই সীমানা নির্ধারিত হওয়া উচিত; চুক্তি বাস্তবায়নে অবহেলা বা কালক্ষেপণ সীমানা পরিবর্তন করবে না।
গতি পরিবর্তনের আগে ভারতে এবং বাংলাদেশে নদী কোথায় ছিল এরকম একটি ধারণার ভিত্তিতে র‌্যাডক্লিফ রেখা পুনরাঙ্কনÑ অথবা কল্পনা করেÑ সীমানা নির্ধারণ করা হয়। ভারত সরকারের একটি অফিস ও শ্মশান মাঝামাঝি জায়গায় পড়ে যায়; কল্পিত সীমারেখা অভ্রান্ত-অলঙ্ঘনীয় ধরলে নিরন্তর বিবাদ করা যায়। ভারতীয় পক্ষের অনুরোধ, ওই অফিস এবং শ্মশানটি যেন তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়। ভারতের অফিস আমাদের কোনো কাজে লাগবে না, শ্মশানটিও মুসলমানদের কোনো কাজে আসবে না। কল্পিত নদীকে সীমান্ত মানার পর এই অনুরোধ বন্ধুত্বসুলভ নিষ্পত্তির ইচ্ছে বলে মনে হয়। তারা কল্পিত রেখা না মানলেই, সব জায়গাই ভারতের দিকে পড়ত। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও মনমোহন সিং-এর মানবতাবোধ আমাদের প্রভাবিত করেছিল। রাষ্ট্র এবং রাষ্ট্রের সীমারেখা মানুষের দুঃখ বাড়াবে না, মানুষের কল্যাণ সবার ওপরে।
ভারতীয় পক্ষের প্রতি অবশ্য আমাদের কৌতুক উক্তি ছিলÑ
“আমরা জীবন দিয়ে প্রমাণ করেছি যে জিন্নাহ সাহেবের দ্বি-জাতিতত্ত্ব মিথ্যা, কিন্তু তার প্রভাব এখনও কাটেনি। আমাদের দেশের হিন্দুরাও শ্মশানে মৃতদেহ সৎকার করে, মৃত্যুর পর কেউ দেশত্যাগী হয় না, জাতীয়তা বা ন্যাশনালিটি বদলায় না।”
মৃতের একটি পরিচয় চিরস্থায়ী : সে মানুষ, একদা জীবিত ছিল।
বাংলাদেশ-ভারত সহযোগিতা/উপ-আঞ্চলিক সহযোগিতা উভয় দেশের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে পরিবীক্ষণ ও কৌশলগত দিক-নির্দেশনা (স্ট্রাটেজিক ডিরেকশন) দেওয়ার ব্যবস্থা ছিল, যার ফলে এই অনাবশ্যক তথ্যাধিক্য সমস্যা দূর করা সম্ভব হয়। তদুপরি, দীর্ঘদিনের বৈরী সম্পর্ক অথবা নিরুৎসুক সম্পর্ক নি¤œপর্যায়ের কর্মকর্তাদের বিভ্রান্তির সৃষ্টি করে; উচ্চপর্যায়ের নির্দেশনা ব্যতীত বাংলাদেশ-ভারত ও উপ-আঞ্চলিক সম্পর্ক স্বভাবিক ও উন্নত করা সম্ভব হতো না, সম্ভব নয়।

প্রধানমন্ত্রী মোদির রাজনীতি-অর্থনীতি
কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন ইউনাইটেড প্রগ্রেসিভ অ্যালায়েন্স সরকার সীমান্ত নির্ধারণের জন্য সংবিধান সংশোধন বিল পার্লামেন্টে আনে। সংখ্যা গরিষ্ঠতা না থাকার কারণে তখন বিলটি পাস হয়নি। লোকসভায় বিজেপি একক সংখ্যা গরিষ্ঠ দল; কিন্তু রাজ্যসভায় সংখ্যা গরিষ্ঠতা নেই। আসামে প্রাদেশিক সংসদের নির্বাচন আসন্ন। প্রদেশ-বিজেপি নেতৃত্ব সীমান্ত নির্ধারণকে কেন্দ্র করে কোনো বিতর্কে জড়াতে চায়নি। তারা আসাম বাদ দিয়ে বিলটি পাস করতে চেয়েছিল। কংগ্রেস তাতে বাধ সাধে। কংগ্রেসের দাবির প্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি আসাম বিজেপি দলের দাবি শেষ পর্যন্ত অগ্রাহ্য করেন।
কর্নাটক থেকে নির্বাচিত কংগ্রেস দলের লোকসভার সদস্য ড. শশী থারুর কিছু দিন আগে ‘হে উৎসব’ উপলক্ষে ঢাকায় এসেছিলেন। ১৯৭৫-৭৬ সালে ম্যাসাসুসেটস স্টেটের ক্যামব্রিজে আমরা দুজনই ছাত্র, তখন থেকে পরিচয়/বন্ধুত্ব। শশী অবশ্য অল্প বয়সেই ডক্টরেট করে ফেলে। তার সম্মানে নৈশভোজে ভারতীয় হাইকমিশনার আমাকে আমন্ত্রণ করেছিলেন। শশী বৈদেশিক নীতিবিষয়ক পার্লামেন্টারি কমিটির সভাপতি। জাতিসংঘের উচ্চপদ ছেড়ে দিয়ে কংগ্রেসে যোগ দিয়েছিল; ইউপিএ সরকারের বিদেশ প্রতিমন্ত্রী ছিলেন। সে আমাকে জানায়, পার্লামেন্টারি কমিটি সর্বসম্মতিক্রমে বিলটি (আসামসহ) সুপারিশ করেছে; বিলটি পাস করা এখন সরকারি দলের দায়িত্ব।
আমি সমান ন¤্রস্বরে দ্বিমত জানাই। কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন সম্মিলিত প্রগতিশীল জোট বিলটি প্রথমে উত্থাপন করেছিল; সে কমিটির সভাপতি; কেউ বিলের বিরোধিতা করলে বিলটি সমর্থনের এবং পাস করার চেষ্টার নৈতিক দায়িত্ব সে অস্বীকার করতে পারে না। শশী বলে যে জাতিসংঘে কাজ করে সে একটি গুণ রপ্ত করেছে : কি করে বহুজনের বহুমত দূর করে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা করতে হয়। তবে ভোটের সময় সব দেশ নিজের স্বার্থ বিবেচনায় ভোট দেয়, ক্ষমতাবান দেশগুলো অন্যদের প্রভাবিত করে।
আমাদের কথার মাঝে বিদেশি অর্থপুষ্ট একজন সুশীল সমাজ পরিচালিকা/নেত্রী আমাদের দুজনের মাঝে একটি চেয়ার ঠেলে দিয়ে তার স্বামীর জায়গা করে দিলেন। শশী মৃদুস্বরে ও মাথা নেড়ে বোঝাতে চাইল বিলটি পাস হওয়ার প্রতিবন্ধকতা সে আঁচ করে না। সুশীল নেত্রীর আচরণ আমাদের কথা থামিয়ে দেয়।
তার এই আচরণ অভিনব কিছু নয়। মানবাধিকার সংরক্ষণে নিবেদিত এনজিওদের সম্পর্কে মাইকেল ইগনেটিয়েফ সমালোচনামূলক উক্তি করেছেন। এনজিও কোনো বিশেষ গোষ্ঠীর অধিকার (অথবা অধিকার ভঙ্গের ঘটনা) কেন্দ্র করে কাজ করে, তাতে অন্য কোনো গোষ্ঠীর অধিকার ক্ষুণœ হলো কি-না (অথবা অধিকার ভঙ্গের ঘটনা) সেদিকে নজর দেয় না। মানবাধিকার সর্বজনীন ভাষায় প্রকাশ করা হয়েছে। এনজিও মানবাধিকারের সার্বজনীনতা এবং স্থান-কাল দ্বারা সীমিত অধিকার লঙ্ঘনÑ এ দুটোর মধ্যে পার্থক্য করতে পারে না, ভারসাম্য রাখতে পারে না। (Michael Ignatieff, 1. Human Rights as Politics, 2. Human Rights as Idoloatry, Tanner Lecture in Human Values, Princeton University Press, 2000)
উন্নয়নশীল দেশের মধ্যে সর্বোচ্য জনবহুল ও দীর্ঘতম সময় গণতন্ত্র চর্চাকারী একমাত্র দেশ ভারত। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ন্যায়সংগত যথাযথ ভূমিকা রাখার জন্য প্রয়োজন প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখা এবং তাদের সকল ন্যায়সংগত অধিকার মেনে নেওয়া। সীমান্ত ভূমি বিরোধের বেলায় যা সত্য, অভিন্ন নদীর ক্ষেত্রে তা আরও বেশি সত্য। নদীর ওপর অববাহিকার অধিবাসীদের অধিকার সর্বাগ্রে, তাদের জীবন-সমাজ গড়ে উঠেছে নদীকে কেন্দ্র করে। ভারতীয় ফেডারেশনে অঞ্চল (বা অঙ্গরাজ্য), বর্ণাশ্রম ও ধর্মগোষ্ঠী স্বার্থভিত্তিক রাজনীতি অনেক সময় আন্তর্জাতিক দায়িত্ব পালনের বাধা সৃষ্টি করে।
মোদির জীবনীকার মারিনো এই নীতিকে KHAM রাজনীতি নামে অভিহিত করেছেন। মোদিকে এই নীতি প্রভাবিত করতে পারেনি। সবার সমর্থন নিয়ে, সবার কল্যাণে পরিচালিতÑ মোদি এই নীতি অনুসরণ করেছেন। ক্ষত্রিয়, হরিজন, আদিবাসী ও মুসলিম জনগোষ্ঠীর আদ্যাক্ষর নিয়ে কঐঅগ শব্দটি গঠিত হয়েছে (Kshatriya, Harijan, Adivasi, Muslim) (Andy Marino, Narendra Modi : A Political Biography, Harper Collins Publishers Indian, 2014, pp.57-59)।
মোদি সরকার বিভাজনকারী রাজনীতির ঊর্র্ধ্বে উঠে ভারতের আন্তর্জাতিক দায়িত্বের প্রতি নিষ্ঠা দেখিয়েছেন। তার অর্জন লক্ষ্যভ্রষ্ট না হলে, উপ-আঞ্চলিক সহযোগিতা প্রসারিত ও সুদৃঢ় হবে, ভারত ও প্রতিবেশী দেশগুলো দ্রুত অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়ন অর্জন করবে এবং ভারতের আন্তর্জাতিক মর্যাদা ও প্রভাব বাড়বে।

অমর আত্মার ইচ্ছা অপূর্ণ থাকবে না
বাংলাদেশ-ভারত সীমানা বিবাদ নিষ্পত্তি নিয়ে শুরু করেছিলাম, সেখানে ফিরে যাই। প্রথম ঔপনিবেশিক শাসন আমলে যে সমস্যার শুরু, দ্বিতীয় ঔপনিবেশিক আমলে (অর্থাৎ পাকিস্তান আমলে) যার জটিলতা বাড়ে, তার সমাধানের পদক্ষেপ নেন বঙ্গবন্ধু, আর পরিপূর্ণতা পায় বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ হাসিনার সময়।
বঙ্গবন্ধু ছিলেন স্বাধীনতা সংগ্রামের সফল নেতা।
তার আত্মা অমর। অমর আত্মার ইচ্ছা অপূর্ণ থাকবে না!

জনান্তিক : স্মৃতিনির্ভর লেখায় ব্যক্তিগত অনুভূতি প্রবল থাকে, তাই অনেক জায়গায় নামের সাথে আনুষ্ঠানিক বা রাষ্ট্রাচারসিদ্ধ পরিচয় বাদ পড়েছে। আনুষ্ঠানিকতা বা রাষ্ট্রাচার গভীর অনুভূতি ও শ্রদ্ধায় ঢাকা পড়েছে।

লেখক : প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধুর একান্ত সচিব ছিলেন, অবসরপ্রাপ্ত সচিব, বর্তমানে প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক উপদেষ্টা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *